হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

৭১ সালের বিজয় ও ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের ঐকতান

ড. শাহজাহান খান

সম্প্রতি বাংলাদেশে কিছু বুদ্ধিজীবী ১৯৭১ সালের ঐতিহাসিক মুক্তিযুদ্ধকে জুলাই ২০২৪ সালের গণবিপ্লবের সঙ্গে অন্যায়ভাবে তুলনা করে খাটো করে দেখানোর চেষ্টা করছেন। ১৯৭১ সালের গৌরবময় বিজয়ের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করতে কি ২০২৪ সালের অবিস্মরণীয় ত্যাগকে খাটো করা জরুরি, কিংবা উল্টোটা? ১৯৭১ সালের মুক্তিযোদ্ধাদের ত্যাগ ও অর্জন কি ২০২৪ সালের তুলনায় কম? ১৯৭১ সালের বীরত্বপূর্ণ যুদ্ধ কি ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের প্রতিদ্বন্দ্বী, নাকি পরিপূরক? আমাদের জাতির ইতিহাসের এই দুটি গৌরবময় ঘটনার মধ্যে কি কোনো সম্পর্ক রয়েছে?

যদিও এ ধরনের প্রশ্ন কিছু নির্দিষ্ট রাজনৈতিক কর্মী ও নেতাদের জন্য রাজনৈতিকভাবে সুবিধাজনক, কিন্তু তা শেষ পর্যন্ত জাতিকে বিভক্ত করে এবং দেশের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। তাই অপ্রয়োজনীয় বিভাজনের সম্ভাব্য ক্ষতি থেকে বাঁচতে জাতির জন্য প্রয়োজন উপরোক্ত প্রশ্নগুলোর নিরপেক্ষ ও বস্তুনিষ্ঠ উত্তর।

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর পেতে হলে বুঝতে হবে কেন মানুষ নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এমন কর্মকাণ্ডে অংশ নেয়, যা তাদের জীবনের সমাপ্তি ঘটাতে পারে। তারা এই ঝুঁকি নেয় এমন কিছুর জন্য, যা তাদের জীবনের চেয়েও বেশি মূল্যবান। তারা স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার ও আত্মনিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে সম্মান এবং মর্যাদা অর্জনের আকাঙ্ক্ষা করে, দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনৈতিক ব্যবস্থা ও দমনমূলক শাসকদের পরাজিত করে।

কেন এবং কীভাবে আমরা ১৯৭১ সালের শহীদদের রক্তের সঙ্গে ২০২৪ সালের শহীদদের রক্তের তুলনা করব? আমরা কি একই মানুষের রক্তের কথাই বলছি না, যারা একই স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচারের জন্য দুবারেই লড়েছে?

নিঃসন্দেহে, বাংলাদেশের অভ্যুদয় ১৯৭১ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানকে পশ্চিম পাকিস্তানের শাসন থেকে মুক্ত করার জন্য মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বপূর্ণ সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের ওপর প্রতিষ্ঠিত। তাদের সর্বোচ্চ ত্যাগ ছাড়া বাংলাদেশের অস্তিত্বই সম্ভব হতো না।

২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের স্থপতি ও নেতারা কখনোই ১৯৭১ সালের অর্জনের সঙ্গে ২০২৪ সালের তুলনা করেননি। বরং তারা স্পষ্টভাবে বলেছেন, ২০২৪ সালের সাফল্য ১৯৭১ সালের বিজয়ের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। ১৯৭১ না থাকলে ২০২৪ হতো না। একইভাবে, ২০২৪ সালের অভ্যুত্থান না হলে দেশ এখনো ফ্যাসিবাদী শাসনের অধীনে এবং ভারতীয় আধিপত্যের প্রত্যক্ষ প্রভাবের মধ্যে থাকত।

১৯৭১ সালের সশস্ত্র সংগ্রাম কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না। এটি ছিল এই ভূখণ্ডের মানুষের দীর্ঘদিনের সংগ্রামের চূড়ান্ত বিস্ফোরণ, একটি শোষণমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তি উপমহাদেশ ছেড়ে যাওয়ার পর ভারত ও পাকিস্তানে বিভক্ত হওয়ার পরপরই পূর্ব পাকিস্তানকে আলাদা করার তৎপরতা শুরু হয়।

