কাঠমান্ডু শহর থেকে প্রায় ৮০ কিলোমিটার দূরে নেপালের নোয়াকোট জেলার ত্রিশূলী বাজার। পাহাড়ঘেরা এই জনপদটি একসময় ছিল কর্মচঞ্চল। বাজারজুড়ে মানুষের ব্যস্ততা, দোকানে ক্রেতা-বিক্রেতার ভিড়, সড়কে যানবাহনের চলাচল—সব মিলিয়ে ছিল স্বাভাবিক জীবনের ছন্দ। ত্রিশূলী নদীকে ঘিরেই গড়ে উঠেছিল এখানকার মানুষের জীবন ও জীবিকা।
কিন্তু গত ১৪ সেপ্টেম্বর বিকাল ৩টায় কাঠমান্ডু থেকে বাইক নিয়ে দুর্গম পাহাড়ি ও ঝুঁকিপূর্ণ পথ পেরিয়ে যখন ত্রিশূলী বাজারে পৌঁছলাম, তখন সামনে যে দৃশ্য দেখলাম, সেটি কোনো স্বাভাবিক জনপদের চিত্র নয়।
বাইক থামাতেই চোখে পড়ল সারি সারি বিধ্বস্ত ভবন। কোথাও দেয়াল ভেঙে পড়েছে, কোথাও ছাদ নেই, কোথাও পুরো ভবনটি যেন মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। রাস্তার পাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে ভাঙা টিন, কাঠ, আসবাবপত্র, কাদা আর নদীর বয়ে আনা পাথর।
কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থাকতে হলো। সামনে ধ্বংসস্তূপ, পাশে ক্ষতিগ্রস্ত দোকানপাট, দূরে পাহাড়ের গায়ে মেঘ। চারপাশে মানুষ আছে, কিন্তু আগের সেই কোলাহল নেই। কথা বলছে সবাই, অথচ কথার মধ্যেও যেন এক ধরনের ভারী নীরবতা।
গত ১০ দিনে নেপালের রসুয়া, নোয়াকোট ও ধাদিং জেলার বিভিন্ন দুর্গত এলাকা ঘুরে দেখেছি। হিমবাহ ও বরফধসের পর আকস্মিক পাহাড়ি ঢল কীভাবে একের পর এক জনপদকে বিপর্যস্ত করেছে, তা কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে। রসুয়ার ভুটেকোশি থেকে নোয়াকোটের ত্রিশূলী, দেবীঘাট হয়ে ধাদিং—যেদিকেই গিয়েছি, মানুষের চোখে-মুখে দেখেছি একই আতঙ্ক, একই শোক আর একই অনিশ্চয়তা।
তবে ত্রিশূলীতে পৌঁছানোর পর সেই অনুভূতিটা যেন আরো তীব্র হয়ে উঠল।
ধ্বংসস্তূপের দিকে এগিয়ে যেতেই দেখা গেল মানুষের ব্যস্ততা। তবে সেটি বাজারের স্বাভাবিক ব্যস্ততা নয়। কেউ ধ্বংসস্তূপ সরাচ্ছেন, কেউ ভাঙা দেয়ালের নিচে হাত ঢুকিয়ে কিছু খুঁজছেন, কেউ কাদার মধ্যে পড়ে থাকা জিনিসপত্র তুলে আলাদা করছেন। কারো হাতে কোদাল, কারো হাতে লোহার রড। কেউ খুঁজছেন প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, কেউ মূল্যবান সামগ্রী। আবার কেউ হয়তো এমন কিছু খুঁজছেন, যার আর্থিক মূল্য নেই, কিন্তু স্মৃতির মূল্য অনেক বেশি।
এক জায়গায় কয়েকজনকে ধ্বংসস্তূপ সরাতে দেখলাম। তাদের চোখেমুখে ক্লান্তি, শরীরে অবসাদ; কিন্তু হাত থামছে না। কাছে গিয়ে বুঝলাম, তারা শুধু ঘরের জিনিসপত্র খুঁজছেন না, তাদের চোখে ছিল আরো বড় কোনো অনুসন্ধানের ব্যাকুলতা।
দুর্যোগের পর উদ্ধার অভিযান যে শুধু ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা মানুষকে খুঁজে বের করার কাজ নয়, ত্রিশূলীর এই দৃশ্যটি যেন সেটিই মনে করিয়ে দিল। অনেক সময় এটি পরিবারের কাছে প্রিয়জনের শেষ চিহ্ন খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা।
ত্রিশূলীর মানুষের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টি অনুভব করেছি, সেটি হলো অনিশ্চয়তা—কেউ জানেন, তার বাড়ি নেই; কেউ জানেন, দোকান নেই; কেউ জানেন, জীবিকার অবলম্বন শেষ। কিন্তু সবচেয়ে কষ্টের জায়গাটি তাদের জন্য, যারা এখনো জানেন না তাদের স্বজনের কী হয়েছে।
একজন মানুষকে নদীর দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখলাম। কিছুক্ষণ পরপর আশপাশের মানুষের সঙ্গে কথা বলছেন। চোখে শুধু অপেক্ষা। সেই অপেক্ষার কোনো নির্দিষ্ট সময় নেই। সকাল থেকে সন্ধ্যা, সন্ধ্যা থেকে রাত—হয়তো কোনো এক মুহূর্তে খবর আসবে। উদ্ধারকারী দল কোনো সন্ধান পেয়েছে। হয়তো কোনো হাসপাতালে পাওয়া গেছে। আবার সেই খবরটি আরো বেদনাদায়কও হতে পারে।
এই অপেক্ষার যন্ত্রণা বাইরে থেকে বোঝা কঠিন।
ত্রিশূলী বাজারের একপাশে দাঁড়ালে নদী দেখা যায়। নদী এখন অনেকটাই শান্ত। অথচ এই নদীর তীব্র স্রোতই কয়েক সপ্তাহ আগে মানুষের ঘরবাড়ি, দোকানপাট ও স্বপ্নের ওপর দিয়ে বয়ে গেছে।
নদীর তীরে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছিল, প্রকৃতির শক্তির সামনে মানুষের তৈরি সবকিছু কতটা অসহায়।
যেখানে কয়েক সপ্তাহ আগেও বসতি ছিল, সেখানে এখন কাদা ও পাথরের স্তর। কোথাও গাছের সঙ্গে আটকে আছে কাপড়, কোথাও ভেসে আসা কাঠ, কোথাও পড়ে আছে ভাঙা ঘরের অংশ। এসব ছোট ছোট চিহ্নই যেন বলে দিচ্ছে—এখানে একসময় একটি স্বাভাবিক জীবন ছিল।
ত্রিশূলী থেকে দেবীঘাটের দিকে এগিয়ে যাওয়ার পর ধ্বংসের চিত্র আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। রাস্তার দুপাশে ক্ষতিগ্রস্ত বসতি। কোথাও বাড়ির অর্ধেক নেই, কোথাও দোকানের সামনের অংশ ভেঙে পড়েছে। সরকারি ভবন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান—সবকিছুর ওপরই দুর্যোগের ছাপ।
দেবীঘাটে গিয়ে মনে হয়েছে, একটি জনপদ যেন হঠাৎ থেমে গেছে। মানুষ আছে, কিন্তু স্বাভাবিক জীবন নেই; ঘর আছে, কিন্তু নিরাপত্তা নেই; দোকান আছে, কিন্তু ব্যবসা নেই।
একজন দোকানির সঙ্গে কথা বলেছিলাম। দোকানের ভেতরে জমে ছিল কাদা ও পলি। নষ্ট হয়ে গেছে পণ্য ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী। তিনি ক্ষতির কথা বলছিলেন। কিন্তু তার কথার মধ্যে সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা ছিল—আবার কীভাবে শুরু করবেন?
‘একটি দোকান বানানো যায়, নতুন করে পণ্য তোলা যায়; কিন্তু পুঁজি কোথা থেকে আসবে? পরিবারকে কোথায় রাখা হবে? আবার যদি এমন দুর্যোগ আসে?’ এই প্রশ্ন শুধু একজন দোকানির নয়। ত্রিশূলী, দেবীঘাট, রসুয়া কিংবা ধাদিংয়ের বহু মানুষের প্রশ্ন এখন একই।
রসুয়ায় গিয়ে দেখেছি বিপর্যয়ের আরেক ভয়াবহ চেহারা। ভুটেকোশি নদীর তাণ্ডবে সীমান্তবর্তী জনপদ, সড়ক, সেতু, বাজার ও বিভিন্ন স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কোথাও নদী রাস্তার অংশ কেটে নিয়েছে, কোথাও সেতুর ওপর আঘাত করেছে, কোথাও পুরো জনপদের চেহারাই বদলে দিয়েছে।
রসুয়া থেকে নোয়াকোট, নোয়াকোট থেকে ত্রিশূলী, এরপর দেবীঘাট হয়ে ধাদিং—পথ যত এগিয়েছে, দৃশ্য বদলেছে, কিন্তু মানুষের কষ্টের গল্প বদলায়নি।
কেউ হারিয়েছেন ঘর, কেউ ব্যবসা, কেউ জমি, কেউ জীবিকার একমাত্র অবলম্বন। আর কেউ হারিয়েছেন পরিবারের সবচেয়ে প্রিয় মানুষটিকে।
১০ দিনের এই সরেজমিন যাত্রায় একটি বিষয় বারবার মনে হয়েছে—সংবাদে আমরা সংখ্যার কথা বলি, কিন্তু সংখ্যার পেছনের মানুষগুলোকে দেখা যায় না।
কতজন মারা গেছেন, কতজন নিখোঁজ, কতটি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত, কত কিলোমিটার রাস্তা ভেঙেছে—এসব সংখ্যা অবশ্যই প্রয়োজনীয়। কিন্তু ত্রিশূলীর ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে মনে হয়েছে, একজন নিখোঁজ হওয়া মানে শুধু একটি সংখ্যা নয়, তার পেছনে একটি পরিবার আছে। একজন নিখোঁজ মানে হয়তো একজন মা অপেক্ষা করছেন, একজন স্ত্রী অপেক্ষা করছেন, কোনো সন্তান হয়তো দরজার দিকে তাকিয়ে আছে।
