নতুন বাংলাদেশ নির্মাণের উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে সামনে রেখে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের অধিবেশন গত ১২ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হয়েছে। অতীতের তিক্ত ইতিহাস পেছনে ফেলে বর্তমান সংসদ ঘিরে মানুষের স্বপ্নগুলো যেন আকাশছোঁয়া হয়ে উঠেছে; যদিও আমাদের স্বাধীনতার পর ১২টি জাতীয় সংসদের মধ্যে সাতটি সংসদ মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেনি। এছাড়া তিন পর্বের বৈপ্লবিক পরিবর্তনের পর বিএনপির ক্ষমতাসীন হওয়ার তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা দলটিকে কঠিন পরীক্ষায় উপনীত করেছে।
এখন প্রথমেই সংসদের মেয়াদ পূর্ণ না হওয়ার বিষয়ে আলোচনা করা যাক। এ এক বিষাদময় অভিজ্ঞতা। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত টানা ছয়টি জাতীয় সংসদের কোনোটিই মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেনি। এছাড়া রয়েছে ২০২৪ সালের সংসদের মেয়াদ পূর্ণ না হওয়ার ঘটনা। সব মিলিয়ে স্বাধীনতার বিগত ৫৫ বছরের ইতিহাসে ১২টি সংসদের মধ্যে সাতটি সংসদেরই মেয়াদ অপূর্ণ থেকে গেছে। অন্যদিকে ২০০৭ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ১৭ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনের যে বেদনাদায়ক ইতিহাস দেশবাসী প্রত্যক্ষ করেছে, তা সাধারণ মানুষের স্বপ্নগুলো ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে।
অর্থাৎ স্বাধীনতার পর একদিকে যেমন টানা ২৫ বছর ধরে প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ, পঞ্চম ও ষষ্ঠ সংসদের মেয়াদ পূর্ণ না হওয়ার পাশাপাশি দ্বাদশ সংসদে এ দেশের মানুষের গণতান্ত্রিক চেতনার প্রায় মৃত্যু ঘটেছিল। মাত্র সপ্তম, অষ্টম, নবম, দশম ও একাদশ সংসদ পাঁচ বছরের মেয়াদ পূর্ণ করতে সক্ষম হয়েছিল। তবে এর মধ্যে আবার অষ্টম, নবম, দশম ও একাদশ সংসদ ছিল চরম বিতর্কিত ও একপেশে, যা সত্যিকার অর্থে জনগণের অংশগ্রহণমূলক ছিল না। কিন্তু এমন তো কথা ছিল না; কারণ পৃথিবীর ইতিহাসে কেবল বাংলাদেশের মানুষই শুধু গণতন্ত্রের জন্য রক্তাক্ত যুদ্ধের মাধ্যমে একটি দেশ স্বাধীন করেছে।
অর্থাৎ যে জাতি গণতন্ত্রের জন্য যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছে, সেই জাতিকেই শুরু থেকেই স্বৈরতান্ত্রিক ও ফ্যাসিবাদী শাসনের জাঁতাকলে পিষ্ট হতে হয়েছে। আবার অন্যদিকে যে জাতি পশ্চিম পাকিস্তানের ২২ পরিবারের শোষণ থেকে মুক্ত হতে অস্ত্র হাতে নিয়েছিল, সে জাতিই এখন ২২শ’ কিংবা তার চেয়েও অধিক পরিবারের লুণ্ঠনে রিক্ত ও সিক্ত—যাদের বলা হয় অলিগার্স, অর্থাৎ সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী দল, যারা ছিল আওয়ামী শাসনামলে লাখ লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচারের মাধ্যম। আবার যে জাতি স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় সুদৃঢ় ঐক্যের ইতিহাস গড়েছিল, সেই জাতি আজ নানাভাবে বিভক্ত হয়ে পড়েছে, যা একটি স্বাধীন দেশের জন্য দুর্ভাগ্য ছাড়া আর কিছুই নয়।
