বাংলাদেশে গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের ইতিহাস কোনো সাম্প্রতিক ঘটনা নয়; বরং এটি ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির একটি দীর্ঘ ও ধারাবাহিক ঐতিহ্যের অংশ। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা মনে করেন, কর্তৃত্ববাদী শাসনের প্রথম লক্ষ্যগুলোর একটি হলো স্বাধীন তথ্যপ্রবাহকে নিয়ন্ত্রণ করা, কারণ সত্য ও অবাধ তথ্যই স্বৈরশাসনের সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ। বাংলাদেশের ইতিহাসে ১৬ জুন একটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ ও বেদনাবিধুর দিন। ১৯৭৫ সালে একদলীয় বাকশালব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার প্রাক্কালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার দেশের অধিকাংশ সংবাদপত্র বন্ধ করে মাত্র চারটি সরকার অনুমোদিত পত্রিকাকে প্রকাশনার সুযোগ দেয়। সংবাদপত্রের স্বাধীনতার ইতিহাসে দিনটি আজও ‘কালো দিবস’ হিসেবে স্মরণ করা হয়। এর মধ্য দিয়ে স্বাধীন রাষ্ট্রে ভিন্নমত ও মুক্ত সাংবাদিকতার ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের একটি বিপজ্জনক নজির প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
সময়ের প্রবাহে শাসক পরিবর্তিত হলেও গণমাধ্যমের প্রতি ক্ষমতাসীনদের দৃষ্টিভঙ্গির মৌলিক পরিবর্তন ঘটেনি। শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলেও একই প্রবণতা নতুন রূপে ফিরে আসে। শুধু ভিন্নমত ও অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের কারণে বন্ধ করে দেওয়া হয় দৈনিক আমার দেশ; নানা প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক চাপে কার্যত স্তব্ধ করে দেওয়া হয় দিনকালসহ একাধিক সংবাদমাধ্যম। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, সাইবার নিরাপত্তা আইন, মামলা-হামলা, বিজ্ঞাপন নিয়ন্ত্রণ এবং লাইসেন্সের চাপের মাধ্যমে সংবাদপত্র ও সাংবাদিকদের ওপর এমন এক ভীতিকর পরিবেশ তৈরি করা হয়, যেখানে সত্য প্রকাশ ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। ফলে গণমাধ্যমের একটি বড় অংশ জনগণের কণ্ঠস্বর না হয়ে ক্ষমতার প্রতিধ্বনিতে পরিণত হয়।
জুলাই ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান তাই কেবল একটি রাজনৈতিক সরকারের পতনের ঘটনা নয়; এটি তথ্যের ওপর দীর্ঘদিনের নিয়ন্ত্রণ, সত্যকে আড়াল করার সংস্কৃতি এবং গণমাধ্যমকে ক্ষমতার হাতিয়ারে পরিণত করার রাজনীতিরও একটি ঐতিহাসিক প্রত্যাখ্যান। ১৬ জুনের কালো দিবস থেকে জুলাই অভ্যুত্থান পর্যন্ত বিস্তৃত এই ইতিহাস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা হরণ এবং সত্যকে দমনের প্রতিটি প্রচেষ্টা শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্র ও শাসকগোষ্ঠীকেই বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। আর যখন শাসক বাস্তবতা দেখতে পায় না, তখন ইতিহাস তার নিজস্ব উপায়ে সেই বিচ্ছিন্নতার মূল্য আদায় করে নেয়।
