হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে নেতিবাচক প্রভাব ও করণীয়

মো. মুখলেছুর রহমান

ছবি: সংগৃহীত

বর্তমান বিশ্বে অর্থনীতি, শ্রমবাজার এবং জ্বালানি সরবরাহ এতটাই অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত যে, একটি অঞ্চলের যুদ্ধ বা সংঘাত খুব দ্রুত সারা বিশ্বে নেতিবাচক প্রভাব তৈরি করতে সক্ষম হয়। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত সেই বাস্তবতাকে নতুন করে সামনে এনেছে। বাংলাদেশের মতো শ্রমনির্ভর ও রেমিট্যান্সনির্ভর অর্থনীতির জন্য এই সংঘাত শুধু পরোক্ষ নয়; বরং প্রত্যক্ষভাবে একটি জটিল অর্থনৈতিক ঝুঁকির সৃষ্টি করেছে।

ইরান, ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান উত্তেজনা এবং আঞ্চলিক অস্থিরতা দীর্ঘায়িত হলে এর বহুমাত্রিক নেতিবাচক প্রভাব বাংলাদেশের শ্রমবাজারে গভীরভাবে প্রতিফলিত হবে—তা অনেকাংশে নিশ্চিত বলে ধারণা করা যায়।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে রেমিট্যান্স একটি প্রধান স্তম্ভ। এ-বিষয়ক তথ্যাবলি বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায় যে, প্রথমত : ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশে রেমিট্যান্স এসেছে প্রায় ২১-২৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

দ্বিতীয়ত : মোট রেমিট্যান্সের প্রায় ৫৫-৬০ শতাংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে।

তৃতীয়ত : শুধু Saudi Arabia থেকেই প্রায় ২৫ শতাংশ রেমিট্যান্স আসে।

চতুর্থত : আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত এবং ওমান—এই দেশগুলো মিলিয়ে প্রায় ৩০-৩৫ শতাংশ অবদান রাখে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের একটি বড় অংশই আসে প্রবাসী আয়ের মাধ্যমে, যা আমদানি ব্যয় মেটানো এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

বাংলাদেশের প্রবাসী শ্রমিকদের সংখ্যা প্রায় ১ দশমিক ৩-১ দশমিক ৪ কোটি (cumulative), যার মধ্যে সক্রিয়ভাবে কর্মরত কয়েক মিলিয়ন শ্রমিক মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থান করছেন। সৌদি আরবে ২০-২৫ লাখ, আরব আমিরাতে ১০-১২ লাখ, ওমানে ৭-৮ লাখ, কাতারে ৫-৬ লাখ, কুয়েতে ৩-৪ লাখ বাংলাদেশি শ্রমিক কর্মরত আছেন।

এই বিশাল শ্রমশক্তি মূলত নিম্ন ও মধ্যশ্রেণির পেশার সঙ্গে জড়িত, যা যুদ্ধের সময় সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হয়।

মধ্যপ্রাচ্যে আমাদের শ্রমবাজারে যুদ্ধের সরাসরি প্রভাব পরিলক্ষিত হয় নিম্নোক্তভাবে—

প্রথমত, শ্রমচাহিদা হ্রাস। (Demand Shock)

বিশেষজ্ঞদের মতে, যুদ্ধের সময় মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় অবকাঠামো প্রকল্প ৩০-৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে (ঐতিহাসিক ট্রেন্ড অনুযায়ী)।

বে সরকারি বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়। নির্মাণ খাতে শ্রমিক চাহিদা দ্রুত কমে যায়, ফলে বাংলাদেশ থেকে নতুন শ্রমিক নিয়োগও আশঙ্কাজনক হারে কমে যায়।

দ্বিতীয়ত, মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত বাংলাদেশি জনশক্তির চাকরি হারানোর ঝুঁকি তৈরি হয়।

গালফ অঞ্চলে অর্থনৈতিক মন্দার সময় (২০০৮ বা ২০২০ মহামারিতে) বিদেশি শ্রমিকদের মধ্যে ১০-২০ শতাংশ পর্যন্ত চাকরি হারানোর নজির রয়েছে। নিম্ন পেশার শ্রমিকদের প্রথমে ছাঁটাই করা হয়।

এই প্রবণতা বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতেও পুনরাবৃত্তি হওয়ার জোরালো আশঙ্কা রয়েছে।

তৃতীয়ত, রেমিট্যান্সে বিরূপ প্রভাব পড়তে শুরু করে। গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে অনুমিত হয়, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে রেমিট্যান্স ১০-১৫ শতাংশ বা তার চেয়ে বেশি হারে কমে যেতে পারে। এর ফলে বাংলাদেশে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে সরাসরি চাপ তৈরি হবে।

চতুর্থত, জ্বালানি বাজার ও শ্রমবাজারের মধ্যে গভীর আন্তঃসম্পর্ক বিদ্যমান রয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনীতি মূলত জ্বালানি তেলের ওপর নির্ভরশীল। হরমুজ প্রণালি (Staight of Hormuz) দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল পরিবাহিত হয়।

বর্তমানে এই রুট বন্ধই বলা যায়। ফলে তেলের দাম বহুলাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে। সরকার উন্নয়নব্যয় কমাতে বাধ্য হয়েছে। শ্রমবাজার ইতোমধ্যেই যথেষ্ট সংকুচিত হয়ে পড়েছে।

