বাংলাদেশে ১৭ বছর অপশাসন চালানোর পর শেষ পর্যন্ত জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে পৃথিবীর ইতিহাসের এক ভয়াবহ স্বৈরশাসনের অবসান ঘটে। সেই গণঅভ্যুত্থানে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক কোনো একক সংগঠিত প্ল্যাটফর্ম না থাকা সত্ত্বেও কোনো দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি ছাড়াই হাজারো শিক্ষার্থী রাস্তায় নেমে আসেন। এই অভিজ্ঞতা থেকেই পরবর্তী সময়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অ্যালামনাইদের একটি কার্যকর ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্ল্যাটফর্মে যুক্ত করার চিন্তা সামনে আসে। সেই ধারাবাহিকতায় গড়ে ওঠে প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (পুনাব)। পুনাব নিয়ে লিখেছেন সামিন ইয়াসার
জুলাইয়ের সঙ্গে প্রতিষ্ঠাতাদের সম্পর্ক
২০২৪-এর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের একটা পর্যায়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরা দেখেছেন ঢাবির হলগুলোতে বারুদের গন্ধে তাদের বন্ধুরা টিকতে পারছেন না। চারদিকে মৃত্যুর আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছিল। অদৃশ্য এক প্রাকৃতিক শক্তি তাদের মধ্যে এমন অনুভূতি তৈরি করেছিল, ঢাবির হল থেকে কোনো রকমে জীবন নিয়ে পালিয়ে আসা, সামনে ভেসে বেড়ানো ভিডিও ও স্থিরচিত্রের মানুষগুলো যেন তাদের আপন ভাই, বেস্টফ্রেন্ড কিংবা খুব কাছের সহপাঠী। এ যেন ছিল ২৫ মার্চ ১৯৭১-এর আরেক কালরাত। সেই থেকেই তারা বুকে নিয়ে নিল, পেছনে না তাকিয়ে শেষ দেখে ছাড়ার জেদ। পুনাবের প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্যদের প্রায় সবাই শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলনকে সমন্বয় করতে সম্পৃক্ত ছিল।
২০২৪ সালের আন্দোলনকে গণঅভ্যুথানে রূপ দিতে মাঠের সক্রিয়তার পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আন্দোলনের বিভিন্ন তথ্য, ছবি, ভিডিও ও জরুরি বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে ‘বুয়েটিয়ান’, ব্রিঙ্গিং জাস্টিস টু ইউ, ‘বাংলাদেশ ব্ল্যাক হ্যাট হ্যাকার্স’সহ বিভিন্ন জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকভিত্তিক পেজ সক্রিয় ছিল। শিক্ষার্থীরা এসব পেজে তথ্য পাঠাতেন এবং সেগুলোর মাধ্যমে সারা দেশের আন্দোলনের খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ত।
এমনই একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক তথ্য প্রচারকারী গুরুত্বপূর্ণ সোশ্যাল মিডিয়া পেজ, যা দীর্ঘ সময় ধরে কয়েকজন সাবেক শিক্ষার্থীর দ্বারা পরিচালিত হতো, জুলাই আন্দোলন চলাকালে এটির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন পরবর্তীকালে পুনাবের প্রতিষ্ঠাতা রায়হান পাটোয়ারী এবং সহ-প্রতিষ্ঠাতা আল মাহমুদ আবির। আন্দোলনের সময় তারা জার্মানিতে অবস্থান করায় স্বৈরাচারের নাগালের বাইরে ছিল এবং ওই পেজ ও টেলিগ্রাম চ্যানেলের জন্য তথ্য সংগ্রহ, বুদ্ধিভিত্তিক দিকনির্দেশনা লেখা ও প্রকাশ করার নেপথ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। শিক্ষার্থীরা রাতে অনলাইন মিটিংয়ের মাধ্যমে কর্মসূচি ঠিক করতেন, নিজেদের গ্রুপে জানিয়ে দিতেন এবং বিদেশের অ্যাডমিনরা ব্যক্তিগতভাবে সেগুলো সংগ্রহ করে ছড়িয়ে দিতেন। এ কার্যক্রমে দেশ থেকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের কয়েকজন যোগাযোগ রেখে সার্বক্ষণিক সাহায্য করেন।
