রাজনীতি নামক খেলাটিতে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করা স্বাভাবিক রীতি। জামায়াত-এনসিপি জোট বিএনপিকে চাঁদাবাজ হিসেবে ডাকতেই বেশি পছন্দ করে। ড. কনক সারওয়ারের সঙ্গে সর্বশেষ আলোচনা অনুষ্ঠানটিতে পারস্পরিক সম্পর্ক উন্নয়নের জন্যে ঢালাওভাবে পুরো দলটিকে চাঁদাবাজ ডাকার এই স্বরটিকে আরেকটু সফট বা মোলায়েম করতে পরামর্শ দিয়েছিলাম। আমি যা করছি তা একজন মিডিয়েটরের কাজ—সেটা করছি গণতন্ত্রের স্বার্থে, নেহাত দেশের প্রতি একটা টান থেকে! আমার এই শুভ নিয়তটি ধরতে না পেরে অনেকেই আমাকে নিষ্ঠুরভাবে চাঁদাবাজির সমর্থক হিসেবে অভিহিত করে বসলেন!
অফেন্সিভ-ডিফেন্সিভ যা-ই হোক, এর জবাবে বিএনপিরও একটা পাল্টা মিসাইল দরকার। ‘রাজাকার’ নামক মিসাইলটি পরীক্ষামূলকভাবে চালানো হয়েছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগ এটাকে ভোঁতা বানিয়ে গেছে! জামায়াতের দিকে এটির ব্যবহার অনেক সময় বিএনপির নিজের মাথার ওপরই আপতিত হয়! কাজেই ‘গুপ্ত’ নামের মিসাইলটি এক্ষেত্রে খুব উপযোগী মনে হয়েছে! এতে জামায়াতও কাঙ্ক্ষিত বিক্রিয়া বা প্রতিক্রিয়া দেখায়! প্রতিক্রিয়া দেখে বিএনপি টের পায়, এটা ভালোভাবে কাজ করছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এটাকে বানিয়েছেন ‘গুপ্ত-গুপ্ত’! রাজনৈতিক মাঠে এসব মিসাইল-অ্যান্টি-মিসাইল খুবই স্বাভাবিক ফেনোমেনা।
জটিলতা দেখা দিয়েছে অন্য জায়গায়। সুশীল বলয় থেকে এসে অত্যন্ত প্রভাবশালী হয়ে পড়েছেন জনৈক উপদেষ্টা। নিজ দলের আরো কয়েকজন সিনিয়র নেতাকে একই পদে নিয়োগ দেওয়া হলেও অজানা কারণে বাকিরা সবাই অনেকটা নিভৃতে চলে গেছেন। তারেক রহমান ‘গুপ্ত-সুপ্ত’ নামক যে মিসাইলটি প্রতিপক্ষ জামায়াতের ওপর ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন, সেটাই এই শক্তিধর উপদেষ্টা বিএনপিকে ভেতর থেকে ভাঙনের কাজে ব্যবহার করেন কি না, সেটা দেখতে আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। ইঁদুর হয়তো ঘর কাটা শুরু করেছে! দুদিন পর পরই তিনি বিএনপির মধ্যে গুপ্ত-সুপ্তদের প্রভাব এবং তারা কীভাবে বিএনপিকে ধ্বংস করবে, সে ব্যাপারে ১০ নম্বর মহাবিপদ সংকেত ঘোষণা করছেন।
ফলে এই গুপ্ত-সুপ্ত চিহ্নিত হওয়ার ভয়ে বিএনপির ভেতরে একটু জোরেশোরে আল্লাহকে ডাকার মানুষও কমে যাচ্ছে। কেউ অতিমাত্রায় রবীন্দ্রভক্ত, কেউবা মা দুর্গাভক্ত, আর কেউবা শ্রীকৃষ্ণভক্ত হয়ে পড়ছে। বিএনপির মধ্যে যারা দলটির প্রতিষ্ঠাতা মশিউর রহমান জাদুমিয়া, শাহ আজিজ, মাওলানা মতিনের অনুসারী (কমপক্ষে ৬০-৭০ শতাংশ), তারাও নিদারুণ মনঃকষ্টে পড়ে গেছেন! নব্যদের টার্গেটে তারাও। সেটলাররা ভূমিপুত্রদের উৎখাত করতে চাচ্ছে!
