ইসরাইলি নিরাপত্তা মন্ত্রিসভা অধিকৃত পশ্চিম তীরের এক বিশাল এলাকাকে তাদের ‘রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি’ হিসেবে ঘোষণা করার প্রস্তাব গত সপ্তাহে অনুমোদন করেছে। ১৯৬৭ সালে পশ্চিম তীর দখল করার পর থেকে ইহুদি বর্ণবাদী দেশটির এ ধরনের প্রথম পদক্ষেপ এটি। এই পদক্ষেপের লক্ষ্য হলো পশ্চিম তীরের অধিকৃত এলাকার এরিয়া ‘সি’-তে ইসরাইলের অবৈধ বসতি সম্প্রসারণ এগিয়ে নেওয়া।
১৯৯৫ সালে স্বাক্ষরিত অসলো-২ চুক্তি অনুযায়ী পশ্চিম তীরকে তিনটি প্রশাসনিক অঞ্চল ‘এ’, ‘বি’ ও ‘সি’তে ভাগ করা হয়। এরিয়া ‘এ’ এলাকা ফিলিস্তিনি প্রধান শহরগুলো নিয়ে গঠিত, যা মোট ভূখণ্ডের ১৮ শতাংশ। এই এলাকা বর্তমানে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের (পিএ) নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। কিন্তু এই এলাকায় ইসরাইলি সেনা ও পুলিশ নিয়মিত নিরাপত্তা অভিযান চালিয়ে থাকে। এরিয়া ‘বি’তে রয়েছে ২২ শতাংশ ভূখণ্ড, যা বর্তমানে ফিলিস্তিনি নাগরিক ও ইসরাইলি নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এরিয়া ‘সি’তে রয়েছে মোট আয়তনের ৬০ শতাংশ ভূখণ্ড, যা সম্পূর্ণ ইসরাইলি নিয়ন্ত্রণে আছে। এখান থেকেই ১৫ শতাংশ ভূখণ্ড ‘রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি’ ঘোষণার প্রস্তাব অনুমোদন করেছে ইসরাইলের নিরাপত্তা মন্ত্রিসভা। এই প্রস্তাবের প্রাথমিক লক্ষ্য হলো ২০৩০ সালের মধ্যে এই জমিতে বসতি স্থাপন করা। বর্তমানে এরিয়া-সি’র মধ্যেই বেশির ভাগ অবৈধ ইহুদি বসতি অবস্থিত।
জর্ডান ইসরাইলের এই পদক্ষেপকে নিজেদের জন্য একটি বিপৎসংকেত হিসেবে দেখছে। কারণ ইসরাইলের এই পদক্ষেপ আগামী দিনে জর্ডানের ও দেশটির বাদশাহ আবদুল্লাহর অস্তিত্বের জন্য সরাসরি হুমকি তৈরি করবে। বাদশাহ আবদুল্লাহর জন্য ইসরাইলের এই ঘোষণা তার ‘রেড লাইন’ বা ‘লাল রেখা’ অতিক্রম করার মতো গুরুতর একটি বিষয়। কারণ এর আগে তিনি বলেছিলেন, ফিলিস্তিনিদের কোনো স্থানচ্যুতি, কোনো বিকল্প স্বদেশ, ফিলিস্তিনি স্বার্থের কোনো অবসান ঘটানোকে জর্ডান মেনে নেবে না। কিন্তু তার এই তিন বক্তব্যই এখন ঝুঁকির মধ্যে পড়ে গেছে এবং এর সঙ্গে জর্ডানের স্থিতিশীলতাও জড়িত।
সংগত কারণেই জর্ডান দ্রুতই ইসরাইলের এই সিদ্ধান্তের নিন্দা জানিয়েছে এবং এই পদক্ষেপকে অবৈধ হিসেবে অভিহিত করেছে। নিন্দা জানিয়েছে ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস, ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ, মিশরসহ আরব ও মুসলিম দেশগুলো, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) এবং জাতিসংঘও। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পশ্চিম তীরের বিশাল এলাকাকে ইসরাইলে অন্তর্ভুক্তির ব্যাপারে তার আপত্তি পুনর্ব্যক্ত করলেও তিনি এই পদক্ষেপের নিন্দা বা ইসরাইলকে তা বাতিল করার আহ্বান জানানো থেকে বিরত রয়েছেন।
ইসরাইলের জ্বালানিমন্ত্রী এলি কোহেন ইসরাইলি রেডিওকে বলেছেন, তাদের এই পদক্ষেপ ‘কার্যত সার্বভৌমত্ব বাস্তবায়ন’ করার সমান। এটি আসলে এই সত্যই প্রতিষ্ঠা করে যে, ফিলিস্তিনি নামে কোনো রাষ্ট্র থাকবে না। প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কাটজ অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচের সঙ্গে এক যৌথ বিবৃতিতে বলেছেন, ‘আমরা ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের ধারণাকে হত্যা করতে থাকব।’
