এটি ছিল এক বিরল ঘটনা। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন ঘটনা আর কখনো ঘটেনি। ক্ষমতাসীন দলের একজন নারী এমপি দুষ্কর্ম ও অপরাধের অভিযোগে পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন। বাংলাদেশের ৫৫ বছরের রাজনৈতিক ইতিহাসে এ রকম ঘটনা এটাই প্রথম। আর এ জন্য দেশবাসীর প্রশংসায় ভাসছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। কারণ তারই নির্দেশে সংরক্ষিত আসনের এমপি ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি পদত্যাগ করেন। ঢাকার মিরপুরে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা, ভাঙচুর ও দখলের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগের পরই তার ওপর এই কঠিন সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত নেমে এসেছে।
কথার ধূম্রজাল নয়, সাধারণ মানুষ যেকোনো অপরাধের বিরুদ্ধে অ্যাকশন দেখতে চায়। আর তারেক রহমান সেটিই করেছেন। অতীতে এ ধরনের ঘটনায় সরকারি দল সবসময় এ ধরনের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে দলের কোনো এমপি, মন্ত্রী কিংবা নেতাকে রক্ষা করার জন্য ষড়যন্ত্র কিংবা অন্য কোনো অজুহাত তৈরি করতেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সে পথে হাঁটেননি। তিনি কঠোর অবস্থান গ্রহণ করে ওই এমপিকে পদত্যাগে বাধ্য করিয়েছেন। এ ঘটনা দলের অন্যদের জন্য একটি সতর্কবার্তা, যারা এরই মধ্যে দেশের বিভিন্ন স্থানে দখল ও চাঁদাবাজিতে জড়িয়ে পড়েছেন।
কিন্তু এ ধরনের একটি চমৎকার ইতিবাচক ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সংঘটিত একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা নতুন একটি বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা সৃষ্টির অভিযোগে বর্তমানের জামায়াত নেতা ও বিতর্কিত ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানকে গ্রেপ্তার, রিমান্ডে নেওয়া এবং অতঃপর কারাগারে পাঠানোর ঘটনা নিয়ে বেশ নেতিবাচক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। হতে পারে, বিমানবন্দর স্টাফদের সঙ্গে সাবেক এমপি আখতারুজ্জামানের আচরণ অত্যন্ত বাড়াবাড়ি পর্যায়ে ছিল। সে কারণে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের মামলায় পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করতে বাধ্য হয়েছে। কিন্তু পরে তাকে রিমান্ডে নেওয়া ও জেলে পাঠানোর ঘটনাও বাড়াবাড়ি পর্যায়ের হয়েছে বলে অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করছেন। অনেকে এমনও বলেছেন, তাকে থানা থেকে ছেড়ে দেওয়াই উত্তম ছিল, জেলে পাঠানো উচিত হয়নি।
যদিও মেজর আখতারুজ্জামান সবসময় বিতর্কিত মন্তব্য ও আচরণের কারণে সমাজে বেশ পরিচিত।
তিনি বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হওয়া সত্ত্বেও অনাহূত বিরূপ মন্তব্যের কারণে পাঁচবার বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত হয়েছেন। বিএনপির মনোনয়ন নিয়ে তিনি দুবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলেও কখনো দলের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেননি; বরং সবসময় নেতিবাচক সমালোচনা করে আনন্দ উপভোগ করেছেন। এমনকি তিনি দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে কঠোর সমালোচনা করতেও দ্বিধাবোধ করেননি। আর এ কারণেই তিনি বারবার বহিষ্কৃত হয়েছেন। এমনকি তিনি বিএনপিতে থাকা অবস্থায় জামায়াতে ইসলামীকে স্বাধীনতাবিরোধী ও রগকাটা পার্টি হিসেবে অভিহিত করে নেতাকর্মীদের জামায়াত থেকে সাবধান থাকার কথা বলেছিলেন। অথচ আজ তিনি সেই জামায়াতে ইসলামীরই একজন নেতা।
যাই হোক, মেজর আখতারুজ্জামান তার নেতিবাচক ও উগ্র মেজাজ এবং দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গ কিংবা নীতি ও দলবদলের কারণে বারবার বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত হলেও কখনো গ্রেপ্তার হননি বা বিচারের মুখোমুখি দাঁড়াননি। তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে এই প্রথম সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছেন। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, সত্যিই কি তিনি সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার কারণে গ্রেপ্তার হয়েছেন, নাকি বিমানবন্দরের অব্যবস্থাপনা ঢাকার জন্য এই গ্রেপ্তারের নাটক কিংবা উদ্দেশ্যমূলক এটি করা হয়েছে?