গণঅভ্যুত্থানের পর সচেতন শিক্ষার্থী এবং অ্যালামনাইদের মধ্যে একটি উপলব্ধি তৈরি হয়, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অ্যালামনাইদের সমন্বয়ে এমন একটি প্ল্যাটফর্ম প্রয়োজন, যা জুলাইয়ের মূল্যবোধ ধারণ করার পাশাপাশি শিক্ষা, পলিসি, প্রযুক্তি, নেতৃত্ব, সংস্কৃতি ও জাতীয় বিভিন্ন বিষয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মসূচি পরিচালনা করবে। সেই লক্ষ্যেই জুলাই আন্দোলনে রাস্তায় সরাসরি সক্রিয় ভূমিকা রাখা এবং অনলাইনে তথ্য ও সহায়তা দেওয়া আগ্রহী শিক্ষার্থী ও অ্যালামনাইদের নিয়ে একটি কার্যকর সাংগঠনিক কাঠামো তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ২১ অক্টোবর ২০২৪ আনুষ্ঠানিকভাবে পুনাবের যাত্রা শুরু হয়।
নেতৃত্ব, কাঠামো ও সাংগঠনিক বিস্তার
বর্তমানে পুনাব দেশের বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে পরিচালিত হচ্ছে। প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন রায়হান পাটোয়ারী। তিনি ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করে উচ্চশিক্ষার জন্য জার্মানিতে যান এবং স্নাতক সম্পন্ন করে বর্তমানে সেখানে একটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিকস ও ইমারসিভ প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছেন।
সংগঠনকে শুরু থেকে সার্বিক সহযোগিতা ও পরামর্শ দেওয়ার জন্য প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে যুক্ত রয়েছেন অতীশ দীপঙ্কর বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান শামসুল আলম লিটন। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় আন্তর্জাতিক ও প্রবাসী কমিউনিটিকে সম্পৃক্ত করার ক্ষেত্রে তার ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য।
পুনাবের বর্তমান নেতৃত্বে সিনিয়র সহসভাপতি হিসেবে রয়েছেন আসিফ মোহাম্মদ বিন আলম, সহসভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন : রফিকুল ইসলাম, আল মাহমুদ আবির ও তারেক হোসাইন। সাধারণ সম্পাদকের পদ শূন্য থাকায় সিনিয়র সহকারী সাধারণ সম্পাদক আমিন আল রাজি ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন। ফোরাম ম্যানেজমেন্ট সম্পাদকের দায়িত্বে রয়েছেন এ কে এম ফাহিম।
এছাড়া সংগঠনের শৃঙ্খলা রক্ষায় রয়েছে একটি পৃথক শৃঙ্খলাবিষয়ক কমিটি। সেখানে সিনিয়র অ্যালামনাই সদস্য হিসেবে রয়েছেন ফার্মাসিস্ট ড. নূর আলম, সাংবাদিক ও অ্যাকটিভিস্ট মহিউদ্দিন আহমেদ, প্রকৌশলী হোসাইন তালিবুল ইসলাম, প্রকৌশলী রেজাউল করিম রিগ্যান, প্রযুক্তিবিদ তানভীর আমিন বাপ্পি ও ব্যবসায়ী ওয়াইস রহমান।
পুনাবের কার্যক্রমকে বিষয়ভিত্তিকভাবে বিস্তৃত করতে বর্তমানে সাতটি ফোরাম পরিচালিত হচ্ছে : ডিবেট ফোরাম, টেকনোলজি অ্যান্ড ইনোভেশন ফোরাম, স্পোর্টস অ্যান্ড ফিটনেস ফোরাম, ইন্টারন্যাশনাল মডেল ইউনাইটেড ফোরাম, অ্যালামনাই অ্যাফিলিয়েশন ফোরাম, এইচআর অ্যান্ড কমিউনিকেশন ফোরাম এবং পিআর অ্যান্ড ডিজিটাল এনগেজমেন্ট ফোরাম। প্রতিটি ফোরামের নিজস্ব নির্বাহী কমিটি এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিনিধি রয়েছে। আগ্রহীরা পুনাবের ওয়েবসাইটের মাধ্যমে সদস্যপদের আবেদন করতে পারেন; পরে ভাইভা ও যোগ্যতা যাচাইয়ের মাধ্যমে বিভিন্ন ফোরামে সদস্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
