সাংস্কৃতিক স্বকীয়তাই প্রকৃত স্বাধীনতার মৌলিকতম নিয়ামক ও ভিত্তি।
সংস্কৃতির যা কিছু প্রতিবেশী জাতিগুলো থেকে স্বজাতিকে স্বকীয়তায় ভাস্বর করে, তাই আদরণীয়, পালনীয়, স্মরণীয় ও সংরক্ষণীয়। বিশ্বাসী-অবিশ্বাসী, ধর্ম-বর্ণ, জাতিগোষ্ঠী, মঝব-গ’র মজহব, আলেম-জাহেল, জ্ঞানী-নির্জ্ঞান নির্বিশেষে বাংলার সব জনসাধারণেরই উচিত, জাতীয় স্বাধীনতার মৌলিক শর্ত, জাতীয় স্বকীয়তা ভাস্বর রাখতে হলেও, শবেবরাতের মর্যাদা সমুন্নত রেখে তার পালন। যদিও বা কেউ স্ববিশ্বাসে-অবিশ্বাসে আল্লাহতায়ালার জন্য তাতে ধর্মীয়ভাবে আগ্রহী না হতে পারে। আর বিশ্বাসী ধার্মিকরা তো করবেন নিজস্ব বিশ্বাস মতেই ।
বাংলার সংস্কৃতির চিরায়ত
আবহমান বাংলার লোকসংস্কৃতির চিরায়ত একটি পার্বণ হিসেবে হাজার বছর ধরে পালিত হয়ে আসছে ‘শবেবরাত’, যা ‘ভাগ্য-রজনি’ বলে সাধারণ্যে পরিচিত। এ রাতে সারা বছরের ভাগ্য নির্ধারিত হয় বলে সাধারণত বিশ্বাস করা হয়। সেই বিশ্বাস থেকে রাজধানীসহ সব শহর, গ্রামবাংলার ব্যাপকতর জনসাধারণ এ রাত সারারাত জেগে থেকে বিশেষ এবাদত-বন্দেগি করে ভাগ্যনিয়ন্তা আল্লাহতায়ালার কাছে ভাগ্যোন্নইয়ন করে সারা বছর ভাগ্য ভালো রাখার আকুতির চেষ্টা করেন। নিজেদের ভাগ্যোন্নয়নের এই আকুতির অংশ হিসেবে নিজেদের ইহজাগতিক জীবনের দীর্ঘায়ু আর পারলৌকিক মঙ্গল আর সুখের সঙ্গে সঙ্গে নিজেদের প্রয়াতদেরও পারলৌকিক মুক্তি, মঙ্গল ও সুখের জন্যও দোয়া করেন। প্রয়াত বিশ্বাসীদের জন্য এমন শুভকামনাসহ তারা এ রাতে গোরস্তানে গিয়ে প্রয়াতদের সালাম করে তাদের কবরে জিয়ারত করে দোয়া করেনÑতাদের জন্যও, নিজেদের জন্যও।
দোয়া কবুলের সম্ভাবনা বাড়ানোর জন্য, দোয়া কবুলের মালিক, আল্লাহতায়ালার নিজের ‘আপনজন’, দরিদ্র-অভাবীদের এ রাতে একটু ভালো খাবারÑবিশেষ করে মিষ্টান্নের মতো যে বিশেষ খাবার, যাদের জোটে না, তাদের একেবারেই, তা-সহ ‘হালুয়া রুটি’ বানিয়ে তাদেরও খাওয়ানো, নিজেরাও খাওয়া এবং আত্মীয় ও প্রতিবেশীদেরও খাইয়ে আত্মীয়ার বন্ধন এবং প্রতিবেশীর সঙ্গে সদ্ব্যবহারের ধর্মীয় অনুশাসন অনুসরণের পুণ্য অর্জনের চেষ্টাও করেন তারা ।
