গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দেড় দশক পর নির্বাচিত সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের পরও দেশে এক ধরনের নীরব অস্থিরতা চলছে। জুলাই সনদের বাস্তবায়ন নিয়ে একদিকে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অবিশ্বাস তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে ইরান যুদ্ধের প্রভাব সমাজ ও অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে যাচ্ছে। চৌদ্দ শতাধিক মানুষের আত্মত্যাগের বিনিময়ে নিপীড়নমূলক শাসনের অবসান ঘটালেও দেশে যেন স্বস্তি ফিরে আসছে না। জনগণের অধিকার হরণকারী রাজনৈতিক দুর্বৃত্তদের অনেকে দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছে, আবার কেউ বিচারের মুখোমুখি। এখন দেশের মানুষের প্রধান চাওয়া হলো জাতীয় ঐক্যের ভিত্তিতে রাজনীতিতে যাতে গুণগত পরিবর্তন আসে। রাজনৈতিক দলগুলো মানুষের এই আকাঙ্ক্ষা কতটা পূরণ করতে পারবে, তা নিয়ে সংশয় থাকলেও আশাবাদী হওয়ার মতো নানা দিক আছে।
সত্যিকার অর্থে দেশের সংসদীয় রাজনীতিতে শুরু হয়েছে নতুন এক অভিযাত্রা। সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী যেমন এবার প্রথম নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে সংসদে এসেছেন, তেমনি বিরোধী দলের নেতাও প্রথমবার সংসদে এসেছেন। এবারের সংসদে বেশির ভাগ সদস্য প্রথমবারের মতো নির্বাচিত হয়েছেন। এই তরুণ সংসদ সদস্যরা শুধু নিজেদের নির্বাচনি এলাকা নয়, সামগ্রিকভাবে দেশের চিত্র বদলে দিতে পারেন।
ক্ষমতাসীন দল সংসদে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও সংসদে ৭৮ জন বিরোধী দলের সদস্য রয়েছেন। একমাত্র সপ্তম সংসদে ১১৬ আসন নিয়ে বিএনপি বিরোধী দল ছিল। এমনকি ১৯৮৬ সালে এরশাদের পাতানো নির্বাচনে বিরোধী দল আওয়ামী লীগ ৭৬ আসনে বিজয়ী হয়েছিল। অন্য সংসদগুলোতে এতসংখ্যক বিরোধীদলীয় সদস্যের উপস্থিতি ছিল না। ফলে এবারের সংসদে শক্তিশালী বিরোধী দলের উপস্থিতি রয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই সংসদের কার্যক্রমের দিকে মানুষের আগ্রহ রয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় গণমাধ্যমগুলো সংসদের কার্যক্রম প্রচার করছে। সেখানে আমরা দেখছি, মানুষ আগ্রহের সঙ্গে সংসদ সদস্যদের বক্তব্য শুনছেন।
সংসদ হলো এমন এক মঞ্চ, যেখানে বিতর্ক ও আলোচনার মাধ্যমে জনমতের প্রতিফলন ঘটে। এটি একদিকে যেমন সরকারকে কাজ করার শক্তি জোগায়, অন্যদিকে সরকারের ওপর নজরদারি করে ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখে। সংসদীয় পদ্ধতিতে নির্বাহী বিভাগ (প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভা) তাদের কাজের জন্য সংসদের কাছে দায়বদ্ধ থাকে। সংসদ সদস্যদের বিভিন্ন প্রশ্ন, আলোচনা এবং ‘অনাস্থা প্রস্তাব’-এর মাধ্যমে সরকারকে নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। এতে সরকারের স্বৈরাচারী হয়ে ওঠার সুযোগ কমে যায়।
দুর্ভাগ্যজনক দিক হলো, আমাদের সংসদীয় রাজনীতির ইতিহাস সুখকর নয়। স্বাধীনতার পর সংসদীয় রাজনীতির সম্ভাবনাকে একদলীয় শাসনব্যবস্থা কায়েমের মাধ্যমে শুরুতেই ক্ষুণ্ণ করেছিলেন স্বয়ং শেখ মুজিবুর রহমান। রাষ্ট্রপতি-শাসিত সরকারব্যবস্থার মধ্য থেকে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বিরোধী দলের রাজনীতি শুধু ফিরিয়ে আনেননি, ১৯৭৯ সালের সংসদে আমরা প্রথম বহুদলীয় বৈচিত্র্যময় উপস্থিতি দেখেছি। জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে বহুদলীয় রাজনীতির সম্ভাবনাময় গতিপথ লাইনচ্যুত হয়েছিল।
