সরকার অনুমোদন দিলে প্রয়োজনে ক্রসফায়ার করতেও পুলিশ পিছপা হবে না, পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকিরের এমন বক্তব্যের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি)।
দলটির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু ও সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ এক যৌথ বিবৃতিতে বলেন, একজন দায়িত্বশীল রাষ্ট্রীয় বাহিনীর প্রধানের মুখে এ ধরনের বক্তব্য শুধু উদ্বেগজনক নয়, বরং আইনের শাসন, মানবাধিকার ও নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকারের প্রতি প্রকাশ্য অবজ্ঞার শামিল।
নেতৃদ্বয় বলেন, কোনো সভ্য, গণতান্ত্রিক ও আইনের শাসনে বিশ্বাসী রাষ্ট্রে পুলিশের সর্বোচ্চ পদে থাকা কোনো কর্মকর্তা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের মতো গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের সম্ভাবনাকে এভাবে প্রকাশ্যে তুলে ধরতে পারেন না। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার দায়িত্ব অপরাধীকে আইনের আওতায় আনা, আদালতের বাইরে কাউকে ক্রসফায়ার করার হুমকি দেওয়া নয়। সরকারের অনুমোদন থাকলেই কোনো নাগরিককে বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যার বৈধতা তৈরি হয় না। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ব্যবহার অবশ্যই সংবিধান, আইন ও মানবাধিকারের সীমার মধ্যে থাকতে হবে।
তারা বলেন, ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলে পুলিশ বাহিনীর একটি অংশকে কীভাবে দমন-পীড়ন, গুম, নির্যাতন ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল, বাংলাদেশের মানুষ তা প্রত্যক্ষ করেছে। বিশেষ করে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় শিক্ষার্থী, শিশু, নারী, শ্রমজীবী মানুষসহ নিরস্ত্র নাগরিকদের ওপর নির্বিচারে গুলিবর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের ভয়াবহ স্মৃতি এখনো জাতিকে তাড়িত করে। সেই রক্তাক্ত অভিজ্ঞতার পরও যদি পুলিশের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে ক্রসফায়ার ফিরিয়ে আনার বার্তা দেওয়া হয়, তাহলে তা রাষ্ট্রীয় জবাবদিহি ও গণতান্ত্রিক উত্তরণের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক।
এবি পার্টির নেতৃদ্বয় আরও বলেন, পুলিশ কোনো সরকারের ব্যক্তিগত বাহিনী নয়, পুলিশ জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সাংবিধানিক ও আইনগত দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান। সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পুলিশের দায়িত্ববোধ ও পেশাদারিত্বেরও পরিবর্তন ঘটাতে হবে—এমন নয়, বরং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থেকে আইনের প্রতি আনুগত্যই হওয়া উচিত পুলিশের মূল অঙ্গীকার। কিন্তু আইজিপির এ বক্তব্য জনমনে আশঙ্কা তৈরি করেছে যে, আবারও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে মানুষের জীবন কেড়ে নেওয়ার সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে কি না!
তারা বলেন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড কোনোভাবেই অপরাধ দমনের গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি হতে পারে না। কোনো ব্যক্তি অপরাধে জড়িত থাকলে তাকে গ্রেপ্তার করতে হবে, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগ প্রমাণ করতে হবে এবং স্বাধীন আদালতের বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। অপরাধী দমনের নামে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া কিংবা রাষ্ট্রীয় বাহিনীকে হত্যার ক্ষমতা দেওয়ার মানসিকতা একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য বিপজ্জনক।
বিবৃতিতে নেতৃদ্বয় বলেন, যে পুলিশ জনগণের জানমালের নিরাপত্তা দেওয়ার কথা, সেই পুলিশ বাহিনীর প্রধান যদি ক্রসফায়ার ফিরিয়ে আনার কথা বলেন, তাহলে জনগণের নিরাপত্তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। এ ধরনের বক্তব্য পুলিশের প্রতি জনগণের আস্থা পুনর্গঠনের প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করবে এবং অতীতের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ভয়াবহ স্মৃতিকে আবারও সামনে নিয়ে আসবে।
এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু ও সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ অবিলম্বে সরকারের কাছে আইজিপির বক্তব্যের ব্যাখ্যা দাবি করেন এবং একই সঙ্গে বাংলাদেশে আর কোনোভাবেই ক্রসফায়ার বা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সংস্কৃতি ফিরে আসবে না মর্মে অঙ্গীকার চান। জুলাইয়ের শহীদদের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে অর্জিত নতুন বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থায় গুম, খুন, নির্যাতন ও বিচারহীনতার কোনো স্থান থাকতে পারে না বলে তারা দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।