ঠিক এরকম একটা পটভূমিতে বর্তমান সংসদ জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন করতে কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখবে, সেটা নিয়ে এরই মধ্যে জল্পনাকল্পনা শুরু হয়েছে। আর এটা সত্য, অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতার কারণে এ দেশের মানুষ সবসময় আশা-নিরাশার দোদুল্যমানতায় ভুগতে থাকে। অতীতের দিকে ফিরে তাকালে দেখা যাবে, কীভাবে এ দেশে বারবার গণতন্ত্র বিপর্যস্ত হয়েছে। এর ফলে স্বাধীনতার পর থেকে সাতটি সংসদ কোনো মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেনি। যেমন প্রথম জাতীয় সংসদের কথাই ধরুন। সংবিধান অনুযায়ী, ১৯৭৩ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত প্রথম জাতীয় সংসদের মেয়াদ ছিল দুই বছর আট মাস।
দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ স্থায়ী হয়েছিল দুই বছর ১১ মাস। তৃতীয়টা ১৭ মাস, চতুর্থ সংসদ দুই বছর সাত মাস, পঞ্চমটা চার বছর আট মাস, ষষ্ঠ সংসদ ১২ দিন ও দ্বাদশ সংসদ ছয় মাস সাত দিন স্থায়ী হয়েছিল।
এদিকে যে পাঁচটি সংসদ মেয়াদ পূর্ণ করেছিল তার মধ্যে দুটি স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শেষ হয়েছে। যেমন শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সপ্তম জাতীয় সংসদ এবং দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে অষ্টম জাতীয় সংসদ। কিন্তু নবম, দশম ও একাদশ জাতীয় সংসদ ছিল চরম বিতর্কিত, একতরফা ও ফ্যাসিবাদী শাসনের আঁতুড়ঘর। এর থেকে বোঝা যাচ্ছে, স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের বিগত ৫৫ বছরের রাজনৈতিক ইতিহাস কতটা বেদনাদায়ক ও হতাশাজনক ছিল।
তবে মাঝেমধ্যে যে আশার আলো জ্বলে ওঠেনি, তা নয়; কিন্তু সে আলো নিভে গেছে বারবার। তবে সবচেয়ে কৌতূহলোদ্দীপক ইতিহাস হচ্ছে, বাংলাদেশের এই দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসে তিনটি বড় পরিবর্তনের পর বিএনপি গুরুদায়িত্ব লাভ করেছে। প্রথম বড় পরিবর্তনের পর বিএনপি নামক দলটির জন্ম হয়েছে। পরবর্তী সময়ে আরো দুটি পরিবর্তনের পর জনগণ বিএনপিকে ক্ষমতাসীন করেছে। যেমন ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর বিএনপি নামক একটি নতুন রাজনৈতিক দল গঠিত হয়। আর ১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ২০৭টি আসনে বিজয়ী হয়ে একটা ঐতিহাসিক মোড়ে অবতীর্ণ হয়। কিন্তু খুব অল্পদিনের মধ্যেই জনগণের ভাগ্যাকাশে অমানিশা নেমে আসে। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্নে বিভোর হয়ে থাকা জনগণের ভাগ্যে অল্পদিনের মধ্যেই দুঃস্বপ্ন নেমে আসে। অর্থাৎ সেনাপ্রধান জেনারেল এরশাদ ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ ষড়যন্ত্রমূলক এক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বিএনপি সরকারকে উৎখাত করে।
আবার ছাত্র-জনতার তীব্র আন্দোলনের মুখে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর স্বৈরশাসক এরশাদ সরকারের পতন ঘটলে ১৯৯১ সালে একটি নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে বিজয়ী হয়ে বিএনপি সরকার গঠন করেছিল। ঠিক একইভাবে ছাত্র-জনতার রক্তাক্ত জুলাই বিপ্লবের পর আবারও সেই বিএনপি বিপুলভাবে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করেছে। গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে যেকোনো স্বৈর বা ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসানের পর নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে বিএনপির ক্ষমতাসীন হওয়ার তাৎপর্য যদি এবার বিএনপি নেতৃবৃন্দ বুঝতে না পারেন, তাহলে অমানিশার ঘোর অন্ধকারে এই জাতি পতিত হবে আবার।
