হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

ইরান যুদ্ধ তুরস্কের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ

মুরাত ইয়েসিলতাস

ইরানে মার্কিন-ইসরাইলি আগ্রাসন নিরাপদ দূরত্বে বসে নিশ্চিন্তে দেখার অবস্থানে নেই তুরস্ক। রাজনৈতিক দূরত্ব বজায় রেখে যুদ্ধের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা তুরস্কের পক্ষে সম্ভব নয়। এটি এমন একটি যুদ্ধ, যা তুরস্কের তাৎক্ষণিক কৌশলগত পরিমণ্ডলজুড়ে বিস্তৃত হচ্ছে এবং একই সঙ্গে তাদের সীমান্ত, অর্থনীতি, কূটনীতি ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। এই যুদ্ধের কোনো পক্ষ না হয়ে তুরস্ক কীভাবে এর আঞ্চলিক বিস্তার রোধ করতে পারে, সেটিই এখন দেশটির কাছে গুরুত্বপূর্ণ। এটাই আঙ্কারার বর্তমান নীতির মূল কথা, যার অর্থ হচ্ছে—নিষ্ক্রিয় নিরপেক্ষতা নয়, আবার সামরিক জোটও নয়, বরং যুদ্ধে জড়িয়ে না পড়ে কূটনীতির সংমিশ্রণে সুচিন্তিত কৌশল নির্ধারণ করা, যাতে তুরস্ক কোনোভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, আবার যুদ্ধও থেমে যায়।

বাইরের অনেক পর্যবেক্ষকের কাছে তুরস্কের অবস্থান অস্পষ্ট মনে হয়। কিন্তু তাদের এ ধারণা আঙ্কারার কৌশলগত অবস্থানের ব্যাপারে একটি ভুল ব্যাখ্যা। তুরস্ক যেমন ন্যাটোর সদস্য, তেমনি ইরানের সঙ্গেও তার দীর্ঘ স্থলসীমান্ত আছে। তুরস্কে ন্যাটোর সমরাস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম যেমন আছে, তেমনি ইরানের সঙ্গে দেশটির গভীর ভৌগোলিক, বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক নির্ভরশীলতাও আছে।

তুরস্ক বোঝে, ইরানের পতন বা যুদ্ধের অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার মধ্যপ্রাচ্যকে আরো বিশৃঙ্খল করবে। এ কারণেই ইরানের যুদ্ধ তুরস্কের জন্য সাধারণ পররাষ্ট্রনীতির ঊর্ধ্বে এবং খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আঙ্কারা শুধু একটি আঞ্চলিক সংঘাত রোধ করার চেষ্টা করছে না, বরং একই সঙ্গে চেষ্টা করছে সীমান্ত অঞ্চলগুলো যাতে স্থায়ী বিরোধের কেন্দ্রে পরিণত না হয়।

যুদ্ধের তাৎপর্য

তুরস্ক যে কারণে এই যুদ্ধকে উপেক্ষা করতে পারে না, তার প্রথম কারণ হলো নিরাপত্তা। এই সংঘাত ইতোমধ্যেই প্রমাণ করেছে, এই যুদ্ধকে ভৌগোলিকভাবে সীমাবদ্ধ রাখা সম্ভব নয়। ক্ষেপণাস্ত্র তুরস্কের ভূখণ্ড অতিক্রম করেছে বা তার ভূখণ্ডে আঘাত হেনেছে, যা স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, তুরস্ক শুধু এই সংকটের প্রতিবেশীই নয়, বরং এর বিস্তারজনিত প্রভাবের সরাসরি শিকার হওয়া রাষ্ট্রগুলোর একটি। আরো গুরুতর বিপদটি হলো, এই যুদ্ধ ইরাক ও সিরিয়াকে যেভাবে নতুন রূপ দিচ্ছে তার ফলে দুটি রণাঙ্গনেই তুরস্কের কৌশলগত ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।

প্রথমত, ইরাকে আরো রাজনৈতিক ও গোষ্ঠীগত বিভাজন এমন একটি বিশৃঙ্খল পরিবেশ তৈরি করবে, যা তুরস্ক বছরের পর বছর ধরে প্রতিরোধ করার চেষ্টা করে আসছে। অন্যদিকে সিরিয়ার কুর্দি বিদ্রোহীদের সংগঠন ওয়াইপিজির ভবিষ্যৎ কী হবে, তা একটি জটিল প্রশ্ন এবং এই ইস্যুটি সিরিয়ার কেন্দ্রীয় সরকারের অবস্থান সংহত করার সম্ভাবনাকে দুর্বল এবং তুরস্কের জন্যও নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে। কুর্দি ইস্যু তুরস্কের জন্য কোনোভাবেই গৌণ বিষয় নয়।