উল্লেখযোগ্য কার্যক্রম
যাত্রা শুরুর পরপরই প্রথম সংগঠন হিসেবে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের তথ্য সংগ্রহ করে তালিকা প্রকাশ করে পুনাব। একই সঙ্গে শহীদ পরিবার ও আহত শিক্ষার্থীদের তথ্য সংগ্রহ এবং সাধ্যমতো সহযোগিতার কাজও সংগঠনটি চালিয়ে যাচ্ছে।
২০২৪ সালের ৮ ডিসেম্বর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে সুশাসন ও শিক্ষানীতি নিয়ে ‘শেপিং টুমরো : আ কোলাবোরেটিভ ডায়ালগ অন এডুকেশন অ্যান্ড গুড গভর্ন্যান্স’ শীর্ষক একটি সংলাপের আয়োজন করা হয়। একই বছরের ১২ ডিসেম্বর বৈশ্বিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতে কী ধরনের সংস্কার প্রয়োজন, তা নিয়ে আয়োজিত হয় ‘শেপিং বাংলাদেশ আইসিটি ফিউচার’ পলিসি ডায়ালগ। এতে দেশের আইসিটি খাতের অভিজ্ঞ অ্যালামনাই, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগের প্রধান ও শিক্ষক এবং কম্পিউটার ক্লাবের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক ড. ইউসুফ মাহবুবুল ইসলাম। এর কিছুদিন পর ‘লেকচার অন ইউসেজ অব আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স : দ্য ফিউচার অব বাংলাদেশ’ শীর্ষক একটি সেমিনার আয়োজন করে পুনাব।
জুলাই ঘোষণাপত্র প্রকাশের আগে জাতীয় প্রেস ক্লাবে পুনাব আয়োজন করে ‘জুলাই ঘোষণাপত্র নিয়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবনা’ শীর্ষক আলোচনা সভা, যেখানে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা অংশ নেন। জুলাই আন্দোলনে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী শিক্ষার্থীদের অবদান তুলে ধরতে শিল্পকলা একাডেমিতে সাত দিনব্যাপী আয়োজন করা হয় ‘ব্রেভ ডটার্স অব জুলাই’। একইভাবে জুলাইয়ের স্মৃতি ও অভিজ্ঞতা নিয়ে ‘উত্তাল জুলাই, অমলিন স্মৃতি : অভ্যুত্থান ও আমরা’ শীর্ষক আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়।
ফিলিস্তিন ইস্যুতে বাংলাদেশের সম্ভাব্য নীতিগত অবস্থান নিয়ে আলোচনা করতে পুনাব আয়োজন করে ‘রেজিস্টিং ইনজাস্টিস : ফাইন্ডিং স্ট্র্যাটেজিস ফর আ প্যালেস্টাইন-সাপোর্টিভ বাংলাদেশ’ শীর্ষক পলিসি ডায়ালগ। ২০২৫ সালের নভেম্বরে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে আয়োজন করা হয় ‘বাংলাদেশ নেক্সট : ইয়ুথ এমপাওয়ারমেন্ট ডায়ালগ’। শিক্ষার্থীদের মাদক থেকে দূরে এবং শরীর গঠনে উৎসাহিত করতে ইন্টার ইউনিভার্সিটি বডিবিল্ডিং ও ফিটনেস চ্যাম্পিয়নশিপ প্রতিযোগিতা ২০২৫ আয়োজন করা হয়, যা প্রতিবছর অব্যাহত রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।
