দার্শনিক অ্যান্টোনিও গ্রামশি দেখিয়েছিলেন, রাষ্ট্র শুধু দমনযন্ত্র দিয়ে টিকে থাকে না; টিকে থাকে হেজেমনির মাধ্যমে, অর্থাৎ সম্মতি উৎপাদনের ক্ষমতার ভেতর দিয়ে। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের পতন সেই হেজেমনির ভাঙনের একটি ক্লাসিক উদাহরণ। ২০০৯-পরবর্তী সময়ে দলটি যে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আধিপত্য গড়ে তোলে, তা জনগণের অভিজ্ঞতা থেকে বিচ্ছিন্ন এক আত্মতুষ্ট নৈতিকতার ওপর দাঁড়িয়েছিল। বিশেষ করে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় সাংবাদিক-বুদ্ধিজীবী-কালচারাল উইং নিজেদের ভাষা ও রুচিকে ‘জাতীয় বিবেক’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছে। পিয়েরে বুর্দিয়ুর ভাষায় এটি ছিল সিম্বলিক ভায়োলেন্স—যেখানে শিক্ষিত ভাষা, রেফারেন্স ও রুচির মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে নীরবে হেয় করা হয়। এই সহিংসতা শারীরিক নয়, কিন্তু রাজনৈতিকভাবে আরো মারাত্মক; কারণ এটি জনগণের সম্মতিকে ধ্বংস করে দেয়। দার্শনিক
হান্না আরেন্ট রাজনৈতিক ক্ষমতা ও সহিংসতার পার্থক্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছেন, সহিংসতা আসলে ক্ষমতার বিকল্প নয়; বরং ক্ষমতার দুর্বলতার লক্ষণ। আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রে আমরা সেটাই দেখেছি। যখন জনসমর্থন ক্ষয় হতে থাকে, তখন ভাষা আরো আক্রমণাত্মক হয়, যুক্তি পরিণত হয় জাস্টিফিকেশনে আর সমালোচনা হয়ে ওঠে রাষ্ট্রদ্রোহ। ১৯৭০-এর দশকে লাতিন আমেরিকার সামরিক শাসনগুলোও ঠিক এ পথেই হেঁটেছিল—বুদ্ধিজীবীদের একাংশ স্বৈরতন্ত্রকে নৈতিক ভাষা জুগিয়েছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই ভাষাই জনগণের ক্ষোভকে তীব্র করেছে।
বিএনপির রাজনীতিকে যদি বিশ্লেষণ করা হয়, তাহলে ম্যাক্স ওয়েবারের লেজিটিমেসির ধারণা প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। দীর্ঘ দমন-পীড়নের মধ্য দিয়ে বিএনপি এক ধরনের ‘ভুক্তভোগীর বৈধতা’ অর্জন করে। মির্জা ফখরুল বা রিজভীর মতো নেতাদের সংযত ভাষা রাষ্ট্রীয় সহিংসতার বিপরীতে একটি নৈতিক কনট্রাস্ট তৈরি করেছিল। ইতিহাসে আমরা এমন উদাহরণ পেয়েছি দক্ষিণ আফ্রিকায়—নেলসন ম্যান্ডেলার সংযমই এপারথেইড রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তিকে ভেঙে দিয়েছিল। কিন্তু ওয়েবার একই সঙ্গে সতর্ক করেছিলেন—বৈধতা ক্ষণস্থায়ী, যদি তা দায়িত্বশীল আচরণে রূপ না নেয়।