১৯৭১ সালে আমাদের যোদ্ধা ও জনগণের অভূতপূর্ব বিজয় ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টিতে আমাদের পূর্বপুরুষদের সাফল্যের ওপরেই প্রতিষ্ঠিত ছিল। স্বাধীন পাকিস্তান না হলে বৃহত্তর ভারত থেকে বাংলাদেশকে মুক্ত করা অসম্ভব হতো। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, ব্রিটিশদের বিদায়ের এক বছরের মধ্যে ভারত তাদের সেনাবাহিনী ব্যবহার করে কিছু অমীমাংসিত রাজ্য (যেমন : জম্মু ও কাশ্মীর, হায়দরাবাদ ও জুনাগড়) দখল করে নেয়।

অবাক হওয়ার কিছু নেই যে, ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর ঢাকায় পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের অনুষ্ঠানে মুক্তিবাহিনীর প্রধান জেনারেল এম এ জি ওসমানীকে অনুপস্থিত রেখে বাংলাদেশের বিজয়কে ভারতীয়দের বিজয়ে পরিণত করেছিল। পূর্ব পাকিস্তানকে বৃহত্তর ভারতের অংশ বানানোর পরিকল্পনার আলোকেই হয়তো ওই কাজ করা হয়েছিল।

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে পাকিস্তান সৃষ্টির ফলে শুধু অল্প কিছু সুবিধাভোগী এলিট উপকৃত হয়েছিল, কিন্তু সাধারণ জনগণের বৃহৎ অংশ প্রত্যাশিত কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হয়েছিল। দুঃখজনকভাবে, স্বাধীনতার পর বাংলাদেশেও এই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটে এবং শাসকগোষ্ঠী ও প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসঘাতকতায় জনগণ তাদের কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ থেকে বঞ্চিত হয়।

এ অঞ্চলের মানুষ ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন ও পাকিস্তানি শাসনের বিরুদ্ধে একই লক্ষ্য—স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার, সমতা ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনের জন্য—দৃঢ়ভাবে লড়াই করেছে। ১৯৭১ সালের পরও এই সংগ্রাম অব্যাহত থাকে, কারণ ক্রমেই সাধারণ মানুষের অবস্থা আরো খারাপ হতে থাকে। ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ ও একদলীয় শাসনব্যবস্থা জনগণকে সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে বাধ্য করে। ১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনও একই চেতনার বহিঃপ্রকাশ ছিল।

২০২৪ সালের আগস্টে ক্ষমতাচ্যুত সরকারের বিরুদ্ধে ছাত্র নেতৃত্বাধীন আন্দোলনের আগে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হয়ে ওঠে। মানুষ আবার বৈষম্য, চাঁদাবাজি এবং দমনমূলক ও দুর্নীতিগ্রস্ত শাসন থেকে মুক্তি পেতে মরিয়া হয়ে ওঠে। গণঅভ্যুত্থানটি স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার, সমতা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের একই অভিন্ন আকাঙ্ক্ষার মধ্য দিয়েই গড়ে ওঠে।

অতীতে বারবার, অত্যাচারী ক্ষমতাসীন ব্যক্তি ও গোষ্ঠী জনগণের আকাঙ্ক্ষার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। ১৯৭১ ও ২০২৪ সালের শহীদদের প্রতি প্রকৃত সম্মান জানাতে হলে এই চক্রের অবশ্যই অবসান ঘটাতে হবে।

বারবার বাংলাদেশের মানুষ দুর্নীতি, বৈষম্য, অন্যায়, ফ্যাসিবাদ এবং মানুষের মৌলিক অধিকারের অবমাননার বিরুদ্ধে তাদের দৃঢ়তা ও সাহস প্রদর্শন করেছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, দেশের ক্ষমতাসীনরা ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতে ব্যর্থ হয়েছে। বরং এক প্রজন্মের দুর্নীতিবাজ সুবিধাবাদীদের জায়গায় আরেক প্রজন্ম আসছে, জনগণের রক্তাক্ত আত্মত্যাগকে উপেক্ষা করেই চলছে।

১৯৪৭ সালের ঘটনা আমাদের জাতীয় ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। তবে ১৯৭১ সালের বিজয় বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ স্থানে রয়েছে। অন্যদিকে, জুলাই ২০২৪ সালের সংগ্রামের সাফল্য আমাদের ইতিহাসের মুকুটে নতুন রত্ন, যা সর্বোচ্চ ত্যাগ ও প্রকৃত স্বাধীনতার অঙ্গীকারের মাধ্যমে অর্জিত। এই তিনটি ঘটনার চূড়ান্ত লক্ষ্য একই—স্বাধীনতা, সমতা, ন্যায়বিচার ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার অর্জনের পথে ভিন্ন ভিন্ন মাইলফলক। বাংলাদেশের ইতিহাসের এই তিনটি মহান পর্যায়ের সংগ্রামে অংশগ্রহণকারী আত্মত্যাগী মানুষের মধ্যে পার্থক্য করা অন্যায় ও অসম্ভব।

