হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

পতাকা বদলেছে শাসন নয়

মুহাম্মদ ইফতেখার ফাহামি

দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা ছিল ১৯৪৭ সাল। ব্রিটিশ শাসনের অবসানের মধ্য দিয়ে জন্ম নিল দুটি নতুন রাষ্ট্র—পাকিস্তান ও ভারত। সিরিল র‍্যাডক্লিফের টানা সীমারেখার ওপর গড়ে উঠল নতুন দেশ; রক্তাক্ত সেই সময়ের বুক চিরেই উচ্চারিত হলো—‘আজাদি’। আজাদি কি সত্যিই এসেছিল, নাকি কেবল ব্রিটিশ শাসকের কাছ থেকে দেশীয় অভিজাতদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর হয়েছিল? ১৯৪৭ সালের উত্তরাধিকার বিচার করতে হলে এই অস্বস্তিকর প্রশ্নটিকেই সামনে আনতে হবে, কারণ পতাকা বদলালেই আজাদি আসে না; আজাদি তখনই অর্থবহ হয়, যখন জনগণ নিজেদের শাসন করতে পারে। কোনো জাতিই শোষক বা উপনিবেশবাদীর সঙ্গে টেবিলে বসে প্রকৃত আজাদি অর্জন করেনি। তাহলে ১৯৪৬ সালের ক্যাবিনেট মিশন প্ল্যানের মাধ্যমে আমরা কী পেয়েছিলাম? পরিকল্পনাটি ব্যর্থ হয়ে ১৯৪৭ সালের দেশভাগকে ত্বরান্বিত করে। রাষ্ট্র নতুন হলেও ঔপনিবেশিক কাঠামো অক্ষত থাকে; ব্রিটিশদের আইন, আমলাতন্ত্র, সেনাবাহিনী ও প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান বহাল থাকে। ১৯৪৭ সাল থেকে এখন পর্যন্ত দক্ষিণ এশিয়ার মানচিত্র ও রাজনীতি বদলালেও উপনিবেশবাদের মূল কাঠামো রয়ে গেছে।

ব্রিটিশ উপনিবেশবাদ নিয়ে আলোচনা করলে তা সহজে শেষ করা সম্ভব নয়। তাই এখানে পুলিশ সার্ভিস নিয়ে আলোচনা করতে চাই, কারণ এই প্রতিষ্ঠান সমাজ, রাষ্ট্র ও রাজনীতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। এ বিষয়ে পড়াশোনা শুরু করতে গিয়ে একটি অদ্ভুত মিল লক্ষ করি—পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও ভারতের পুলিশ সার্ভিসের আইনি ভিত্তি মূলত ১৮৬১ সালের পুলিশ আইন। পাকিস্তান ও ভারতে এর সংস্কার হলেও বাংলাদেশে এই আইন এখনো কার্যকর। সমস্যা কেবল এই নয় যে, আইনটি ব্রিটিশদের প্রণীত; কারণ ব্রিটিশদের নির্মিত ইংল্যান্ডের পুলিশব্যবস্থা বিশ্বের অন্যতম উন্নত পুলিশব্যবস্থা। আসল প্রশ্ন হলো, ব্রিটিশরা আমাদের কোন চোখে দেখত? কারণ শাসক তার শাসিতকে যেভাবে দেখে, তার আইন ও প্রতিষ্ঠানও সেভাবেই নির্মাণ করে। ব্রিটিশদের চোখে আমরা ছিলাম অধীনস্থ ও উপনিবেশিত জনগোষ্ঠী; ১৮৬১ সালের পুলিশ আইনও জনগণের সেবা বা নিরাপত্তার জন্য নয়, বরং নিয়ন্ত্রণ ও শাসন করার জন্য তৈরি হয়েছিল। এই আইন ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার ও কেন্দ্রীভূত নিয়ন্ত্রণমূলক কাঠামোর কারণে সমালোচিত। জনকল্যাণমূলক পুলিশিংয়ের পরিবর্তে এতে আনুগত্য, শৃঙ্খলা এবং প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণকে অধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

