হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

ফ্যামিলি কার্ড কীভাবে কার্যকর করা যাবে

আমিনুল মোহায়মেন

ছবি: সংগৃহীত

নতুন সরকারের নির্বাচনি অঙ্গীকারের অন্যতম প্রধান ফোকাস ছিল ফ্যামিলি কার্ডের মতো সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি, যা সরকার দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম এক মাসের মধ্যেই সফলভাবে বাস্তবায়ন শুরু করেছে। ফ্যামিলি কার্ড এবং এ ধরনের কর্মসূচিগুলো শুধু জনতুষ্টিমূলক উদ্যোগ নয়, বরং এগুলো দেশের আর্থসামাজিক কাঠামোকে ভেতর থেকে শক্তিশালী করে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে খুবই কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে বাংলাদেশে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির অতীতের অভিজ্ঞতা স্বস্তিদায়ক নয়। বাংলাদেশ সরকার ও জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি কর্তৃক প্রকাশিত একটি রিপোর্টে বলা হয়েছে এসব কর্মসূচির ৬২ দশমিক ৮ শতাংশ উপকারভোগী দরিদ্রও না, কোনো ধরনের ঝুঁকিতেও নেই। এদিকে উপকারভোগীদের মাত্র ৬ দশমিক ৬ শতাংশ অতি দরিদ্র। আবার ৬৪ থেকে ৬৯ শতাংশ দরিদ্র পরিবার কোনো ধরনের সরকারি সুবিধা পায় না। (From Strategy to Impact : Assessment of Bangladesh’s Social Security Policy Support Programme)

তার মানে দেখা যাচ্ছে, দুই-তৃতীয়াংশ দরিদ্র জনগণ সরকারের এসব সহায়তা পায় না; যারা পাচ্ছে, তাদের দুই-তৃতীয়াংশ আবার দরিদ্র নয়। এসব ভাতার জন্য নিবন্ধনের ক্ষেত্রে দুর্নীতি ও রাজনৈতিক প্রভাবের বিষয় তো রয়েছেই। তাছাড়া বর্তমানে প্রদত্ত ভাতার পরিমাণ খুব কম হওয়ায় দারিদ্র্যবিমোচনে এগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। যেমন : বয়স্ক ভাতা বা বিধবা ভাতার পরিমাণ মাসে ৭০০ টাকা মাত্র। তাছাড়া এসব কর্মসূচির সংখ্যাও খুব বেশি, সেগুলোর বাস্তবায়ন ঘটে বিচ্ছিন্ন অবস্থায়। বর্তমান অর্থবছরে ৯৫টি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি/স্কিম রয়েছে। একই বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন মন্ত্রণালয় ভিন্ন ভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করায় তাদের মধ্যে সমন্বয় থাকে না। ফলে একই কাজ বারবার বিভিন্ন দপ্তর করায় জনগণের অর্থের অপচয় হয়।

বাংলাদেশের সামাজিক সুরক্ষাব্যবস্থার আরেকটি বড় দুর্বলতা হচ্ছে, সরকারি অর্থায়নের ওপর পুরোপুরি নির্ভরতা। নাগরিকরা কোনো ধরনের চাঁদা দিয়ে এতে অংশ নেন না। সামাজিক নিরাপত্তা খাতের পুরো অর্থই আসে রাজস্ব বাজেট বা জনগণের দেওয়া কর থেকে। বাজেটের প্রায় ১৫ শতাংশ চলে যায় সামাজিক সুরক্ষা খাতে। এর ফলে একদিকে রাজস্ব বাজেটের ওপর প্রচণ্ড চাপ পড়ে, আবার উপকারভোগীরা এগুলো দেখেন সরকারি সাহায্য হিসেবে, তাতে সাহায্যের ওপর নির্ভরতা বেড়ে যায়।