২০২৬ সালের ১৩ জুলাই প্রথমবারের মতো আয়োজন করা হয় ‘জুলাই মেমোরিয়াল অ্যাওয়ার্ড’, যেখানে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহতদের পরিবার ও আহত শিক্ষার্থীদের সম্মাননা দেওয়া হয়। একই সঙ্গে ২৮টি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে পুনাব আয়োজন করে ‘পিপলস ম্যান্ডেট’ শীর্ষক জাতীয় বিতর্ক প্রতিযোগিতা। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের জুলাই শহীদদের পরিচিতি নিয়ে একটি প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। পাশাপাশি তাদের স্মরণে প্রকাশিত হয় ‘প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির শহীদ গাথা : রক্তে লেখা চব্বিশ’ শীর্ষক স্মরণিকা। এই বছর থেকে প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিগুলো ঠিকমতো জুলাইকে ধারণ করছে কি না পুনাব সেটি নিয়ে তথ্য সংগ্রহ করে প্রতিবছর জুলাই মনিটরিং রিপোর্ট প্রকাশ করবে। এ বছরের রিপোর্ট তৈরিতে তথ্য সংগ্রহের কাজ চলমান রয়েছে ।
সদ্য স্নাতক সম্পন্ন করা শিক্ষার্থীদের দক্ষতা উন্নয়নের বিষয়েও কাজ শুরু করেছে পুনাব। সম্প্রতি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগের ৩০ জন নবীন স্নাতককে ওয়েব ডেভেলপমেন্ট, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ইমারসিভ প্রযুক্তিবিষয়ক প্রশিক্ষণের সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে সংগঠনটির পক্ষ থেকে।
চট্টগ্রামেও পুনাবের কার্যক্রম ক্রমেই বিস্তৃত হয়েছে। সেখানকার বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বার্ষিক ইফতার মাহফিল, জুলাই স্মৃতি ফুটবল টুর্নামেন্ট, বিভিন্ন সংকটে বাংলাদেশের করণীয় নিয়ে পলিসি ডায়ালগ, সাংবাদিকদের চোখে জুলাই প্রদর্শনীসহ শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে বিভিন্ন প্রতিযোগিতা ও অনুষ্ঠান আয়োজন করে আসছে।
বাকি অংশ পড়ুন আমার দেশ অনলাইনে
শিক্ষার্থীদের ইতিবাচক উদ্যোগকে উৎসাহিত করাও পুনাবের অন্যতম লক্ষ্য। এর অংশ হিসেবে সাম্প্রতিক বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের সুনাম বৃদ্ধি করায় ইউআইইউ মার্স রোভার টিমকে সম্মাননা স্মারক দিয়েছে সংগঠনটি। এছাড়া পুনাব সদস্যদের মধ্যে নেতৃত্বের দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ এবং প্রতিবছর রমজানে ইফতার মাহফিল, মাসিক সাধারণ সভা, সাপ্তাহিক বিতর্কচর্চা ইত্যাদি আয়োজন নিয়মিতই হয়ে থাকে ।
বার্ষিক জুলাই মেমোরিয়াল অ্যাওয়ার্ড
জুলাইয়ের স্মৃতিকে সর্বজনীন করা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে এর তাৎপর্য তুলে ধরার পাশাপাশি বিভিন্ন ইতিবাচক ও সৃজনশীল কাজকে উৎসাহিত করতে পুনাব প্রতিবছর জাতীয়ভাবে জুলাই মেমোরিয়াল অ্যাওয়ার্ড আয়োজনের পরিকল্পনা করেছে। ২০২৬ সালের আয়োজনে ৯টি ক্যাটাগরিতে বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাবকে তাদের বিগত এক বছরের কার্যক্রমের ভিত্তিতে পুরস্কৃত করা হয়। এর মাধ্যমে পুনাব শিক্ষার্থীদের পাঠ্যক্রমবহির্ভূত কার্যক্রমকে আরো উৎসাহিত করতে চায়।
এ বছর সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের পুরস্কার পায় নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি সাংস্কৃতিক সংগঠন (এনএসইউএসএস), ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি কালচারাল ক্লাব এবং ডিআইইউ কালচারাল ক্লাব। ফটোগ্রাফি ক্যাটাগরিতে পুরস্কৃত হয় ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি ফটোগ্রাফি ক্লাব, আইইউবিএটি ফিল্মস অ্যান্ড ফটোগ্রাফি এবং ডিআইইউ ফিল্ম অ্যান্ড ফটোগ্রাফি ক্লাব। মিডিয়া ও ক্রিয়েটিভ ক্যাটাগরিতে স্বীকৃতি পায় নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি এথিকস অ্যান্ড ডাইভারসিটি ক্লাব, ডিআইইউ ক্রিয়েটিভ পার্ক এবং ইউএপি ড্রামা ক্লাব।