সারারাত এবাদতের জন্য মসজিদে যাওয়া এবং গোরস্তানে জিয়ারত করতে যাওয়ার সময় অন্ধকার রাতে রাস্তা দেখার সুবিধার্থে পথে পথে আলো জ্বালানোটাকেও পুণ্যকর্মে সহায়তার পুণ্য অর্জনের উদ্দেশ্যে লোকরা এভাবে আলো জ্বালাতেন। তার অনুস্প্রেরণেই যেন এখনো অনেকে, যেখানে বিদ্যুৎ বাতি থাকার কারণে অন্ধকার রাতে রাস্তা দেখানোর জন্য আর পথে পথে প্রদীপ বা মোমবাতি জ্বালানোর প্রয়োজন না থাকলেও এমন বাতি জ্বালায় অথবা শোভাবর্ধনের জন্য বিদ্যুৎ বাতির মালা দিয়ে বিভিন্ন ইমারত সাজায়। এই অপচয়মূলক বাতি জ্বালানোতে কোনো পুণ্য থাকার কথা তো নেই—অপচয়ের কারণে পাপই হবে। তা সত্ত্বেও শবেবরাতের মূল মর্ম না বুঝে, এমন বাতি জ্বালিয়ে শোভাবর্ধন করা হয় এবং তার সঙ্গে সঙ্গে কোথাও কোথাও শিশুদের আতশবাজির মারাত্মক রেওয়াজও প্রচলিত হয়ে পড়ে।
১৮০০ শতকের শুরুর দিকে ভারতের মোগল শাসকদের দুর্বলতার সুযোগে প্রায় ৫০০ বছর বাংলাদেশে পারস্য থেকে ভারত হয়ে আসা পারসি শিয়া ঔপনিবেশিক কিছু ব্যক্তি নবাব সেজে বসে নিজস্ব শিয়া বিশ্বাসের অনুসরণে শবেবরাতের তারিখ নিয়ে তাদের বিশ্বাস মোতাবেক রাতটিকে কল্পিত ইমাম মাহদীর জন্মদিন হিসেবে পালনের উৎসবের অংশ হিসেবে এ রাতে আলোকসজ্জা, হালুয়া-রুটি খাওয়া ও খাওয়ানোর সঙ্গে আতশবাজিসহ নানা কিছুর প্রচলন করে বলে প্রতীয়মান।
এভাবে শবেবরাত উদযাপনে তার মূল ভাব—গম্ভীর এবাদত-বন্দেগির ধারাটি—অপসংস্কৃতিমূলক এমন এক ধারায় প্রবাহিত হয়ে পড়ে, যা প্রাজ্ঞ ধর্মশিক্ষকদের অনেকেই প্রতিরোধ করা জরুরি মনে করেন। মূলত ভাবগম্ভীর এবাদত-বন্দেগি ও পুণ্য সাধনার সঙ্গে মিশিয়ে ফেলা অপসংস্কৃতিমূলক হালকা ফূর্তি-জ্ঞাপক ‘বেদাত’, তথা ধর্মে নবাবিষ্কৃত বা নবসংযোজিত বিষয়গুলোর বিরোধিতা করতে গিয়ে তাদের কেউ কেউ শবেবরাতের এই মহৎ রজনি ও দিবস পালনটিকেই ‘বেদাত’ বলে তার পুরোটারই বিরোধিতা করতে শুরু করেন—এ যেন মাথাব্যথা হওয়ার কারণে তা উপশমে মাথাটাই কেটে ফেলার আজগুবি ডাক্তারির মতো!