বন্দুকের নলের মুখে ক্ষমতা দখলের পর ১৯৮৬ সালে এরশাদ জাতীয় সংসদ নির্বাচন করেছিলেন। প্রধান বিরোধী দল বিএনপির বর্জনের মধ্য দিয়ে যে সংসদ গঠিত হয়েছিল, তাও মেয়াদ পূরণ করতে পারেনি। এরশাদের পতনের পর ১৯৯১ সালে পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে সংসদীয় গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু হয়েছিল। কিন্তু ১৯৯৩ সালে আবার সংসদ বর্জনের রাজনীতি শুরু হয়। পরবর্তী সংসদগুলোতেও আমরা একই ধারাবাহিকতা দেখেছি।
সংসদের মেয়াদ পূরণ না করে রাজপথের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে নির্বাচন হয়েছে। এসব নির্বাচনে কোনো একপক্ষ বিজয়ী হলেও সংঘাত ও সহিংসতার কারণে রাজনীতিবিদদের ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা কমতে থাকে। এর ভয়ংকর পরিণতি হিসেবে দেশের রাজনীতিতে বিদেশি হস্তক্ষেপ ও বন্দুকের নলের প্রভাব বেড়ে যায়। অলিগার্ক ব্যবসায়ী ও দুর্নীতিবাজ আমলাতন্ত্র রাজনীতিবিদদের চেয়েও ক্ষমতাশালী হয়ে ওঠে। এই চক্র ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দেশে ফ্যাসিবাদী শাসনের ভিত রচনা করেছিল। এরপর আমরা দেখেছি, জনগণের ভোটের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তনের ধারণা বদলে যায়। পরপর তিনটি নির্বাচন হয়েছে জনগণের অংশগ্রহণ ছাড়া। এমনকি দিনের ভোট রাতে হওয়ার অবিশ্বাস্য ঘটনাও ঘটেছে।
এখন প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কি আবার ৫০ বছরের সেই পুরোনো রাজনীতির ধারায় ফিরে যাবে, নাকি ভবিষ্যৎমুখী রাজনীতির নতুন ধারা সূচিত হবে? সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের রাজনীতি এখন একটি বড় রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। চব্বিশের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান এবং সাম্প্রতিক নির্বাচনের পর রাজনীতিতে নতুন ধারার এক প্রবল সম্ভাবনা ও বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। গত কয়েক দশকের প্রথাগত দ্বিমেরু রাজনীতির কাঠামো ভেঙে এখন বহুমুখী এবং সংস্কারমুখী রাজনীতির আলোচনা শুরু হয়েছে। ক্ষমতাসীন দলের নেতারা স্বীকার করুক বা না-করুক, রাজনীতিতে এখন আদর্শিক লড়াইয়ের চেয়ে ‘সংস্কার’ বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সামনের দিনগুলোয় ক্ষমতাসীন দলকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে। বিএনপির সঙ্গে বিরোধী রাজনৈতিক দল ও সামাজিক নানা পক্ষের মধ্যে সংস্কার প্রশ্নে আদর্শিক দ্বন্দ্ব দেখা যেতে পারে। প্রতিশোধের রাজনীতি বন্ধ করে জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার প্রধান দায়িত্ব পড়বে ক্ষমতাসীন দলের ওপর। এছাড়া অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় নতুন নেতৃত্বের সক্ষমতা প্রমাণের বিষয় তো আছেই।
রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের মানুষ রাজনীতিতে পরিবর্তন দেখতে চায়। সেই পরিবর্তনের আলোচনা হতে হবে সংসদে। বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি যাতে সংসদের ভেতরে থাকে, তা নিশ্চিত করতে হবে ক্ষমতাসীনদের। তারা যদি তা করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে বাংলাদেশকে গভীর সংকটের দিকে নিয়ে যাবে। আমরা যেন ভুলে না যাই, অতীতে সংসদ থেকে বিরোধী দল যখন রাজপথে চলে গেছে, তখন রাজনীতির খেলার মাঠে দেশি-বিদেশি নানা পক্ষ সক্রিয় হয়ে উঠেছে। এই অদৃশ্য শক্তির মূল লক্ষ্য হলো সরকারকে দুর্বল করা, যাতে তাদের স্বার্থ রক্ষা করা সম্ভব হয়। দুই পক্ষ যখন প্রান্তিক অবস্থানে চলে যায়, তখন সংঘাত অনিবার্য হয়ে ওঠে। বিদেশি শক্তিও সেই সুযোগ গ্রহণ করে।
