হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

মক্কা চুক্তি সম্প্রসারণ ও বাংলাদেশের ভূমিকা

নাজমুস সাকিব

গত ৭ অগাস্ট সৌদি আরবের মক্কায় সাক্ষরিত হয় মক্কা প্যাক্ট

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান গত সপ্তাহে জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন, মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির সদস্য দেশগুলো আমন্ত্রণ জানালে এতে যোগ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করবে ঢাকা। তার এই বক্তব্যের পর নয়াদিল্লিতে নিরাপত্তাসংক্রান্ত উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তবে ঢাকা জোর দিয়ে বলেছে, চুক্তিতে যোগ দেওয়ার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানানো হয়নি এবং এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ নির্ভর করবে চুক্তি স্বাক্ষরকারী দেশগুলোর ইচ্ছার ওপর।

এখানে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হলো, এই জোটে যোগ দিলে বাংলাদেশ কী অবদান রাখবে বা ভূমিকা কী হবে? সম্ভাব্য নতুন অন্য সদস্যদের তুলনায় বাংলাদেশ আঙ্কারা, ইসলামাবাদ ও রিয়াদের কাছে অনেক বেশি কিছু তুলে ধরার সক্ষমতা রাখে। ফলে জোটের সদস্যরা সে অনুযায়ী আলোচনা এগিয়ে নিতে পারে। এখানে মৌলিক বিষয়গুলো দিয়ে আলোচনা শুরু করা যেতে পারে। যেকোনো সামরিক জোট সবসময়ই যে সভ্যতার সংহতির বহিঃপ্রকাশ—তা কিন্তু নয়, বরং বিশৃঙ্খল আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় এগুলো মূলত নিরাপত্তা-সংক্রান্ত সেবা বা সক্ষমতার আদান-প্রদান (সরবরাহকারী ও ক্রেতার মধ্যকার লেনদেন) বলা যায়।

মক্কা জোটে বাংলাদেশের যোগ দেওয়ার আগ্রহের বিষয়টিও একইভাবে কৌশলগত ও উদ্দেশ্যমূলক হওয়া উচিত। এখানে প্রশ্ন হচ্ছে—বাংলাদেশ এমন কী দিতে পারে, যা জোটের প্রতিষ্ঠাতা তিনটি দেশ গ্রহণ করতে আগ্রহী হবে? পাশাপাশি, সদস্যপদ লাভের ফলে বাংলাদেশের নিজস্ব নিরাপত্তার ক্ষেত্রেই (হার্ড-সিকিউরিটি) বা কী সুবিধা অর্জিত হবে?

নিরাপত্তাসংক্রান্ত সংকট বা দ্বিধা নেই

দীর্ঘ সময় ধরে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে অবদান রাখা শীর্ষস্থানীয় দেশগুলোর একটি বাংলাদেশ। কয়েক দশকের প্রাতিষ্ঠানিক অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন মিশনে বাংলাদেশ কখনো কখনো প্রায় ৫,৫০০ থেকে ৭,০০০ ইউনিফর্মধারী সদস্য মোতায়েন করেছে। এর মাধ্যমে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমকে তার সামরিক বাহিনীর একটি বিশেষায়িত দক্ষতায় পরিণত করেছে বাংলাদেশ।

জটিল ও প্রতিকূল পরিবেশে কাজ করার মাধ্যমে বাংলাদেশের বাহিনীগুলো বিমান চলাচল (অ্যাভিয়েশন), জরুরি চিকিৎসাসেবা বা রোগী স্থানান্তর (মেডিকেল ইভাকুয়েশন) এবং প্রকৌশল কাজের মতো ক্ষেত্রে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে নিয়োজিত বাংলাদেশের একটি অ্যাভিয়েশন ইউনিট সৈন্য, সরঞ্জাম ও হতাহতদের পরিবহনের কাজে ৩৯,০০০ ঘণ্টারও বেশি সময় কোনো দুর্ঘটনা ছাড়াই সফলভাবে ফ্লাইট পরিচালনা করেছে।

জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়ন কমার ফলে বাংলাদেশের সেই আয় ও প্রশিক্ষণের সুযোগ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। তাই একই সক্ষমতা বজায় রাখার জন্য ঢাকার এখন বিকল্প কোনো পৃষ্ঠপোষক বা সহযোগীর প্রয়োজন। যদি এই চুক্তির আওতায় পর্যায়ক্রমিক বা ঘূর্ণায়মান বাহিনী, ঘাঁটির নিরাপত্তা রক্ষাকারী দল কিংবা যুদ্ধের সময়ে বাড়তি সৈন্য পাঠানোর ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়, তবে বাংলাদেশ তুলনামূলক কম ‘সুযোগ ব্যয়’ (অপরচ্যুনিটি কষ্ট) করার বিনিময়ে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সৈন্য বা জনবল দিয়ে সহায়তা করতে পারবে।

বাংলাদেশ এমন একটি ‘এক্সপিডিশনারি’ (অভিযান-ক্ষমতাসম্পন্ন) বা ‘স্ট্যান্ডবাই’ (প্রস্তুত) বাহিনী মোতায়েন করতে পারে, যার ফলে তাদের নিজস্ব প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় কার্যত কোনো নেতিবাচক প্রভাব বা সুযোগ ব্যয় ছাড়াই কাজ চালানো সম্ভব হবে। ঠিক এ ধরনের অসামঞ্জস্যপূর্ণ বা বিশেষায়িত (অ্যাসিমেট্রিক) অবদানই একটি দেশকে জোটের জন্য বোঝা না বানিয়ে বরং মূল্যবান অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।

জাতিসংঘের কার্যক্রমে যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণ কমিয়ে আনার পর বিত্তশালী সদস্য রাষ্ট্র সৌদি আরবের সঙ্গে যথাযথ আলোচনার মাধ্যমে বাংলাদেশ একটি সুবর্ণ সুযোগ কাজে লাগাতে পারে। এর ফলে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশন থেকে বাংলাদেশের সেনাসদস্যরা যে অর্থ পেয়ে থাকেন, তার বিকল্পব্যবস্থা দ্রুত গড়ে তোলা সম্ভব হতে পারে।

মক্কা চুক্তির সদস্য তিনটি দেশের কোনোটিই বঙ্গোপসাগরের তীরে অবস্থিত নয়; কিংবা মালাক্কা প্রণালির মতো কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ সংকীর্ণ নৌপথের কাছাকাছি তাদের কোনো অবস্থান নেই।

একটি জোটের ক্ষেত্রে বন্দরের উপস্থিতি মানেই হলো লজিস্টিকস বা রসদ সরবরাহ, প্রয়োজনীয় সামগ্রী সংগ্রহ, নজরদারি এবং চলাচলের সুবিধা। ভৌগোলিক নৈকট্য প্রতিপক্ষের গতিবিধি রোধ বা ‘ডিনায়াল ক্যাপাবিলিটি’ বাড়ানোর ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখতে পারে।

ঢাকার সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি আঙ্কারা ও ইসলামাবাদকে পূর্ব ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে লজিস্টিকস ও চলাচলের সুবিধা দেবে, যেমন—বন্দরে নোঙর করা, যৌথ প্রশিক্ষণ ও সম্ভাব্য পর্যায়ক্রমিক উপস্থিতির সুযোগ, যার জন্য কোনো আনুষ্ঠানিক সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের বিপুল ব্যয়ের প্রয়োজন পড়বে না।

এ অঞ্চলে ভারতের আধিপত্যের বিপরীতে একটি পরোক্ষ কৌশলগত ভারসাম্য বা ‘হেজ’ হিসেবে বিবেচিত এই চুক্তিটি প্রকৃত কৌশলগত গভীরতা দেবে। বিশেষ করে, ইসলামাবাদের জন্য এটি যুদ্ধের পরিস্থিতিতে তার প্রধান প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে একটি ‘পূর্ব রণাঙ্গন’ (ইস্টার্ন ফ্রন্ট) খোলার সুযোগ তৈরি করে দেবে। বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী আধুনিকীকরণের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এবং বাহিনীর আয়তনের তুলনায় প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের ঘাটতি রয়েছে।