এ যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নিম্নরূপ নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

এক. বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ হ্রাস পেতে পারে। রেমিট্যান্স কমলে রিজার্ভে উল্লেখযোগ্য হারে ডলারের ঘাটতি তৈরি হতে পারে।

দুই. মুদ্রাস্ফীতি বাড়তে পারে। জ্বালানি মূল্য বৃদ্ধি পেলে পরিবহন খরচ বাড়ে। ফলে স্বভাবতই খাদ্যপণ্যের দাম ৫-১০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তিন. বেকারত্ব বৃদ্ধি পাবে। বিদেশ থেকে ফেরত শ্রমিকদের সংখ্যা বাড়লে অভ্যন্তরীণ বেকারত্ব স্বাভাবিকভাবেই বৃদ্ধি পাবে।

এমতাবস্থায় আমাদের অনতিবিলম্বে নীতিগত করণীয় ঠিক করতে হবে। কালবিলম্ব না করে নিম্নোক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

এক. শ্রমবাজারে অন্তত ২০-৩০ শতাংশ বৈচিত্র্য আনতে হবে। নতুন নতুন শ্রমবাজার খুঁজে বের করতে হবে।

ইউরোপ, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া, লাতিন আমেরিকার দেশ গায়ানাসহ অন্য সম্ভাব্য দেশগুলোয় জনশক্তি রপ্তানি বাড়ানোর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। জনশক্তি রপ্তানি বাজার সম্প্রসারিত করতে হবে।

দুই. আমাদের জনশক্তিকে অবশ্যই দক্ষতা উন্নয়নে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। দক্ষ জনশক্তি যত বৃদ্ধি পাবে, রেমিট্যান্সপ্রবাহও তত বৃদ্ধি পাবে।

বর্তমানে প্রবাসীদের ৭০ শতাংশ দক্ষতার বিবেচনায় নিম্নপর্যায়ের। এটি কমিয়ে উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন জনশক্তি বাড়াতে হবে।

তিন. রেমিট্যান্স ডিজিটালাইজেশনে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। হুন্ডির পরিবর্তে ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স বৃদ্ধি করতে সক্ষম হলে বছরে ২-৩ বিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত রেমিট্যান্স সংগ্রহ সম্ভব হবে।

চার. বিদেশে কর্মরত শ্রমিক ভাইদের জন্য অবশ্যই অন্তত ১ বিলিয়ন ডলারের সুরক্ষা তহবিল গঠন করতে হবে।

পাঁচ. দেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে।

বিদেশফেরত শ্রমিক ভাইবোনদের জন্য ক্ষুদ্র ও মাঝারিশিল্পে সহজ শর্তে বিনিয়োগ দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।

দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের অংশ হিসেবে নির্ভরতা কমানোর পথ খুঁজে বের করতে হবে। বাংলাদেশকে এখন তিনটি দিকে মনোযোগ দিতে হবে—এক. রপ্তানি বৈচিত্র্যকরণ, দুই. দেশীয় শিল্পায়নে সরকারি সহায়তা বৃদ্ধি এবং উদ্বুদ্ধ করণ, তিন. মানবসম্পদ উন্নয়ন।

এ কথা ভুললে চলবে না, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বাংলাদেশের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ—তাতে কোনো সন্দেহ নেই, কিন্তু একই সঙ্গে এ কথাও মনে রাখতে হবে, এটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কাঠামো পুনর্গঠনের একটি সুযোগও এনে দিয়েছে।

যদি এখনই সঠিক নীতি গ্রহণ করা যায় এবং দলমত, ধর্ম-বর্ণ, শ্রেণি-পেশা নির্বিশেষে সবাই সেই নীতি আন্তরিকভাবে অনুসরণ করেন, তাহলে এই সংকট ভবিষ্যতে একটি শক্তিশালী ও টেকসই অর্থনীতির ভিত্তি তৈরি করতে বাংলাদেশকে সুযোগ তৈরি করে দিতে পারে। সে সুযোগ গ্রহণ করতে হলে দ্রুততার সঙ্গে সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিকল্প নেই।

লেখক : অর্থনীতিবিদ, ব্যাংকিং বিশেষজ্ঞ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

mukhles1975@gmail.com

শিক্ষাব্যবস্থার বিপর্যয় ও মানহীন বিশ্ববিদ্যালয়

শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে অস্ট্রেলিয়া-যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষা

অর্থনীতির গতি ও বিনিয়োগ পরিস্থিতি

ইরানি বিশ্ববিদ্যালয় ধ্বংস ও মার্কিন ক্যাম্পাসে কণ্ঠরোধ

‘মৌলবাদী অর্থনীতি’ থেকে ইসলামি ব্যাংকিং

ভবদহ জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান

ইরান যুদ্ধ গুঁড়িয়ে দিয়েছে আমিরাতের উচ্চাকাঙ্ক্ষা

‘কিচেন ক্যাবিনেট’ সংস্কৃতির গতিপ্রকৃতি

শিক্ষাবিদ ও সংস্কারক প্রফেসর মুহাম্মাদ আব্দুল বারী

দেশ আর ৫ আগস্টের আগে ফিরবে না