অথচ বাংলার চিরায়ত সংস্কৃতির হাজার বছরেরও অধিক ধরে পালিত এই বার্ষিক অনুষ্ঠান বাংলার বৃহত্তর জনসংখ্যার, ব্যাপকতর সমাজের পালিত ধর্মের মূল সূত্র—কোরান শরিফ এবং সুন্নতের খবরের আকর হাদিস শরিফের উৎস থেকেই উৎসারিত।
বরকতময় রাত
কোরআন শরিফের ‘আদ-দুখান’ নামক ৪৪তম সুরায় এক বরকতময় রাতের কথা বলা হয়েছে। ইক্রিমাহর মতো প্রখ্যাত কোরআন শরিফ ব্যাখ্যাকারী ‘মুফাসসির’ বলেছেন, এই রাত হলো—কোরআন শরিফের ব্যাখ্যার মূল দায়িত্বপ্রাপ্ত হিসেবে যার কথা খোদ কোরআন শরিফে নির্দেশিত, সেই হজরত মুহাম্মদের শিক্ষার আকর ‘সুন্নত’-এর খবরের ভান্ডার হাদিস শরিফে বর্ণিত শাবান মাসের যে মধ্যরাতকে সাধারণত ‘শবেবরাত’ বলা হয়।
কোনো কোনো মুফাসসির বলেছেন, এই বরকতময় রাত হলো রমজান মাসের যে রাতকে ‘শবেকদর’ বলা হয়, তা। কোরআন শরিফ ও হাদিস শরিফের ব্যাখ্যায় এমন একাধিক বিকল্প সিদ্ধান্তের সম্ভাবনা দেখা দিলে বিশেষজ্ঞরা ‘তাত্ত্বিক’ নামে যে পদ্ধতি ব্যবহার করেন, সে মতে এখানে সুরাহ আদ-দুখানের সংশ্লিষ্ট আয়াতে উল্লিখিত ‘বরকতময় রাত’ কথাটি ‘শবেবরাত’ ও ‘শবেকদর’—উভয়ের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হতে পারে অথবা তার কোনো একটির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হতে পারে।
বাংলায়, বিশ্বের কোরআন-হাদিস অনুসরণকারী কোটি কোটি জনসংখ্যার বিশালতর সংখ্যাগরিষ্ঠের মতোই, চিরকালই তা ‘শবেবরাত’ হিসেবেই পালিত হয়ে এসেছে, আর সুরাহ কদরে বর্ণিত ‘কদর’-এর রাত কথাটির আলোকে ‘শবেকদর’ পালিত হয়—ইক্রিমাহর মতো মুফাসসিরের কোরআন ব্যাখ্যা এবং তার ভিত্তিরূপ হাদিসের আলোকে।
‘বেদাত’?
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকরা বাংলাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দখলীকৃত দেশে স্বীয় শাসন-শোষণের স্বার্থে স্থানীয়দের সাংস্কৃতিক স্বকীয়তা মুছে ফেলার ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে যেসব পদক্ষেপ নেয়, তারই অনুষঙ্গ হিসেবে স্থানীয় বা বিদেশি কিছু সুবিধাভোগী ও তাদের অনুসারীদের মাধ্যমে চালিত প্রচারণায় শবেবরাতের মতো নানা স্থানীয় ও জাতীয় উৎসব-উদযাপনকে প্রশ্নবিদ্ধ করাতে উদ্যোগী হয়। ধর্মে ধর্ম-নিষিদ্ধ নবসংযোজিত কোনো কিছুকে ‘বেদাত’ বলে ধর্মের অন্যান্য বিষয়ের মতো শবেবরাতকেও ‘বেদাত’ ও নিষিদ্ধ বলে প্রচারণার সূত্র এখান থেকেই।
এর জন্য ধর্মের দীর্ঘ ইতিহাসে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ধর্মজ্ঞানীদের বলা নানা কথাকে প্রেক্ষিত-বিচ্ছিন্ন করে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয় যে ধর্মীয় সিদ্ধান্তের বিশেষজ্ঞ পদ্ধতি সম্পর্কে অজ্ঞ সাধারণ ধার্মিক ব্যক্তিকে ভুল বুঝিয়ে ধর্মে পালিত অনেক কিছুই পরিত্যাগ করতে উদ্বুদ্ধ করা হয়। ঔপনিবেশিক শক্তিরা এমন সূক্ষ্ম ‘মগজ-ধোলাই’-এর শিকার করে হিন্দু, বৌদ্ধ, চৈনিকসহ দখলীকৃত দেশগুলোর অন্য জনগোষ্ঠীকেও।