ইতিহাসের একটি নির্মম বৈশিষ্ট্য হলো—ক্ষমতা যখন বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, তখন তার পতনের সূচনা হয় নীরবে; কিন্তু সেই পতনের শব্দ প্রতিধ্বনিত হয় বহু দূর পর্যন্ত। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বলেন, কোনো শাসনব্যবস্থার স্থায়িত্ব কেবল প্রশাসনিক শক্তি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কিংবা নির্বাচনি সংখ্যাগরিষ্ঠতার ওপর নির্ভর করে না; বরং তা নির্ভর করে জনগণের সম্মতি, সামাজিক বৈধতা এবং তথ্যপ্রবাহের বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর। ইতালীয় রাজনৈতিক দার্শনিক আন্তোনিও গ্রামসি তার ‘হেজিমনি’ বা সাংস্কৃতিকাধিপত্য তত্ত্বে দেখিয়েছেন, একটি শাসকগোষ্ঠী কেবল বুলেটের জোরে ক্ষমতায় টিকে থাকে না, তাদের প্রয়োজন হয় মতাদর্শিক রাষ্ট্রযন্ত্রের, যার অন্যতম প্রধান হাতিয়ার গণমাধ্যম। যখন এই রাষ্ট্রীয় বয়ান এবং জনগণের প্রাত্যহিক অভিজ্ঞতার মধ্যে গভীর ও অলঙ্ঘনীয় ব্যবধান সৃষ্টি হয়, তখন রাজনৈতিক সংকট অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে। ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসে সেই চিরন্তন সত্যকেই নতুনভাবে এবং অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে প্রতিষ্ঠা করেছে। আজ ২০২৬ সালের জুন মাসে দাঁড়িয়ে, যখন আমরা জুলাইয়ের দ্বিতীয় বার্ষিকীর দ্বারপ্রান্তে, তখন আন্দোলনের নানা মাত্রা—শহীদদের স্মৃতি, রাষ্ট্র সংস্কারের রূপরেখা, রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাস কিংবা ‘নতুন বাংলাদেশ’-এর স্বপ্ন নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। কিন্তু এর সমান্তরালে একটি মৌলিক প্রশ্ন এখনো তাত্ত্বিক ও কাঠামোগত গভীরতা পায়নি। আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ দেড় দশকের শাসনামলে মূলধারার গণমাধ্যমের ভূমিকা কী ছিল এবং জুলাই অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপট তৈরিতে সেই ভূমিকা কতটা দায়ী?
গণমাধ্যমকে ঐতিহ্যগতভাবেই গণতন্ত্রের ‘চতুর্থ স্তম্ভ’ বলা হয়। এডমন্ড বার্ক ব্রিটিশ পার্লামেন্টে সাংবাদিকদের গ্যালারির দিকে আঙুল দিয়ে এই শব্দবন্ধের সূচনা করেছিলেন। তাত্ত্বিকভাবে, গণমাধ্যমের প্রধান দায়িত্ব তিনটি : রাষ্ট্রক্ষমতার ওপর নজরদারি করা, সঠিক ও নিরপেক্ষ তথ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং জনমত গঠনের জন্য একটি মুক্ত আলোচনা কেন্দ্র বা ‘পাবলিক স্ফিয়ার’ তৈরি করা, যা ইয়ুর্গেন হাবেরমাস তার তত্ত্বে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যখন গণমাধ্যম এই ওয়াচডগ বা পাহারাদারের ভূমিকা ছেড়ে ক্ষমতার অংশীদারে পরিণত হয়, তখন তা সমাজকে সত্য থেকে দূরে সরিয়ে নেয়। গত দেড় দশকে বাংলাদেশের গণমাধ্যমের একটি বিশাল অংশ ধীরে ধীরে ক্ষমতাকেন্দ্রিক বয়ানের প্রধান বাহক হয়ে উঠেছিল। অবশ্য সব গণমাধ্যম একই