হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

রাজনৈতিক সাংবাদিকতার নামে যা হচ্ছে

কাকন রেজা

গণমাধ্যমে শিরোনাম হলো, ‘কলকাতা বিমানবন্দরে আওয়ামী লীগের তোপের মুখে অভিনেতা মোশারফ করিম’। অনেকটা এ রকমই শিরোনামের ধরন বাংলাদেশের অধিকাংশ গণমাধ্যমে। অথচ দেশে যখন ফ্যাসিস্ট রেজিমের সুবিধাভোগী এবং নির্যাতকদের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের ক্ষোভের প্রকাশ ঘটে, তখন এ ধরনের মাধ্যমগুলোর শিরোনামে লেখা হয় ‘মব’। ফলে প্রকৃত মব ঢেকে যায় শিরোনামের ‘মব’-এর আড়ালে। এ ধরনের শব্দচয়নের রাজনীতিকে যারা সাংবাদিকতা বলেন, তারা মূলত অসাধু নয় মহামূর্খ। বিভিন্ন উদ্ধৃতি, গবেষণার আলাপ তুলে ধরে হয়তো এমন অসাধুতা ও মূর্খতার পক্ষে ‘থোড় বড়ি খাড়া’ টাইপ প্রবন্ধ, নিবন্ধ এবং সোকল্ড প্রতিবেদনও দাঁড় করানো যায়। যদিও এটিকে ঠিক প্রতিবেদন বলা যায় না, বলা যায় না খবরের বিশ্লেষণও। সোজা কথায় এগুলো হয়ে ওঠে ‘চোরের সাক্ষী গাঁটকাটা’ টাইপ কিছু একটা।

‘তোপ’ আর ‘মব’ এ দুই শব্দ প্রয়োগের উদ্দেশ্যই প্রমাণ করে দেয়, এটি সাংবাদিকতা নয় রাজনীতি। শব্দচয়নের রাজনীতি যে সাংবাদিকতা ধারণ করে তা নিঃসন্দেহে অপসাংবাদিকতা। এই অপসাংবাদিকতা বা রাজনৈতিক সাংবাদিকতার পক্ষে বয়ান উৎপাদন করাও খারাপ সাংবাদিকতা। এই সাংবাদিকতা গণমাধ্যমকর্মী হত্যা, নির্যাতনের বিচার বিরুদ্ধ সাংবাদিকতা। নির্যাতকদের পক্ষের সাংবাদিকতা। এই সাংবাদিকতা নীতি এবং মূল্যহীন।

এই লাইনের সাংবাদিকতা যারা করেন, তারা আমার লেখা পড়েন জানি। তাদের দু-একজন হয়তো প্রকাশ্যেই বলবেন, আমি ‘মব’-এর পক্ষে মত উৎপাদন করতে চাইছি। যারা বলবেন, তাদের মনে মনে গালি দিয়েই বলি, ২০১৮ সালে আমি লেখা শুরু করেছিলাম ‘মব’-এর বিরুদ্ধে। সেই ফ্যাসিস্টকালে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের ঘটনা। ফ্যাসিস্টদেরই এক যুবকর্মী ক্ষমতার দাপটে প্রকাশ্যে গাড়ির মধ্যে এক তরুণীর সঙ্গে যৌনতায় লিপ্ত হয়েছিলেন। যে কারণে লোকজন জড়ো হয়ে তাকে গণপিটুনি দিয়েছিলেন। সেই ‘মব’-এর বিরুদ্ধে লিখেছিলাম তখনকার জনপ্রিয় গণমাধ্যম প্রিয় ডটকমে। লিখেছিলাম, “মোহাম্মদপুরের ঘটনায় যারা প্রতিরোধ করতে গিয়ে ‘মবে’ অংশ নিয়েছেন, সঙ্গে যারা তাল মিলিয়ে বলেছেন, ‘পিটিয়ে ঠিক করেছে, শালাকে ঝুলিয়ে দেওয়া হলো না কেন’Ñতাদের এমন কথাগুলোও অপরাধের অংশ। বিনাবিচারে হত্যাকে যারা সমর্থন করেন, যারা মানুষের মৃত্যু কামনা করেন, তাদের সঙ্গে এমন বক্তব্যের খুব একটা ফারাক নেই। ক্রসফায়ারে সমর্থনকারী অসহিষ্ণুরাও একই ভাষায় কথা বলেন।” ‘মব জাস্টিস’, অসহিষ্ণু সমাজ আর বিচারহীনতার প্রতিচ্ছবিÑগুগলে সার্চ করলে এই শিরোনামে লেখাটি পেয়ে যাবেন। সুতরাং, আমাকে ‘মব’-এর পক্ষের লোক বানানো খুব সহজ হবে না।

যাকগে, আসল কথায় আসি। যারা খবরমাধ্যমের লোক হয়ে, মাধ্যমের ত্রুটিগুলো ধরিয়ে না দিয়ে বরং সেই ত্রুটির যৌক্তিকতা প্রমাণের চেষ্টা করেন, তারা মূলত মানসিকভাবে বিভ্রান্ত। পাগল বললাম না, কারণ পাগল বুদ্ধিভ্রষ্ট। কিন্তু খবরমাধ্যমের সেই মানুষগুলো ধূর্ত। বুদ্ধি না থাকলে চালাক হওয়া যায়, কিন্তু বুদ্ধিবৃত্তির চর্চা না থাকলে ধূর্ত হওয়া চায় না। শেয়াল ধূর্ত, চালাক নয় এবং শেয়ালপণ্ডিতও। পোঙ্গাপণ্ডিত।