তবে এই সত্য স্বীকার করতে হবে যে, শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অব্যবস্থাপনা বর্তমানে চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিশেষ করে, প্রবাসী শ্রমিকদের প্রতি অবজ্ঞা এবং ইমিগ্রেশন শেষ করার পর ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাগেজের জন্য অপেক্ষা করা ও ট্রলির অপ্রতুলতা যাত্রীদের ভোগান্তিকে দুঃসহ পর্যায়ে পৌঁছে দিয়েছে। সম্প্রতি কানাডা থেকে আগত একজন নারী যাত্রী ভিডিও বার্তায় বিলম্বে লাগেজ আসার যে বর্ণনা দিয়েছেন, তা খুবই নেতিবাচক। যারা সচরাচর বিদেশ গমনাগমন করেন, তারা নিশ্চয়ই লক্ষ করেছেন যে, বিশ্বের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশন পার হওয়ার আগেই লাগেজ চলে আসে। এ নিয়ে অপেক্ষার প্রহর গুনতে হয় না।
আমার মনে হয়, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় পরিস্থিতির বেশ উন্নতি ঘটেছিল। তখন যাত্রীদের সেবা দেওয়ার দৃশ্য চোখে পড়ার মতোই ছিল। ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে ওমরাহ পালন করতে সৌদি আরব যাওয়ার ও আসার পথে সেটি আমি দেখেছি। তখন দেখেছি, সিনিয়র যাত্রীদের প্রতি সম্মান দেখানোর সে দৃশ্যও। আর লাগেজ আসার বিলম্ব চোখে পড়েনি। বর্তমানে যাতায়াতকারী আমার পরিচিতদের কাছ থেকে যা শুনেছি, তা খুবই হতাশাজনক।
এই প্রেক্ষাপটে বিশেষজ্ঞদের অভিমত হচ্ছে, বাংলাদেশ সত্যিই যদি আগামীতে সফলভাবে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ দেখতে চায়, তাহলে বিদেশি বিনিয়োগের সব বাধা অতিক্রম করতে হবে। সেটি করতে গেলে অবশ্যই আন্তর্জাতিক এই বিমানবন্দরের দুরবস্থা লাঘব করা জরুরি। কারণ কোনো বিদেশি বিনিয়োগকারীকে যদি এই বিমানবন্দরে নেমে লাগেজ কিংবা ট্রলির জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়, তাহলে সে আর এ দেশে বিনিয়োগ করার কথা স্বপ্নেও ভাববে না। তাই আমাদের উচিত হবে, কোনো অনাহূত ঘটনার জন্য কাউকে শাস্তি দেওয়ার আগে পুরো পরিস্থিতির আনুপূর্বিক তদন্ত হওয়া এবং দায়ী ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনা।
মেজর আখতারুজ্জামান কোন প্রেক্ষাপটে বেপরোয়া হয়ে উঠেছিলেন, সেটি অনুসন্ধান করলেই প্রকৃত সত্য বের হয়ে আসবে। যদি ব্যাপারটা এ রকম হয়, পরিস্থিতিটা এতটাই বাজে ছিল যে, একজন সচেতন মানুষ হিসেবে আখতারুজ্জামান নিজেকে ধরে রাখতে পারেননি, তাহলে এতটুকু প্রতিক্রিয়া স্বাভাবিক। কিন্তু তিনি প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে কোনো কর্মকর্তাকে ঘাড় ধরে বের করে দেওয়ার হুমকি দিতে পারেন না। কারণ তিনি একজন সাবেক এমপি এবং আর যারা তার সঙ্গে ছিলেন, তারা বর্তমানের এমপি, অর্থাৎ আইনপ্রণেতা। তারা ওমরাহ পালন করে দেশে ফিরছিলেন। আর যে ইস্যুটি নিয়ে মেজর আখতারুজ্জামান অসৌজন্যমূলক আচরণে প্রবৃত্ত হয়েছিলেন, সেটি তো একটি জাতীয় ইস্যু ছিল। কারণ আমাদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের এই বেহাল অবস্থা কার্যত আমাদের অগ্রগতির পথে বিরাট বাধা। তাই সঙ্গে থাকা আইনপ্রণেতারা মেজর আখতারুজ্জামানকে নিবৃত্ত করে বিষয়টি পার্লামেন্টে উত্থাপন করার জন্য সমস্যার আরো গভীরে যেতে পারতেন। তা না করে শুধু দর্শকের ভূমিকায় থেকে পরিস্থিতিকে আরো অবনতির দিকে নিয়ে গিয়ে তারা ভুল করেছেন। প্রকৃতপক্ষে আমরা সবার কাছ থেকে বিমানবন্দরের মতো স্থানে সহনশীলতা ও প্রাজ্ঞ দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন দেখতে চাই।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক