হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

আমেরিকার সমাজে বন্দুক সহিংসতা

ডা. ওয়াজেদ খান

ডা. ওয়াজেদ খান

আমেরিকার লুইজিয়ানা অঙ্গরাজ্যে সম্প্রতি একটি বাড়িতে গুলিতে নিহত হয়েছে আট শিশু। এর মধ্যে সাতজনই হামলাকারী ব্যক্তির নিজের সন্তান। অপরজন তাদের আত্মীয়। যুক্তরাষ্ট্রে ২০২৪ সালের পর সবচেয়ে প্রাণঘাতী বন্দুক হামলার ঘটনা এটি। নিহত শিশুদের মধ্যে পাঁচজন মেয়ে ও তিনজন ছেলে। তাদের বয়স তিন থেকে ১১ বছরের মধ্যে। নির্মম এ ঘটনায় অভিভাবকরা উদ্বিগ্ন। দেশজুড়ে দাবি উচ্চারিত হচ্ছে কঠোর বন্দুক নিয়ন্ত্রণ আইন কার্যকর করার জন্য। অর্থ ও অস্ত্রের দেশ আমেরিকা। বিশ্বব্যাপী অস্ত্রবাজির জন্য দুর্নাম আছে পারমাণবিক শক্তিধর এ রাষ্ট্রটির। মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে দেশটির অভ্যন্তরেও এখন ছোঁয়া লেগেছে অস্থিরতার। আমেরিকার বহুজাতিক সমাজে চলমান বন্দুক সহিংসতায় প্রাণহানি এসব সমস্যার চেয়েও অধিকতর গভীর ও জটিল। সমাজের অন্যতম জনস্বাস্থ্য সমস্যা বন্দুক সহিংসতায় প্রতিনিয়ত প্রাণহানি ঘটছে মানুষের। প্রাণনাশের অনানুপাতিক এই হার সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশা ও বয়সের মানুষকে পরিণত করছে নির্মম শিকারে। সাধারণ মানুষের পাশাপাশি সমাজবিজ্ঞানী ও মানসিক চিকিৎসকরাও উদ্বিগ্ন অপ্রতিরোধ্য এ বন্দুক সহিংসতায়। প্রায় ৩৪ কোটি জনসংখ্যার দেশ আমেরিকায় গড়ে প্রতিদিন ১৩০ জনের প্রাণহানি ঘটে বন্দুক সহিংসতায় এবং আহত হয় প্রায় ২০০ জন। সে হিসেবে প্রতিবছর প্রাণহানির সংখ্যা দাঁড়ায় ৪৭ হাজার। আমেরিকার ‘সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি)’-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বন্দুক সহিংসতায় প্রাণহানির সংখ্যা ছিল ৪৬ হাজার ৭২৮ জন। এর মধ্যে ২৭ হাজার ৩০০ জনের মৃত্যু ঘটে আগ্নেয়াস্ত্রের দ্বারা আত্মহত্যায়। আত্মহত্যার এই হার ৫৮ শতাংশ। বন্দুক দ্বারা খুনের ঘটনা ঘটে ৩৮ শতাংশ। এই সংখ্যা ১৭ হাজার ৯২ জন। একই বছর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিতে প্রাণ হারায় ১ দশমিক ৩ শতাংশ এবং দুর্ঘটনাবশত ও অজানা কারণে গুলির ঘটনায় প্রাণ হারায় এক শতাংশ মানুষ। এর আগে ২০২১ সালে বন্দুক সহিংসতায় প্রাণহানির সংখ্যা ছিল ৪৮ হাজার ৮৩০।

বিশ্বে বেসামরিক নাগরিকদের হাতে সবচেয়ে বেশি বন্দুক রয়েছে আমেরিকায়। এই সংখ্যা ৩৯ দশমিক ৩ কোটি, যা মোট জনসংখ্যার চেয়েও ছয় কোটি বেশি। আমেরিকার ১০০ জন নাগরিক গড়ে ১২০টি বন্দুকের অধিকারী। কাকতালীয়ভাবে ৮৭ শতাংশ বন্দুকের মালিকানা বন্দুকের অর্ধেক মালিকের হাতে কেন্দ্রীভূত। এসব অস্ত্রের প্রায় ৬০ শতাংশ হ্যান্ডগান। গোটা বিশ্বের বেসামরিক মালিকানাধীন মোট অস্ত্রের ৪৫ শতাংশই রয়েছে আমেরিকার বেসামরিক ব্যক্তিদের হাতে। আমেরিকা জুড়ে ২০২৫ সালে বন্দুক সহিংসতা তিন শতাংশ হ্রাস পেয়েছে প্রতি লাখে। তারপরও গত বছর ২০২৫ সালে সহিংসতা ঘটেছে ৪০৮টি।