রকম ছিল না। কিছু ব্যতিক্রমী ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, হাতেগোনা কয়েকটি সংবাদপত্র এবং বেশকিছু সাহসী সাংবাদিক জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সত্য প্রকাশের চেষ্টা করেছেন। কিন্তু সামগ্রিক করপোরেট কাঠামো ও নীতি ছিল ভীতি এবং চাটুকারিতার মিশ্রণ। ফলস্বরূপ সংবাদ পরিবেশনের জায়গায় স্থান করে নেয় ‘প্রোপাগান্ডা’ বা প্রচারণা, গঠনমূলক সমালোচনার জায়গায় আসে অন্ধ প্রশংসা এবং অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার জায়গা দখল করে নেয় নিরঙ্কুশ আনুগত্য।
আমেরিকান সাংবাদিক ও চিন্তাবিদ ওয়াল্টার লিপম্যান তার ১৯২২ সালের বিখ্যাত ‘পাবলিক ওপিনিয়ন’ গ্রন্থে লিখেছিলেন, জনগণ বাস্তবতাকে সরাসরি দেখে না; তারা বাস্তবতার একটি কৃত্রিম চিত্র দেখে, যা গণমাধ্যম তাদের সামনে নির্মাণ করে। লিপম্যান একে বলেছিলেন ‘ছায়া বাস্তবতা’। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও দীর্ঘদিন ধরে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার চিত্র বা ‘মেগা ন্যারেটিভ’ নির্মাণ করা হয়েছিল। সেখানে দৃশ্যমান অবকাঠামোগত উন্নয়ন ছিল সর্বত্র, যেকোনো রাজনৈতিক বিরোধিতা ছিল ষড়যন্ত্র, সমালোচনা ছিল রাষ্ট্রবিরোধিতা এবং ভিন্নমত ছিল অগ্রগতির শত্রু। এই কৃত্রিম বয়ান একসময় এতটাই শক্তিশালী ও একচেটিয়া হয়ে ওঠে যে, স্বয়ং ক্ষমতাসীন মহলের নীতিনির্ধারকরাও হয়তো বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলেন—জনগণ তাদের ওপর সম্পূর্ণ সন্তুষ্ট। নোয়াম চমস্কি ও এডওয়ার্ড হারম্যান তাদের ‘ম্যানুফ্যাকচারিং কনসেন্ট’ মডেলে দেখিয়েছেন কীভাবে ফিল্টারিংয়ের মাধ্যমে গণমাধ্যমকে বাধ্য করা হয় সরকারের অনুগত হতে। বাংলাদেশে এই ফিল্টারিং করা হতো লাইসেন্স বা ফ্রিকোয়েন্সি বাতিলের ভয়, ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন’ বা ‘সাইবার নিরাপত্তা আইন’-এর জুজু এবং সরকারি বিজ্ঞাপনের অন্যায় নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে।
অথচ মাটির ভেতরের সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। দ্রব্যমূল্যের অনিয়ন্ত্রিত ঊর্ধ্বগতি, শিক্ষিত যুবসমাজের কর্মসংস্থানের ভয়াবহ সংকট, ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক বৈষম্য, ব্যাংকিং খাতের নজিরবিহীন লুটপাট ও অর্থপাচার, আমলাতন্ত্র ও প্রশাসনের চরম দলীয়করণ এবং সর্বোপরি মানুষের ভোটাধিকার হরণের ক্ষোভ ভেতরে ভেতরে জমা হচ্ছিল। সরকারি প্রচারণার রেশমি পর্দার আড়ালে এই বারুদ জমে উঠলেও মূলধারার গণমাধ্যম তা দেখতে বা দেখাতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে যখন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন শুরু হয়, তখন গণমাধ্যমের এই কাঠামোগত বিচ্ছিন্নতার প্রকৃত ও কুৎসিত চেহারা উন্মোচিত হয়। আন্দোলনের প্রথম দুই সপ্তাহে বহু টেলিভিশন চ্যানেল ও প্রধান সারির সংবাদপত্র শিক্ষার্থীদের দাবির