কিন্তু শবেবরাত যে ‘বেদাত’ বা ধর্মে ধর্মবহির্ভূত কোনো নবসংযোজন নয়, তা বেদাত-প্রতিরোধে সুদূর অতীতেরও বিখ্যাত ও সম্মানিত দৃঢ়চিত্ত ধর্মনায়ক এবং ধর্মজ্ঞানীদের বক্তব্য থেকেই জানা যায়। উদাহরণস্বরূপ, প্রথম দিককার সব খলিফার মতোই, বিশেষভাবে ধর্মের নামে ধর্মে অধর্মমূলক অনাচার উৎপাতনকারী খলিফা উমর বিন আব্দুল আজিজ বিশেষ করে মধ্য শাবানের রাত—যাকে সাধারণ্যে ‘শবেবরাত’ বলা হয়—তার পালনের নির্দেশ দেন। সারাজীবন বেদাতের বিরুদ্ধে সংগ্রামে অত্যন্ত দৃঢ়চিত্ত ইবন তাইমিয়্যাহও এই রাতের বিশেষ মর্যাদার কথা জোর দিয়ে বলেছেন। আর তার অনুসরণীয়, বেদাতের বিরুদ্ধে অত্যন্ত দৃঢ়চিত্ত সংগ্রামী ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (র.) তো এর উৎসাহব্যঞ্জক হাদিসও বর্ণনা করেছেন।
‘বরাত’-এর রাত
কিছু পথভ্রষ্ট হয়ে পড়া পরপর তিন খলিফা—মামুন, মুতাসিম ও ওয়াসিকের নির্দেশে অসাধারণ শারীরিক নির্যাতনের মুখেও ‘বেদাত’ প্রতিরোধে অত্যন্ত অনড় ইমাম আহমদ ইবন হাম্বল-সংকলিত একটি হাদিস মতে নবীজি (সা.) বলেন, যার মোটামুটি অর্থ হলো—‘শাবানের পঞ্চদশ রাতে তিনি তাঁর দৃষ্টিপাত করেন; অতঃপর দুই ধরনের লোক ছাড়া তাঁর সব বান্দাকেই ক্ষমা করে দেন।’
এখানে ‘মোটামুটি’ বলা হলো এ জন্য যে, উপরোক্ত হাদিসের মতোই তাওরাত ও ইঞ্জিলের মতো কোরআন-হাদিসে বর্ণিত ঐশী মাধ্যমে প্রাপ্ত কোনো কথা বা বিষয়ের সম্পূর্ণ সঠিক অনুবাদ সম্ভব নয়; তা মূল ভাষায়ই বোঝা প্রয়োজন। অপারগদের জন্য বড়জোর যা করা যায়, তা হলো তার একটি সামগ্রিক ধারণা দেওয়া এবং তাদের বিস্তৃত ব্যাখ্যা জেনে বোঝার উৎসাহ দান।
অন্যান্য বর্ণনা মতে জানা যায়, তিনি (সা.) ক্ষমা না পাওয়াদের মধ্যে আরো অন্য ধরনের লোকের কথাও বলেন; তাদের অন্তর্ভুক্ত হলো আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্নকারী এবং মা-বাবার অবাধ্য ব্যক্তিরা।
ইবন মাজাহ নামে পরিচিত গ্রন্থসহ সহিহ হাদিসের ছয়টি সর্বপ্রসিদ্ধ সংকলনের অন্তর্ভুক্ত অন্যান্য হাদিস সংকলনে বর্ণিত হাদিস অনুযায়ী নবীজি (সা.) হজরত আয়েশাকে (রা.) আরো বলেন, যার মোটামুটি অর্থ—‘মধ্য শাবানের রাতে আল্লাহ নিম্নতম আকাশে অবতরণ করেন এবং বনি কাল্ব গোত্রের ভেড়া ও পশমের সংখ্যার চেয়েও অধিক লোককে ক্ষমা করেন।’
ইবন মাজাহ সংকলিত আরেকটি হাদিস মতে, নবীজি (সা.)) বলেন, যার মোটামুটি অর্থ—এই রাতে সূর্যাস্ত থেকে ভোর পর্যন্ত আল্লাহ তাঁর বান্দাদের জিজ্ঞেস করেন, ‘কেউ কি আছে আমার কাছে ক্ষমাপ্রার্থী, যাতে আমি তাকে ক্ষমা করি? কেউ কি আছে আমার কাছে রিজিকপ্রার্থী, যাতে আমি তাকে রিজিক দান করি? কেউ কি আছে কষ্টে নিপতিত, যাতে আমি তার কষ্ট দূর করি?’
