হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

ধর্ম তেল ও ইরানযুদ্ধ

মেহেদী হাসান

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের ইরান আগ্রাসনের কারণ কী ধর্ম না আন্তর্জাতিক পেট্রোলিয়াম রাজনীতির খেলা-এ প্রশ্ন সামনে এসেছে। এর উত্তর হলো ধর্ম এবং পেট্রোলিয়াম রাজনীতি উভয়ই। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের ইরান আগ্রাসনের পেছনে ধর্ম কীভাবে জড়িত, তার সঠিক উত্তর খুঁজতে হলে ফিরে যেতে হবে অন্তত সাড়ে ৩ হাজার বছর আগে। কারণ, বর্তমানে চলমান ইরানযুদ্ধ অতীতে জেরুসালেম ঘিরে চলা দুইশ বছরের ক্রুসেডসহ কয়েক হাজার বছরের যুদ্ধ থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। আজকের ইসরাইল রাষ্ট্র তথা ফিলিস্তিন ঘিরে কয়েক হাজার বছর ধরে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, বিভিন্ন সাম্রাজ্য ও সভ্যতার উত্থান-পতনের ঘটনা ঘটেছে। ফিলিস্তিন ঘিরে অতীতের সেই কয়েক হাজার বছরের যুদ্ধের ধারাবাহিকতায়ই ঘটেছে আজকের ইরান আগ্রাসনের ঘটনা। যেখানে সর্বশেষ আসমানি কিতাব কোরআনের সুরা বনি ইসরাইলে ফিলিস্তিনে দুবার ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞের কথা উল্লেখ আছে, সেখানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের চলমান ইরান আগ্রাসন কোনো অবস্থাতেই ধর্ম বা ধর্মযুদ্ধ থেকে আলাদা করার উপায় নেই।

আজকের ইসরাইল-ফিলিস্তিন নামক ভূখণ্ডই ছিল হজরত ইবরাহিমসহ কোরআনে বর্ণিত অনেক নবী ও রাসুলের বিচরণ ক্ষেত্র। এখানেই জন্ম হজরত ঈসার। ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের দাবি মতে, এখানেই তাকে শূলে চড়ানো হয়েছিল। এখানেই উদ্ভব ইহুদি ও খ্রিষ্টধর্মের আর এটিই হলো ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের তীর্থ স্থান। এটিই ছিল মুসলমানদের প্রথম কিবলা। শেষ নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর মিরাজ প্রসঙ্গে কোরআনে এক রাতে মক্কা থেকে জেরুসালেম গমনের কথা উল্লেখ আছে। এই জেরুসালেম ঘিরেই খ্রিষ্টান আর মুসলমানদের মধ্যে শত শত বছর চলেছে ধর্মযুদ্ধ।

তাছাড়া বর্তমান ইরান সরকার হলো ১৯৭৯ সালে ইমাম খোমেনির নেতৃত্বে ইসলামি বিপ্লবের ধারাবাহিক সরকার। ইরানে ইসলামি বিপ্লবের শুরু থেকেই একে ধ্বংস ও প্রতিহত করার ষড়যন্ত্র এবং চেষ্টা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল ও আরবের কোনো কোনো রাজ পরিবার। সর্বশেষ গত ডিসেম্বর থেকে ইরানে যখন সরকারবিরোধী বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে, তখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সরাসরি বিরোধীদের প্রতি আহ্বান জানান রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান দখলের এবং তাদের সাহায্যেরও আশ্বাস দেন। বর্তমানে ইরান আগ্রাসনের অন্যতম লক্ষ্য ইরানে ইসলামি বিপ্লবের ধারাবাহিক সরকারের পতন ঘটিয়ে সেখানে তাদের অনুগত সরকার প্রতিষ্ঠা করা। সুতরাং বহুভাবে এ যুদ্ধের সঙ্গে ধর্ম জড়িত।