বিগত সময়ে আমরা দেখেছি, পরস্পরবিরোধী আঞ্চলিক শক্তিধর দেশগুলো ফ্যাসিবাদী শাসকদের জোরালো সমর্থন দিয়ে গেছে। হাসিনার নিপীড়নমূলক শাসন কায়েমে তাদের ভূমিকা কোনো অংশে কম ছিল না। হাসিনার পতন ও পলায়নের পর তারা নতুন শক্তির সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করেছে। কিন্তু দেড় দশকে দেশের যে ক্ষতি হয়েছে, তা কখনোই পূরণ হওয়ার নয়। বর্তমান ক্ষমতাসীনদের মনে রাখতে হবে, সংখ্যাগরিষ্ঠতা কিংবা সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার বয়ান যেন ক্ষমতার একমাত্র উৎস না হয়; বরং জনআকাঙ্ক্ষার দিকে তাদের নজর দিতে হবে।
খুব বেশি দিন আগের কথা নয়, শেখ হাসিনা প্রকাশ্য সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, তার চাই ‘পাওয়ার’। সেই পাওয়ার বা ক্ষমতার প্রয়োগ আমরা দেখেছি। হাসিনার দেড় দশকের শাসনে বিরোধী দলের ওপর শুধু নিপীড়ন চলেনি, বিরোধী দলের নেতাদের চরিত্রহননও নিয়মিত বিষয়ে পরিণত হয়েছিল। বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে সব ধরনের আলোচনার পথ রুদ্ধ করা হয়েছিল। বিরোধীদলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াসহ বহু বিরোধীদলীয় নেতার ওপর আক্রমণ পারিবারিক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। এমনকি রাজনৈতিক নেতাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার পর জানাজা পর্যন্ত করতে দেওয়া হয়নি। লাশবাহী গাড়ি আটকে রেখে লাশের অবমাননা পর্যন্ত করা হয়েছে। এমন বর্বর রাজনৈতিক কৌশল সাম্প্রতিক সময়ে খুব কম দেশেই দেখা গেছে।
আমরা আশাবাদী হতে চাই দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিবর্তন আসবে। ইতোমধ্যে আমরা তার কিছু আভাস দেখতে পাচ্ছি। সংসদ নেতা ও বিরোধী দলের নেতা একসঙ্গে বসছেন। সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানেও তারা একসঙ্গে অংশ নিচ্ছেন। দীর্ঘ সময় পর মানুষ এমন পরিবেশ দেখছে। সংসদে আমরা সব দলের সংসদ সদস্যদের প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়াকে শ্রদ্ধা জানাতে দেখছি। রাষ্ট্র পরিচালনায় তাদের ভূমিকা স্মরণ করা হচ্ছে। এগুলো সবই ইতিবাচক দিক। জাতির কাছে গ্রহণযোগ্য এই নেতাদের দেখানো পথ অনুসরণ করে জাতীয় ঐক্য গড়ে উঠতে পারে।
জুলাই সনদের বাস্তবায়ন নিয়ে দেশের রাজনীতিতে এক ধরনের অস্থিরতা ও পরস্পরের প্রতি সন্দেহ বা অবিশ্বাস আছে। ক্ষমতাসীন দলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারা জুলাই সনদ বাস্তবায়নে অঙ্গীকারবদ্ধ। অন্যদিকে, বিরোধী দল চায় এটি দ্রুত নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাস্তবায়ন করা হোক। জুলাই সনদ বাস্তবায়নে কিছু বিষয়ে দুই দলের মধ্যে পরস্পরবিরোধী অবস্থানও রয়েছে। আলোচনার মাধ্যমে এই বিরোধ কমিয়ে আনা সম্ভব। পারস্পরিক অবিশ্বাস যাতে না বাড়ে, সেদিকে ক্ষমতাসীন দলকে এগিয়ে আসতে হবে। কোন আইনগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করা হবে বা সংবিধান সংশোধন করতে হবে—এ বিষয়ে আলোচনা করে একটি রোডম্যাপ তৈরি করতে পারলে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জটিলতার বড় অংশ অবসান সম্ভব হবে। জুলাই সনদে মূলত ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা প্রতিফলিত হয়েছে। সেটি কোনো দলের পক্ষ থেকে অস্বীকার করা সম্ভব নয়।
আইনি মারপ্যাঁচ কিংবা সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার দোহাই দিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো অতীতে দেশকে গভীর সংকটের মুখে ফেলেছে। জুলাই সনদের বাস্তবায়ন নিয়ে যদি হতাশা তৈরি হয়, তা শেষ পর্যন্ত গভীর রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি করতে পারে। বাংলাদেশ এখন ঝুঁকিপূর্ণ সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি মোটেও ভালো নয়। ইরান যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব দেশের সমাজ ও অর্থনীতির ওপর পড়তে যাচ্ছে। এমন এক সংকটময় সময়ে রাজনৈতিক ঐক্য প্রয়োজন।
লেখক : সহযোগী সম্পাদক, আমার দেশ
alfaz@dailyamardesh.com