তুরস্কের ড্রোন, স্থল-প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, নৌ-শিল্প এবং পাকিস্তানের ক্রমবর্ধমান যুদ্ধবিমান শিল্পের জন্য তাদের বর্তমান ক্রেতা-ভিত্তির বাইরে নতুন রপ্তানি বাজারের প্রয়োজন। ২০২৪ সালে নয়াদিল্লির সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েনের পর ঢাকা হঠাৎ করেই উপলব্ধি করে যে, তাদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বা অস্ত্রভান্ডারকে নতুন করে ঢেলে সাজানো প্রয়োজন। তুরস্ক ও পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম নির্মাতাদের জন্য বাংলাদেশ একটি বিশাল এবং স্থিতিশীল ক্রেতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, যেখানে কোনো শক্তিশালী দেশীয় প্রতিরক্ষা লবি বা স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর বাধা নেই। উপসাগরীয় বা মধ্য এশিয়ার অধিকাংশ বাজারের তুলনায় বাংলাদেশে পণ্য বিক্রি করা সহজ এবং এর মাধ্যমে আগামী এক দশক পারস্পরিক সামরিক সক্ষমতার সামঞ্জস্য নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

অর্থনৈতিক দিক বিবেচনায় সাহায্য বা বাণিজ্য-সংক্রান্ত আনুষ্ঠানিক বিবৃতির চেয়ে এখানে দুটি বিষয় অধিক গুরুত্বপূর্ণ। শ্রমশক্তিকে দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার, শুধু সৌদি আরবেই প্রায় ৩৫ লাখ বাংলাদেশি কর্মরত, যা দেশটিতে বসবাসরত অভিবাসীদের মধ্যে বৃহত্তম গোষ্ঠী, পাশাপাশি সৌদি আরব বাংলাদেশের রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়েরও বৃহত্তম উৎস। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশটি থেকে ৫ দশমিক ৮৫ বিলিয়ন ডলার আয় হয়েছে।

অর্থনৈতিক দিক থেকে বিবেচনা করলে, সহায়তা বা বাণিজ্য-সংক্রান্ত আনুষ্ঠানিক বিবৃতির চেয়ে দুটি বিষয় বা ‘লিভার’ (প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার) অধিক গুরুত্বপূর্ণ।

শ্রমশক্তিকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার

শুধু সৌদি আরবেই প্রায় ৩৫ লাখ বাংলাদেশি কর্মরত রয়েছেন, যা তাদের দেশটির বৃহত্তম প্রবাসী জনগোষ্ঠীতে পরিণত করেছে। পাশাপাশি, সৌদি আরব বাংলাদেশের রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়েরও প্রধান উৎস। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশটি থেকে ৫৮৫ কোটি (৫ দশমিক ৮৫ বিলিয়ন) ডলার আয় হয়েছে।

নিরাপত্তাবিষয়ক সম্পর্ক ঢাকার জন্য এমন এক অবস্থান তৈরি করে, যার মাধ্যমে তারা কোনো দরকষাকষির ক্ষমতা ছাড়া দ্বিপক্ষীয় অনুরোধ বা অনুনয়-বিনয়ের পরিবর্তে শ্রমিক কোটা, মজুরি সুরক্ষা এবং ভিসার নিশ্চয়তার মতো বিষয়গুলো আলোচনার প্যাকেজের অংশ হিসেবেই নিশ্চিত করতে পারে। এটি একটি জনমিতিক বাস্তবতাকে, অর্থাৎ সেখানে আগে থেকেই কর্মরত লাখ লাখ শ্রমিককে এমন এক দরকষাকষির হাতিয়ারে পরিণত করে, যা রাষ্ট্রগুলো সচরাচর ব্যবহারের সুযোগ পায় না।