হজরত ঈসা (আ.)-এর জন্মের অনুমান এক হাজার বছর আগে হজরত দাউদ (আ.) বিশাল এক রাজত্বের অধিকারী ছিলেন। আজকের ফিলিস্তিনি ছিল তার রাজধানী। হজরত দাউদের পর তার ছেলে হজরত সুলায়মান (আ.) সেই সাম্রাজ্যের সম্রাট হন। তিনি তখন জিনদের মাধ্যমে এক বিশাল মসজিদ কমপ্লেক্স নির্মাণ করেন, যার কথা কোরআনে সুরা সাবায় উল্লেখ আছে। আজকে জেরুসালেমের যেখানে বায়তুল আকসা মসজিদ, ডোম অব রক অবস্থিত, সেখানেই ছিল এ মসজিদ। শেষ পর্যন্ত এই মসজিদ ঘিরে ইহুদিদের ধর্ম ব্যবসা ও বাড়াবাড়ি চূড়ান্ত সীমালঙ্ঘনের পর্যায়ে পৌঁছায়। হজরত ঈসার জন্মের ৫৮৬ বছর আগে এই মসজিদ মাটির সঙ্গে গুঁড়িয়ে দেন ব্যাবিলনের রাজা নেবুকড নেজার এবং সেখানকার ইহুদিদের ব্যাপকভাবে হত্যা করা হয়। যারা জীবিত ছিল, তাদের দাস বানিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় ব্যাবিলন, তথা আজকের ইরাকে। এটা সুরা বনি ইসরাইলে বর্ণিত জেরুসালেমে প্রথম ম্যাসাকারের ঘটনা। এরপর ৫৩ বছরের মাথায় খ্রিষ্টপূর্ব ৫৩৯ সালে আজকের ইরান তথা পারস্য বিজয়ী সম্রাট সাইরাস দি গ্রেট ব্যাবিলনীয়দের পরাজিত করে জেরুসালেম দখল করেন। তিনি বিতাড়িত ইহুদিদের আবার সেখানে ফিরে আসার অনুমতি দেন। এরপর ইহুদিরা হজরত সুলায়মান নির্মিত মসজিদের স্থলে আগের মসজিদের অনুকরণে নতুন একটি মসজিদ নির্মাণ করে যাকে ইহুদিরা সেকেন্ড টেম্পল বলে থাকে।

খ্রিষ্টপূর্ব ৩৩২ সালে আলেকজান্ডার জেরুসালেম দখল করেন। এরপর খ্রিষ্টপূর্ব ৬৩ সালে রোমান সেনাপতি পম্পেই গ্রিক হেলেনীয়দের পরাজিত করে জেরুসালেম দখল করেন। জেরুসালেম রোমানদের অধীনে আসার পর থেকে সেখানকার ইহুদিরা বারবার বিদ্রোহ করে। এ অবস্থায় ৭০ খ্রিষ্টাব্দে রোমান সেনাপতি টাইটাস জেরুসালেমে অভিযান পরিচালনা করেন এবং নির্মম গণহত্যার হত্যার মাধ্যমে তাদের বিদ্রোহ দমন করা হয়। কোরআনের সুরা বনি ইসরাইলে এটা জেরুসালেমের দ্বিতীয় ম্যাসাকার হিসেবে উল্লেখ আছে। দুটি ম্যাসাকার সম্পর্কেই কোরআনে বলা হয়েছেÑইহুদিদের চূড়ান্ত বাড়াবাড়ির কারণে তাদের ওপর এই বর্বরতা নেমে আসে। বিদ্রোহ দমনের পর ৫০০ বছর পর্যন্ত রোমানরা ইহুদিদের জেরুসালেমে প্রবেশ নিষিদ্ধ করে রাখে।

ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত ওমর ৬৩৭ সালে বিনাযুদ্ধে জেরুসালেম জয় করেন। এরপর আবার ইহুদিরা সেখানে ফিরে আসার সুযোগ পায়। পরে ৪০০ বছর পর্যন্ত সেখানে ইসলামি সভ্যতার বিকাশ ঘটে। পরবর্তীতে খেলাফত শাসন ব্যবস্থা দুর্বল ও বিভিন্নভাবে বিভক্ত হওয়ায় জেরুসালেমের ওপর প্রভাব হারায় মুসলমানরা।

