হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

ভোটের মাঠে দুই রহমান এবং নির্বাচন কমিশন

আলফাজ আনাম

হাজারো মানুষের আত্মত্যাগ ও পঙ্গুত্ব বরণের বিনিময়ে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশের মানুষ মুক্তি পেয়েছিল নিপীড়নমূলক শাসন থেকে। দেড় দশক ধরে হরণ করা হয়েছিল এ দেশের মানুষের মৌলিক অধিকার; ছিল না নিজেদের নেতা নির্বাচন করার ক্ষমতা। হাজারো মানুষ হয়েছে গুম-খুন। দীর্ঘ জেলজীবন কেটেছে লাখ লাখ রাজনৈতিক নেতা-কর্মীর। রাজনৈতিক নেতাদের ঝুলতে হয়েছে ফাঁসিকাষ্ঠে। অবশেষে এক হাজার চারশ মানুষের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে এক নতুন বাংলাদেশের জন্ম হয়েছে; পালিয়ে যেতে হয়েছে ইতিহাসের এক নিষ্ঠুর শাসককে। তিনি শুধু একাই পালিয়ে যাননি, মন্ত্রিসভার সদস্য এবং সংসদ সদস্যদের নিয়ে পালিয়ে গেছেন। এমন পলাতক নেতা পৃথিবীর ইতিহাসে আর খুঁজে পাওয়া যাবে না।

রক্তাক্ত এক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার পথে চলতে শুরু করেছে বাংলাদেশ। মানুষ তার ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পেতে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে নির্বাচনি প্রচার অভিযান। কিন্তু এই যাত্রা এখনো খুব সহজ নয়। নির্বাচন অনুষ্ঠানের আগে কিছুটা হলেও ঈশান কোণে কালো মেঘ দেখা যাচ্ছে। শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের ক্ষেত্রে দুই দিক থেকে প্রতিবন্ধকতা বা ঝুঁকি আছে। একটি হলো নির্বাচনে অংশ নেওয়া দলগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সংঘাতের ঝুঁকি, অপরটি হচ্ছে প্রতিবেশী দেশের সমর্থনপুষ্ট পলাতক দলের নেতা-কর্মীদের গোপন তৎপরতা।

হাসিনার পতন ও পলায়ন বাংলাদেশে নতুন এক রাজনৈতিক বাস্তবতার জন্ম দিয়েছে। দেশের প্রধান রাজনৈতিক শক্তি এখন জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং জামায়াতে ইসলামী। হাসিনাবিরোধী আন্দোলনের এই দুই মিত্র দল এখন পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী। এর আগে তারা কখনো পরস্পরের মোকাবিলা করেনি। ফলে দুই দলের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ভাষা তীরের মতো আঘাত করছে নেতা-কর্মীদের। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরস্পরকে আক্রমণের ঝড় বয়ে যাচ্ছে। নির্বাচনি প্রচারণা শুরু হওয়ার পর এই আক্রমণ আরো তীব্র হয়ে উঠছে। এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে ভোটের মাঠে। আনুষ্ঠানিক নির্বাচনি প্রচারণা শুরু করার আগের দিন রাজধানীতে একটি দলের নারী কর্মীদের হেনস্তা করাকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে জড়িয়েছে দুই দলের কর্মীরা। সামনের দিনগুলোয় এ ধরনের সংঘাত ও সংঘর্ষের ঘটনা যে আরো বাড়বে, তা নিশ্চিত করে বলা যায়।

এ ধরনের সংঘাতময় পরিস্থিতির জন্য ওত পেতে বসে আছে পলাতক দলটি। সংবাদমাধ্যমগুলোয় অস্ত্র ও অর্থ ছড়ানোর নানা খবর এসেছে। পলাতকদের আশ্রয়দাতা দেশটির গতিবিধি সুবিধাজনক নয়। তারা বুঝে গেছে, সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হলে ফ্যাসিবাদী শক্তির ফেরার পথ রুদ্ধ হবে, যা হবে দিল্লির আরেকটি নৈতিক পরাজয়। ইতোমধ্যে নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশে রাজনৈতিক মেরূকরণ ঘটে গেছে। বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার জরিপে দেখা গেছে, নির্বাচনের পরিবেশ যদি শান্তিপূর্ণ থাকে, তাহলে ইতিহাসে সর্বোচ্চ ভোটার উপস্থিতি হতে পারে। কারণ দেশের মানুষ ভোট দেওয়ার জন্য মুখিয়ে আছে। এর মধ্যে প্রায় পাঁচ কোটির বেশি ভোটার এবার তাদের প্রথম ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। স্বাভাবিকভাবে বিদেশি মদতপুষ্ট পলাতক দলটির কৌশল হবে ভোটার উপস্থিতি কমাতে নানাভাবে আতঙ্ক সৃষ্টি করা। এমন পরিস্থিতিতে নির্বাচনে অংশ নেওয়া প্রতিদ্বন্দ্বী দলের প্রার্থীরা যদি সংঘাতে লিপ্ত হয়, তার সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করবে পলাতকরা।

ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়েছে, দেশের ভেতরে ফ্যাসিবাদী দলটির খুনে কাঠামো এখনো সক্রিয় আছে। নির্বাচন সামনে রেখে এ ধরনের গুপ্তহত্যার পথ বেছে নিতে পারে, যাতে মানুষ আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। আবার এমন ঘটনাকে কেন্দ্র করে ক্ষোভ-বিক্ষোভ থেকে নির্বাচন ভন্ডুলের চেষ্টা করা হতে পারে। ফলে সুষ্ঠু নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশ বড় ধরনের এক রাজনৈতিক ঝুঁকির মধ্যে থাকবে।

হাসিনার পতনের পর ধারণা করা হয়েছিল, নিপীড়ক দল আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে বিএনপি একক রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হবে। বাস্তবতা হচ্ছে, রাজনৈতিক শূন্যতা দীর্ঘ সময় থাকে না। মাত্র এক বছরের মধ্যে দেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপট পাল্টে যেতে থাকে। প্রধান রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয় জামায়াতে ইসলামী। এর প্রমাণ মেলে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্র সংসদ নির্বাচনে। সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামী ছাত্রশিবিরের ভূমিধস বিজয় প্রমাণ করে দেশের রাজনৈতিক মানচিত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। দেশের তরুণরা পুরোনো রাজনৈতিক বিভাজনের রাজনীতি আর পছন্দ করছে না। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ-বিপক্ষের যে কার্ড খেলে হাসিনা জাতিকে বিভক্ত করেছিলেন, দেশের তরুণসমাজ আর এই চেতনার রাজনীতিতে আগ্রহী নন। তারা ইতিহাসনির্ভর পেছনে ফেরার রাজনৈতিক কৌশলগুলো ধরে ফেলেছে। ফলে বিএনপির সামনে নতুন এক রাজনৈতিক বাস্তবতা হাজির হয়েছে।

দেড় দশক ধরে বিএনপি ফ্যাসিবাদী একটি দলকে মোকাবিলার কৌশল নিয়ে ব্যস্ত ছিল। কিন্তু মিত্র যখন প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠে তখন তাকে কীভাবে মোকাবিলা করতে হবে, তার পথ ছিল অজানা। সহজ পথ হিসেবে ফ্যাসিবাদী দলটি যেভাবে ইসলামপন্থি দল জামায়াতকে মোকাবিলা করেছে, একই বয়ান হাজির করার চেষ্টা করে বিএনপি। কিন্তু তরুণরা সম্ভবত এই বয়ান পছন্দ করেনি। এর প্রতিফলন আমরা দেখছি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্র সংসদ নির্বাচনে। বিএনপির প্রতি তরুণদের মুখ ফিরিয়ে নেওয়া দলটির জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

নতুন বাস্তবতায় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার পথ হচ্ছে ইতিবাচক রাজনীতির ধারায় ফিরে যাওয়া। এবারই প্রথম রাজনৈতিক দলগুলো ইশতেহার ঘোষণার আগে নির্বাচনে বিজয়ী হলে জনগণের জন্য কোন দল কী করতে চায়, তার প্রচারণা শুরু করেছে। বিএনপির পক্ষ থেকে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডসহ গণমুখী নানা ধরনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। আবার জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে দেশ পরিচালনার পলিসি পেপার হাজির করা হয়েছে। কল্যাণমুখী রাষ্ট্র পরিচালনার ধারণা থেকে কৃষি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে তারা বিভিন্ন ধরনের প্রতিশ্রুতির কথা বলেছে। দু’দলের সমর্থকরা এসব প্রতিশ্রুতি ও প্রস্তাবনার পক্ষে-বিপক্ষে কথা বলছেন। অপরদিকে ছাত্রদের দল জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপি রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকা অপরাধীদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছে। অতীতে রাষ্ট্র পরিচালনায় রাজনৈতিক দলগুলোর অঙ্গীকার নিয়ে এমন আলোচনা কমই হয়েছে। নির্বাচনি ইশতেহার শুধু সংবাদপত্রের পাতায় প্রকাশিত হতো; সাধারণ ভোটারদের মধ্যে এর কোনো প্রভাব পড়ত না। কিন্তু এবার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, মূল্যস্ফীতি ও খেলাপি ঋণের মতো বিষয়গুলো নির্বাচনি আলোচনায় গুরুত্ব পাচ্ছে। এ ধরনের আলোচনা গণতান্ত্রিক রাজনীতির জন্য ইতিবাচক দিক। এর মাধ্যমে দেশের মানুষ শুধু মার্কা নয়, দলের অঙ্গীকার ও প্রার্থীর যোগ্যতা বিচার করার সুযোগ পাচ্ছে। রাজনৈতিক দলগুলোকে ধীরে ধীরে এভাবে জবাবদিহিতার মধ্যে আনা সম্ভব হবে।

রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনি প্রচারণা শুরু হওয়ার আগে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে গুরুতর কিছু প্রশ্ন উঠেছে। ’৯০-এর স্বৈরাচার পতন-পরবর্তী সময়ে যে কয়েকটি শান্তিপূর্ণ ও অবাধ নির্বাচন হয়েছে, তাতে নির্বাচন কমিশন নিরপেক্ষ ও কঠোর ভূমিকা পালন করেছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে বর্তমান নির্বাচন কমিশন আইন ও নীতির প্রশ্নে কঠোর ভূমিকা নিতে পারেনি। দুর্বল নির্বাচন কমিশন নিয়ে এক ধরনের শঙ্কা রয়েছে, যদিও প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের ঐকমত্যের ভিত্তিতে এই কমিশন গঠন করা হয়েছিল। নির্বাচন কমিশনাররা যদি রাজনৈতিক পক্ষপাতের ঊর্ধ্বে উঠে কঠোর অবস্থান না নিতে পারেন, তাহলে ভয়াবহ সংকট দেখা দিতে পারে। রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তিতে ফ্যাসিবাদী আমলের নির্বাচন কমিশনারদের অপমানজনক পরিণতি আমরা দেখেছি। বর্তমান নির্বাচন কমিশন এ থেকে শিক্ষা নিয়ে পক্ষপাতমুক্তভাবে কঠোর ও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণে কোনোভাবেই পিছপা হবে না বলে দেশের মানুষ আশা করে। নির্বাচন কমিশনকে মনে রাখতে হবে, সুষ্ঠুভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগ করা শুধু রাজনৈতিক দলের ইচ্ছাপূরণের বিষয় নয়, জনগণের সর্বোচ্চ আকাঙ্ক্ষা পূরণের উপায়। নির্বাচন কমিশন দেশের মানুষের ভোটাধিকার নিশ্চিত করার ব্যাপারে অঙ্গীকারবদ্ধ।

এ কথাও সত্য, রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচন কমিশনের ক্লায়েন্ট। তাদের আচরণের ওপর নির্ভর করবে সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ। রাজনৈতিক দলগুলোকে মনে রাখতে হবে, মাত্র দুই বছর আগের রক্তক্ষয়ী গণ-অভ্যুত্থানের ছবিগুলো মানুষের মনে এখনো জীবন্ত রয়েছে। দেশের মানুষ একটি বেদনাদায়ক সময় পার করেছে। এই রক্তাক্ত অভ্যুত্থানের সুফল হিসেবে তারা ভোটের মাধ্যমে নেতা নির্বাচন করতে চায়। এই অধিকার প্রয়োগে রাজনৈতিক দল কিংবা নির্বাচন কমিশন ব্যর্থ হলে তা হবে অভ্যুত্থানের শহীদ ও আহতদের রক্তের সঙ্গে বেইমানি। যদি সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে ক্ষমতা হস্তান্তর না হয়, তাহলে দেশ যে গভীর খাদে পড়ে যাবে, তা থেকে টেনে তোলার জন্য হয়তো আরো রক্তের নদী পাড়ি দিতে হবে। ফলে আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠান শুধু অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নয়; প্রতিটি রাজনৈতিক দল ও নাগরিকের সমান দায়িত্ব। মনে রাখতে হবে, দেশের রাজনৈতিক আকাশের ঈশান কোণে যে কালো মেঘের ঘনঘটা দেখা যাচ্ছে, তা কেটে যেতে পারে রাজনৈতিক নেতাদের দায়িত্বশীল ভূমিকা ও নির্বাচন কমিশনের ন্যায়নিষ্ঠ ভূমিকার ওপর। তবে প্রধান দায়িত্ব এখন ‘দুই রহমান’-এর ওপর—বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান।

লেখক: সহযোগী সম্পাদক, আমার দেশ

alfaz@dailyamardesh.com

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক এবং থিঙ্কট্যাঙ্কের ভূমিকা

জিয়া, তালপট্টি এবং অমীমাংসিত ইতিহাস

নেকাব বিতর্ক ও একটি পর্যালোচনা

সেভাস্টোপল থেকে চট্টগ্রাম বন্দর ফেনী করিডর

ডনরোনীতি : আমেরিকান আধিপত্যের পুনরুত্থান

দেশের মর্যাদা থেকে ক্রিকেট বড় নয়

জিয়াউর রহমানকে কেন পাঠ করতে হবে

শহীদ জিয়া: ক্ষণজন্মা মহাপুরুষ, আদর্শের রূপকার

বাংলার আরেক পার্বণ শবেমেরাজ

জোট রাজনীতির নায়ক-খলনায়ক