নানা কারণেই কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকানদের মাঝে বন্দুক সহিংসতার ঘটনা বেশি ঘটে, যা শ্বেতাঙ্গ আমেরিকানদের তুলনায় ১২ গুণ অধিক এবং ১৫ থেকে ৩৪ বছর বয়সিরা সাধারণত এর শিকার। অপরদিকে বয়স্ক শ্বেতাঙ্গরা আত্মহননের কাজে বেছে নেয় আগ্নেয়াস্ত্র। ১ থেকে ৯ বছরের কৃষ্ণাঙ্গ শিশুদের মাঝে গুলির ঘটনায় মৃত্যুর হার শ্বেতাঙ্গদের তুলনায় ১০ গুণ বেশি। গৃহবিবাদের কারণে বছরে ছয় শতাধিক নারী নিহত হয় বন্দুক সহিংসতায়। আমেরিকায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বন্দুক সহিংসতার ব্যাপকতায় অভিভাবকরা উদ্বিগ্ন। প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয়—সর্বত্রই বন্দুক সহিংসতায় অকালে ঝরে পড়ছে অসংখ্য প্রাণ। বিগত দুই দশকে আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে এই মৃত্যুহার। কলম্বাইন হাইস্কুলে ১৯৯৯ সালে বন্দুক সহিংসতায় ১৪ জন শিক্ষার্থী নিহত হয় এবং আহত হয় অনেকে। প্রতিবছরই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মৃত্যুসংখ্যা বাড়ছে বন্দুক সহিংসতার ঘটনায়। শুধু ২০২৪ সালেই ৩৯টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বন্দুক সহিংসতার ঘটনা ঘটে।

বন্দুক সহিংসতার ঘটনা বেশি ঘটছে মিসিসিপি, লুইজিয়ানা, নিউ মেক্সিকো, আলাবামা ও ওয়াইমিং রাজ্যে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোয় বন্দুক আইন তুলনামূলকভাবে শিথিল হওয়ার কারণেই এসব রাজ্য সহিংসতাপ্রবণ। এছাড়া আলাস্কা, মন্টানা, আরকানসাস, মিজৌরি, টেনেসি ও সাউথ ক্যারোলিনা উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ। এসব রাজ্যে প্রতিটি বাড়িতেই রয়েছে ব্যক্তিগত একাধিক অস্ত্র। নতুন ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুললে বা পারিবারিক অনুষ্ঠানানে বন্দুক উপহার দেওয়ার রেওয়াজ আছে বিভিন্ন এলাকায়। উন্নত বিশ্বের মধ্যে বন্দুক সহিংসতায় মৃত্যুহার সবচেয়ে বেশি আমেরিকায়, যা ফ্রান্সের তুলনায় ১৯ গুণ, জার্মানির তুলনায় ৭৭ গুণ এবং অস্ট্রেলিয়ার তুলনায় ৩৩ গুণ বেশি। আমেরিকায় ২০ বছর বয়সের নিচের আট শতাংশ তরুণের মৃত্যু হয় বন্দুক সহিংসতায়। শারীরিক, মানসিক ও জরুরি চিকিৎসার জন্য আমেরিকা ৫৫৭ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করে প্রতিবছর। অনুন্নত দেশের মধ্যে বন্দুক সহিংসতায় বেশি মৃত্যুর হার জ্যামাইকা ও ইকুয়েডোরে।

বিশ্বের সবচেয়ে বড় মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের দেশ আমেরিকা। এ দেশে বড় একটি জনগোষ্ঠী রয়েছে, যারা মানসিকভাবে অসুস্থতায় ভুগছে। তাদের মাঝে নৈরাশ্য এবং অপরাধপ্রবণতা ব্যাপক। এছাড়া দারিদ্র্য, ধর্ম-বর্ণ, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও বৈষম্য বন্দুক সহিংসতা বৃদ্ধির সহায়ক হিসেবে কাজ করছে। সবচেয়ে বড় কথা হলো আগ্নেয়াস্ত্রের সহজপ্রাপ্যতা। আত্মরক্ষা ও পারিবারিক নিরাপত্তার অজুহাতে সহজেই বন্দুকের লাইসেন্স প্রাপ্তি ও পাচারকৃত অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার প্রতিনিয়ত ঝুঁকি বাড়াচ্ছে বন্দুক সহিংসতার; বিশেষ করে শহরের বাইরের এলাকায়। কোভিড-পরবর্তী সময়ে আমেরিকার ২৫টি রাজ্যে বন্দুক সহিংসতা কিছুটা হ্রাস পেয়েছে। ২০২২ সালের দ্বিদলীয় সামাজিক নিরাপত্তা আইন কার্যকর হওয়ায় সামাজিক নিরাপত্তা অনেকটাই উন্নত হয়েছে এসব রাজ্যে।

