হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

অপ্রতিমের পর কে

আমার দেশ অনলাইন

ঘড়ির কাঁটা দিয়ে একটি শিশুর মৃত্যুর হিসাব করা যায় না, তবু এই লেখা শুরু করতে হচ্ছে ঘড়ি দিয়েই। কারণ এই মৃত্যুর প্রতিটি মুহূর্তে একটি করে সুযোগ ছিল।

১৮ সেপ্টেম্বর বিকাল সাড়ে ৩টার দিকে কুমিল্লার কোটবাড়ীর ভাড়া বাসা থেকে বের হয়েছিল সপ্তম শ্রেণির ছাত্র ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম। মায়ের আইফোন হাতে নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে শালবন বিহারে ছবি তুলতে যাওয়ার কথা বলে সে বের হয় আর ফেরেনি। সন্ধ্যার পর তার বাবা থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন। মোবাইল ফোনের অবস্থান শনাক্ত করে দেখা যায়, সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা পর্যন্ত ফোনটি গন্ধমতি এলাকায় ছিল। তারপর তা বন্ধ হয়ে যায়। পরদিন শনিবার দুপুর ১টার দিকে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়-সংলগ্ন লালমাই পাহাড়ের জঙ্গল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

ফোনের শেষ সংকেত থেকে মরদেহ উদ্ধার পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ১৮ ঘণ্টা, নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে হিসাব করলে প্রায় ২২ ঘণ্টা। এ সময়টায় একটি মা ফেসবুকে ছেলের ছবি দিয়ে সাহায্য চেয়েছেন, একটি বাবা থানায় গেছেন, আর একটি দেশ ঘুমিয়েছে।

প্রতি ঘণ্টায় তিন শিশু নিখোঁজ

অপ্রতিমের ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন ঠেকতে পারে, সংখ্যাগুলো তা বলে না। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে দেশে ১৫ হাজার ৭১৭ শিশু নিখোঁজ হয়েছে। পুলিশের দাবি, ৮৭ শতাংশের বেশি শিশুকে উদ্ধার করা গেছে। উদ্ধার হয়েছে ১৩ হাজার ৬৭৯ জন। এটি সত্যিই সাফল্য। কিন্তু বাকি ২ হাজার ৩৮ জনÑঅর্থাৎ প্রায় ১৩ শতাংশ, এখনো ফেরেনি।

প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে নিখোঁজ শিশুদের মধ্যে অন্তত ৩৬ জনের মরদেহ উদ্ধার হয়েছে। একই সময়ে নিহত শিশুর সংখ্যা ১৫৫। এর মধ্যে শারীরিক নির্যাতনে মারা গেছে ৬৮ জন। পরিবারের ভেতরে নির্যাতনে নিহত ৪৯ জন। ধর্ষণের পর হত্যার শিকার ২৬ জন। ধর্ষণচেষ্টার পর হত্যা ৪টি, গুলিতে মৃত্যু ৩টি। গৃহকর্মী শিশুর ওপর নির্যাতনে মৃত্যু দুটি।

ভয়ের ঠিকানা ভুল জায়গায়

চলতি মাসে জামালপুরের মাদারগঞ্জে সাত বছরের এক শিশু নিহত হয়েছে। পুলিশের ভাষ্য, শিশুটিকে তার সহপাঠীর বাবা ধর্ষণের পর হত্যা করেছে। পাবনায় ১০ বছরের একটি শিশু ৯ সেপ্টেম্বর নিখোঁজ হয়ে সাত দিন পর ডোবা থেকে মরদেহ হয়ে ফিরেছে।

অপ্রতিমের ক্ষেত্রেও ঘাতকরা ছিল পরিচিত। এখান থেকে একটি অস্বস্তিকর সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হয়। আমাদের শিশু-নিরাপত্তার ভাষা এখনো ‘বাইরের শত্রু’র ছবিতে আটকে আছে। বাস্তবের বিপদ বেশিরভাগ সময় আসে বিশ্বাসের দরজা দিয়ে। পাশের বাসার ভাইয়া, সহপাঠীর বাবা, খেলার সঙ্গী, বড় বন্ধু। শিশুকে আমরা ‘অচেনা’ থেকে সাবধান করি, কিন্তু ‘চেনা’র মধ্যে কোন আচরণটা বিপজ্জনক, তা শেখাই না।