বাংলাদেশের রপ্তানি খাত বর্তমানে বিপজ্জনকভাবে পশ্চিমা পোশাক বাজারের ওপর নির্ভরশীল, যা এখন শুল্ক বা ট্যারিফ-সংক্রান্ত চাপের মুখে রয়েছে। ‘সৌদি ভিশন ২০৩০’-এর আওতাধীন পুঁজি এবং তুরস্কের শিল্প বিনিয়োগ—এগুলো এমন বিকল্প, যা এখনো পুরোপুরি কাজে লাগানো হয়নি। প্রতিরক্ষা-সংশ্লিষ্ট ও শ্রম-নিবিড় অংশীদারত্ব এমন সব সুযোগের (যেমন : সার্বভৌম তহবিল বরাদ্দ ও যৌথ উদ্যোগে উৎপাদন) দ্বার উন্মোচন করতে পারে, যা শুধু বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষে আলোচনা করে অর্জন করা সম্ভব নয়। কারণ ঐতিহাসিকভাবে এই অঞ্চলে বড় আকারের পুঁজি প্রবাহের আগেই নিরাপত্তা সম্পর্ক গড়ে ওঠে, পরে নয়।

বাংলাদেশ এমন সব সুবিধা বা সম্পদ দিতে পারে যা তুরস্ক, পাকিস্তান ও সৌদি আরবের জন্য লাভজনক, যেমন : যুদ্ধক্ষেত্রে পরীক্ষিত ও দক্ষ জনবল (সৈন্য), ভৌগোলিক অবস্থান এবং প্রতিরক্ষা-শিল্পের বাজার। বিনিময়ে বাংলাদেশের উচিত তার এই অবদানের যথাযথ মূল্য বা প্রতিদান নিশ্চিত করা, যেমন—আকাশ-প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, বর্ধিত প্রতিরোধ ব্যবস্থার নিশ্চয়তা, গোয়েন্দা তথ্যবিনিময়, যৌথ উৎপাদন, পাল্টা আঘাত হানার সক্ষমতা (যা টিকে থাকতে সক্ষম) গড়ে তোলার সহায়তা, সহজে ড্রোন ও অস্ত্র হস্তান্তর এবং রেমিট্যান্স প্রদানকারী শীর্ষস্থানীয় কর্মীদের জন্য সুবিধাজনক শ্রমশর্ত।

বাংলাদেশের জন্য এই চুক্তিটি তার বিদ্যমান সম্পদকে এমন সব সক্ষমতায় রূপান্তর করতে পারে, যা বর্তমানে তার নেই। এই প্রতিদান আদায়ের উপযুক্ত সময় এখনই, যখন চুক্তিটি সম্প্রসারিত হচ্ছে এবং এমন সব সদস্য খুঁজছে যারা শুধু বোঝা না হয়ে বরং দায়িত্ব ও ভার ভাগ করে নেওয়ার ক্ষেত্রে অবদান রাখতে পারবে। কাজেই, ‘মক্কা চুক্তি’তে বাংলাদেশের যোগ দেওয়ার সবার জন্যই একটি লাভজনক বা ‘উইন-উইন’ পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।

লেখক : শিক্ষক, কেন্টাকি বিশ্ববিদ্যালয়, যুক্তরাষ্ট্র

আবারও বাড়ল স্বর্ণের দাম

মতলবে বাসচাপায় নিহত অটোরিকশা যাত্রী, আহত ৪

একাকীত্বকে ঘিরে চীনের ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি

নড়িয়ায় নিজের বসতঘরে আগুন দিল দুই ভাই

সাংবাদিক পুলক চ্যাটার্জির আবেগঘন পাঁচটি চিরকুট

চিকিৎসকের সহায়তায় মৃত্যু বৈধ করার প্রস্তাব নাকচ করল ব্রিটিশ পার্লামেন্ট

একাধিক স্ত্রী থাকলে স্বামীর সম্পত্তি কীভাবে ভাগ হয়

নারীদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে

গজারিয়ায় গৃহবধূর লাশ উদ্ধার, স্বামী পলাতক

বিশ্বজুড়ে সন্ত্রাসবাদের প্রধান পৃষ্ঠপোষক যুক্তরাষ্ট্র: বাঘাই