নিজের গতরের মাপ ভুলে গিয়ে কিছুদিন আগে নুরু হুংকার ছুড়লেন, ‘হু ইজ হাদি?’ শহীদ হাদিকে একটু চিনিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলাম আমার গত কলামটিতে। সাংবাদিক কলামিস্ট আলফাজ আনাম ভাইও তাই করেছিলেন! মেজাজ হারিয়ে ভিপি নুর আমাকে এবং আলফাজ ভাইকে ‘গুপ্ত জামায়াত’ ডেকে মনের ঝাল মিটালেন!
নুরুদের জন্য কষ্টের সংবাদটি হলো—আমরা কেউ উড়ে এসে জুড়ে বসিনি। এমন কিছু নেই যা নিয়ে গিল্টি ফিলিংসে ভুগতে হবে! কোনো নারীর সঙ্গে প্রতারণা করিনি, কোনো ব্যবসায়ীকে হানিট্র্যাপ করে ভার্সিটি কিংবা টিভি সেন্টার দখল করিনি, অন্যের হক নষ্ট করিনি, বিদেশি স্পাইয়ের সঙ্গে সম্পর্ক করিনি! আমাদের জীবনটি খোলা বইয়ের মতো—এখানে গোপনীয় কোনো চ্যাপ্টার নেই! বরং গর্ব করে বুক উঁচিয়ে
বলার মতো অনেক কিছু রয়েছে।
তখনকার থানা সদরে ঐতিহ্যবাহী নজরুল একাডেমিতে (কবি কাজী নজরুলের স্মৃতিবিজড়িত দরিরামপুর হাইস্কুল) ভর্তি হই! ঐতিহ্যবাহী স্কুলে সেরা ছাত্রদের মধ্যে পজিশন থাকায় আশপাশের মানুষের কাছ থেকে এক ধরনের শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও সমীহ উপভোগ করেছি। আমার স্কুল, কলেজ এবং মেরিন একাডেমিতে থাকাবস্থায় শিবির সব জায়গাতেই প্রকাশ্যেই তাদের কার্যক্রম চালাতে পারত। কাজেই ছাত্রশিবিরের সঙ্গে আমার সম্পৃক্ততা কোনো বন্ধুর নজর এড়াত না!
আমাদের সময়ে বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ ঢাকা কলেজে ভর্তি, সেখান থেকে মেরিন একাডেমি এবং মেরিন একাডেমির পাসিং আউট পরীক্ষায় ইঞ্জিনিয়ারিং শাখায় সর্বোচ্চ নম্বর প্রাপ্তিতে রৌপ্য পদক অর্জন—সব মিলিয়ে নিজ এলাকায় এক ধরনের সেলিব্রিটি হিসেবে গণ্য হই! গ্রাম ও শহরতলিতে আমাদের বা আগের প্রজন্মের অনেকেই তা উপভোগ করেছেন! যারা রাজধানীতে বা বড় শহরে বেড়ে উঠেছেন, তাদের এই অভিজ্ঞতাটি হয়নি!
ফলে আমার প্রতি আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব এবং এলাকার মানুষের নজরটি আরো তীক্ষ্ণ ও প্রসারিত হয়। এ অবস্থায় তলে তলে শিবির-জামায়াত করলে কারো দৃষ্টি এড়ানো কঠিন হতো! জামায়াতই এটা তাদের প্রচারণায় সগৌরবে বলে বেড়াত।
আমার জন্য তখন অবস্থা এতটাই সঙ্গিন ছিল যে, যৌবনের দখিন হাওয়ায় এলাকার সুন্দরী মেয়েদের পেছনে ঘোরা তো দূরের কথা একটু ভালোভাবে তাকাতেও পারতাম না। কারণ যেকোনো স্পটে আমার দিকে অন্তত ১০টি চোখ ফোকাস করা থাকত!