জুলাই বিপ্লবের পর বিএনপির চারপাশে যে নতুন বুদ্ধিজীবী ও কালচারাল অ্যাকটিভিস্টদের সমাগম ঘটেছে, তা জ্যাঁ-পল সার্ত্রের ব্যাড ফেইথ ধারণাকে মনে করিয়ে দেয়। তারা পরিবর্তনের ভাষা ব্যবহার করছে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে পুরোনো আধিপত্যের কাঠামোই পুনরুৎপাদন করছে। নিজেদের ‘উচ্চতর চেতনা’ দাবি করে তারা সাধারণ মানুষকে আবার নিচু স্তরে ঠেলে দিচ্ছে। এটি আসলে ফুকোর পাওয়ার-নলেজ তত্ত্বেরই পুনরাবৃত্তি—যেখানে জ্ঞান উৎপাদনের নিয়ন্ত্রণ মানেই ক্ষমতার দখল। ফলে আওয়ামী লীগের যে জাস্টিফিকেশন কালচার সমাজ প্রত্যাখ্যান করেছিল, বিএনপির ভেতরে তার পুনর্জন্ম ঘটছে ভিন্ন রঙে, ভিন্ন ঢঙে।
রাজনৈতিক অপরাধের প্রশ্নে যে হোয়াটঅ্যাবাউটিজম দেখা যাচ্ছে, তা ইতিহাসে নতুন নয়। সোভিয়েত ইউনিয়নে স্তালিন যুগে, কিংবা পরবর্তীকালে মাও-পরবর্তী চীনে, একই কৌশল ব্যবহার করে ক্ষমতাসীনরা নিজেদের অপরাধ ঢাকতে অতীতের অপরাধের তালিকা হাজির করেছিল। কিন্তু এই কৌশল, সমাজতত্ত্বের ভাষায়, একটি বুমেরাং ইফেক্ট তৈরি করে—যুক্তি ঘুরে এসে নিজের পক্ষকেই আঘাত করে। বাংলাদেশেও সেটাই ঘটছে। আওয়ামী লীগের অপরাধের ফিরিস্তি তুলে বিএনপির ভেতরের সহিংসতা বা চাঁদাবাজিকে লেজিটিমাইজ করা জনগণের চোখে বিশ্বাসযোগ্য হচ্ছে না।
রাষ্ট্রের ভেতরে চাঁদাবাজি, দলীয় পৃষ্ঠপোষকতা ও প্রশাসনিক শৈথিল্য ব্যাখ্যা করতে গেলে রাজনৈতিক অর্থনীতির প্যাট্রোন-ক্ল্যায়েন্ট মডেল অনিবার্য হয়ে ওঠে। ঔপনিবেশিক আমল থেকে দক্ষিণ এশিয়ায় যে শাসন কাঠামো তৈরি হয়েছিল, তা স্বাধীনতার পরও ভাঙেনি। দল বদলায়, কিন্তু পৃষ্ঠপোষকতার নেটওয়ার্ক থেকে যায়। ফল হলো, জনগণের অভিজ্ঞতায় শাসক বদলালেও শোষণের ধরন অপরিবর্তিত থাকে। ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুলের অ্যাডর্নো ও হর্কহাইমার এই প্রবণতাকেই বলেছিলেন অথরিটারিয়ান কন্টিনিউইটি ব্যবস্থার বদল হয়, কিন্তু মানসিকতা বদলায় না।
তবু ইতিহাসের ধারায় জুলাই বিপ্লব একটি গুরুত্বপূর্ণ ছেদ তৈরি করেছে, এটি শুধু রাজনৈতিক নয়, বরং একটি মোরাল ইকনোমি-এর জাগরণ। মানুষ এখন শাসকের ভাষা, বুদ্ধিজীবীর যুক্তি ও ন্যারেটিভকে আগের মতো অন্ধভাবে গ্রহণ করছে না। তারা বুঝতে শিখেছে—মুক্তি আসে না দল বদলালে, আসে ক্ষমতার চর্চা বদলালে।
বাংলাদেশের ইতিহাস রক্ত ও প্রতিরোধের ইতিহাস। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন, পাকিস্তানি নিপীড়ন, তারপর স্বাধীন বাংলাদেশের ধারাবাহিক রাজনৈতিক সহিংসতা—এই দীর্ঘ যাত্রা মানুষকে একটি সত্য শিখিয়েছে : যে রাজনীতি জনগণের মর্যাদাকে অস্বীকার করে, সে রাজনীতি ক্ষমতায় যাক বা না যাক, ইতিহাসের আদালতে টিকে থাকে না। ক্ষমতার আগে যে পতনের লক্ষণ আমরা আজ দেখছি, তা আসলে ভবিষ্যতের জন্য এক সতর্কসংকেত, যা উপেক্ষা করলে ইতিহাস আবার নির্মমভাবে নিজেকে পুনরাবৃত্ত করবে।