আইনটির ৩ নম্বর ধারায় পুলিশের ওপর সরকারের সার্বিক তত্ত্বাবধান প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, যা পুলিশ বাহিনীর ওপর নির্বাহী কর্তৃপক্ষের শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণের ভিত্তি তৈরি করে। একই সঙ্গে ১২ নম্বর ধারায় মহাপরিদর্শককে সরকারের অনুমোদনসাপেক্ষে পুলিশ বাহিনীর সংগঠন, দায়িত্ব, পরিচালনা ও শৃঙ্খলা-সংক্রান্ত নিয়ম প্রণয়নের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এই কাঠামো অতিরিক্ত কেন্দ্রীভূত, দমনমূলক এবং জবাবদিহিতার দিক থেকে দুর্বল।

এই প্রেক্ষাপটে আমাদের পুলিশের নির্দয় ও কর্তৃত্ববাদী আচরণকে কেবল ব্যক্তিগত ব্যর্থতা বা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনার ফল হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ তারা তাদের আইনি ভিত্তি অনুযায়ী ‘সঠিক’ কাজই করে যাচ্ছে। তারা এমন এক ঔপনিবেশিক আইনি কাঠামোর অধীনে কাজ করে, যেখানে জনগণকে নাগরিকের বদলে নিয়ন্ত্রণযোগ্য প্রজা হিসেবে বিবেচনা করা হতো। একই উত্তরাধিকার আমাদের আমলাতন্ত্র, সামরিক বাহিনী ও বিচারব্যবস্থাতেও বিদ্যমান। ব্রিটিশ শাসন থেকে আজাদির পর যুক্তরাষ্ট্র ধীরে ধীরে নিজের রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে একটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্রব্যবস্থা নির্মাণ করেছিল। বিপরীতে উপনিবেশোত্তর রাষ্ট্রগুলো ঔপনিবেশিক প্রতিষ্ঠান ও শাসনপদ্ধতির মৌলিক কাঠামো বহাল রেখেই নিজেদের রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে এবং ওয়েস্টমিনস্টার মডেলকে গ্রহণ করেছে। ফলে তৈরি হয়েছে একশ্রেণির ‘কালো ইংরেজ’—চেহারায় ইংরেজ নয়; কিন্তু চিন্তা, প্রতিষ্ঠান ও শাসনদৃষ্টিতে সম্পূর্ণ ইংরেজ। বিষয়টি কেবল আইন বা এক টুকরো কাগজের নয়; মূল প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্র পরিচালনা ও শাসনব্যবস্থা সম্পর্কে আমাদের চিন্তাভাবনা কতটা ঔপনিবেশিকতার বাইরে যেতে পেরেছে?

রাষ্ট্রশিল্প বা statecraft নিয়ে ভাবতে হলে ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়া জরুরি। ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্তির পর আমেরিকার প্রতিষ্ঠাতারা ওয়েস্টমিনস্টার মডেল অনুসরণ না করে ক্ষমতার পৃথক্‌করণ ও জবাবদিহিতার ওপর ভিত্তি করে একটি প্রেসিডেনশিয়াল ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিলেন। অথচ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো রাজতন্ত্রের ঐতিহাসিক কাঠামো থেকে বিচ্ছিন্ন একটি ওয়েস্টমিনস্টার মডেল এবং ঔপনিবেশিক আইনকানুনের ওপর ভর করেই রাষ্ট্র পরিচালনা করে চলেছে। ফলে শাসনব্যবস্থার বাহ্যিক রূপ বদলালেও তার ভেতরের ঔপনিবেশিক যুক্তি অটুট রয়ে গেছে।

লেখক : উইকিপিডিয়া পেজ এডিটর

নিখোঁজের দেড় মাস পর ডোবা থেকে উদ্ধার অটোরিকশা চালকের লাশ

পানিবন্দি অর্ধলাখ মানুষ, ২৫ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদান বন্ধ

হুথিদের বিরুদ্ধে স্থল যুদ্ধের জন্য পুনর্গঠিত হচ্ছে ইয়েমেনের সেনারা

গ্রেপ্তার পৌনে দুই লাখ, সাজা ১৭ হাজার

ধুনটে শতবর্ষী বিদ্যালয়ের বেহাল দশা, পাঠদান ব্যাহত

বড়াইগ্রামে পাটের বাম্পার ফলন, দাম পেয়ে খুশি চাষিরা

ফরিদপুরে মহাসড়কে লাগামহীন চাঁদাবাজি

দখল-দূষণে অস্তিত্ব সংকটে বাগেরহাটের ভৈরব নদ

সৌদিতে হুথিদের হামলায় মসজিদসহ বহু ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত

মাদক মামলায় সাজা কম, খালাস বেশি