বিএনপি-জামায়াত জোট যখন যখন ক্ষমতায় তখন আওয়ামী জোট তাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনরত। সেই আন্দোলনে বাসে আগুন লাগানোর ঘটনায় গণমাধ্যমে শিরোনাম হলো, ‘ক্ষোভের আগুন ছড়িয়ে গেল সবখানে’। কিন্তু এর বিপরীতে যখন বিএনপি-জামায়াত জোট ফ্যাসিজমের বিরুদ্ধে আন্দোলনরত, তখন বাস পোড়ানোর ঘটনায় খবরের শিরোনামে জায়গা হলো ‘পৈশাচিকতা’, ‘দুর্বৃত্ত’, ‘ধ্বংসাত্মক’ এমন সব শব্দের। এই শব্দ সহযোগে তৈরি করা হলো আন্দোলনের বিরুদ্ধে শিরোনাম, খবর। যারা এই শিরোনামের খবর তৈরি করল তারাই সেই ‘পোঙ্গাপণ্ডিত’।

এই যে খবরের শব্দচয়ন, শিরোনাম তৈরির ইনটেনশন, এটি না বোঝার সামান্যতম কারণ নেই। এটা যে সাংবাদিকতা নয়, এটি প্রমাণ করতে হাজার শব্দও লাগে না। লাগে না ওজনদার উদ্ধৃতিও। যাদের উদ্দেশ্য আছে, যারা অপসাংবাদিকতাকে মননে ধারণ করেন, তাদেরই শুধু নানা কিছু ঘাঁটতে হয় এ ধরনের সাংবাদিকতার পক্ষে বয়ান তৈরিতে। আর অনৈতিকতার পক্ষে এমন ঘাঁটাঘাঁটি ‘পোঙ্গাপণ্ডিত’দের কাজ।

এই অপসাংবাদিকতার অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে। দিয়ে শেষ করা যাবে না। গণমাধ্যমের কাজ হলো জবাবদিহির ক্ষেত্র তৈরি করা এবং নিজে জবাবদিহি চাওয়া। খবরগুলো জবাবদিহির ক্ষেত্র তৈরি করে। সম্পাদকীয়, উপসম্পাদকীয় নিজে জবাবদিহি চায়। এস্টাব্লিশমেন্টের বিপক্ষে দাঁড়ানোই গণমাধ্যমের কাজ। এস্টাব্লিশমেন্ট মানেই সরকার নয়, এ কথাটাও মাথায় রাখতে হবে। বিরোধীরাও এর বাইরে নয়। সোজা ও সহজ কথায় মানুষের পক্ষে দাঁড়ানোই সাংবাদিকতা বা গণমাধ্যমের কাজ।

ব্যতিক্রম বাদে আমাদের গণমাধ্যম কি এই কাজটি কখনোই সঠিকভাবে করেছে কিংবা করতে পেরেছে অথবা করার চেষ্টা করেছে? প্রশ্নটা রইল। এখানে প্রাসঙ্গিকতার কারণে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের ‘গদি মিডিয়া’র কথা বলি। সেখানে জেন-জি মুভমেন্ট তথা ককরোচ জনতা পার্টির তরুণদের হাতে কীভাবে নিগৃহীত হচ্ছে ‘গদি মিডিয়া’। ম্যাসমিডিয়া যখন প্রোপাগান্ডিস্ট হয়ে ওঠে, তখন সংগতই মানুষ মিডিয়ারও বিপক্ষে দাঁড়ায়। সেখানে তাই হয়েছে। আমাদের দেশে যেভাবে কোনো কোনো মিডিয়া প্রোপাগান্ডিস্ট হয়ে উঠছে, তাতে অচিরেই মিডিয়ার বিরুদ্ধে একইভাবে মানুষের বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠা অসম্ভব কিছু নয়। এখানের জেন-জিরাও হয়তো প্রোটেস্ট করবে সেসব মিডিয়ার বিরুদ্ধে, যারা ‘গদি মিডিয়া’র অনুগামী। তখন ‘মব’ নয়, সত্যিকার অর্থেই ‘তোপ’-এর মুখে পড়তে হবে প্রোপাগান্ডিস্টদের, এখানকার ‘গদি মিডিয়া’র।

লেখক: সাহিত্যিক, সাংবাদিক

ইসরাইলকে পরাজয়ের তিক্ত স্বাদ উপহার দিয়েছে ইরান

রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে নতুন বর্বরতা ও করণীয়

আত্মমর্যাদার পররাষ্ট্রনীতিতে ফিরছে বাংলাদেশ

রোহিঙ্গা ও বিপন্ন উখিয়া-টেকনাফের কথা

আ.লীগ ফেরার সম্ভাবনা কতটা, কীভাবে

বাজেট নিয়ে যে জরুরি প্রশ্নটি কেউ করে না

নিষেধাজ্ঞার পরও প্লাস্টিক ব্যাগের বিরুদ্ধে লড়াই

বাংলা ভাগের আড়ালে নৌ-অফিসার

‘পুশইন’ কূটনীতির অনিষ্টেও নির্বিকার?

ডিপ স্টেটের গভীরে বাংলাদেশ