যাই হোক, জুলাই-আগস্টে প্রায় দুই হাজার মানুষের শহীদ হওয়ার পর একটি নির্মম স্বৈরতন্ত্রের পতন ঘটেছিল। ইতিহাসের ভাষায় এটি ছিল একটি রেজিম র্যাপচার, যেখানে জনগণ রক্ত দিয়ে রাজনৈতিক বৈধতার নতুন সীমা টেনে দেয়। এমন মুহূর্তের পর রাজনীতিতে ফেরার পথে আবার মানুষ খুন হবে, এ কল্পনাই হওয়ার কথা নয়। হান্না আরেন্ট বলেছিলেন, বিপ্লবের আসল লক্ষ্য ক্ষমতা দখল নয়, বরং এমন একটি রাজনৈতিক পরিসর তৈরি করা, যেখানে সহিংসতা অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে। কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতা দেখাচ্ছে, আমরা সেই পরিসর তৈরি করতে ব্যর্থ হয়েছি।
শেরপুরের ঘটনা বিচ্ছিন্ন কোনো দুর্ঘটনা নয়; এটি রাষ্ট্রীয় পক্ষপাত ও রাজনৈতিক সহিংসতার যৌথ ফল। ম্যাক্স ওয়েবারের রাষ্ট্র-সংজ্ঞা অনুযায়ী, রাষ্ট্রই বৈধ সহিংসতার একমাত্র অধিকারী। কিন্তু যখন প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী একটি নির্দিষ্ট দলের পক্ষে নীরব বা সক্রিয় পক্ষপাত দেখায়, তখন সেই বৈধতা ভেঙে পড়ে। ইতিহাসে এমন উদাহরণ আমরা বহুবার দেখেছি—১৯৯০-এর দশকে পূর্ব ইউরোপে, কিংবা আরব বসন্ত-পরবর্তী মিসরে—রাষ্ট্রীয় পক্ষপাত শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক সহিংসতাকে উসকে দেয়।
গত দেড় বছরে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলে বহু মানুষ নিহত হয়েছে। এটি শুধু নৈতিক ব্যর্থতা নয়, বরং সাংগঠনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় একটি ফিইলিওর অফ ইন্টারনাল ডিসিপ্লিন। রবার্ট মিশেলস তার ‘আয়রন ল অব অলিগার্কি’ তত্ত্বে দেখিয়েছিলেন, বড় রাজনৈতিক দলগুলোয় নেতৃত্ব যদি নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহি হারায়, তবে তৃণমূল স্তরে সহিংসতা অনিবার্য হয়ে ওঠে। বিএনপিকে এই বিপদের কথা বারবার জানানো হয়েছিল, কিন্তু দলটি সতর্কতা গ্রহণ করেনি। ফলে আজ মাওলানা রেজাউল করিমের হত্যাকে আর ‘দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা’ বলে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই; এটি পূর্বানুমেয় ছিল।
তারেক রহমান যখন ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড নিয়ে কথা বলেন, ‘আই হ্যাভ আ প্ল্যান’ বলেন, তখন রাজনৈতিক দর্শনের একটি মৌলিক প্রশ্ন উঠে আসে। জন লকের সামাজিক চুক্তি তত্ত্ব অনুযায়ী, রাষ্ট্র বা রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রথম দায়িত্ব নাগরিকের জীবন রক্ষা করা। যদি একজন মানুষ রাজনৈতিক কর্মীদের