১৯৪৭ সালের আগে দীর্ঘ সংগ্রামে ‘আমরা’ ছিলাম (আমাদের পূর্বপুরুষরা) এবং ‘তারা’ ছিল ব্রিটিশরা। তখন মুসলিম ও হিন্দুরা একই শত্রুর বিরুদ্ধে একসঙ্গে লড়েছে। ১৯৭১ সালে ‘আমরা’ ছিলাম পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ এবং ‘তারা’ ছিল পশ্চিম পাকিস্তানিরা।

এ দুই ক্ষেত্রেই সংগ্রাম ছিল বিদেশি শাসকদের বিরুদ্ধে। কিন্তু ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে ‘আমরা’ ছিলাম বিভিন্ন রাজনৈতিক ও অরাজনৈতিক শক্তির জনগণ আর ‘তারা’ ছিল ফ্যাসিবাদী শাসন, তাদের দুর্নীতিগ্রস্ত সহযোগী ও বিদেশি প্রভু ও সমর্থকরা। এই গণঅভ্যুত্থান শুধু রাজনৈতিক নিপীড়নের বিরুদ্ধে নয়, বরং প্রতিবেশীদের নগ্ন সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ও অর্থনৈতিক শোষণের বিরুদ্ধেও ছিল।

সাধারণ মানুষের আকাঙ্ক্ষা হলো প্রকৃত স্বাধীনতা অর্জন করাÑযেমন তারা পিণ্ডি থেকে মুক্ত হয়েছে, তেমনি দিল্লির প্রভাব থেকেও মুক্ত হওয়া জরুরি হয়ে পড়েছিল। ১৯৭১ সালে মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানের হাত থেকে বাংলাদেশকে মুক্ত করেছিলেন, অন্য কোনো দেশের নিয়ন্ত্রণে দেওয়ার জন্য নয়। তাই আজকের নতুন বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা ১৯৭১ কিংবা ১৯৪৭-এর সংগ্রাম থেকে ভিন্ন নয়।

যদি নতুন শাসকরাও পূর্বসূরিদের ভুলের পুনরাবৃত্তি করে, তবে জনগণ আবার তাদের ন্যায্য অধিকারের জন্য সংগ্রামে নামতে বাধ্য হতে পারে, যা আরেকটি রক্তক্ষয়ী সংঘাতের দিকে নিয়ে যেতে পারে।

২০২৪ সালের আন্দোলন ১৯৭১ সালের অর্জনকে অস্বীকার করেনি; বরং অতীত শাসকদের দ্বারা উপেক্ষিত সেই একই আকাঙ্ক্ষাকে আরো জোরদার করেছে। বাংলাদেশের আমজনতা মুক্তির একই আকাঙ্ক্ষা নিয়ে বারবার লড়াই করেছে। তাই তাদের কাছে ১৯৪৭, ১৯৭১ এবং ২০২৪ একই সংগ্রামের রক্তেলেখা তিনটি বেদনাদায়ক কিন্তু সফলতা ও গৌরবের অবিভক্ত অধ্যয়।

লেখক : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন কুইন্সল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, সাবেক উপাচার্য, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ

ভূমধ্যসাগরের নীল জলে ডুবছে কেন জেনজিরা

সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন ও বিরোধী নেতার দুঃখ

নতুন সময়সূচি ও অর্থনীতিতে প্রভাব

নাতিশীতোষ্ণতার সন্ধানে

জ্বালানিনির্ভরতা ও জাতীয় নিরাপত্তা সংকট

ইরান যুদ্ধ পেট্রোডলারের জন্যও বড় পরীক্ষা

আমলাতন্ত্র ও জনতার সচিবালয়

হজ ব্যবস্থাপনায় সংস্কার

আমেরিকা কি গণতান্ত্রিক নাকি টেকনো-প্লুটোক্রেটিক রাষ্ট্র

দলমুক্ত শিক্ষাঙ্গন থেকে জ্ঞানভিত্তিক রাষ্ট্রের পথে