এই যে একাধিক বিশুদ্ধ হাদিসে বারবার ক্ষমার কথা বলা হয়েছে—ইমাম আহমদের মতো কঠোর ‘বেদাত’ প্রতিরোধী ইমাম আহমদ ইবন হাম্বলের সংকলনেও—তার কোনো কোনো বর্ণনায় এই ক্ষমাকে বলা হয়েছে ‘বরাআত’। এই শব্দটি ফারসি, তুর্কি, উর্দু ও বাংলা উচ্চারণে সংক্ষেপিত হয়ে হয় ‘ব্রাত’ বা ‘বরাত’। সে থেকেই শাবানের মধ্য, তথা পঞ্চদশ রাতকে ‘বরাত’-এর রাত—অর্থাৎ ‘মুক্তি’-এর রাত বা ‘মুক্তি’ রজনি বলা হয়।
আরবির পরই ফারসি যেহেতু ধর্মের একটি ঐতিহ্যবাহী ভাষা হিসেবে আবির্ভূত হয় এবং বাংলাদেশসহ তুরস্ক ও ইউরোপের বলকান অঞ্চল থেকে শুরু করে পারস্য, মধ্য এশিয়া, চীনা সাম্রাজ্যের অংশ, হিন্দুস্তান হয়ে বাংলাদেশসহ মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া—এমনকি তারও পর পর্যন্ত বিস্তৃত বিশাল এলাকায় প্রায় এক হাজার বছর ধরে ফারসিই সরকারি, শিক্ষা ও সংস্কৃতির প্রধান ভাষা হিসেবে কার্যকর ছিল—ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক দখলদারদের আগমনের অনেক পরে তা পরিবর্তিত হওয়ার আগ পর্যন্ত—সে কারণে সর্বত্র স্থানীয় ভাষায় আরবির মতো ফারসির বহু শব্দ আত্মস্থ হয়ে সাদরে ব্যবহৃত হয়।
এভাবেই বাংলাতেও ‘রাত’-এর প্রতিশব্দ হিসেবে ফারসি ‘শব’ ব্যবহৃত হতে শুরু করে। ফলে মুক্তির রাত হয় ‘বরাত’-এর ‘শব’, এবং ফারসির ব্যাকরণ অনুযায়ী তা হয়ে পড়ে ‘শব-এ বরাত’, সংক্ষেপে ‘শবেবরাত’।
শবেবরাতের রাতের ‘এবাদত’
ওপরে বর্ণিত হাদিসগুলো থেকেই বোঝা যায়, এ রাতের বিশেষ তাৎপর্য হলো—এই রাতে আল্লাহতায়ালার এমন এক বিশেষ দয়া রয়েছে, যার মাধ্যমে তিনি বিশেষ আগ্রহে পাপমোচনমূলক ক্ষমা দান করেন, রিজিক দান করেন এবং বিপদ মোচন করেন। আর তার স্নেহধন্য বান্দারা সেসবই তার কাছে প্রার্থনা করেন। এই প্রার্থনাই হলো ‘দোয়া’। এ কারণেই এ রাতের বিশেষ ‘ইবাদত’ হলো ‘দোয়া’। এই বিশেষ বিষয়গুলো চেয়ে দোয়া করাই শবেবরাতের রাতে করণীয় প্রধান ‘ইবাদত’।
এ রাতে নবীজি (সা.)-এর একটি বিশেষ দোয়া করা যেতে পারে, যা ইমাম বায়হাকী সংকলিত হজরত আয়েশা (রা.) বর্ণিত একটি সহিহ হাদিসে পাওয়া যায়। নবীজি (সা.) তা সিজদায় এবং বেতরের পর পাঠ করতেন। হজরত আয়েশা (রা.)-এর এক বর্ণনা অনুযায়ী, একবার নবীজি (সা.) রাতে এত দীর্ঘ সময় সিজদায় ছিলেন যে তিনি (রা.) ভয় পেয়ে নবীজি (সা.) জীবিত আছেন কি না, তা দেখার জন্য তার পা স্পর্শ করেন; তখন তিনি (সা.) পা নাড়ান। আর তিনি (রা.) নবীজি (সা.)-কে একটি দোয়া করতে শুনেন, যাতে আল্লাহতায়ালার কাছে যে কথা বলা হয়, তার বাংলায় মোটামুটি অর্থ দাঁড়ায়—