তবে আমার মায়ের মাগফিরাতের উদ্দেশ্যে ত্রিশাল শহরে (প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক প্রস্তাবিত নজরুল সিটি) স্থাপিত ইসলামী একাডেমির জমিদাতা ও প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে জামায়াত ট্যাগ জুটে যায়। এরপর ময়মনসিংহ শহরেও বেশ কয়েকটি প্রাইভেট প্রতিষ্ঠান করেছি। সেখানে বিএনপি, তাবলীগ এবং জামায়াতের সমর্থক থাকলেও জামায়াতের প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রচার পেয়ে যায়।
নব্বইয়ের দশকেই আমাদের প্রতিষ্ঠানটি ত্রিশাল এলাকায় টপ অবস্থানে চলে যায়। ২০০০ সালের পরপর ময়মনসিংহ শহরেও আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলো সুধীজনের মনোযোগ কাড়ে! এগুলো জামায়াতের প্রতিষ্ঠান না হলেও প্রতিপক্ষরা প্রচার চালিয়ে জামায়াতের পক্ষে বিনা খরচায় প্রচারণার ব্যবস্থা করে দিয়েছে। এভাবে জামায়াতকে তার শুভাকাঙ্ক্ষীরা যতটুকু এগিয়ে দিয়েছে—তার শত্রুরা এগিয়েছে আরো বেশি!
নির্মম সত্য কথাটি হলো, বিএনপি বলয়ের অনেক ধনাঢ্য ব্যক্তিকে এসব প্রতিষ্ঠান তৈরি করতে উদ্বুদ্ধ করতে চেয়েছি। আমার এই প্রচেষ্টার কথা টপ নেতৃত্বকেও জানিয়েছি। এখন পর্যন্ত সেই প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে, তবে আজ পর্যন্ত কেউ সাড়া দেননি।
ময়মনসিংহ শহরে স্থাপিত এসব প্রতিষ্ঠান থেকে এযাবৎ ২০ হাজারের মতো ছাত্রছাত্রী বের হয়েছে। এদের মধ্যে একজনও বলতে পারবেন না যে, এসব প্রতিষ্ঠান থেকে জামায়াতের কোনো দাওয়াত দেওয়া হয়েছে।
তবে ত্রিশালের ইসলামী একাডেমি থেকে ইসলামি জীবনব্যবস্থায় চলতে উৎসাহ দেওয়া হয়, যেহেতু প্রতিষ্ঠানের নামই ইসলামী একাডেমি! তবে আমার স্পষ্ট নির্দেশনা ছিল, যাতে কোনো একটা বিশেষ রাজনৈতিক দলের ভাবধারা প্রচার করা না হয়।
ছাত্রজীবনে লালিত এই চেস্টিটি (Chastity) মানে ‘আই-হেইট-পলিটিক্স’ ভাবধারাটি, যা একজন কুমারীর মতোই আগলে রেখেছি—শেষমেষ তা ভেঙে দিয়েছেন শফিক রেহমান! আমরা সেই প্রজন্ম যারা যায়যায়দিনের মইন-মিলার রোমান্টিক রাজনৈতিক সংলাপে বিমোহিত ছিলাম! এই শফি ভাইয়ের সান্নিধ্যে এসেই বিএনপি ও ম্যাডাম জিয়ার ব্যক্তিত্ব ও রাজনীতির প্রতি আকর্ষিত হই।
এক-এগারোয় সরাসরি বিএনপির পক্ষ নিই, তখন হাওয়া ভবন থেকে সুবিধাপ্রাপ্তরাও হাওয়া ভবন ও তারেক রহমানকে গালি দিতেন। শফি ভাই যখন বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক কমিটির চেয়ারম্যান, তখন ম্যাডামের পক্ষ থেকে জাতিসংঘের মহাসচিবকে লেখা চিঠিগুলো প্রথমে আমার কাছে পাঠাতেন। আমি তা বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের কাছে পাঠাতাম। তিনি তখন জাতিসংঘে উচ্চপদে আসীন এবং তা মহাসচিবের কাছে পৌঁছাতেন। প্রধানমন্ত্রী সম্ভবত তার এসব অবদান ভুলে যাননি! জাতিসংঘসহ গ্লোবাল প্রতিষ্ঠানগুলোয় যে শেখ হাসিনা প্রভাব বিস্তার করতে পারেননি, তাতে শফিক রেহমানের লিখিত এবং ম্যাডামের পক্ষ থেকে পাঠানো সেই চিঠিগুলো নিঃসন্দেহে বিশেষ ভূমিকা রেখেছিল!
