ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন আর মাত্র দুই দিন বাকি। বলা চলে, দরজায় কড়া নাড়ছে। নির্বাচনি প্রচার শেষ পর্যায়ে। এরই মধ্যে দুই মূল দল বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন দুই জোটের প্রধানেরা ঢাকার বাইরে প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোয় প্রচার শেষ করেছেন। এখন ঢাকায় তাদের প্রচার চালাবেন।
এ দুই জোটের বাইরে চরমোনাই পীরের দল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টিসহ (সিপিবি) অন্যান্য ছোটখাটো দল তাদের সাধ্যানুযায়ী এই প্রচারে রয়েছে। জামায়াত জোটের অংশীদার হলেও এনসিপির প্রধান নাহিদ ইসলাম েএবং বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হকের নির্বাচনি প্রচারও গণমাধ্যম গুরুত্ব দিয়ে কাভার করছে।
গত ২২ জানুয়ারি থেকে নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরু হয়। ওইদিন দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর সিলেটের আলিয়া মাদরাসা মাঠে সমাবেশ করার মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ভোটের প্রচার শুরু করেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
একই দিন মিরপুর-১০ নম্বরের আদর্শ উচ্চবিদ্যালয় মাঠে আয়োজিত সমাবেশের মধ্য দিয়ে নির্বাচনি প্রচার শুরু করেন ঢাকা-১৫ আসনের প্রার্থী ও জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান।
দুদল বিএনপি-জামায়াতের প্রধানরাই একে-অন্যকে ‘দোষারোপ’ বা ‘সমালোচনা’ না করার কথা বললেও একই পথে হাঁটছেন তারা। প্রথমদিনেই বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান সিলেটের একাধিক নির্বাচনি সমাবেশে বক্তব্য দেন এবং বক্তব্যে তিনি সরাসরি না হলেও জামায়াতে ইসলামীকে ইঙ্গিত করে বিভিন্ন মন্তব্য করেন। দলটির বিরুদ্ধে তিনি ‘মিথ্যাচার’ করা, মানুষকে ‘ঠকানো’ ও ‘শিরক’ করার অভিযোগ আনেন। এমনকি, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকার কথাও টেনে আনেন তারেক রহমান।
অন্যদিকে জামায়াত আমির বলেন, ‘ভোট ডাকাতদের কারণে ১৭ বছর মানুষ ভোট দিতে পারেননি এবং দেশের মানুষ নতুন কোনো ভোট ডাকাত দেখতে চান না।’ তিনি বলেন, ‘আর এই দেশে ফ্যাসিবাদের ছায়াও দেখতে চাই না। ফ্যাসিবাদ এখন যদি নতুন কোনো জামা পরে সামনে আসে, ৫ আগস্ট যে পরিণতি হয়েছিল, সেই নতুন জামা পরা ফ্যাসিবাদের একই পরিণতি হবে।’
বিগত তিনটি নির্বাচনের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বিএনপির দিকে ইঙ্গিত করে সমাবেশে বলেন, ‘আপনারা কি নতুন কোনো ভোট ডাকাত দেখতে চান? আমরা নতুন কোনো ভোট ডাকাত দেখতে চাই না।’
শফিকুর রহমান আরো বলেন, ‘চাঁদাবাজি, দখল-বাণিজ্য, মামলাবাজি, দুর্নীতি, সন্ত্রাস, পাথর মেরে লোক হত্যা, গাড়ি চাপা দিয়ে লোক হত্যা, এগুলো থেকে যারা নিজের কর্মীকে বিরত রাখতে পারবে, তারাই জনগণকে আগামীর বাংলাদেশ উপহার দিতে পারবে। যারা এগুলো পারবে না, তারা যত রঙিন স্বপ্নই দেখাক, জাতি তাদের মতলব বুঝতে পারবে।’
এরপর থেকে দুই জোটের নির্বাচনি জনসভার সব কটিতেই তাদের প্রধানরা একে-অন্যকে ঘায়েল করতে বাক্যবাণ ছুড়েছেন, দোষারোপ করতেও কসুর করেননি। অনেকে একে অন্যের উদ্দেশে দুই প্রধানের তির্যক বাক্যবাণ, দোষারোপ ইত্যাদিকে দেশের রাজনীতি চিরচেনা রূপই উল্লেখ করে বলেন, এতে কোনো পরিবর্তন আসেনি। দুই প্রধানের বক্তব্যের এই ধারা তাদের অন্য সমাবেশগুলোতেও বজায় ছিল।
বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে বিএনপি-জামায়াতের এই সমালোচনামূলক বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্লেষকদের বক্তব্য তুলে ধরে বলেছে, এতে রাজনৈতিক সংস্কৃতির কোনো পরিবর্তন হয়নি। পুরোনো ধারাতেই তা চলছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক জোবাইদা নাসরীন মনে করেন, বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি বিরাজমান, তাতে শুধু অন্যকে হেয় করা বা দোষারোপ করা, প্রতিপক্ষকে হেনস্তার মুখোমুখি করার মতো ভাষা ব্যবহার করা হয়। কারণ দলগুলো মনে করে, অন্যকে নীচু করার মধ্য দিয়ে জয় নিশ্চিত হবে। (নির্বাচনি প্রচারে পরস্পরের সমালোচনায় বিএনপি-জামায়াত, কী বার্তা দিচ্ছে, মরিয়ম সুলতানা, ২৩ জানুয়ারি ২০২৬)
একই প্রতিবেদনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, অধ্যাপক সাব্বীর আহমেদের মন্তব্যও তুলে ধরা হয়েছে। তিনি মনে করেন, ‘দোষারোপের রাজনীতি’ টার্মটিকেই ‘রাজনৈতিক’ বলা হয় এবং তিনি মনে করেন, এ কথাটির কোনো গুরুত্ব নেই। কারণ ‘রাজনীতির খেলাটাই হলো শত্রু-মিত্র খেলা। এখানে আপনি আপনার প্রতিপক্ষকে ঘায়েল না করতে পারলে আপনি দুর্বল হিসেবে প্রমাণিত হবেন’। তিনি বলেন, গুরুত্বপূর্ণ হলো, এই প্রচারকে কেন্দ্র করে যেন কেউ আহত-নিহত না হন। যদি ভায়োলেন্স (সহিংসতা) হয়, তাহলে নির্বাচনের পরিবেশ নষ্ট হয়ে যাবে।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রচারের সময় প্রতিপক্ষকে আক্রমণ (কথায়) করার যে রীতি, এটি ভোটের ময়দানে জনমত তৈরির ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে। কারণ অনেক সময় ভোটাররা মিথ্যাকেও সত্য মনে করে।
প্রথম আলোর এক প্রতিবেদনে দুই দলের এমন বিপরীতমুখী অবস্থানকে তাদের ‘রাজনৈতিক বা আদর্শগত অবস্থান’ বলে মন্তব্য করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ। তিনি বলেন, নিজেদের মধ্যে ভিন্নতা দেখাতে হলে তো এগুলোকে তারা সামনে আনবেই। এখন উদ্বেগের জায়গাটা হচ্ছে, এগুলোকে কেন্দ্র করে কোনো বড় ধরনের সংঘাত তৈরি হয়ে যায় কি না। সেটা যতক্ষণ পর্যন্ত না হচ্ছে, ততক্ষণ এটাকে স্বাভাবিক হিসেবে ধরে নেওয়া ভালো। (প্রচারের শুরুতেই উত্তাপ, বিএনপি-জামায়াত মুখোমুখি, ২৪ জানুয়ারি, ২০২৬)
আসলে রাজনৈতিক বিশ্লেষক সাব্বীর আহমদ কিংবা অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ যা বলেছেন, তাই সঠিক মনে হয় আমাদের কাছে। কেননা, গণতন্ত্র ভিন্নমতকে প্রাধান্য দেয় বেশি। ভিন্নমত না থাকলে তা হয় এককেন্দ্রিক এবং এ জন্য তা একদেশদর্শী। এই ভিন্নমতের প্রকাশ ঘটে সুন্দর শব্দচয়ন দিয়ে কিংবা তির্যক বাক্যবাণে। তির্যক শব্দাবলি ব্যবহার করা রাজনৈতিক সংস্কৃতির নিম্নমান হবে তা কিন্তু নয়। কেননা, নির্বাচনি জনসভা কোনো শ্রেণিকক্ষ না যে, শুধু সুন্দর সুন্দর বাক্য দিয়ে শিক্ষক তত্ত্বের জটিলতা উন্মোচন করবে শিক্ষার্থীদের কাছে। তবে এটা আমাদের স্মরণে রাখতে হবে, দোষারোপ করতে গিয়ে কিংবা তির্যক শব্দাবলি ব্যবহার করতে গিয়ে তা যেন আবার একে-অন্যের ব্যক্তিগত চরিত্র হনন না হয়ে পড়ে, সেই দিকটা খেয়াল রাখতে হবে।
রাজনীতি বিরোধ থেকেই শুরু হয়। যেখান থেকে আপত্তি তোলা হয়, সেখান থেকেই রাজনৈতিক কার্যকলাপের শুরু, শান্তি পুনরুদ্ধারের সঙ্গে সঙ্গেই তার শেষ। তাহলে রাজনীতি সৃষ্টি হয় বিরোধ বা সংঘাতকে কেন্দ্র করে। রাজনীতি হচ্ছে একটি সমাজের সদস্যদের মধ্যে পার্থক্যের স্বাভাবিক প্রতিক্ষেপ। (দরবেশ আলী খান, রাজনীতি ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পত্রিকা, সপ্তম সংখ্যা, জুন, ১৯৭৮)
এই পার্থক্যের কথা মনে রাখলে দলগুলোর বক্তৃতা-বিবৃতিতেও পার্থক্য থাকবে, একে-অন্যের প্রতি তির্যক বাক্যবাণ ছুড়বেÑএটাই স্বাভাবিক এবং এটাই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সৌন্দর্য। তবে একে অন্যকে দোষারোপ করে তির্যক বাক্যবাণ ছুড়ে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করা একটা সীমার মধ্যে থাকতে হবে। এটি যেন কোনোভাবেই সংঘাতে রূপান্তর না ঘটে, সেদিকে আমাদের প্রার্থীদের খেয়াল রাখতে হবে।
লেখক : সিনিয়র সহকারী মহাসচিব, বিএফইউজে