একটি ধ্বংস হওয়া বাড়ি মানে শুধু ইট-পাথর-টিনের ক্ষতি নয়। সেখানে হয়তো ছিল একটি পরিবারের বহু বছরের সঞ্চয়, সন্তানের শৈশব, বাবা-মায়ের স্মৃতি, বিয়ের ছবি, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র—একটি পুরো জীবনের গল্প।
এই কারণেই ত্রিশূলীর ধ্বংসস্তূপ শুধু ধ্বংসস্তূপ নয়; প্রতিটি ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে একটি করে গল্প। আর সেই গল্পের সবচেয়ে বেদনাদায়ক অংশ হলো অপেক্ষা।
দুর্যোগের পানি নেমে গেছে। নদী এখন শান্ত। উদ্ধারকারী দল কাজ করছে। কোথাও রাস্তা মেরামতের প্রস্তুতি চলছে। মানুষও ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু যাদের স্বজন নিখোঁজ, তাদের অপেক্ষা এখনো শেষ হয়নি।
মৃত্যুর খবরের চেয়েও কখনো কখনো নিখোঁজ থাকার অনিশ্চয়তা বেশি কঠিন; কারণ সেখানে শেষ বলে কিছু নেই। প্রতিদিন নতুন করে আশার জন্ম হয়, আবার নতুন করে হতাশাও আসে।
ত্রিশূলীতে দাঁড়িয়ে মনে হয়েছে, এই বিপর্যয়ের সবচেয়ে বড় ক্ষত হয়তো চোখে দেখা যায় না।
ভেঙে পড়া ভবন দেখা যায়। কাদায় ডুবে থাকা রাস্তা দেখা যায়। ধ্বংস হয়ে যাওয়া দোকান দেখা যায়। কিন্তু একজন মানুষের ভেতরে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, সেটি দেখা যায় না।
২০ সেপ্টেম্বর বিকালে ত্রিশূলী বাজারে দাঁড়িয়ে সামনে ও বাঁ দিকে সারি সারি বিধ্বস্ত ভবনের দিকে তাকিয়ে মনে হয়েছিল, আমি যেন একটি ধ্বংস হয়ে যাওয়া শহরে এসে দাঁড়িয়েছি। কিন্তু দিন শেষে বুঝলাম, এটি শুধু ধ্বংস হওয়া ভবনের গল্প নয়, এটি মানুষের গল্প।
ধ্বংসস্তূপ সরাতে থাকা মানুষের গল্প। নিখোঁজ স্বজনের অপেক্ষায় থাকা পরিবারের গল্প। দোকান হারানো ব্যবসায়ীর গল্প। ঘর হারানো মানুষের গল্প। আবার সব হারিয়েও নতুন করে দাঁড়ানোর চেষ্টা করা মানুষের গল্প।
ত্রিশূলীর নদী এখন তার স্বাভাবিক গতিতে বয়ে যাচ্ছে। পাহাড়গুলোও আগের মতোই দাঁড়িয়ে আছে। আকাশে মেঘ জমছে, আবার মেঘ কেটে সূর্যের আলোও পড়ছে নদীর পানিতে।
শুধু নদীর পাড়ের মানুষের জীবন আর আগের জায়গায় নেই।
ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে হয়তো নতুন ঘর উঠবে। ক্ষতিগ্রস্ত দোকান আবার খুলবে। রাস্তা মেরামত হবে। বাজারে আবার মানুষের ভিড় হবে। শিশুরা আবার স্কুলে যাবে। ত্রিশূলী হয়তো আবার তার পুরোনো চেহারায় ফিরতে শুরু করবে। কিন্তু যে মানুষটি স্বজন হারিয়েছেন, তার কাছে সেই পুরোনো ত্রিশূলী আর ফিরে আসবে না।
প্রকৃতির কাছে মানুষ কতটা অসহায়—ত্রিশূলী তার নির্মম সাক্ষী। আর ধ্বংসস্তূপের পাশে স্বজনের অপেক্ষায় থাকা মানুষগুলো মনে করিয়ে দিচ্ছেন—পানি নেমে গেলেই সব দুর্যোগ শেষ হয় না। কোনো কোনো দুর্যোগ নদীর স্রোতের সঙ্গে চলে যায়, আর কোনো কোনো দুর্যোগ মানুষের বুকের ভেতর থেকে যায় বছরের পর বছর।
ত্রিশূলীর মানুষের জন্য ২৬ আগস্টের সেই দিনটি হয়তো একসময় ক্যালেন্ডারের একটি তারিখ হয়ে যাবে। কিন্তু তাদের স্মৃতিতে এটি থেকে যাবে এমন একটি দিন হিসেবে, যেদিন নদী শুধু পানি নিয়ে আসেনি; নিয়ে গেছে ঘর, জীবিকা, স্বজন আর বহু মানুষের সাজানো জীবন।
লেখক: দৈনিক আমার দেশ চট্টগ্রাম প্রতিনিধি