এ অবস্থায় ফ্রান্সের পোপ আরবান দি সেকেন্ড ১০৯৫ সালে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ক্রুসেড বা ধর্মযুদ্ধ ঘোষণা করেন। এ ধর্মযুদ্ধের উদ্দেশ্য ছিল ৪০০ বছর ধরে মুসলমানদের অধীনে থাকা জেরুসালেমকে উদ্ধার করে সেখানে খ্রিষ্টান রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করা। মুসলমানদের বিরুদ্ধে ধর্মযুদ্ধে খ্রিষ্টানদের অংশ নিতে উদ্বুদ্ধ করার জন্য পোপ আরবান দি সেকেন্ড মুসলমানদের বিরুদ্ধে ইতিহাসের জঘন্যতম মিথ্যাচার ও অপবাদ আরোপ করেন। পোপ আরবানের প্রথম অভিযোগ ছিল খলিফা ওমর জোর করে খ্রিষ্টানদের কাছ থেকে জেরুসালেম দখল করেছিলেন। জেরুসালেম দখলের পর সেখানে পরে মুসলমানদের মাধ্যমে খ্রিষ্টানদের হত্যা, খ্রিষ্টান নারীদের গণধর্ষণ ও দাসে পরিণত করাসহ নিকৃষ্ট সব মিথ্যা প্রচারণা চালিয়ে খ্রিষ্টানদের উত্তেজিত করতে থাকেন ক্রুসেডে যোগ দেওয়ার জন্য। ক্রুসেডে যারা যোগ দেবে, তাদের জান্নাতে যাওয়ারও গ্যারান্টি দেন তিনি। পোপ অভিযোগ করেন, জেরুসালেমের সব গির্জা বেধর্মী মুসলমানরা দখল করেছেন এবং খ্রিষ্টান নারীদের দিয়ে অনৈতিক ব্যবসা করানো হচ্ছে। মুসলমানরা খ্রিষ্টানদের খতনা করাচ্ছেন এবং সেই রক্ত গির্জার বেদিতে ছিটিয়ে দেওয়া হচ্ছে। মুসলমানদের পোপ ঈশ্বরের শত্রু, অভিশপ্ত ও অপবিত্র হিসেবে আখ্যায়িত করেন। পোপের জঘন্য এসব মিথ্যাচারে পুরো ইউরোপে তখন উগ্র ও অশিক্ষিত খ্রিষ্টানদের মধ্যে তীব্র উন্মাদনা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। পোপের নেতৃত্বে হাজার হাজার খ্রিষ্টান খোলা তরবারি নিয়ে মুসলমানদের কচুকাটা করার জন্য তীব্র রক্তপিপাসা নিয়ে ১০৯৬ সালে ফ্রান্স থেকে জেরুসালেমের পথে রওনা দেন। তিন বছরে তিন হাজার মাইল পথ পাড়ি দিয়ে ১০৯৯ সালে জেরুসালেমে পৌঁছে মুসলমানদের রক্তে গোসল করেন খ্রিষ্টান সেই ধর্মযোদ্ধারা। কেবল মুসলমান নয়, সেখানে থাকা ইহুদিরাও তখন রক্ষা পায়নি খৃস্টান ধর্মযোদ্ধাদের পৈশাচিক গণহত্যা থেকে।

খ্যাতিমান খ্রিষ্টান ইতিহাসবিদরা স্বীকার করেছেন, পোপ আরবান দি সেকেন্ড সম্পূর্ণ মিথ্যা অভিযোগে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ক্রুসেড ঘোষণা করেছিলেন। নামকরা খ্রিষ্টান ইতিহাসবিদ স্টিভেন রানসিম্যান তার ‘এ হিস্ট্রি অফ দ্য ক্রুসেডস’ বইতে মুসলমানদের বিরুদ্ধে পোপের ক্রুসেডকে ‘মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। এভাবে থমাস অ্যাসব্রিজ, আর্নল্ড জে. টয়েনবি, থমাস মাস্টনাকসহ অনেক ইতিহাসবিদ, গবেষক পোপ আরবানের তীব্র সমালোচনা করেছেন মিথ্যা অভিযোগে ধর্মযুদ্ধ ঘোষণার জন্য।

