বাংলাদেশে সাম্প্রতিক অপরাধের মানচিত্রে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের নাম ‘কিশোর গ্যাং’। পাড়া-মহল্লার উঠতি মাস্তানদের এই চক্রগুলো আজ আর কেবল স্কুল পালানো বা ছোটখাটো উচ্ছৃঙ্খলতায় সীমাবদ্ধ নেই; তারা জড়িয়ে পড়ছে প্রকাশ্য খুন, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, ধর্ষণ, মাদক কারবার এবং নারকীয় সব পৈশাচিকতায়। ঢাকার মোহাম্মদপুর, উত্তরা কিংবা ঢাকার বাইরের বিভাগীয় ও জেলা শহরগুলো—সর্বত্রই ধারাল সুইচগিয়ার ও দেশি অস্ত্রে সজ্জিত এই দলগুলো সাধারণ মানুষের জীবনকে এক চরম নিরাপত্তাহীনতার মুখে ঠেলে দিয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন তথ্য অনুযায়ী, শুধু রাজধানী ও এর আশেপাশেই শতাধিক কিশোর গ্যাং সক্রিয়, যার সদস্যসংখ্যা কয়েক হাজার। কিন্তু এই বিপদের শিকড় আরো গভীরে; পারিবারিক তদারকির অভাব, সামাজিক স্খলন এবং আইনের কাঠামোগত দুর্বলতা একে আজ এক প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে।
তবে জনমনে ক্ষোভের সবচেয়ে বড় জায়গাটি হলো বিচারহীনতার সংস্কৃতি, যার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বর্তমান আইনি কাঠামো। ২০১৩ সালে জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদ (ইউএনসিআরসি) অনুসারে বাংলাদেশে ‘শিশু আইন, ২০১৩’ প্রণীত হয়। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করতে গিয়ে এই আইনে ১৮ বছর পর্যন্ত বয়সসীমাকে ‘শিশু’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। আইনের মূল উদ্দেশ্য ছিল কোমলমতি শিশুদের লঘু অপরাধের ক্ষেত্রে সংশোধনের সুযোগ দেওয়া এবং তাদের প্রাপ্তবয়স্ক অপরাধীদের কুপ্রভাব থেকে দূরে রাখা। কিন্তু আইনটির বড় গলদ প্রকাশ পাচ্ছে তখন, যখন ১৬ বা ১৭ বছর বয়সি একজন কিশোর ঠান্ডা মাথায় পূর্বপরিকল্পিতভাবে হত্যাকাণ্ড বা নৃশংস ছিনতাই সংগঠিত করছে।
বর্তমান শিশু আইনের আওতায় কোনো শিশু বা কিশোরকে প্রচলিত অর্থে নিয়মিত কারাগারে পাঠানো যায় না; তাদের পাঠানো হয় শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে (কিশোর সংশোধনাগার)। তদুপরি, এই আইনের ৪২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী শিশুকে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া নিষিদ্ধ এবং অধিকাংশ গুরুতর অপরাধেও তাদের সর্বোচ্চ আটক রাখার মেয়াদ অত্যন্ত সীমিত (সাধারণত সর্বোচ্চ ৩ থেকে ১০ বছর)।
বাস্তবতা হলো, দেশের শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রগুলো, যেমন গাজীপুরের টঙ্গী বা কোনাবাড়ীর কেন্দ্রগুলো, প্রকৃত সংশোধনের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা ও আধুনিক সাইকো-সোশ্যাল কাউন্সেলিং ব্যবস্থায় অত্যন্ত দুর্বল। ফলে সংশোধনাগারে গিয়ে প্রকৃত অর্থে মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তর ঘটার বদলে অনেক কিশোর সেখানে আরো দাগি অপরাধীদের সংস্পর্শে আসে। কয়েক মাস বা কয়েক বছর পর জামিন বা মেয়াদের শেষে যখন তারা সমাজে ফিরে আসে, তখন অনেক ক্ষেত্রেই তারা কোনো সুনাগরিক হয়ে ফেরে না; বরং তাদের মানসিকতা আরো সহিংস ও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। মাঠপর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তারাও প্রায়ই স্বীকার করেন, আটক করা অপরাধীদের বয়স ১৮ বছরের নিচে হওয়ায় তারা শিশু আইনের সুবিধার সুযোগ নিয়ে দ্রুত জামিনে বের হয়ে আসে এবং আগের চেয়ে বড় অপরাধে লিপ্ত হয়।
বিশ্বের বহু দেশ কিন্তু এই সংকট উপলব্ধি করে নিজেদের আইনে বড় পরিবর্তন এনেছে। ভারতে ২০১২ সালের নির্ভয়া মামলার এক অপরাধী অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় কঠোর সাজা থেকে রেহাই পায়। এই তীব্র ক্ষোভের মুখে ভারত তাদের ‘Juvenile Justice (Care and Protection of Children) Act, 2015’ সংশোধন করে। সেখানে সুস্পষ্ট বিধান যুক্ত করা হয় যে, ১৬ থেকে ১৮ বছর বয়সি কোনো কিশোর যদি খুন, ধর্ষণ বা মারাত্মক কোনো জঘন্য অপরাধ করে, তবে মানসিক ও শারীরিক সক্ষমতা যাচাই সাপেক্ষে তাকে প্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে বিবেচনা করে নিয়মিত আদালতে বিচার করা যাবে। যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও সিঙ্গাপুরের মতো দেশেও অপরাধের নৃশংসতা ও প্রকৃতির ওপর নির্ভর করে কিশোরদের সাধারণ ফৌজদারি আদালতের মুখোমুখি করার সুস্পষ্ট আইন রয়েছে।
বাংলাদেশেও এখন এই আইনি সংস্কারের দাবি সময়ের অনিবার্য প্রয়োজন হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিশু আইনের মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রাখা জরুরি প্রথমবার ঘটা লঘু বা অসাবধানতাবশত অপরাধের জন্য। কিন্তু খুন, ছুরিকাঘাত, পরিকল্পিত হামলা ও দলবদ্ধ ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধের ক্ষেত্রে বয়সের ঢাল ব্যবহার করে পার পাওয়ার পথ অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে।
আইন সংশোধন করে অন্তত ১৬ থেকে ১৮ বছর বয়সি যারা তাদের জঘন্য অপরাধের ক্ষেত্রে মানসিক পরিপক্বতা মূল্যায়ন বোর্ডের ব্যবস্থা চালু করা এবং তাদের নিয়মিত আদালতে বিচারের আওতায় আনার পথ উন্মুক্ত করা দরকার। একইসঙ্গে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রগুলোর অবকাঠামো ও কাউন্সেলিং ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ছাড়া কেবল আটক রেখে সমাধান মিলবে না। নাগরিকের বাঁচার সাংবিধানিক অধিকারের চেয়ে কোনো অপরাধীর বয়সের সুযোগ বেশি মূল্যবান হতে পারে না। রাষ্ট্র যদি সময়োপযোগী আইনি সংস্কার ও কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত না করে, তবে আগামী দিনে পাড়া-মহল্লার কিশোর গ্যাং এক অপ্রতিরোধ্য দানবে পরিণত হয়ে গোটা সমাজের নিরাপত্তা কাঠামোকে গুঁড়িয়ে দেবে।
লেখক: শিক্ষার্থী, অর্থনীতি বিভাগ, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়