এমপি-মন্ত্রী হওয়ার খায়েশ থাকলে অনেক আগেই রাজনীতিতে যোগ দিতে পারতাম! দেখতে দেখতে ষাটের কোঠায় পৌঁছে গেছি। জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতি করলে প্রকাশ্যেই করার মতো সাহস রয়েছে। আমার চেয়েও অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দিয়েছেন, তাতে তারা সমাজচ্যুত হয়ে পড়েননি।
থাবা বাবাদের প্রাদুর্ভাব যেভাবে ঠেকিয়েছিলেন বেগম খালেদা জিয়া ও আমার দেশ
সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে আওয়ামী লীগ ‘জামায়াতের মহিলা আমির’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছিল। এর পেছনে একটা কাহিনি বা শানে নুজুল রয়েছে।
তখন শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চের রমরমা অবস্থা। চেতনার জগতে দ্বিতীয় মুজিব হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন রংপুর মেডিকেল কলেজ ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ডা. ইমরান এইচ সরকার! মনে হয়েছিল নতুন এক শিশুপীরের আবির্ভাব হয়েছে। তার হুকুম পালনে এবং সেবায় তটস্থ যেন সারা জাতি—কোথায় না জানি ত্রুটি হয়ে পড়ে। রাজধানীর এক পাঁচ তারকা হোটেল ইমরান এবং তার সাঙ্গোপাঙ্গদের জন্য পুরোদমে ফ্রি করে দেওয়া হয়! অন্য বিশেষ খেদমতটি নাকি আপনা-আপনি ফ্রি হয়ে যায়। শাহবাগে জনতার জন্য বিরিয়ানি ফ্রি! সে এক এলাহি কাণ্ড!
আর এগুলোর পুরো সরবরাহ এসেছে পাশের খাজা বাবার দরবার থেকে! সেই খাজা বাবার দরবার থেকে
থাবা বাবার (ব্লগার রাজীবের ছদ্মনাম) মতো চরম ইসলামবিদ্বেষীরা বেরিয়ে আসে। থাবা বাবার আসল পরিচয় দৈনিক আমার দেশ জনগণের গোচরে নিয়ে আসে! ব্লগের নামে ইসলাম ও মুসলিম বিশ্বের কলিজার টুকরা তুল্য নবী মুহাম্মদ (সা.) ও উম্মুল মুমিনিনদের জঘন্য ভাষায় আক্রমণ করে! তাতে হেফাজতে ইসলামসহ পুরো জাতি বুঝতে পারে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের নামে দেশ ও জাতির বিরুদ্ধে কী ভয়াবহ ষড়যন্ত্র হচ্ছে! পুরো মিডিয়াজগৎ শাহবাগ নিয়ে মাতোয়ারা। সবার কাছে এটা তাহরির স্কয়ার! তখন আমার দেশ শিরোনাম করে, শাহবাগে ফ্যাসিবাদের পদধ্বনি। এটি জাতির জন্য ওয়েক-আপ কল হিসেবে কাজ করেছিল।
২০১৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি রাতে ঢাকার মিরপুরের পলাশনগরে ব্লগার ও স্থপতি আহমেদ রাজীব হায়দার আততায়ীর হাতে খুন হন! তার হত্যাকাণ্ড আন্দোলনে বারুদ জ্বালিয়ে দেয়। পরদিন ১৬ ফেব্রুয়ারি শেখ হাসিনা রাজীবের বাসায় গিয়ে তার পরিবারের সদস্যদের সমবেদনা জানান। ১৭ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদে আওয়ামী লীগ নেতা তোফায়েল আহমেদ রাজীবকে ‘দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধের প্রথম শহীদ’ বলে ঘোষণা করেন!
যারা আওয়ামী লীগ এবং ‘র’-এর কর্মপদ্ধতি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল, তারা সহজেই বুঝতে পেরেছিলেন—কাদের পরিকল্পনায় এই হত্যাকাণ্ডটি সংঘটিত হয়েছিল! জঙ্গিদের ওপর দোষটি চাপালেও জীবনটি যাচ্ছিল থাবা বাবাদের। এই বাবারা বৃহত্তর কৌশলের গুটি হিসেবে ব্যবহৃত হন। কয়েকজন ব্লগার নিহত হলে বাকিরা জান বাঁচাতে তাড়াতাড়ি দেশ ছাড়েন।
শিশুপীর হক মাওলার স্টাইলে ‘জয় বাংলা’ বলে হুংকার মারেন—জাতির অন্তরাত্মা কেঁপে ওঠে! শিশুপীর অর্ডার করেন—পতাকা তোলো, পতাকা নামাও। অনুগত মুরিদের মতো সারা জাতি সেই হুকুম তামিল করে! কেউ প্রশ্ন করার হিম্মত রাখেননি—এই কমবখত নালায়েক কোন অথরিটিতে এই হুকুম দেন?
শাহবাগি মাওলানা নামে খ্যাত মাওলানা ফরিদ উদ্দিন মাসঊদ দলবল নিয়ে সেই মঞ্চে উঠে বাইয়াত গ্রহণ করে এসেছেন। এখন শুধু বাকি বিএনপির বাইয়াত। বিএনপির একটি অংশও দারুণ উচ্ছ্বসিত ও উদ্বেলিত।
অনেকবারই দেখা গেছে, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক গুন্ডা, সাংস্কৃতিক পান্ডা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক ষণ্ডারা যখন এক যুগে কোনো ভেলকিবাজি শুরু করে, তখন প্রথম বাতাসেই কুপোকাত হয়ে পড়ে বিএনপির একটা অংশ। এটা ২০০৭-এ এক-এগারো নামক ভেলকির সময় যেমন দেখা গেছে, তেমনি ২০১৩ সালে একই গণজাগরণ মঞ্চের ভেলকিতেও পরিলক্ষিত হয়েছে!
২০১৩ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়া চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে যান; ২৬ বা ২৭ ফেব্রুয়ারি দেশে ফেরেন। শাহবাগের বাতাসে কাত হয়ে পড়া বিএনপির অংশ সিদ্ধান্ত নেয় যে, বেগম খালেদা জিয়া বিদেশ থেকে ফিরলেই বিমানবন্দর থেকে সরাসরি শাহবাগের মঞ্চে নিয়ে যাওয়া হবে। ম্যাডামের ওপর মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টির জন্য শাহবাগি মিডিয়া এটি ফলাও করে আগেভাগেই প্রচার করে। একজন নেতা ম্যাডামের কাছে এই প্রস্তাব উত্থাপনের দায়িত্ব নিলেন। এই প্রস্তাব শুনে ম্যাডাম অগ্নিশর্মা হয়ে পড়েন। প্রস্তাবককে একটা কঠিন ধমক দিলেন। সবাই হতভম্ব হয়ে পড়ল! ম্যাডামের সেই চেহারা দেখে এবং কণ্ঠ শুনে বিমানবন্দরে উপস্থিত সবাই ভড়কে গেলেন। সেদিন ম্যাডামের এই পদক্ষেপ জাতিকে একটা ভয়াবহ বিপর্যয় থেকে বাঁচিয়েছে! হতাশ লীগ এবং তাদের সাংস্কৃতিক পান্ডা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক ষণ্ডারা এর পর থেকেই ম্যাডামকে জামায়াতের মহিলা আমির বলে ডাকতে থাকে।
এখানেই একজন রাষ্ট্রনায়ক (Statesman) এবং একজন রাজনীতিবিদের (Politician) মধ্যে পার্থক্য! ম্যাডাম সেদিন গণজাগরণ মঞ্চে হাজির হলে হয়তোবা তার দল পরবর্তী নির্বাচনে একটু সুবিধা পেত, কিন্তু আমাদের দেশটিকে নিয়ে হিন্দুত্ববাদীদের পুরো পরিকল্পনাটি সফল হয়ে পড়ত! কোটি কোটি আত্মার দোয়ায় এই একটি কাজই ম্যাডামের পরকালীন নাজাতের ওসিলা হয়ে পড়তে পারে।
সেই বেগম জিয়ার রেখে যাওয়া দলের সিনিয়র নেতারা সবকিছু আউলে ফেলছেন। শেখ হাসিনা স্টাইলে সংখ্যালঘুদের খুশি করতে গিয়ে নিজের ধর্মের চৌহদ্দি পেরিয়ে যাচ্ছেন! এই কিসিমে যদি সংখ্যালঘুদের মন জয় করতে হয়, তবে বলা যায়, সরকার সত্যি বিপদে আছে।
প্রত্যেকটা ধর্মের বা প্রত্যেকটা কালচারের কিছু ইউনিক বৈশিষ্ট্য বা সেনসিটিভিটি থাকে। ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক নেতা আমাদের রাষ্ট্রপতি মহোদয় তার প্রেস সচিব হিসেবে বেছে নিয়েছেন আরেক ছাত্র ইউনিয়নের নেতাকে! ফলে এই স্পর্শকাতরতা উপলব্ধি করা বঙ্গভবনবাসীদের জন্য কঠিন হবে বৈকি!