খ্রিষ্টানরা ধর্মযুদ্ধের মাধ্যমে জেরুসালেম দখলের ৮৮ বছর পর ১১৮৭ সালে মুসলিম সেনাপতি গাজী সালাহউদ্দিন আইউবী বিনা রক্তপাতে আবার জেরুসালেম জয় করেন । এরপর ১০০ বছর পর্যন্ত ইউরোপের খ্রিষ্টান শাসকরা মুসলমানদের বিরুদ্ধে ধর্মযুদ্ধ চালিয়ে যান জেরুসালেমকে আবার দখলের জন্য, কিন্তু তারা ব্যর্থ হন।

কালের পরিক্রমায় জেরুসালেম তুরস্কের উসমানীয় খেলাফতের অধীনে আসে । কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধে উসমানীয় খেলাফতের পরাজয় ও পতনের পর তাদের বিশাল সাম্রাজ্য ভাগ করে নেয় ইউরোপ। জেরুসালেম তখন বৃটেনের অধীনে আসে। এরপর বেলফোর ঘোষণা অনুসারে সারা বিশ্ব থেকে ইহুদিদের ফিলিস্তিনে এনে জড়ো করা ও ইসরাইল রাষ্ট্র গঠনের কার্যক্রম এগিয়ে চলে। আরবরা এর প্রতিবাদ করে এবং তখন থেকেই শুরু হয় ইসরাইল-আরব দ্বন্দ্ব ও সংঘাত।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিজয়ী শক্তি যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও ব্রিটেনের নেতৃত্বে ফিলিস্তিনিদের ওপর গণহত্যা চালিয়ে, তাদের বাড়িঘর, জমিজমা থেকে তাড়িয়ে সেখানে ইহুদিদের জন্য গায়ের জোরে ইসরাইল নামক একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা হয়। জাতিসংঘকে ব্যবহার করে ১৯৪৮ সালের ১৪ মে সন্ত্রাসী কায়দায় ইসরাইল নামক রাষ্ট্রের গোড়াপত্তনের পরের দিন থেকে ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত আরবরা ইসরাইলের বিরুদ্ধে চারটি বড় যুদ্ধ করে কিন্তু প্রতিবারই তারা পরাজিত হয়। কারণ আজ যেমন যুক্তরাষ্ট্র ইসরাইল রাষ্ট্রকে রক্ষার জন্য যুদ্ধ করছে, ঠিক একইভাবে অতীতে প্রতিটি যুদ্ধে ইসরাইলকে রক্ষায় এগিয়ে আসে যুক্তরাষ্ট্রসহ ইসরাইলের পশ্চিমা মিত্ররা।

ইসরাইল মূলত ইহুদিদের জন্য একটি ধর্মভিত্তিক জাতিরাষ্ট্র। ধর্মভিত্তিক এই জাতিরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য বিশ্বের যারাই হুমকি হিসেবে আবির্ভূত হবে, তারা বিশ্বের যে প্রান্তেই থাকুক না কেন, তাদের ইসরাইল হত্যা করবে-এটা নেতানিয়াহু সরকারের দ্ব্যর্থহীন ঘোষণা। ইসরাইল রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্যই যুক্তরাষ্ট্র দশকের পর দশক ধরে আরব রাষ্ট্রগুলো ও তাদের তেল সম্পদ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছে।

ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের স্পষ্ট ঘোষণা হল ইরানকে তারা কোনো অবস্থাতেই পারমাণবিক বোমার অধিকারী হতে দেবে না। শুধু তাই নয়, ইসরাইলে হামলা করা যায় ইরানের কাছে এমন কোন ব্যালিস্টিক মিসাইলও থাকতে পারবে না। এখানেই শেষ নয়, ইরানকে অর্থনৈতিকভাবেও তারা শক্তিশালী হতে দেবে না। অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী ইরানকেও হুমকি মনে করে ইসরাইল। এসব শর্ত মেনে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আত্মসমর্পণ না করার কারণে ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ইসরাইল একযোগে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছে। যেহেতু এ যুদ্ধ ইসরাইল রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য এবং যেহেতু ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ধর্মের ওপর ভিত্তি করে, তাই এ যুদ্ধের পেছনে ধর্ম একটি বড় কারণ তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও স্বীকার করেছেন, ইসরাইলের স্বার্থে এবং ইসরাইলের চাপের কারণে তারা ইরানে হামলা চালিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের সাম্প্রতিক ইনস্টাগ্রামে প্রকাশিত একটি ছবি নিয়ে বিশ্বব্যাপী আলোচনা চলছে। ছবিতে দেখা যাচ্ছে-হেগসেথের গায়ে এমন ক্রসচিহ্নিত উল্কি আঁকা রয়েছে, যেটি ১১ শতকে শুরু হওয়া খ্রিষ্টান ক্রুসেডাররা ব্যবহার করতেন। পিট হেগসেথের এই ছবি নিয়ে ব্রিটেনের বিখ্যাত ইনডিপেন্ডে পর্যন্ত ৬ মার্চ একটি কলাম প্রকাশ করেছে। ইনডিপেন্ডেন্ট লিখেছে-‘ইসরাইল আমেরিকায় বসে যারা এই যুদ্ধ শুরু করেছে, তারা ৪৫ বছর ধরে পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে যুদ্ধের ময়দান বানিয়েছে মূলত ‘একটা চিন্তা থেকে’। তাদের মূল চিন্তা হচ্ছে, এটা ‘শেষ জামানার যুদ্ধ’, War of the End Times, ‘ঈসা মাসিহ চলে আসার যুদ্ধ’।

জেরুসালেমে নিযুক্ত আমেরিকান রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি যুদ্ধ শুরুর আগে এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ইসরাইল যদি আশপাশের আরব রাষ্ট্রগুলো দখল করে নেয়, তবে তাতে তার সমর্থন থাকবে। তিনি দাবি করেন, নীল নদ থেকে দজলা নদী পর্যন্ত বিস্তৃত বিশাল ভূখণ্ডের ওপর ইহুদি জনগণের ‘বাইবেলসম্মত অধিকার’ রয়েছে। এই সীমানার মধ্যে বর্তমান জর্ডান, সিরিয়া, লেবানন এবং সৌদি আরব ও ইরাকের কিছু অংশ অন্তর্ভুক্ত।

ইসরাইলের লক্ষ্য বৃহত্তর ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। বৃহত্তর ইসরাইল রাষ্ট্র বলতে তারা বুঝিয়ে থাকে নবী হজরত দাউদ ও হজরত সুলায়মানের রাজত্বের সীমানা। হজরত সুলায়মান ও দাউদের বিশাল রাজত্বের সীমানা আজকে ফিলিস্তিনের উত্তরে লেবানন, সিরিয়া ছাড়িয়ে তুরস্কের আদানা পর্যন্ত। দক্ষিণে এর সীমানা মিসরের নিল নদ পর্যন্ত। পূর্ব-দক্ষিণে এর রাজ্যের সীমানা জর্ডান, ইরাক, কুয়েত, সৌদি আরব ছাড়িয়ে ইয়েমেন পর্যন্ত।

ইসরাইলের লক্ষ্য ধাপে ধাপে বৃহত্তর ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। প্রথম ধাপে রয়েছে লেবাননের লিতানী নদীর দক্ষিন উপকূল পর্যন্ত এবং সিরিয়ার দক্ষিনের অংশবিশেষ দখল করে বর্তমান ইসরাইল রাষ্ট্রের সাথে একীভূত করা। এ পরিকল্পনায় বর্তমান গাজা এবং পশ্চিমতীরকেন্দ্রিক যে নামেমাত্র ফিলিস্তিন রাষ্ট্র আছে তাও মিশে যাবে বৃহত্তর এই ইসরাইল রাষ্ট্রের সীমানায়।

বর্তমানে ইসরাইলের প্রধান লক্ষ্য হজরত সুলায়মান যেখানে মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন, সেখানে তাদের ভাষায় তৃতীয় টেম্পল নির্মাণ করা। এই লক্ষ্যে তারা গঠন করেছে টেম্পল ইনস্টিটিউট। টেম্পল উদ্বোধনের জন্য বাছাই করে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে রাব্বি। টেম্পলের নকশাও প্রকাশ করা হয়েছে। টেম্পল উদ্বোধনের রিচুয়াল পালনের জন্য ২০২২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস থেকে আনা হয়েছে পাঁচটি লাল গরু। এটা কোন কল্পকাহিনী নয়, বরং জেরুসালেম পোস্টসহ ইসরাইলের বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে এ বিষয়ে নিয়মিত খবর প্রকাশিত হচ্ছে।

