হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক সমস্যা মোকাবিলায় জনগণের অংশগ্রহণ

ড. শাহজাহান খান

সম্প্রতি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার মতো মশাবাহিত প্রাণঘাতী রোগ থেকে মানুষকে রক্ষায় সক্রিয় ভূমিকা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ এই সমস্যার সমাধানের জন্য সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে আসা এই নির্দেশ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়।

আমি নিজে ২০২৩ সালের আগস্ট মাসে অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত হয়েছিলাম। আজও আমার গোড়ালির জয়েন্টে ব্যথা রয়ে গেছে। তাই আমি আশা করি, সংশ্লিষ্ট সবাই প্রধানমন্ত্রীর এই আন্তরিক আহ্বানে সাড়া দেবেন এবং দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে মশাবাহিত প্রতিরোধযোগ্য রোগ নির্মূল করতে বা কমাতে কার্যকর ভূমিকা পালন করবেন।

ঢাকা শহরে মাঝেমধ্যে দেখা যায় মশা নিধনের নামে প্রচণ্ড শব্দ করে ওষুধ ছিটানো হয়, কিন্তু বাস্তবে এর তেমন কোনো কার্যকারিতা দেখা যায় না। এ ধরনের কর্মসূচি অনেক সময় করদাতাদের অর্থ অপচয় ছাড়া আর কিছুই নয়।

আমি মনে করি, মশা নিধনের পাশাপাশি, ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার প্রতিরোধের ভ্যাকসিন আবিষ্কার করা আবশ্যক। এ দেশের সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানীদের এ বিষয়ে গুরুত্বসহ চিন্তা করা উচিত। সরকারপ্রধানের অফিসও এ ব্যাপারে উদ্যোগ নিতে পারে।

বাস্তবতা হলো, শুধু সরকারের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। সচেতন নাগরিক হিসেবেও আমাদের দায়িত্ব আছে। মশাবাহিত রোগ প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো মশার বংশবিস্তারস্থল ধ্বংস করা। জলাবদ্ধতা দূর করা, স্থির পানির উৎস পরিষ্কার রাখা, এমনকি ছাদের বাগানের টবেও যেন পানি জমে না থাকে—এসব বিষয়ে সবাইকে সচেতন হতে হবে। প্রতিটি মহল্লা বা এলাকায় মানুষ যদি সম্মিলিতভাবে উদ্যোগ নেয়, তবে এটি কোনো কঠিন কাজ নয়।

তবে মশা নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি আসলে আমাদের পরিবেশ ব্যবস্থাপনার বৃহত্তর সমস্যার অংশ। আমরা প্রায়ই যত্রতত্র ময়লা ফেলি এবং আবর্জনা ছড়িয়ে রাখি—কখনো কখনো মসজিদের প্রবেশমুখেও থুথু ও কফ ফেলি। নোংরা টয়লেট, অপরিচ্ছন্ন রাস্তা এবং দুর্গন্ধযুক্ত বাজার—এসব দৃশ্য আমাদের প্রতিদিনের বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ ইসলাম ধর্মে পরিচ্ছন্নতাকে ঈমানের অর্ধেক বলা হয়েছে। তবু বাস্তবে আমরা পরিচ্ছন্নতার বিষয়ে খুব কম গুরুত্ব দিই। অথচ আমরা চাইলে খুব সহজেই এই পরিস্থিতির পরিবর্তন আনতে পারি।

১৯৯৫ সালে চীনের বেইজিংয়ে ভ্রমণের সময় আমি একটি ঘটনা দেখেছিলাম। এক নারী শিক্ষার্থী রাস্তায় থুথু ফেলায় তাকে ১০ ইউয়ান জরিমানা করা হয়। তাকে বলা হয়েছিল, টিস্যু ব্যবহার করে তা নির্দিষ্ট ডাস্টবিনে ফেলতে হবে। কঠোর নিয়ম এবং নাগরিক সচেতনতার কারণেই আজ চীন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশ ও সুস্থ জীবনযাপনের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে।

ধূমপান ও মাদকাসক্তিও আমাদের সমাজের আরেকটি বড় সমস্যা। গবেষণায় দেখা গেছে, পরোক্ষ ধূমপান সরাসরি ধূমপানের চেয়েও বেশি ক্ষতিকর। তাই তরুণ সমাজকে রক্ষা করতে সামাজিক ও যুব নেতৃত্বের সম্মিলিত উদ্যোগ অত্যন্ত জরুরি।