‘আমি আপনার সন্তুষ্টির মাধ্যমে আপনার অসন্তোষ থেকে আশ্রয় চাই,
আপনার ক্ষমার মাধ্যমে আপনার শাস্তি থেকে আশ্রয় চাই,
আর আমি আপনার কাছেই আপনার থেকে আশ্রয় চাই।
আমি আপনার যথাযথ প্রশংসা করতে সক্ষম নই;
আপনি নিজেই যেমন নিজের প্রশংসা করেছেন, তেমনই আপনি।’
আলেমরা শাবানের পঞ্চদশ রাতে, অর্থাৎ ‘শবেবরাত’-এ এই দোয়াটি পাঠের কথা উল্লেখ করেছেন। যারা এই দোয়া করতে চান, তারা কোনো যোগ্য আলেমের কাছ থেকে এর সঠিক মূল আরবি উচ্চারণ ও পূর্ণ অর্থ জেনে নিতে পারেন।
ইবন মাজাহ সংকলিত আরেকটি হাদিসে নবীজি (সা.) বলেন, যার মোটামুটি অর্থ—এই রাতে সূর্যাস্ত থেকে ভোর পর্যন্ত আল্লাহতায়ালা তার বান্দাদের জিজ্ঞেস করেন, ‘কেউ কি আছে আমার কাছে ক্ষমাপ্রার্থী, যাতে আমি তাকে ক্ষমা করি? কেউ কি আছে আমার কাছে রিজিকপ্রার্থী, যাতে আমি তাকে রিজিক দান করি? কেউ কি আছে কষ্টে নিপতিত, যাতে আমি তার কষ্ট দূর করি?’
শবেবরাতের নামাজ
কোরআন শরিফে আল্লাহতায়ালা ধৈর্য ও নামাজের মাধ্যমে সাহায্য চাইতে বলেছেন। তাই শবেবরাতে—ওপরে বর্ণিত হাদিসে যে তিন বিষয়ে আল্লাহতায়ালার সাহায্য প্রার্থনার কথা এসেছে—সেসব বিষয়ে দোয়ার সঙ্গে অতিরিক্ত ‘নফল’ নামাজ আদায় করাও শবেবরাতের রাতে কোরআন শরিফের নির্দেশনার আলোকে করা যেতে পারে।
শবেবরাতের রাতে নবীজি (সা.) দীর্ঘ সিজদাসহ নামাজ আদায় করছিলেন বলেও হজরত আয়েশা (রা.) বর্ণিত হাদিসে জানা যায়।
তবে এ ধরনের নামাজকে শবেবরাতের জন্য বিশেষ কোনো বাধ্যতামূলক নামাজ মনে করা অননুমোদিত, অর্থাৎ ‘বেদাত’। কেননা ধর্মের মূলনীতি (‘উসুলুশ শরিয়াহ’) অনুযায়ী কোরআন শরিফ বা নিশ্চিত হাদিসে স্পষ্টভাবে ‘ফরজ’ বা ‘বাধ্যতামূলক’ বলা না হলে কোনো কিছুকেই ফরজ বা বাধ্যতামূলক বলা যায় না। ঠিক তেমনি কোরআন শরিফ বা নিশ্চিত হাদিসে স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ না হলে কোনো কিছুকেই ‘হারাম’, ‘বেদাত’ বা নিষিদ্ধ বলা যায় না।
‘শবেবরাতের রোজা’
দৃশ্যত, একটি মাত্র ‘জয়িফ’ হাদিসে বিশেষভাবে শবেবরাতের দিনের রোজা—অর্থাৎ ‘শবেবরাতের রোজা’-এর কথা বলা হয়েছে। এ কারণে কেউ কেউ শবেবরাতের দিন রোজাকে ‘বেদাত’ বা নিষিদ্ধ মনে করেন। কিন্তু এটি সঠিক নয়।