একটি ফোনের দাম

ঘটনার পেছনে পুলিশ যে উদ্দেশ্য দেখছে, তা আইফোন ছিনিয়ে নেওয়া। পুলিশ সুপার জানিয়েছেন, ফোনটি উদ্ধার হয়েছে। আদালতে তিনজন স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। এখানে একটি অর্থনৈতিক-সামাজিক প্রশ্ন আছে, যা আমরা এড়িয়ে যাচ্ছি। একটি স্মার্টফোন এখন শুধু যন্ত্র নয়, মর্যাদার প্রতীক। যে সমাজে কয়েক হাজার টাকার ঋণ কিংবা ফোন একটি প্রাণের চেয়ে বেশি লোভনীয় হয়ে ওঠে, সেখানে ফোনটি হাতে নিয়ে হাঁটা শিশু আসলে ‘চলমান টোপ’। মা-বাবার দামি ফোন সন্তানের হাতে দেওয়া আধুনিক অভিভাবকত্বের অংশ। কিন্তু এর সঙ্গে যে ঝুঁকিও আসে, সে হিসাব আমরা করি না। ফোনে লোকেশন শেয়ারিং চালু থাকলে, কিংবা অন্তত পরিবারের নিজস্ব একটি নিয়ম থাকলেÑ‘কোথায় যাচ্ছ, কার সঙ্গে, কখন ফিরবে’Ñসেই সন্ধ্যার ছবিটা ভিন্ন হতে পারত। এটি অভিভাবকের দোষ খোঁজা নয়। শোকার্ত একটি পরিবারের দিকে আঙুল তোলা আমাদের কাজ নয়। বরং প্রশ্নটা রাষ্ট্র ও সমাজের কাছে : সাধারণ পরিবারকে এই প্রযুক্তিগত ঝুঁকির বিষয়ে কি সচেতন করা হচ্ছে?

ঘটনার পর কিশোর অপরাধ নিয়ে আলোচনা স্বাভাবিকভাবেই সামনে এসেছে। সেই আলোচনার পেছনে বাস্তব ভিত্তিও আছে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে ২৩৭টি কিশোর গ্যাং সক্রিয়, সদস্য প্রায় ৫০ হাজার। মোহাম্মদপুর, বছিলা ও আদাবর—এই তিন এলাকা থেকেই গত দেড় বছরে অন্তত চার হাজার কিশোর অপরাধী গ্রেপ্তার হয়েছে। অথচ পুলিশের ভাষ্য, কয়েক মাসের মধ্যেই তারা জামিনে বেরিয়ে আবার অপরাধে ফেরে।

কিন্তু অপ্রতিমের ঘটনা আরেকটি জটিলতা দেখায়। পুলিশ সুপার জানিয়েছেন, গ্রেপ্তারকৃতদের বিরুদ্ধে আগে কোনো পুলিশ রেকর্ড নেই। অর্থাৎ ঘাতকরা কোনো পরিচিত গ্যাংয়ের সদস্য ছিল কি না, তা এখনো তদন্তাধীন। যদি না হয়, তাহলে নিরাপত্তাব্যবস্থার জাল খুব সংকীর্ণ জায়গায় ফেলা হচ্ছে। আমরা ‘গ্যাং’ খুঁজছি, অথচ বিপদ আসছে এমন তরুণদের কাছ থেকে, যাদের নাম কোনো তালিকায় নেই। যাদের কেউ চিনত ‘ভালো ছেলে’ বা ‘ওই বাসার ভাইয়া’ বলে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সমাজের পচন ও নৈতিক অবক্ষয়ের কথা বলেছেন। কথাটা ঠিক, তবে ‘অবক্ষয়’ দিয়ে কিছু ব্যাখ্যা হয় না। প্রশ্ন হলো, যে তরুণরা স্কুলছুট, কর্মহীন, পরিবারের নজরের বাইরে এবং সামাজিক স্বীকৃতির খোঁজে বিপথে যায়, তাদের জন্য আমাদের কী আছে? খেলার মাঠ কোথায়? আদর্শিক সংগঠন কোথায়? শিক্ষকের মেন্টরশিপ কোথায়? আর একটি স্পষ্ট কথা : অভিযুক্তদের একজনের বয়স সতেরো। কিশোরদের বিচারের আইনও সংস্কার করা অপরিহার্য। বর্তমান ব্যবস্থায় যে সংশোধনাগারে ঢুকে একজন কিশোর আরো পোক্ত অপরাধী হয়ে বের হয়, সেটি সংশোধনাগার নয়।

রেখাচিত্র উপরের দিকে

সংখ্যাগুলো সাধারণত একে অপরের সঙ্গে না মিললেও দিকটা মিলে যায়। ‘শিশুরাই সব’ নামের একটি সংস্থা গণমাধ্যম পর্যবেক্ষণ করে জানিয়েছে, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসেই অন্তত ৮৬ শিশু হত্যার শিকার হয়েছে আর যৌন নির্যাতনের শিকার ৩৩৬ জন। তুলনায় ২০২৫ সালের পুরো বছরে সংখ্যাটি ছিল ১২৪ ও ৩০৮। অর্থাৎ যৌন নির্যাতনের ঘটনা অর্ধেক বছরেই গত বছরের সারা বছরকে ছাড়িয়ে গেছে। হত্যার ক্ষেত্রেও ছয় মাসেই গত বছরের প্রায় ৭০ শতাংশে পৌঁছেছে।