এছাড়া নারী ও কন্যাশিশুর বিরুদ্ধে সহিংসতার উদ্বেগজনক বৃদ্ধি আমাদের সমাজের জন্য গভীর লজ্জার বিষয়। একটি মুসলিমপ্রধান দেশে এ ধরনের ঘটনা আমাদের নৈতিক অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। আমাদের মা-বোন ও মেয়েদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আমাদের সবার দায়িত্ব। অপরাধীদের সামাজিক চাপে রাখতে ও আইনি বিচারের আওতায় আনতে সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।

ঢাকার ভয়াবহ যানজটও অনেকাংশে আমাদের নিজেদের আচরণের ফল। আমরা প্রায়ই ট্রাফিক নিয়ম অমান্য করি এবং আইন অমান্য করে অন্যদের আগে যাওয়ার চেষ্টা করি। ফলে শেষ পর্যন্ত সবাই একই স্থানে আটকে যাই। ট্রাফিক আইন মেনে চলা প্রতিটি চালকের স্বাভাবিক অভ্যাস হওয়া উচিত। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের সমাজে অনেক সময় মনে করা হয় আইন শুধু দুর্বলদের জন্য। এই মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে উন্নত ও সভ্য সমাজ গড়ে তোলা কঠিন।

আমার বিশ্বাস, একজন দায়িত্বশীল, আস্থাভাজন ও দূরদর্শী রাষ্ট্রনেতার অনুপ্রেরণামূলক নেতৃত্ব জনগণকে সচেতন করে এবং তাদের সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত করে অনেক বড় পরিবর্তন আনতে পারে। সরকার আন্তরিক হলে সমাজকর্মী, ধর্মীয় নেতা এবং যুব স্বেচ্ছাসেবকদের সম্পৃক্ত করে, স্থানীয় মসজিদ, মন্দির, স্কুল, কলেজ, মাদরাসা, ক্রীড়া ক্লাব ও অন্যান্য সামাজিক সংগঠন এই উদ্যোগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

বাংলাদেশের প্রয়োজন একটি শক্তিশালী সামাজিক ও যুব আন্দোলন, যা সমাজের ক্ষতিকর ও অনৈতিক কর্মকাণ্ড বর্জন করে দুষ্কৃতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেবে এবং জনগণের কল্যাণে ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে।

আমাদের জাতীয় জীবনে শহীদ ও বীরদের যে স্বপ্ন ছিল, তা বাস্তবায়ন করতে হলে আমাদের নিজেদেরও পরিবর্তিত হতে হবে। দেশের সব সমস্যার সমাধান শুধু সরকারের ওপর ছেড়ে দিলে চলবে না। নাগরিক হিসেবেও আমাদের দায়িত্ব রয়েছে।

একসময় আমরা ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন এবং পাকিস্তানি বঞ্চনাকে আমাদের দুর্ভাগ্যের জন্য দায়ী করেছি। কিন্তু স্বাধীনতার এত বছর পর আমাদের এখন নিজেদের কর্মকাণ্ডের দিকেও ফিরে তাকাতে হবে এবং সংশোধিত হতে হবে। শহীদদের রক্তের সঙ্গে প্রতারণা করে যারা অবৈধ সম্পদ বানিয়েছে, তাদের জবাবদিহি করতে হবে। অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে সরকার ও জনগণের যৌথ উদ্যোগেই একটি ন্যায়ভিত্তিক, পরিচ্ছন্ন ও উন্নত বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব।

লেখক : ইমেরিটাস প্রফেসর, ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন কুইন্সল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া।

সাবেক উপাচার্য, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ

Email: Shahjahan.Khan@unisq.edu.au

দখল ও সংঘাতপ্রিয় একটি রাষ্ট্র

এক-এগারোর দুঃসময় ভোলা যাবে না

শিক্ষা বোর্ড ও বছরভেদে পরীক্ষার ফলে তারতম্য কতটা যৌক্তিক

আইন ও এখতিয়ারের প্রশ্নে যে বিভ্রান্তি

জ্বালানি সংকটে ভাঙছে জোট : রাশিয়ামুখী ভারত

ফ্যাসিবাদী শাসনে সেনাবাহিনীর ভেতরের অভিজ্ঞতা

যে হাসপাতালকে যুদ্ধ থামাতে পারেনি

সাধারণ চাওয়াগুলো পূরণ কি অসম্ভব

আলেমদের বঞ্চনা

দেশের ইমেজের জন্য অশনিসংকেত