পেট্রোলিয়াম রাজনীতি

১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাঙনের পর প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন রাশিয়াকে আবার যুক্তরাষ্ট্রের নতুন প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দাঁড় করান। অন্যদিকে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক ও সামরিক ক্ষেত্রে রাতারাতি উত্থান ঘটে চীনের। চীন ও রাশিয়ার যৌথ উত্থান ও বন্ধুত্ব ক্রমেই ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে একটি মেরূকরণে রূপ নিতে থাকে। রাশিয়া ও চীনের এই যৌথ উত্থান বিশ্বব্যাপী যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য, বিশেষ করে, ডলারকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। এ অবস্থায় প্রথম ট্রাম্প প্রশাসন রাশিয়াকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ঘোষণা করে এবং রাশিয়ার বিরুদ্ধে সম্ভাব্য পারমাণবিক যুদ্ধের জন্যও প্রস্তুতি নেয়। এ প্রস্তুতির অংশ হিসেবে ডোনাল্ড ট্রাম্প স্বল্প ক্ষমতার বা টেকটিক্যাল পারমাণবিক বোমা বানানোর নির্দেশ দেন এবং বানিয়েও ফেলা হয়। এর নাম W76-2। এ ছাড়া চীন-রাশিয়াকে মোকাবেলায় যুক্তরাষ্ট্র তখন পারমানবিক অস্ত্র কর্মসূচী সম্প্রসারণ ও আধুনিয়াকনের পদক্ষেপ গ্রহণ করে।

বাইডেন প্রশাসনের সময় কৌশল নেওয়া হয় প্রথমে রাশিয়ার অর্থনৈতিক ও সামরিক মেরুদণ্ড চীর তরে ভেঙে দেওয়ার। ইউক্রেন যুদ্ধ ছিল এ পরিকল্পনার অংশ। এরপর তারা চীন ঠেকানোর পরিকল্পনা করে। তবে এ পরিকল্পনা পূর্ণমাত্রায় সফল হয়নি; বরং চীনের অগ্রযাত্রা দুর্বার গতিতে চলতে থাকে। এ অবস্থায় বাইডেন প্রশাসন রাশিয়ার পরিবর্তে চীনকে তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আমলে নেয়। ২০২১ সালে সামিট ফর ডেমোক্রেসি আয়োজনের মাধ্যমে বাইডেন প্রশাসন চীনের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় স্নায়ুযুদ্ধ শুরু করে।

ট্রাম্প প্রশাসন প্রথমবার ক্ষমতায় থাকার সময় চীনের বিরুদ্ধে বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু করে এবং দ্বিতীয়বারও একই পথে হাটে। কিন্তু চীন ট্রাম্পের কাছে মাথানত না করে রেয়ার আর্থ রপ্তানি বন্ধ করাসহ যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে পাল্টা আঘাত করে। শেষ পর্যন্ত ট্রাম্প প্রশাসন চীনের বিরুদ্ধে বাণিজ্যযুদ্ধে পিছু হটতে বাধ্য হয়।

এবার ট্রাম্প প্রশাসন চীনকে জ্বালানি তেলের মাধ্যমে পথে বসানোর পরিকল্পনা করে। চীন বিশ্বের সবচেয়ে বড় জ্বালানি তেল আমদানিকারক ও ভোক্তা। ২০২৫ সালে চীন দৈনিক ১ কোটি ১৬ লাখ ব্যারেল জ্বালানি তেল আমদানি করেছে। এই জ্বালানি তেল তারা আমদানি করে থাকে রাশিয়া, সৌদি আরব, ইরান, ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান ও মালয়েশিয়া থেকে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে চীন ভেনেজুয়েলা থেকে খুবই কমদামে প্রচুর পরিমাণ জ্বালানি তেল আমদানি করত। ভেনেজুয়েলার রপ্তানি করা জ্বালানি তেলের প্রায় ৭০ ভাগ চীন আমদানি করত এবং এটাই ভেনেজুয়েলার বৈদেশিক আয়ের প্রধান উৎস।