যৌক্তিকতা ও গভীরতা অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়। আন্দোলনকারীদের স্বতঃস্ফূর্ত ক্ষোভকে ‘কোটাপন্থি বনাম কোটাবিরোধী’র কৃত্রিম দ্বন্দ্বে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। সরকারি দল যখন আন্দোলনকারীদের ওপর ‘ট্যাগিং’-এর নোংরা রাজনীতি শুরু করে, গণমাধ্যমের একটি বড় অংশ তখন সেই একই সুর প্রতিধ্বনিত করে শিক্ষার্থীদের চরিত্রহননে লিপ্ত হয়।
জুলাইয়ের মাঝামাঝি যখন আবু সাঈদ, মুগ্ধসহ শত শত শিক্ষার্থীর রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হচ্ছিল, তখনো মূলধারার টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে ‘উন্নয়নের গান’ কিংবা সাজানো টক শো প্রচারিত হচ্ছিল। দেশের ভেতরে নিউজ সেন্সরশিপ এমন এক বীভৎস পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, রাষ্ট্রীয় বাহিনীর সরাসরি গুলির দৃশ্য আড়াল করে কেবল ‘সহিংসতা ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ ধ্বংসের’ খণ্ডচিত্র প্রচার করা হচ্ছিল। এটি ছিল রবার্ট হ্যাকেটের ‘রেজিম-সাপোর্টিং মিডিয়া’ মডেলের এক নিকৃষ্ট বাস্তব রূপায়ণ। ঠিক যে সময় দেশের ভেতরের গণমাধ্যমগুলো নীরব বা নিয়ন্ত্রিত ছিল, সে সময় বিবিসি, আলজাজিরা, রয়টার্স এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো উপগ্রহ চিত্র এবং মাঠপর্যায়ের ভিডিও বিশ্লেষণ করে রাষ্ট্রীয় বলপ্রয়োগের ভয়াবহতা বিশ্বের সামনে তুলে ধরছিল। দেশের মানুষ তখন বাধ্য হয়ে ভেতরের সঠিক খবরের জন্য বাইরের আন্তর্জাতিক উৎসের দিকে তাকিয়ে ছিল।
যখন মূলধারার গণমাধ্যম জনগণের ভাষা হারিয়ে ফেলে, তখন সমাজ হাত গুটিয়ে বসে থাকে না। জুলাই অভ্যুত্থানে মূলধারার গণমাধ্যমের ব্যর্থতার সমান্তরালে জন্ম নেয় ‘সিটিজেন জার্নালিজম’ বা নাগরিক সাংবাদিকতা। ফেসবুক, এক্স, ইউটিউব, টিকটক এবং টেলিগ্রামের মতো প্ল্যাটফর্মগুলো একটি শক্তিশালী ‘বিকল্প পাবলিক স্ফিয়ার’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। স্মার্টফোনের ক্যামেরায় ধারণ করা প্রতিটি ফ্রেম একেকটি অকাট্য বুলেটে পরিণত হয়েছিল। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বাড়াবাড়ি, সাধারণ মানুষের প্রতিরোধ এবং কিশোর-তরুণদের বীরত্বের ভিডিওগুলো সেন্সরশিপের দেয়াল ভেঙে কোটি মানুষের স্ক্রিনে পৌঁছে যায়। এর ফলে প্রচলিত গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতার সংকট চূড়ান্ত রূপ নেয়। গণমাধ্যম তত্ত্বের অন্যতম মূল কথা হলো—সংবাদমাধ্যমের প্রকৃত পুঁজি মূলধন বা আধুনিক প্রযুক্তি নয়; এর আসল পুঁজি ‘জনআস্থা’ বা ট্রাস্ট। জুলাই মাসে বাংলাদেশের মূলধারা এই পুঁজি সম্পূর্ণভাবে হারিয়ে দেউলিয়া হয়ে পড়েছিল।