একজন নিষ্ঠাবান হিন্দু প্রত্যাশা করেন না যে, সরকার তাদের সঙ্গে একই তরঙ্গে তাদের ধর্মীয় শ্লোক পাঠ করুক। তারা চান, যেন নির্বিঘ্নে এবং নিরাপদে তাদের ধর্মকর্ম পালন করতে পারেন। এটাই সরকার করেছে, কিন্তু কিছুসংখ্যক নেতার অবিমৃশ্যকারী মন্তব্য অহেতুক সেই সদিচ্ছাগুলোকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। ইশরাকের মতো ইয়ং নেতৃত্বের কাজকে অল্প বয়সের ইমম্যাচুরিটি হিসেবে আখ্যায়িত করলেও আশি-ঊর্ধ্ব বুড়োদের এসব কাজকে কী হিসেবে অভিহিত করা যাবে, জানি না!
আমার দেশ গত ১৯ অক্টোবর একটি চমৎকার প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। ‘বাংলাদেশ বনাম ভারত : সংখ্যালঘুদের ধর্মপালনের অধিকারের বিপরীত চিত্র’ শিরোনামের এই প্রতিবেদনটি চমৎকারভাবে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং ধর্মীয় সহিষ্ণুতার এক অপূর্ব চিত্র তুলে ধরেছে।
সব অপপ্রচারের বিরুদ্ধে এসব কাজ হলো সর্বোৎকৃষ্ট বুদ্ধিবৃত্তিক জবাব। অনেক কষ্ট করে আমরা এসব প্রতিবেদন ও কলাম লিখি। নেতৃত্বের প্রতি অনুরোধ—দয়া করে আপনারা এগুলো পড়ুন। তখন দেখবেন সংখ্যালঘুদের প্রতি মানবিকতা ও দয়া দেখালেও শিরক করতে হবে না! বেশি কথা বলার দরকার নেই, কাজ করুন। আপনাদের ভালো ও মানবিক কাজগুলো আমরাই বিনা খরচে জনগণের কাছে পৌঁছে দেব, ইনশাআল্লাহ!
কারণ জনগণের বড় অংশ বুঝে গেছে, নুরু-জাহেদদের কাছ থেকে ‘গুপ্ত জামায়াত’ খেতাব জুটলেও আমরা অসত্য কথা বলি না, দেশ ও জাতির স্বার্থের বিরুদ্ধে কিছু বলি না। কেন যেন মনে হচ্ছে, ম্যাডাম জীবিত থাকলে তাকে আজ এই গোষ্ঠী ‘জামায়াতের মহিলা আমির’ থেকে ‘গুপ্ত জামায়াতের আমির’ হিসেবে প্রমোশন দিতেন।
একটা বিশ্বস্ত সূত্রে জানতে পারলাম, প্রধানমন্ত্রী নাকি প্রতিদিন সকালে যে খবরের কাগজগুলো পড়েন তার মধ্যে আমার দেশও রয়েছে। সুতরাং আসল চিত্রটি তার কাছ থেকে একেবারে মাইনাস করা বোধ হয় সম্ভব হচ্ছে না। এটি আশাব্যঞ্জক। শেখ হাসিনা যেখানে তার ক্রিটিক কোনো কাগজকে গণভবনে ঢুকতেই দিতেন না, সেখানে গঠনমূলক সমালোচনা এবং বস্তুনিষ্ঠ সংবাদকে যদি এভাবে গ্রহণ করেন, তবে প্রধানমন্ত্রী কখনোই পথটি হারাবেন না।
তিনি শুধু মধুর মতো বা শরবতের মতো ভালোবাসাকেই নয়—নুনের মতো ভালোবাসাকেও পরখ করে দেখছেন। এটাই আশার কথা।