বন্দুক সহিংসতা আমেরিকার সমাজে বড় ধরনের একটি মানবিক সমস্যা। প্রতিরোধযোগ্য এই জনস্বাস্থ্য সমস্যা সমাধানের দাবি বারবার উচ্চারিত হলেও কার্যত তার কোনো স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না। যখনই কোথাও কোনো বন্দুক সহিংসতায় প্রাণহানির ঘটনা ঘটে, তখনই দেশটির জনগণ সোচ্চার হন। যুগ যুগ ধরে বন্দুক নিরাপত্তা আইন কার্যকরের দাবি উচ্চারিত হচ্ছে আমেরিকায়। মায়েরা রাস্তায় নামছেন, বিভিন্ন সংগঠনও বলছে আইন প্রণয়নের কথা; কিন্তু কিছুতেই বন্ধ হচ্ছে না বন্দুক সহিংসতা। নিরাপদ সমাজ ও জীবনরক্ষার দাবি উপেক্ষিত হচ্ছে বারবারই। কতিপয় রাজ্যের নিজস্ব আইনে বন্দুক সহিংসতা কিছুটা রহিত করা গেলেও কেন্দ্রীয় সরকার কঠোর আইন প্রণয়ন করতে পারেনি অদ্যাবধি।

আমেরিকার সমাজ কঠোর বন্দুক নিয়ন্ত্রণ আইনের পক্ষে। তাদের মতে, কঠোর আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগই পারে বন্দুক সহিংসতা প্রতিরোধ করতে। বিশেষ করে বন্দুকের সহজলভ্যতা কমাতে ব্যাকগ্রাউন্ড চেক এবং নিরাপদ স্টোরেজ আইন জরুরি। এনআরএ বা ন্যাশনাল রাইফেলস অ্যাসোসিয়েশনের প্রভাবমুক্ত দ্বিদলীয় সমঝোতার মাধ্যমে একটি স্থায়ী সমাধানে উপনীত হওয়ার কোনো বিকল্প নেই। বন্দুক সহিংসতা আমেরিকার সমাজে দীর্ঘস্থায়ী ও চরম ভয়ানক একটি সমস্যা। আত্মরক্ষার জন্য বন্দুকের সহজলভ্যতা এখন পরিবারের সদস্যসহ অন্যদের জীবন সংহারের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সামাজিক নিরাপত্তার জন্য আত্মরক্ষায় বন্দুক এখন বড় হুমকি। যুক্তরাষ্ট্রে অসুস্থতার কারণে সবচেয়ে বেশি মানুষের মৃত্যু ঘটে হৃদরোগে। প্রতি ৩৪ সেকেন্ডে হৃদরোগে প্রাণ হারান একজন আমেরিকান। বার্ষিক মৃত্যুর হার এ দেশে ৯ দশমিক ২৮ শতাংশ। গড় আয়ু ৭৭ দশমিক ৫ বছর, যদিও পুরুষরা নারীদের আগে শিকার হন মৃত্যুর। কিন্তু বন্দুক সহিংসতায় পরিবার ও সমাজে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে অপমৃত্যুর সংখ্যা। ঘটনা-দুর্ঘটনা কমবেশি সব কমিউনিটিতেই ঘটেছে। সম্প্রতি বাংলাদেশি কমিউনিটিতেও তুলনামূলকভাবে বেড়েছে অপমৃত্যুর ঘটনা।

লেখক : সম্পাদক, সাপ্তাহিক বাংলাদেশ, নিউ ইয়র্ক

গণভোট বাতিলের পরিণতি

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ : ধ্বংসস্তূপে মানবতার আর্তনাদ

সংসদে মধুরালাপ রাজপথে কিরিচের কোপ

মার্কিন বাহিনীতে ভর্তির বয়স কেন ৪২ করা হচ্ছে

সফল নেতৃত্বের যোগ্যতা ও বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ

ওয়াজেদ আলী খান পন্নী : জাতীয় মুক্তির সিপাহসালার

লুটপাটের মেগা প্রকল্প যখন জনগণের গলার কাঁটা

চিত্তরঞ্জন সুতারের রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ড থেকে শিক্ষা

ন্যায়ের শাসন না ‘মগের মুল্লুক’

নেতানিয়াহু কোত্থেকে পেলেন গণহত্যার লাইসেন্স