হাত থেকেই নিরাপদ না থাকে, তাহলে কল্যাণমূলক পরিকল্পনার নৈতিক ভিত্তি কোথায়? ইতিহাস বলে, রুটি ও উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি কখনোই নিরাপত্তার অভাব ঢাকতে পারে না। ফরাসি বিপ্লবের সময়ও মানুষ ‘ব্রেড’ চাইছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা ‘সিকিউরিটি অ্যান্ড ডিগনিটি’ -এর প্রশ্নেই রাজপথে নেমেছিল। এখানে রাষ্ট্রের ভূমিকাও এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। মিশেল ফুকো দেখিয়েছেন, ক্ষমতা শুধু আদেশে নয়, বরং উপেক্ষার মধ্য দিয়েও কাজ করে। প্রশাসনের নীরবতা, অপরাধীদের প্রশ্রয়, কিংবা দলীয় আনুগত্যের খাতিরে আইন প্রয়োগে শৈথিল্য—সবই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সক্রিয় ব্যবহার। ফলে শেরপুরের রক্তের দায় শুধু বিএনপির নয়; সরকারকেও সেই দায় বহন করতে হবে।
ইতিহাস আমাদের একটি নির্মম সত্য শেখায়—বিপ্লবের পর সবচেয়ে বড় শত্রু আসে বিপ্লবের ভেতর থেকেই। রাশিয়ায় ১৯১৭-এর পর, ইরানে ১৯৭৯-এর পর, এমনকি আমাদের ১৯৭১-এর পরও তা ঘটেছে। যদি রাজনৈতিক দলগুলো শহীদের রক্তকে ক্ষমতার সিঁড়ি বানায় আর সহিংসতাকে ‘অপরিহার্য বাস্তবতা’ বলে মেনে নেয়, তাহলে সেই বিপ্লব নিজেই নিজের অর্থ হারায়। জুলাই-আগস্টের আত্মত্যাগ আমাদের এই দাবি করার নৈতিক অধিকার দিয়েছে—রাজনীতি করতে গিয়ে আর একটি প্রাণও ঝরতে পারে না। এই সীমা ভাঙলে ইতিহাস ক্ষমা করে না।
পাঠক, এখানে একটা কথা ইয়াদ করিয়ে দিতে চাই,
শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অনুরা কুমারা দিশানায়েকের বিপুল ভোটে বিজয় উপমহাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে একটি তাৎপর্যপূর্ণ বাঁক। কার্ল মার্কস বলেছিলেন, ইতিহাস এগোয় শ্রেণিসংঘর্ষের মধ্য দিয়ে, কিন্তু সেই সংঘর্ষ সবসময় সশস্ত্র রূপ নেয় না; কখনো তা গণতান্ত্রিক পরিসরেই নতুন রাজনৈতিক শক্তিকে ক্ষমতায় আনে। শ্রীলঙ্কার এই নির্বাচন সেই সত্যটিকেই নতুনভাবে সামনে আনল। দুই বছর আগে গণঅভ্যুত্থানে প্রেসিডেন্টের পলায়নের পর এই প্রথম একটি নির্বাচিত সরকার পেল দেশটি এবং সেই শূন্যস্থানেই দুর্নীতি, লুটপাট ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে সংগঠিত এক বিকল্প জোট ক্ষমতায় উঠে এলো। জেভিপির উত্থান হঠাৎ কোনো রাজনৈতিক দুর্ঘটনা নয়; এটি দীর্ঘ সংগ্রাম, রক্তক্ষয় ও আত্মসমালোচনার ইতিহাস। একটি রাজনৈতিক শক্তিকে ক্ষমতায় যেতে হলে শুধু রাষ্ট্রক্ষমতা নয়, সামাজিক সম্মতি বা হেজেমেনি অর্জন করতে হয়। জেভিপি দীর্ঘদিন সেই সামাজিক সম্মতি অর্জনে ব্যর্থ ছিল। তারা সংসদীয় রাজনীতিতে ছিল