কম্পিউটার সায়েন্স ও প্রোগ্রামিং ক্যাটাগরিতে পুরস্কৃত হয় ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি কম্পিউটার অ্যান্ড প্রোগ্রামিং ক্লাব, গ্রিন ইউনিভার্সিটি কম্পিউটার ক্লাব এবং বিইউবিটি আইটি ক্লাব। প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনে স্বীকৃতি পায় আইইউবিএটি ইনোভেশন অ্যান্ড এন্টারপ্রেনারশিপ সেন্টার, আইইইই আইআইইউসি স্টুডেন্ট ব্রাঞ্চ এবং প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটি রোবোটিকস ক্লাব।
ক্যারিয়ার উন্নয়ন ক্যাটাগরিতে স্বীকৃতি পায় সাউথইস্ট মডেল ইউনাইটেড নেশনস ক্লাব, বিইউএফটি ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্ট ক্লাব এবং গণ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্ট ক্লাব । স্বেচ্ছাসেবা ও সামাজিক কল্যাণে পুরস্কৃত হয় বিইউএফটি রোভার স্কাউট গ্রুপ, ইউইউ এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড এসডিজি ক্লাব এবং ইউএসটিসি ইউনাইটেড প্রগ্রেস ফাউন্ডেশন। ক্রীড়া ক্যাটাগরিতে স্বীকৃতি পায় ইউআইইউ স্পোর্টস ক্লাব, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি গেমস অ্যান্ড স্পোর্টস ক্লাব এবং এমআইইউ স্পোর্টস ক্লাব।
জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিও দেওয়া হয়। আগ্রাসনবিরোধী সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের জন্য ইনকিলাব মঞ্চ, জুলাই-সংক্রান্ত নথি সংগ্রহ ও সংরক্ষণের জন্য জুলাই রেভল্যুশনারি অ্যালায়েন্স এবং জেন-জি প্রজন্মকে উদ্ভাবনে উৎসাহিত করার জন্য বাংলা ইনোভেটরকে বিশেষ ক্যাটাগরি অ্যাওয়ার্ড ২০২৬ দেওয়া হয়।
শিক্ষকদের অবদানের স্বীকৃতি
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষকও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাদের সেই অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০২৬ সালে ২৫ জন শিক্ষককে শিক্ষক পুরস্কার ২০২৬ দেবে পুনাব।
এই সম্মাননা পেয়েছেন নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবদুল হান্নান চৌধুরী, সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক ড. ইউসুফ মাহবুবুল ইসলাম, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ড. মো. তৌফিকুল ইসলাম মিথিল, সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ড. রমিত আজাদ, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ড. মাহবুব হোসাইন, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির প্রক্টর ড. শাইখ মুহাম্মদ আল্লায়ার, বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের সাবেক সহকারী অধ্যাপক মোহাম্মদ আবদুল হান্নান, প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটির কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগের চেয়ারম্যান মরহুম সৈয়দ মোহাম্মদ মিনহাজ হোসাইন (তন্ময়) এবং ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইউনিভার্সিটি চট্টগ্রামের সহযোগী অধ্যাপক ও আইন বিভাগের চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম।