ইসরাইল সবচেয়ে যেসব গুরুতর পদক্ষেপ নিয়েছে, সেগুলোর মধ্যে আছে পশ্চিম তীরের ভূমি রেকর্ড জনসমক্ষে প্রকাশ করা এবং অ-আরব ব্যক্তিদের সরাসরি ফিলিস্তিনি মালিকদের কাছ থেকে জমি কিনতে অনুমতি দেওয়া। এই পদক্ষেপগুলোর মধ্যে আছে ইসরাইলি বেসামরিক প্রশাসনের সরাসরি নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকাগুলোকে প্রসারিত করার ক্ষমতা বৃদ্ধি করা, বিশেষ করে তথাকথিত এরিয়া ‘এ’-র আওতায় থাকা ফিলিস্তিনি শহুরে কেন্দ্রগুলো, যেগুলো অসলো চুক্তির অধীনে সম্পূর্ণ ফিলিস্তিনি নাগরিক এবং নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণে থাকার কথা ছিল। কিন্তু ইসরাইল এখন এই এলাকাগুলোকেও টার্গেট করেছে।
জর্ডানে ইসরাইলের এই পদক্ষেপকে অসলো চুক্তির ভাগ্য সিলমোহর করে দেওয়া, পিএ’র পতন ঘটানো এবং অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরাইলি আইন, অর্থাৎ সংযুক্তির মাধ্যমে সার্বভৌমত্ব সম্প্রসারণ করে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের বিলুপ্তি ত্বরান্বিত করার উপায় হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর মাধ্যমে ইসরাইল একটি প্রধান ভূ-রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জন করেছে বলে মনে করা হচ্ছে। আর তা হচ্ছে, পশ্চিম তীরের ভূমির ওপর আইনি নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা। এটি ভবিষ্যতের ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য নির্ধারিত অঞ্চলকে ফিলিস্তিনি জনগণের থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলবে। এর মাধ্যমে ৩০ লাখ রাষ্ট্রহীন ফিলিস্তিনি শিগগিরই নিজেদের ভূমির ওপর অধিকার হারিয়ে ইসরাইলি ভূমিতে বসবাস করবে, অথবা সেখান থেকে বিতাড়িত হবে।
ভূমি দখলে ইসরাইলের এই পদক্ষেপ গত দুই বছরে নেতানিয়াহুর সরকারের গৃহীত একাধিক মৌলিক পদক্ষেপের চূড়ান্ত পরিণতি। এর মধ্যে আছে অধিকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি শরণার্থী শিবিরের প্রধান অংশ ভেঙে ফেলা, ৪০ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনিকে গৃহহীন করা এবং এরিয়া ‘সি’র ফিলিস্তিনি বাসিন্দাদের অপসারণ করা। ইসরাইল এরই মধ্যে পশ্চিম তীর জুড়ে এক হাজারটিরও বেশি ব্যারিকেড স্থাপন করেছে, যার মাধ্যমে শহর ও গ্রামগুলোকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। পাশাপাশি কয়েক ডজন অবৈধ ফাঁড়িকে পূর্ণাঙ্গ ইহুদি বসতি হিসেবে অনুমোদন দিয়েছে।
অধিকৃত পশ্চিম তীরের গ্রাম ও শহরে প্রতিদিন ইসরাইলি সেনাবাহিনীর অভিযান ফিলিস্তিনি অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিয়েছে। এর ফলে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ প্রায় দেউলিয়া হয়ে পড়েছে। বসতি স্থাপনকারী সশস্ত্র ইহুদিরা ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ব্যাপক সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালালেও ইসরাইল এদের নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে না। সরকার ও বসতি স্থাপনকারীদের সম্মিলিত সন্ত্রাসের লক্ষ্য হচ্ছে, ফিলিস্তিনিদের নিজেদের ঘরবাড়ি ও জমিজমা ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য করা।