দ্বিতীয় কারণটি অর্থনৈতিক। তুরস্ক মুদ্রাস্ফীতি হ্রাস, রক্ষণশীল নীতি ও আর্থিক শৃঙ্খলার মাধ্যমে সামষ্টিক অর্থনৈতিক নির্ভরযোগ্যতা পুনরুদ্ধারের জন্য বছরের পর বছর ধরে চেষ্টা করছে। ইরান আগ্রাসনকে কেন্দ্র করে একটি দীর্ঘস্থায়ী আঞ্চলিক যুদ্ধ তুরস্কের সেই চেষ্টাকে হুমকির মুখে ফেলেছে। জ্বালানির মূল্যে ঊর্ধ্বগতি, পরিবহন ব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলা, বীমার খরচ এবং হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে অনিশ্চয়তা তুরস্কের মতো জ্বালানি আমদানিকারী দেশের অর্থনীতির ওপর গুরুতর চাপ সৃষ্টি করেছে।

তৃতীয় কারণটি একই সঙ্গে মানবিক ও ভূ-রাজনৈতিক। তুরস্ক এখনো ইরান থেকে আসা ব্যাপক শরণার্থী সংকটের মুখোমুখি হয়নি, কিন্তু আঙ্কারা পুরোপুরি সচেতন যে, ইরানের রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার পতন লাখ লাখ মানুষের স্থানচ্যুতির চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে। যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে ইরানের লাখ লাখ মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য তুরস্কে যেতে পারে।

এছাড়া এই যুদ্ধ এরই মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সামরিক সংঘাতের সীমা অতিক্রম করেছে। উপসাগরীয় দেশগুলো সরাসরি ইরানের হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হওয়ায় এবং হরমুজ প্রণালির মতো সামুদ্রিক সংকীর্ণ পথগুলো কৌশলগত অস্ত্রে রূপান্তরিত হওয়ায় যুদ্ধটি আঞ্চলিক শৃঙ্খলার ভবিষ্যৎ কাঠামো নিয়ে সংকট তৈরি করতে পারে।

কৌশলগত সুবিধা বজায় রাখা

এ কারণেই আঙ্কারার নীতিকে কৌশলগত দৃষ্টিকোণ থেকে বুঝতে হবে। তুরস্ক শুধু যুদ্ধ থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করছে না, তারা তিনটি পরস্পর সম্পর্কিত উদ্দেশ্যও অনুসরণ করছে।

প্রথম উদ্দেশ্যটি হলো যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া থেকে দূরে থাকা। আঙ্কারা বোঝে যে, একবার যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লে তারা তাদের কূটনৈতিক অস্ত্র ব্যবহারের পথটিও হারাবে। আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তুরস্ক তখন নিজেকে এমন একটি সংঘাতে জড়িয়ে ফেলবে, যার রাজনৈতিক পরিসমাপ্তির পথ এখনো অনিশ্চিত।

দ্বিতীয় উদ্দেশ্য হলো—উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের সক্রিয় সহযোদ্ধা হিসেবে যুদ্ধে পূর্ণ অংশগ্রহণ ঠেকানো। একবার এসব দেশ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লে সংঘাতটি তখন আর ইরানকেন্দ্রিক একটি সীমিত যুদ্ধ থাকবে না, বরং মধ্যপ্রাচ্যে একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নেবে, যা তুরস্কের জন্য বড় কৌশলগত সংকট তৈরি করবে। তখন এই যুদ্ধ আর কূটনীতির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। এর ফলে আরো বড় ধরনের সামরিক জোট তৈরি হবে, বৃহৎ শক্তিগুলোর হস্তক্ষেপ বাড়বে এবং আঞ্চলিক রাজনীতির সামরিকীকরণ ত্বরান্বিত হবে।

তৃতীয় উদ্দেশ্য হলো—পাকিস্তান, মিসর ও সৌদি আরবের সঙ্গে একটি কার্যকর মধ্যস্থতা কাঠামো বজায় রাখা, যাতে যুদ্ধের গতি তীব্র হলেও কূটনৈতিক সমাধানের পথ খোলা থাকে। এটি আঙ্কারার কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কারণ এই মাত্রার যুদ্ধ খুব কমই এক পক্ষের সিদ্ধান্তে শেষ হয়। এ ধরনের যুদ্ধ তখনই শেষ হয়, যখন সামরিক ক্লান্তি রাজনৈতিক আলোচনার জায়গা তৈরি করতে শুরু করে।

তুরস্ক উপসাগরীয় অঞ্চলের কৌশলগত সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ নির্ধারণ করতে না পারলেও কূটনৈতিক অচলাবস্থা তৈরি রোধে সাহায্য করতে পারে। এ ধরনের যুদ্ধে সেই ভূমিকাটি কোনোভাবেই গৌণ নয়। এ কারণেই তুরস্ক সংঘাত বৃদ্ধির জন্য ইসরাইলের বৃহত্তর সামরিক লক্ষ্যকে দায়ী করেছে এবং একই সঙ্গে উপসাগরীয় দেশগুলোতে ইরানের প্রতিশোধমূলক হামলার নিন্দা করেছে। সংঘাতের আরো ব্যাপ্তির বিরুদ্ধেও সতর্ক করেছে আঙ্কারা।