এই প্রেক্ষাপটে ফ্যামিলি কার্ড এই খাতকে আরো কার্যকর করার ক্ষেত্রে নতুন কিছু সুযোগ নিয়ে উপস্থিত হয়েছে। বাংলাদেশের দারিদ্র্যবিমোচন হচ্ছে মূলত পরিবারকেন্দ্রিক। ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে পরিবারকে কেন্দ্র করে এই সহায়তাগুলো পুনর্বিন্যস্ত করা সম্ভব। এতে এমন পরিস্থিতি এড়ানো যাবে, যেখানে কিছু পরিবার একাধিক সুবিধা পায় আর অন্যরা কিছুই পায় না। পাশাপাশি অসংখ্য বিচ্ছিন্ন কর্মসূচিকে কমসংখ্যক, আরো সুসংগঠিত কাঠামোয় আনার সুযোগ সৃষ্টি হবে।

ফ্যামিলি কার্ডের কারণে সংস্কারের এই সুযোগের পাশাপাশি একটি বড় চ্যালেঞ্জও হাজির হয়েছে। যেহেতু ফ্যামিলি কার্ডের ভাতার পরিমাণ অন্য কর্মসূচিগুলো থেকে তিন-চার গুণ, তাই ভুল ব্যক্তিকে ভাতা দেওয়া হলে অপচয়ের পরিমাণটাও হবে কয়েকগুণ বেশি।

এই পরিস্থিতিতে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিগুলো জনগণের ভাগ্য উন্নয়নে কার্যকরভাবে ব্যবহারের জন্য নিম্নবর্ণিত পরামর্শগুলো বাস্তবায়ন করা যেতে পারে—

১. ডেটাবেসের আন্তঃসংযোগের মাধ্যমে উপকারভোগীর আর্থসামাজিক অবস্থা যাচাই করা

ফ্যামিলি কার্ডের উপকারভোগী নির্বাচন প্রক্রিয়াকে এমনভাবে সাজাতে হবে, যাতে সবচেয়ে দরিদ্র জনগোষ্ঠীই এটি পেতে পারে। এ জন্য বর্তমানে প্রধানত প্রক্সি মিনস টেস্ট পদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে, যাকে সহজেই বোকা বানানো যায়। এই পদ্ধতিতে ভাতাভোগীকে অনেকগুলো প্রশ্ন করা হয় তার আর্থসামাজিক অবস্থা যাচাই করার জন্য। যেমন : ‘আপনার পরিবারের কারো মালিকানায় মোটরসাইকেল আছে কি না?’ বা ‘আপনার পরিবারের মালিকানাধীন ভূমির পরিমাণ কতটুকু?’ মানুষ সহজেই বুঝে যায় কোন উত্তরটি দিলে ভাতা পাওয়া যাবে এবং সেভাবেই উত্তর দিয়ে থাকে। ফলে এই পদ্ধতি একেবারেই কার্যকর নয়।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে উপকারভোগীর আর্থসামাজিক সামাজিক অবস্থা যাচাইয়ে সবচেয়ে কার্যকর এবং সাশ্রয়ী পথ হচ্ছে সরকারি সব প্রাসঙ্গিক তথ্যব্যবস্থার ডেটার সঙ্গে আন্তঃসংযোগের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে যাচাই করা। যেমন : ভূমির ডেটাবেস থেকে দেখা যে পরিবারের সদস্যদের জাতীয় পরিচয়পত্রের বিপরীতে কতটুকু সম্পত্তি রয়েছে, বিআরটিএ ডেটাবেস থেকে দেখা যে তারা কেউ গাড়ির মালিক কি না, বিদ্যুতের ডেটাবেস থেকে বোঝা যাবে তাদের বিদ্যুৎ ব্যবহার কেমন, সঞ্চয়পত্র ডেটাবেস থেকে জানা যাবে তাদের বড় ধরনের সঞ্চয় আছে কি না—টিআইএন ডেটাবেস বলে দেবে তাদের টিআইএন আছে কি না। আশার কথা, ইতোমধ্যে সরকার সিঙ্গেল রেজিস্ট্রি নামে একটি সফটওয়্যার তৈরি করেছে, যার সঙ্গে এসব ডেটাবেসের অধিকাংশ সংযুক্ত রয়েছে। ফলে সিঙ্গেল রেজিস্ট্রি ব্যবহার করে খুব সহজেই উপকারভোগীর আর্থসামাজিক অবস্থা যাচাই করা যায়। সফটওয়্যারের আন্তঃসংযোগের মাধ্যমে আর্থসামাজিক অবস্থা যাচাইয়ের বিষয়টি আবশ্যিকভাবে প্রতিটি কর্মসূচিতে বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।