জানুয়ারি মাসে যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলা দখলের আগ পর্যন্ত চীন দৈনিক তিন লাখ থেকে পৌনে পাঁচ লাখ ব্যারেল পর্যন্ত অপরিশোধিত জ্বালানি তেল সংগ্রহ করত। বর্তমানে এটা বন্ধ হয়ে গেছে এবং বিকল্প উপায়ে প্রচলিত বাজারদরে চীন সেখান থেকে সামান্য তেল পাচ্ছে। ভেনেজুয়েলায় বিশ্বের সবচেয়ে বেশি, তথা ৩০২ বিলিয়ন ব্যারেল প্রমাণিত অপরিশোধিত জ্বালানি তেল মজুত রয়েছে। ভেনেজুয়েলার সমাজতান্ত্রিক সরকার যুক্তরাষ্ট্রকে বের করে দেওয়ার পর বিপুল পরিমাণ এই জ্বালানি তেলের ওপর ক্রমাগত আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে যাচ্ছিল চীন। সম্প্রতি চীন ভেনেজুয়েলাকে এক বিলিয়ন ডলার ঋণ দেয় এবং তেলের বিনিময়ে সে ঋণ পরিশোধের সুযোগ দেয় ভেনেজুয়েলাকে। ডোনাল্ড ট্রাম্প ভেনেজুয়েলা দখলে নিয়ে সেখানে চীনের প্রভাব বিস্তারের উদ্যোগ নস্যাৎ করে দেন।

বিশ্বে জ্বালানি তেল মজুতের দিক দিয়ে ইরানের স্থান তৃতীয় এবং এর পরিমাণ ২০৮ বিলিয়ন ব্যারেল। চীন ২০২৫ সালে ইরান থেকে দৈনিক গড়ে ১৪ লাখ ব্যারেল জ্বালানি তেল আমদানি করে। নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ইরানের জ্বালানি তেলের ৯০ ভাগই কেনে চীন। ২০২৫ সালে চীন যত অপরিশোধিত জ্বালানি তেল কিনেছে, তার ১৩-১৪ শতাংশ কিনেছে ইরান থেকে।

গত ৪ মার্চ যুক্তরাষ্ট্রের ব্লুমবার্গের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান গত ৪৫ বছর ধরে ২০০ বিলিয়ন ডলারের একটি শ্যাডো ইকোনমি গড়ে তুলেছে চলমান যুদ্ধের কথা চিন্তা করে। আর বিশাল এই শ্যাডো ইকোনমি তারা তৈরি করেছে গোপনে চীনের কাছে সস্তায় জ্বালানি তেল বিক্রির মাধ্যমে। এ খবর বেশ আগেই যুক্তরাষ্ট্র জানতে পারে এবং তা বন্ধের উপায় খুঁজতে থাকে। ট্রাম্প প্রশাসন ইরান দখলের মাধ্যমে ভেনেজুয়েলার মতো ইরানের তেলের ওপর নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পরিকল্পনা করে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল-বাণিজ্যের ওপরও নিয়ন্ত্রণ নিতে চেয়েছে ওয়াশিংটন। আর এভাবে তেলের ওপর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে চীনের অর্থনৈতিক ও সামরিক মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়া এ যুদ্ধ শুরুর অন্যতম কারণ।

লেখক : সহকারী সম্পাদক, আমার দেশ

ভেঙে পড়ছে ইসরাইলের জীবন-সমাজ

মোদির হুংকার ও ইতিহাসের বাস্তবতা

সরকারের মধুচন্দ্রিমা কাল ও অনাকাঙ্ক্ষিত প্রবণতা

জিয়াউর রহমানের সাফল্যের রহস্য

ইরান যুদ্ধ কংগ্রেসের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রভাব ফেলবে

জুলাই বিপ্লব : রাষ্ট্র পুনর্গঠনের অঙ্গীকার

ইরানের অনমনীয় নেতৃত্ব ও আরব দেশগুলোর বিভ্রমের মৃত্যু

মিসর থেকে শিক্ষা

ক্ষমতা বদলালে আনুগত্যেরও রঙ বদলায়

বাংলাদেশে জাকাতের পূর্ণ ফল পেতে করণীয়