আজ ২০২৬ সালের জুনে দাঁড়িয়ে, নতুন বাংলাদেশের বিনির্মাণকালীন প্রক্রিয়ার মধ্যে গণমাধ্যমের গভীর আত্মসমালোচনার সময় এসেছে। সাংবাদিক সমাজকে আজ নিজেদের কাঠামোগত আয়নায় তাকাতে হবে এবং কিছু অপ্রিয় প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে। আমরা কি সাংবাদিকতার পেশাদারিত্ব ধরে রাখতে পেরেছিলাম, নাকি করপোরেট মালিকানার দাসত্ব করেছি? সংবাদ কি তথ্যের ভিত্তিতে ও জনস্বার্থে নির্মিত হয়েছিল, নাকি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য? কেন একজন সাংবাদিককে সত্য লেখার জন্য নয়, বরং চাটুকারিতার জন্য পুরস্কৃত হতে হলো? ইতিহাসের আদালতে দায় শুধু রাজনীতিবিদদের নয়; তথ্য বিকৃতিকারী ও সত্য গোপনকারী তথ্য নির্মাতাদেরও।
সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য আমূল সংস্কারের উদ্দেশ্যে আমাদের তিনটি বিষয়ে নজর দিতে হবে। প্রথমত, কেবল রাজনৈতিক পরিচয়ে বা ব্যবসায়িক স্বার্থ সুরক্ষায় গণমাধ্যমের লাইসেন্স প্রদান বন্ধ করে মালিকানার রাজনীতি দূর করতে হবে। দ্বিতীয়ত, গণমাধ্যমপরিপন্থী সব কালো আইন স্থায়ীভাবে বাতিল করে সাংবাদিকদের আইনি সুরক্ষা দিতে হবে। তৃতীয়ত, করপোরেট মালিকদের প্রভাব থেকে মুক্ত রেখে সম্পাদকীয় নীতিনির্ধারণের স্বাধীনতা বা এডিটোরিয়াল ইন্ডিপেন্ডেন্স নিশ্চিত করতে হবে। সাংবাদিকতার প্রথম আনুগত্য কোনো দল, সরকার বা রাষ্ট্রের প্রতি নয়; তার প্রথম ও শেষ আনুগত্য হলো সত্য এবং জনগণের প্রতি।
জুলাই অভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসের এক যুগসন্ধিক্ষণ। এর চূড়ান্ত ও বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়ন হয়তো সময়ই করবে। কিন্তু একটি রাজনৈতিক সত্য ইতোমধ্যে দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয়েছে—যখন গণমাধ্যম জনগণের ভাষা হারিয়ে ফেলে, তখন জনগণ রাজপথে নিজেদের নতুন ভাষা তৈরি করে নেয়; যখন গণমাধ্যম বাস্তবতাকে ব্ল্যাকআউট করতে চায়, তখন বাস্তবতা নিজেই ইতিহাস হয়ে স্বৈরাচারের সামনে এসে দাঁড়ায়। বাংলাদেশ আজ এক নতুন রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক যাত্রার প্রাক্কালে দাঁড়িয়ে। এই যাত্রাপথে একটি স্বাধীন, নির্ভীক ও বিশ্বাসযোগ্য গণমাধ্যম অপরিহার্য।
জুলাইয়ের শহীদদের আত্মত্যাগ আমাদের বারবার এ কথাই মনে করিয়ে দেয়—ক্ষমতার দম্ভে সত্যকে হয়তো সাময়িকভাবে দমন করা যায়, কিন্তু তাকে কখনো পরাজিত করা যায় না। ইতিহাসের প্রতিটি সফল গণআন্দোলনের মতো, ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানও প্রমাণ করেছে যে, শোষিত মানুষের যৌথ অভিজ্ঞতা ও সত্যের নৈতিক শক্তি যেকোনো আধুনিক ও দানবীয় প্রচারযন্ত্রের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী। সুতরাং জুলাই ২০২৬-এর এই ক্ষণে আমাদের সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন হলো—আমরা কি অতীত থেকে শিক্ষা নেব, নাকি আবার একই ভুলের পুনরাবৃত্তি করব? গণমাধ্যমের ভবিষ্যৎ, গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ মূলত এই একটি প্রশ্নের সততাপূর্ণ উত্তরের ওপরই নির্ভর করছে।
লেখক : রাজনীতি বিশ্লেষক, সাবেক অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়