২. জনসচেতনতা ও স্বচ্ছতা বৃদ্ধি করা

সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির উপকারভোগী নির্বাচনে অনিয়মের পেছনের অন্যতম প্রধান ফ্যাক্টর হচ্ছে, এ বিষয়ে জনসচেতনতার অভাব। সরকারের কী কী কর্মসূচি রয়েছে, সেগুলোর ভাতা কত, কারা পাবে, কীভাবে আবেদন করতে হবে—এ বিষয়ে তেমন কোনো প্রচার-প্রচারণা চোখে পড়ে না। অথচ বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খুব সহজেই এসব তথ্য জনগণকে জানানো যায়। সরকারের কোনো সুবিধা সম্পর্কে ব্যাপকভাবে জানাজানি হলে যথাযথ ব্যক্তিকে বাদ দিয়ে অনুপযুক্ত মানুষকে সেই সুবিধা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

৩. ধীরে ধীরে অবদানভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা চালু করা

কর্মহীন শ্রমিকদের ভাতা ও বয়স্ক ভাতার মতো কর্মসূচিগুলোয় ধীরে ধীরে অবদানভিত্তিক উপাদান যুক্ত করা উচিত। অর্থাৎ, জনগণ আগে থেকেই এই কর্মসূচিগুলোর জন্য নিবন্ধন করবে এবং মাসে মাসে চাঁদা জমা দেবে। এরপর শ্রমিক কর্মহীন হলে বা উপকারভোগী একটি বয়স পার হলে ভাতা পাবেন। সে ক্ষেত্রে প্রদত্ত সুবিধার একটি অংশ সরকার দিতে পারে। অংশগ্রহণমূলক কর্মসূচিগুলো সমাজের সব শ্রেণিপেশার মানুষের জন্যই উন্মুক্ত করা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে বর্তমান কর্মসূচিগুলো চালিয়ে যেতে হবে এবং পাশাপাশি তাদের অংশগ্রহণমূলক ভার্সন শুরু করতে হবে।

৪. স্বাস্থ্যবীমাভিত্তিক সুরক্ষার দিকে অগ্রসর হওয়া

নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারের জন্য সবচেয়ে বড় আর্থিক ধাক্কা আসে স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সংকট থেকে। হৃদরোগ, স্ট্রোক ও ক্যানসারের মতো রোগ এখন ঘরে ঘরে দেখা যাচ্ছে। এসব রোগের কবলে একবার যারা পড়ে, তারা সর্বস্বান্ত হয়ে যায়। বর্তমানে এই রোগীদের আর্থিক সহায়তা দেওয়ার জন্য একটি কর্মসূচি রয়েছে, যাতে বছরে ৬০,০০০ রোগীকে ৫০,০০০.০০ টাকা হিসেবে এককালীন ভাতা দেওয়া হয়। এই ভাতার অর্থ, উপকারভোগীর পরিমাণ কোনো কিছুই পর্যাপ্ত নয়। এভাবে বিচ্ছিন্নভাবে ভাতা না দিয়ে নাগরিকদের স্বাস্থ্যবীমার আওতায় আনা হলে বেশি ফল পাওয়া যাবে। তাছাড়া স্বাস্থ্যসেবার আর্থিক সহায়তা সরাসরি উপকারভোগীদের না দিয়ে সেবাদাতাদের কাছে দেওয়া উচিত। স্বাস্থ্যবীমা কর্মসূচির মাধ্যমে হাসপাতালগুলোকে সরাসরি অর্থ পরিশোধ করা যেতে পারে, যা জবাবদিহি এবং সেবার মান নিশ্চিত করবে। স্বাস্থ্যবীমার আওতাভুক্ত হাসপাতালগুলোয় শক্তিশালী ও আন্তঃসংযুক্ত ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম (MIS) ব্যবহার করতে হবে, তাহলে বীমার অর্থ নিয়ে নয়ছয় রোধ করা যাবে।