প্রথমত, যতক্ষণ কোরআন শরিফ বা নিশ্চিত হাদিসে ফরজ বলে জানা যায় না, ততক্ষণ তাকে ‘ফরজ’ বা অবশ্যই করণীয় মনে না করে কোনো এবাদতকে নিষিদ্ধ মনে করা যায় না। কারণ আল্লাহ নিজেই কোরআন শরিফের সুরা বাকারা, আয়াত ১৮৪-এ বলেছেন—মোটামুটি যার অর্থ, ‘যিনি ভালো কিছু অতিরিক্ত করেন, তা তার জন্যই ভালো।’
কোনো হাদিস শুধু এ কারণে নিষিদ্ধ হয়ে যায় না যে তার কথা শুধু একটি হাদিসে বলা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একটি নামাজ কীভাবে পড়তে হবে, তা কোরআন শরিফে প্রত্যক্ষভাবে বলা নেই। আবদুল্লাহ বিন মসউদ (রা.) বর্ণিত একটি হাদিস ছাড়া অন্য কোনো হাদিসে মোটামুটি সম্পূর্ণভাবে তা খোলাসা করা হয়েছে বলে মনে হয় না। তাই বলে নামাজ যেভাবে পড়া হয়, তা নিষিদ্ধ হয়ে যায় না।
একইভাবে, কোনো কিছু ভালো হওয়ায় বা মন্দ হওয়ায় শুধু এ কারণে সেটি ‘হারাম’, ‘বেদাত’ বা নিষিদ্ধ হয়ে যায় না যে তার কথা একটি জয়িফ হাদিসে বলা হয়েছে। হাদিস শাস্ত্রে যথার্থ পারদর্শীরা ছাড়া অধিকাংশই আজকাল ‘জয়িফ হাদিস’ বলতে ‘দুর্বল হাদিস’ মনে করেন, যা সর্বৈবই ভুল।
এই ভুলের একটি কারণ হলো—আরবি কথাটির শব্দের বাংলা, ইংরেজি বা অন্য ভাষায় সরাসরি অনুবাদ করার চেষ্টা, যেখানে আরবি ব্যাকরণের ‘হজফ’ নামক বিশেষ নিয়মের জ্ঞান বা তা প্রয়োগের অভাব থাকে। আরেকটি কারণ হলো, বিশেষজ্ঞ বিষয়ের জন্য ব্যবহৃত বিশেষজ্ঞসুলভ ভাষা (Technical Language)-এর একটি ধারণাকে সাধারণ কথ্য ভাষায় (Popular Language)-এ অনুবাদ করার ভুল প্রচেষ্টা।
আসলে, ‘জয়িফ’ হাদিসের অর্থ ‘দুর্বল হাদিস’ নয়, বরং এর অর্থ হলো, ‘দুর্বল সনদ-ধারায় প্রাপ্ত নিশ্চিতায়িত হাদিস।’ তার সনদ-ধারার দুর্বলতার কারণে হাদিসটি নিজেই দুর্বল হয়ে যায় না। বিশেষজ্ঞ হাদিসবিদদের পরিভাষায় এটি ‘ইনাদ’-এর দুর্বলতা নামে পরিচিত। এই সনদ-ধারার দুর্বলতাকে কোনো হাদিসের স্বতঃসিদ্ধ দুর্বলতা মনে করার কারণে হাদিসের যথার্থ বিচার ও প্রয়োগে ভীতিজনক ভুল হয়।