একটি বিষয় স্পষ্ট, নীতিহীন মধ্যস্থতাকারীর কোনো বিশ্বাসযোগ্যতা থাকে না। কূটনৈতিক নমনীয়তা ছাড়া নীতিবান কোনো পক্ষের কোনো প্রভাব থাকে না। তুরস্ক উভয়টিই ধরে রাখার চেষ্টা করছে। তুরস্কের এই দৃষ্টিভঙ্গিকে ভারসাম্য রক্ষা, ঝুঁকি এড়ানো বা অস্পষ্টতার ভাষায় ব্যাখ্যা করার একটি প্রবণতা দেখা যায়, যা মোটেই সঠিক নয়। তুরস্ক চলমান সংঘাত নিয়ে কৌশলগত সুবিধা লাভের জন্য কোনো চালবাজি করছে না; বরং প্রতিবেশী অঞ্চলে শুরু হওয়া যুদ্ধকে নতুন মধ্যপ্রাচ্যের মূল চালিকাশক্তি হয়ে ওঠা রোধ করার চেষ্টা করছে। এটি তুরস্কের জন্য অনেক বড় চ্যালেঞ্জ।

যুদ্ধের পর যুদ্ধ

তুরস্কের জন্য যুদ্ধোত্তর আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার পুনরুদ্ধার বর্তমান যুদ্ধের মতোই গুরুত্বপূর্ণ। আঙ্কারা যে কৌশলগত সমস্যার সম্মুখীন, তা শুধু এই সংঘাতের সমাপ্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়—যুদ্ধবিরতির পর এই অঞ্চলের রাজনৈতিক নিয়মকানুন, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং ক্ষমতার স্তরবিন্যাস কারা নির্ধারণ করবে, তার সঙ্গেও এই সমস্যা জড়িত। যদি যুদ্ধোত্তর পরিবেশ দুর্বল রাষ্ট্রীয় কাঠামো, স্বাভাবিক হয়ে ওঠা আন্তঃসীমান্ত হামলা, মিলিশিয়াদের ক্ষমতায়ন এবং অনির্দিষ্টকালের জন্য বহিরাগত শক্তির সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের মাধ্যমে সংজ্ঞায়িত হয়, তবে যুদ্ধ থেমে গেলেও সামগ্রিক পরিস্থিতি বিপজ্জনকই থাকবে। কেবল যুদ্ধবিরতি সেই সমস্যার সমাধান করবে না।

এ কারণেই তুরস্কের উদ্বেগ-উত্তেজনা প্রশমনের বাইরে পরবর্তী পদক্ষেপের রূপরেখা কী হবে, সে পর্যন্ত বিস্তৃত। তুরস্ক এমন একটি আঞ্চলিক ব্যবস্থা চায়, যেখানে সার্বভৌম রাষ্ট্রগুলো তাদের রাজনৈতিক কার্যকারিতা ফিরে পাবে, সীমান্ত নিরাপত্তা পুনরুদ্ধার হবে, প্রক্সি যুদ্ধ সীমিত থাকবে এবং মধ্যপ্রাচ্যকে নতুন রূপ দেওয়ার স্বীকৃত প্রক্রিয়া হিসেবে বাইরের ও আঞ্চলিক সামরিক হস্তক্ষেপ বন্ধ হবে।

এর জন্য এমন একটি কাঠামো প্রয়োজন, যেখানে উপসাগরীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা আঞ্চলিক সহাবস্থানের থেকে বিচ্ছিন্ন থাকবে না এবং ইরানের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা দেশটিকে বিভাজন থেকে রোধ করবে।

এ কারণেই ইরান যুদ্ধ তুরস্কের কাছে এমন একটি বিষয়, যা তারা উপেক্ষা করতে পারে না। কারণ এর সঙ্গে তুরস্কের নিরাপত্তা, অর্থনীতি এবং কূটনীতির স্বার্থ জড়িত রয়েছে। তাই আঙ্কারার কাজ হচ্ছে, চলমান যুদ্ধ যেন আরো বিস্তৃত হতে না পারে তা নিশ্চিত করা। এটাই তুরস্কের বর্তমান নীতির গভীর অর্থ।

ডেইলি সাবাহ অবলম্বনে মোতালেব জামালী

১৯৭৩-২০২৬ : তেল অস্ত্র এখনো কার্যকর

সরকার ও বিরোধী দলে যুদ্ধ কেন

পাঠ্যবইয়ে যেভাবে ফিরলেন শহীদ জিয়াউর রহমান

সিভিল সোসাইটি ও আমলাতন্ত্রের দ্বন্দ্ব

ভেনেজুয়েলাকে ৫১তম অঙ্গরাজ্য করার ইঙ্গিতের অর্থ কী

সংস্কার ইস্যুতে তালগোল ও রাবণ হওয়ার ঝুঁকি

প্লাস্টিকদূষণের কবলে বাংলাদেশ

গণভোট ও নৈতিক সংকট

ব্যাংক খাতে কেন নারী কর্মী কমছে

কেন এত যুদ্ধব্যয়