প্রান্তিক, এমনকি সর্বশেষ পার্লামেন্টে তাদের আসন ছিল মাত্র তিনটি। কিন্তু তারা রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের আগেই সমাজে নৈতিক কর্তৃত্ব তৈরি করার কৌশল শিখেছে, আর এই শিক্ষাটি এসেছে ভয়াবহ ইতিহাসের মধ্য দিয়ে। ১৯৭১ ও ১৯৮৭ সালে জেভিপির নেতৃত্বে সংঘটিত সশস্ত্র অভ্যুত্থান ব্যর্থ হয় এবং প্রায় ৬০ হাজার কর্মী-সমর্থক প্রাণ হারান। রোজা লুক্সেমবার্গ যেমন সতর্ক করেছিলেন, বিপ্লব যদি গণমানুষের সচেতন অংশগ্রহণ ছাড়া শুধু সামরিক অভিযানে পরিণত হয়, তবে তা আত্মঘাতী হয়। জেভিপির ইতিহাস সেই ব্যর্থতারই করুণ উদাহরণ। কিন্তু এখানেই তাদের রাজনৈতিক পরিণতিবোধের প্রমাণ—তারা সহিংস পথকে চূড়ান্ত সত্য না ভেবে গণতান্ত্রিক সংগ্রামের দিকে ফিরে আসে। ন্যাশনাল পিপলস পাওয়ার (এসপিপি) জোট শুধু শ্রমিক বা কৃষকের কথা বলেনি; দুর্নীতিতে জর্জরিত মধ্যবিত্ত, তরুণ প্রজন্ম এবং রাষ্ট্রীয় লুটপাটে ক্লান্ত সাধারণ মানুষকে এক রাজনৈতিক ছাতার নিচে এনেছে। এই ঐক্যই তাদের শক্তি। রাজনৈতিক নেতৃত্ব তখনই বৈধতা পায়, যখন তা নৈতিক আস্থার সঙ্গে যুক্ত হয়। অনুরা দিশানায়েকের নেতৃত্ব সেই আস্থার প্রতীক হয়ে উঠেছে। এই অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশেও সাম্প্রতিক সময়ে একটি গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ক্ষমতাসীনরা দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন এবং শক্তি নৈতিক ক্ষোভে আটকে না থাকে, সংগঠন ও জনসম্পৃক্ততা গড়ে তুলেছে। ইতিহাসের নির্মম নিয়ম হলো—শূন্যতা দীর্ঘদিন থাকে না।
সবশেষে বলা যায়, শ্রীলঙ্কার অভিজ্ঞতা আমাদের সামনে ইতিহাসের এক কঠিন কিন্তু জরুরি শিক্ষা হাজির করে। ক্ষমতার পতন নিজে কোনো মুক্তি নয়; মুক্তি আসে তখনই, যখন সেই পতনের পর একটি নৈতিক, সংগঠিত এবং জনমানুষের জীবনের সঙ্গে যুক্ত রাজনৈতিক বিকল্প দাঁড়িয়ে যায়। রক্ত, ত্যাগ ও ব্যর্থতার ভেতর দিয়েই যে পরিণত রাজনীতি গড়ে ওঠে। এই অভিজ্ঞতা মনে করিয়ে দেয়—সহিংসতার রোমান্টিকতা নয়, মানুষের আস্থা অর্জনই দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তনের একমাত্র ভিত্তি। বাংলাদেশের জন্য প্রশ্নটা তাই কে ক্ষমতায় যাবে তা নয়; প্রশ্নটা হলো, আমরা কি এমন একটি রাজনীতি গড়ে তুলতে পারব, যা ক্ষমতার বদলে মানুষের মর্যাদাকে কেন্দ্রে রাখবে। ইতিহাস অপেক্ষা করে না, কিন্তু যারা ইতিহাস থেকে শেখে, ভবিষ্যৎ শেষ পর্যন্ত তাদের দিকেই ঝুঁকে পড়ে।
লেখক : সাবেক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও গবেষক, ফ্রাই ইউনিভার্সিটি বার্লিন, জার্মানি
sahidkamrul25@gmail.com