মানবাধিকার সংস্থা এমএসএফের মাসিক হিসাবে জুলাই থেকে আগস্টে নারী ও শিশু হত্যার সংখ্যা ৫২ থেকে ৯১-তে পৌঁছেছে, প্রায় ৭৫ শতাংশ বৃদ্ধি। দলবদ্ধ ধর্ষণ ৭ থেকে ১২টি। এক মাসের ব্যবধানে এমন উল্লম্ফনকে হয়তো মৌসুমি ওঠানামা বলে ব্যাখ্যা করা যায়। কিন্তু আসকের সাত মাসের হিসাব বলছে, জানুয়ারি থেকে জুলাইয়ে শিশু ধর্ষণের ঘটনা ২৪১টি। এটি ঘটনার নির্দিষ্ট মাসের কথা নয়, চলমান ধারা।

এখানে একটি সতর্কতা জরুরি। এই সংখ্যাগুলো আলাদা আলাদা সংস্থার, আলাদা পদ্ধতিতে সংগৃহীত। বেশিরভাগই সংবাদমাধ্যম পর্যবেক্ষণনির্ভর, তাই সংস্থাভেদে সংখ্যা মেলে না। আট মাসে নিহত শিশু আসকের হিসাবে ১৫৫, কিন্তু ছয় মাসে ‘শিশুরাই সব’-এর হিসাবে ৮৬। যেখানে একটি জাতীয় শিশু-নিরাপত্তা তথ্যভান্ডার থাকা উচিত ছিল, সেখানে আছে বিচ্ছিন্ন কিছু বেসরকারি খতিয়ান। যে সমস্যা আমরা নিয়মিতভাবে মাপি না, তার সমাধান আমরা পরিকল্পনাও করতে পারি না।

অপ্রতিম নিখোঁজের পর সন্ধ্যায় জিডি হয়েছে, ফোনের অবস্থান জানা গেছে, তারপর রাত গড়িয়েছে। পরদিন দুপুরে খোঁজ মিলেছে জঙ্গলে। এই ফাঁকটাই আসল ব্যর্থতা, এখানে কোনো একক ব্যক্তিকে দায়ী করা যাবে না। দায় ব্যবস্থার।

এই লেখার শুরুতে ঘড়ির কথা বলেছিলাম। শেষ করি একটি বস্তু দিয়ে। পুলিশ আইফোনটি উদ্ধার করেছে। ফোনটির স্ক্রিনে হয়তো এখনো সেই ছবিগুলো আছে, যা একটি তেরো বছরের ছেলে বন্ধুদের সঙ্গে তুলতে চেয়েছিল। যে শিশুটি সেই ফোন হাতে বেরিয়েছিল, সে ফেরেনি।

জানাজা হয়েছে দুবার, প্রথমটি কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে, দ্বিতীয়টি গন্ধমতিতে বাসার পাশের কবরস্থানের সামনে। রোববার সকালে সে সেখানেই চিরনিদ্রায় শায়িত হয়েছে, যে জায়গা থেকে মাত্র দুদিন আগে সে খেলতে বেরিয়েছিল। অপ্রতিমের মা একজন বিশ্ববিদ্যালয়-শিক্ষক, বাবা ব্যবসায়ী। পরিবারটির সামাজিক অবস্থান সচ্ছল, যোগাযোগও ভালো। তারা দ্রুত সাড়া পেয়েছেন, গণমাধ্যমও পাশে ছিল। তবু তাদের সন্তানকে বাঁচানো যায়নি। তাহলে যে পরিবারের ফেসবুক স্ট্যাটাসে ভাইরাল হওয়ার সুযোগ নেই, যার সন্তান নিখোঁজ হয়ে পরিসংখ্যানের ২ হাজার ৩৮ জনের একজন হয়ে যায়, সেই পরিবারগুলোর কী হয়?

শিশুর নিরাপত্তা কোনো একদিনের আবেগ বা একটি মামলার বিষয় নয়। এটি একটি চলমান, নিয়মিত, তথ্যনির্ভর রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক দায়িত্ব। প্রশ্ন এখন এটা নয় যে আমরা কতটা শোকাহত। প্রশ্ন হলো, পরের ২২ ঘণ্টায় কোনো এক মা-বাবার জন্য আমরা কি আলাদা করতে পারব?

লেখক: স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী, জার্নালিজম অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

বিধ্বস্ত ত্রিশূলীর বিপন্ন মানুষের মাঝে

বাংলাদেশের নিরাপত্তার পথনকশা

জনমিতিক ক্রান্তির সুফল আনতে প্রধানমন্ত্রী পারবেন তো

পাকিস্তানের রাজনীতিতে দমন-পীড়ন অস্থিরতা

ভেরিফিকেশনের নামে তামাশা!

জাকাতের প্রাচীন দুই খাত, আধুনিক দুই সংকট

আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবসে বাংলাদেশের প্রবীণ ভাবনা

প্রবীণদের জন্য সমাজ ও সরকারের করণীয়

হিন্দুত্ব ও ভারতীয় কূটনীতির সীমাবদ্ধতা

বোবা কান্না বনাম সরব কান্না