একইভাবে সম্মাননা পেয়েছেন অতীশ দীপঙ্কর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং আইন বিভাগের চেয়ারম্যান এএম মো. সাঈদ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সহকারী অধ্যাপক ও সহকারী প্রক্টর মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম, সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটির সহকারী অধ্যাপক রিগ্যান আহমেদ এবং ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড টেকনোলজির সহযোগী অধ্যাপক ড. কে এম এন সারওয়ার ইকবাল, ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি চট্টগ্রামের সহকারী অধ্যাপক সৈয়দ বিল্লাল হোসাইন, ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইউনিভার্সিটি চট্টগ্রামের সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ শাইফুর রহমান চৌধুরী ও আবদুল্লাহ মো. আহসানুল মামুন, লিডিং ইউনিভার্সিটি সিলেটের সহকারী অধ্যাপক মো. জিহাদুল ইসলাম মনি, ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক ড. মাহতাব উদ্দিন, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যান্ড টেকনোলজির সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ শওকত আলী এবং নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির সিনিয়র লেকচারার শাবনিন রহমান শর্না, ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশের প্রভাষক আন্দালিব নাভিন চৌধুরী ও মেহেদী বিন সামাদ, সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটির প্রভাষক মাহাপারা সানজানা, ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির প্রভাষক আহমদ আসিফ সামি এবং বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের প্রভাষক মো. তৌহিদুল ইসলাম জিহাদি।
আগামীর পরিকল্পনা
পুনাবের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কেন্দ্রে রয়েছে দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কমিউনিটির সার্বিক কল্যাণ নিশ্চিত করা এবং তাদের যৌক্তিক অধিকার ও মতামতকে জাতীয় পর্যায়ে আরো কার্যকরভাবে তুলে ধরা। দীর্ঘদিন ধরে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও তাদের শিক্ষার্থীদের নিয়ে সমাজের একটি অংশে যে অবহেলা বা বঞ্চনামূলক মানসিকতা কাজ করেছে, তার পরিবর্তন ঘটানোও সংগঠনটির অন্যতম লক্ষ্য। এজন্য যোগ্য ও দক্ষ জনবল সম্পৃক্ত করা, সাংগঠনিক কাঠামোকে আরো সুসংহত করা এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও সৃজনশীল শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্তকরণ এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে কার্যকর যোগাযোগ তৈরি করাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
পুনাব মনে করে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নিজস্ব একটি স্বতন্ত্র পরিচয় থাকা জরুরি। একই সঙ্গে রাষ্ট্রের শিক্ষা, প্রযুক্তি, অর্থনীতি, সংস্কৃতি, তরুণ নীতি ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে তাদের মতামতও যথাযথ গুরুত্ব পাওয়া উচিত। সংগঠনটির প্রত্যাশা জুলাইয়ের স্মৃতি ও মূল্যবোধ শুধু ইতিহাসের একটি অধ্যায় হয়ে থাকবে না; বরং তা নতুন প্রজন্মের মধ্যে দায়বদ্ধতা, নেতৃত্ব, জ্ঞানচর্চা এবং ইতিবাচক সামাজিক পরিবর্তনের অনুপ্রেরণা হয়ে বেঁচে থাকবে।