আর এক্ষেত্রে তাদের জন্য একমাত্র গন্তব্য হবে জর্ডান। ইসরাইলের এই পরিকল্পনাটি জর্ডানের রাজধানী আম্মানে এখন স্পষ্টভাবে অনুভূত হচ্ছে। ইসরাইল তার পুরনো কৌশল অনুসরণ করে দুই-রাষ্ট্র সমাধানকে অসম্ভব করে দিয়ে পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনিদের সামনে এটাই তুলে ধরছে যে, জর্ডানই ফিলিস্তিন এবং সেটাই ফিলিস্তিনিদের ঠিকানা।
বর্তমানে পশ্চিম তীরে কয়েক হাজার ফিলিস্তিনি আছেন, যারা জর্ডানের জাতীয়তা ধারণ করেন, অথবা যাদের জর্ডানের অস্থায়ী পাসপোর্ট রয়েছে। জর্ডান পশ্চিম তীরের ওপর তার দাবি ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত বজায় রেখেছিল। কিন্তু বর্তমান বাদশাহ আবদুল্লাহর পিতা বাদশাহ হোসেন ১৯৮৮ সালে পশ্চিম তীরের ওপর থেকে আইনি ও প্রশাসনিকভাবে বিচ্ছিন্ন হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, যদিও সেই সিদ্ধান্ত জর্ডানের সংসদে কখনো অনুমোদিত হয়নি।
ইসরাইলের সঙ্গে জর্ডানের শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরের একটি কৌশলগত কারণ ছিল ইসরাইল ও ফিলিস্তিনি অঞ্চলের সঙ্গে সীমানা নির্ধারণ করা এবং তথাকথিত ‘বিকল্প স্বদেশের’ ধারণাকে কবর দেওয়া। বাদশাহ আবদুল্লাহ বেশ কয়েকবার ইঙ্গিত দিয়েছেন, যদি ইসরাইল পশ্চিম তীর, বিশেষ করে জর্ডান উপত্যকাকে সংযুক্ত করে, তবে জর্ডান এই চুক্তি স্থগিত করবে।
ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডকে বিতর্কিত হিসেবে উল্লেখ করেছিল। এখন ইসরাইল পশ্চিম তীরের ওপর পূর্ণ সার্বভৌমত্ব দাবি করার জন্য অতিরিক্ত পদক্ষেপ নিয়েছে। এই পদক্ষেপ কার্যত ইসরাইলের সঙ্গে পশ্চিম তীরের সংযুক্তিই বলা যায়, যদি এটি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা নাও হয়।
পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনিদের ভাগ্য সম্পর্কে কিছু কট্টরপন্থি ইসরাইলি রাজনীতিক বলে থাকে, জর্ডান হলো ফিলিস্তিনিদের জন্য উপযুক্ত জাতীয় আবাসস্থল। ইসরাইলি এই উগ্রপন্থিরা জর্ডানকে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের বিকল্প হিসেবে প্রতিস্থাপন করতে চায়। বাদশাহ আবদুল্লাহ এবং জর্ডানবাসী ইসরাইলের এ ধরনের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার ক্ষেত্রে ঐক্যবদ্ধ। বাদশাহ আবদুল্লাহ যে রেড লাইন বা লাল রেখাগুলো মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছেন, ইসরাইলের তা গুরুত্বসহ নেওয়া উচিত। তিনি বারবার সতর্ক করে বলেছেন, পশ্চিম তীরের অধিগ্রহণ জর্ডানের জন্য একটি বড় জাতীয় নিরাপত্তা হুমকি, যা প্রতিরোধ করার জন্য যেকোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করতে তারা প্রস্তুত।
যদি ইসরাইল পশ্চিম তীরের সম্পূর্ণ অধিগ্রহণে এগিয়ে যায়, তাহলে ভবিষ্যতে জর্ডান লাখ লাখ বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিকে গ্রহণ করতে অথবা ইসরাইলের সঙ্গে তার শান্তি চুক্তি স্থগিত করার মধ্যে যেকোনো একটি বেছে নিতে বাধ্য হতে পারে। আর তা হবে এমন একটি পদক্ষেপ, যা আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতিকে মৌলিকভাবে বদলে দেবে। আপাতত জর্ডান দেখছে, অপেক্ষা করছে এবং ইসরাইলকে সতর্ক করছে—তার ধৈর্যের সীমা আছে।
আরব নিউজ অবলম্বনে মোতালেব জামালী