৫. সর্বজনীন ইউনিক আইডি চালু

ফ্যামিলি কার্ডকে সফলভাবে বাস্তবায়নের জন্য ফ্যামিলি বা পরিবারকে সঠিকভাবে চিহ্নিত করা অত্যন্ত জরুরি।

বর্তমানে বাংলাদেশে দুটি নাগরিক পরিচয়ব্যবস্থা রয়েছে—একটি হচ্ছে জন্মনিবন্ধন নম্বর, আরেকটি জাতীয় পরিচয়পত্র। ব্যাংক হিসাব, আয়কর, জমি বা গাড়ির রেজিস্ট্রেশন ইত্যাদিতে জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহৃত হয়। অথচ জাতীয় পরিচয়পত্র শুধু আঠারো বছরের বেশি বয়সের নাগরিকরা পেতে পারে। ফলে একটি কার্যকর ফ্যামিলি ট্রি ডেটাবেস তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে না। এই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে ২০২৩ সালে একটি ইউনিক আইডি ব্যবস্থা চালুর জন্য আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। এর আওতায় জন্মনিবন্ধনের সময় প্রতিটি নাগরিককে একটি ইউনিক আইডি দেওয়া হবে, যা জাতীয় পরিচয়পত্রের আদলে গড়ে তোলা হবে। প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে বিদ্যমান এনআইডিই ইউনিক আইডি হিসেবে ব্যবহৃত হবে। এই ইউনিক আইডি ব্যবস্থার দ্রুত বাস্তবায়ন পারিবারিক শনাক্তকরণকে শক্তিশালী করবে এবং পারিবারিক কার্ডের মতো কর্মসূচির কার্যকারিতা বাড়াবে।

৬. অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা জোরদার করা

সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিকে অনিয়মমুক্ত করতে এবং এর সুবিধা যথাযথ ব্যক্তির কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য সরকারের অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থাকে দ্রুত কার্যকর করতে হবে। যখন অধিকাংশ মানুষ এসব সেবা সম্পর্কে অভিযোগ জানাতে পারবে এবং অভিযোগ ও তার প্রতিকারের বিষয়টি উন্মুক্তভাবে জনগণ জানতে পারবে, তখন অনিয়ম ও ভুল অনেকটাই কমে যাবে। যেমন : কোনো এলাকার ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচিতে যদি হকদার মানুষ না পেয়ে সচ্ছল কেউ পান, তাহলে কেউ না কেউ বিষয়গুলো এই ব্যবস্থার মাধ্যমে সরকারকে জানাবেন। জনগণ, সাংবাদিক, সিভিল সোসাইটি দেখতে পাবে কোন বিষয়ে কতটি অনিয়ম হয়েছে। এর ফলে অনিয়মগুলো দ্রুত দূর করার ব্যবস্থা নেওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হবে।

ফ্যামিলি কার্ড উদ্যোগটি বাংলাদেশের সামাজিক সুরক্ষাব্যবস্থাকে সংস্কারের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ এনে দিয়েছে। উপকারিভোগী নির্বাচন পদ্ধতি উন্নত করা, সমন্বয় বৃদ্ধি, স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ এবং ধীরে ধীরে কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে এসব কর্মসূচি স্বল্পমেয়াদি সহায়তার গণ্ডি পেরিয়ে টেকসই দারিদ্র্য হ্রাস ও সামাজিক-অর্থনৈতিক রূপান্তরের শক্তিশালী হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।

শিক্ষকের মর্যাদা ও লাঞ্ছিত শৈশব

আধুনিক সমাজ বিনির্মাণে ইসলামি অনুশাসন

তেহরানের হুলের জ্বালায় যুক্তরাষ্ট্র

বিস্মৃতির অন্তরালে ‘বাংলার বাঘ’

ট্রাম্প এবং শি আসলে কী অর্জন করলেন

ঢাকায় অপরাধপ্রবণতা

রাজনৈতিক আক্রমণের ভাষা ও মনস্তত্ত্ব

রাষ্ট্রপতির চিকিৎসাবিলাস ও বেহাল স্বাস্থ্য খাত

ফারাক্কার প্রভাবে ব্রিজের নিচে নদী নেই!

পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ঝড় ও বাংলাদেশ