আরো লক্ষণীয়, কোনো কিছুকে হারাম বা নিষিদ্ধ বা ফরজ বা বাধ্যতামূলক প্রমাণ করার জন্য ব্যবহার করা না হয়ে শুধু ভালো কিছু করার জন্য উৎসাহ দেওয়ায় (তারগিব) বা মন্দ কিছু থেকে বিরত রাখায় ভীতি প্রদর্শনের জন্য (তারহিব) জয়িফসহ পরীক্ষা-নিরীক্ষিত অন্তত ৩৫ প্রকার নিশ্চিতায়িত (Authenticated) হাদিস ব্যবহার করা যেতে পারে, যা ব্যবহার করা যাবে না, তা হলো—এখনো পরীক্ষিত বা নিশ্চিতায়িত নয় এমন (মৌজু’) বা পরীক্ষিত হয়ে প্রতারণামূলক (মুফতরা’) হিসেবে স্থির হওয়া হাদিস।
ভাগ্য-রজনি
কোরআন শরিফ এবং সুন্নতের হাদিস থেকে প্রাপ্ত শিক্ষার আলোকে বিশ্বাস করা হয়, যে ভাগ্য নির্ধারিত ও পরিচালিত হয় বিভিন্ন পর্যায়ে—সৃষ্টিকাল থেকে শুরু করে প্রতিবছর শাবান মাসের ১৪তম রাত, অর্থাৎ ‘শবেবরাত’ এবং রমজান মাসের শেষ দশ দিনের কোনো এক রাতে, ‘শবেকদর’-এ। এই রাতে ভাগ্যের নির্দিষ্ট বিষয়গুলো প্রয়োগের জন্য চূড়ান্ত পর্যায় নির্ধারিত হয়, যা হয় খোদ খোদাতায়ালার ইচ্ছা ও নির্দেশ মোতাবেক।
এই বিশ্বাস থেকে বাংলার ব্যাপক জনগোষ্ঠীর লোক-সংস্কৃতিতে দেখা যায়, শবেবরাতেও মানুষ আগামী বছরের ভাগ্য উন্নয়নের জন্য বিশেষ দোয়া করে। বিশেষত, পূর্বে উল্লিখিত হাদিস অনুযায়ী, ক্ষমা প্রার্থনা, পরকালের সম্ভাব্য কষ্ট থেকে মুক্তি এবং রিজিক বৃদ্ধির জন্য প্রার্থনা করা হয়।
সংস্কার থেকে গঠিত সংস্কৃতি, অর্থাৎ সমাজের বৃহত্তর জনসংখ্যার মূল্যবোধ, আচরণ ও আচার-অনুষ্ঠানের অভ্যাস, যেগুলো সমাজের গভীর মনোজগতে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে উত্তরাধিকার সূত্রে স্থান পায়, তার বিরুদ্ধ যেকোনো আচরণই অপসংস্কৃতি হিসেবে ধরা হয়।
শবেবরাতের বরকতময় রজনি পালন, যা ‘এবাদত’ ‘বন্দেগি’ ও ধর্মীয় পুণ্যের সঙ্গে যুক্ত, সেটি বাংলার জনগণের সংস্কার এবং সাংস্কৃতিক স্বকীয়তার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।
বাংলার সংস্কৃতির শাশ্বত ও সুন্দর ঐতিহ্য হিসেবে শবেবরাত পালিত হোক ব্যাপকভাবে আর তার ফলে প্রসন্ন হোক বাংলার ভাগ্য, এই ভাগ্য-রজনিতে।
লেখক : যুক্তরাষ্ট্রের এমআইটি থেকে মনোবৈজ্ঞানিক সংস্কৃতি বিশ্লেশণ বিশেষজ্ঞতা সহ বিভিন্ন বিষয়ে উচ্চতর শিক্ষা ও গবেষণা পূর্বক পি.এইচ.ডি. অর্জন করেন। Dhaকা, যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড, ও মদীনায় বিশ্ববিদ্যালয় সহ বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন, ধর্মতত্ব, রাষ্ট্র বিজ্ঞান, মনস্তত্ব, সমাজ উন্নয়ন, ইংরেজী ও আরবী ভাষা সহ বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষকতা ও গবেষণা করেন।