এখানে উল্লেখ করতে হয়, বাংলাদেশে গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে চমৎকার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল ১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদে। কারণ এই সংসদেই সরকার ও বিরোধী দল উভয়ই ঐক্যবদ্ধ হয়ে সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি পদ্ধতি থেকে আবার সংসদীয় পদ্ধতিতে ফিরে গিয়েছিল। সেদিন দ্বাদশ সংশোধনী গৃহীত হওয়ার পর উভয়পক্ষ যে আনন্দ প্রকাশ করেছিল, তা ছিল নজিরবিহীন। সবাই ভেবেছিল, এবার বুঝি সত্যিকার অর্থে একটা গণতন্ত্রের চর্চা দেশবাসী দেখতে পাবে। কিন্তু খুব তাড়াতাড়ি স্বপ্নভঙ্গ হয়ে গেল। কারণ অচিরেই বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনা ঝাঁকি দিয়ে গণতন্ত্র শেখানোর যে পন্থা অবলম্বন করেছিলেন, তা দেশকে আবার আন্দোলনের দিকে নিয়ে যায়।
একপর্যায়ে ১৯৯৪ সালে একটি উপনির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ তুলে বিরোধী দল আওয়ামী লীগসহ অন্যান্য বিরোধী দল সংসদ বর্জন করা শুরু করে। এই প্রক্রিয়ায় ওই বছরের ডিসেম্বর মাসে প্রধান বিরোধী দলসহ সব বিরোধী দলের ১৪৭ জন সংসদ সদস্য একযোগে পদত্যাগ করলে সংসদ অকার্যকর হয়ে পড়ে। এই অবস্থায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার পরামর্শে রাষ্ট্রপতি সংসদ ভেঙে দেন। এর ফলে চার মাস বাকি থাকতেই সংসদ ভেঙে যায়। বিরোধী দলের একগুঁয়েমির ফলে গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার চমৎকার সুযোগ অকালেই নষ্ট হয়ে যায়।
আমাদের সাংবিধানিক রাজনীতির ভাঙাগড়ার ইতিহাসে বেশ কিছু স্মরণীয় স্মৃতিও আছে। যেমন ১৯৭৯ সালের দ্বিতীয় সংসদটি ছিল সবচেয়ে আলোকিত সংসদ। এ ধরনের সংসদ হয়তো বাংলাদেশে আর কখনো আসবে না। সেই সংসদে মেধা ও অভিজ্ঞতার এক অসাধারণ সম্মিলন ঘটেছিল। শাহ আজিজ ছিলেন প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা। বিরোধীদলীয় নেতা ছিলেন আওয়ামী লীগের অভিজ্ঞ পার্লামেন্টারিয়ান আসাদুজ্জামান খান। ছিলেন অসাধারণ বাগ্মী ও সংসদ বিশারদ খান এ সবুর। মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে সদস্যরা তার ভাষণ শুনতেন। সাদা চুলের ন্যাপের মহিউদ্দিন আহমেদের কথাও ভুলে যাওয়ার নয়। বলা যায়, একঝাঁক তারকা সংসদ বিশারদ সেই সংসদে ছিলেন।
সে সংসদ যেমন হাস্যরসে ভরপুর ছিল, তেমনি বিভিন্ন দেশের সংবিধান নিয়ে পাণ্ডিত্যপূর্ণ আলোচনা হতো। শাহ আজিজুর রহমান কথায় কথায় বিভিন্ন দেশের সংবিধানের উদ্ধৃতি দিতেন অবলীলাক্রমে। তখন সংসদ অধিবেশন বসত তেজগাঁওয়ে পুরোনো সংসদ ভবনে। সেটা এখন প্রধানমন্ত্রীর সচিবালয়। ১৯৮০ সালে আমি সাংবাদিক হিসেবে বেশ কয়েকবার ওখানে গিয়েছি। দ্বিতীয় সংসদের শেষ অধিবেশনটি বসেছিল শেরেবাংলা নগরে নির্মিত নতুন সংসদ ভবনে।
অবশেষে বলা যায়, বেদনাদায়ক একটা রাজনৈতিক ইতিহাসের পটভূমিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের কাঁধে এসে পড়েছে নতুন বাংলাদেশ গড়ার গুরুদায়িত্ব। তৃতীয়বারের মতো বিপ্লবের পর আবারও বিএনপির এই ক্ষমতাসীন হওয়ার তাৎপর্য যদি বিএনপি নেতৃবৃন্দ বুঝতে অক্ষম হন, কিংবা ব্যর্থ হয়ে যান, তাহলে কার্যত বাংলাদেশ ব্যর্থ হয়ে যাবে। সুতরাং সংসদকে কার্যকর করার মূল ভূমিকা পালন করতে হবে সরকারি দলকেই।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক