কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সাম্প্রতিক নাশকতামূলক তৎপরতার পরিপ্রেক্ষিতে ফ্যাসিবাদী দলটির সন্ত্রাস ঠেকাতে সারা দেশে নেতাকর্মীদের সতর্ক অবস্থানে থাকার নির্দেশ দিয়েছে বিএনপি। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ঝটিকা মিছিল, ককটেল বিস্ফোরণ ও যানবাহনে অগ্নিসংযোগের মতো ঘটনায় রাজনৈতিক ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার অপচেষ্টা হচ্ছে বলে মনে করছে দলটি।
এমন পরিস্থিতিতে পতিত আওয়ামী লীগের কোনো ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড যাতে বিস্তৃত হতে না পারে, সেজন্য রাজপথে সক্রিয় ও সতর্ক থাকতে নেতাকর্মীদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
গতকাল রোববার বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী, সব যুগ্ম মহাসচিব, ১০ বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক, সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক এবং ঢাকা মহানগরের শীর্ষ নেতাদের বৈঠকে এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বৈঠকে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান অনলাইনে যুক্ত ছিলেন।
দলের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আজ রাজধানীতে বিক্ষোভ মিছিল করবে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপি। নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে থেকে এ কর্মসূচি পালনের কথা রয়েছে। একই সঙ্গে রাজধানীসহ সারা দেশে বিএনপি ও অঙ্গ সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের নিজ নিজ এলাকায় সতর্ক থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
সম্প্রতি রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ককটেল বিস্ফোরণ, বাসে অগ্নিসংযোগ ও আওয়ামী লীগের ঝটিকা মিছিলের ঘটনা ঘটেছে। গতকালও রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে এমন ঘটনার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি বাড়ানো হয়।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিতে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশে দেশ ছাড়ার আগে দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে এ বৈঠক করেন বিএনপি চেয়ারম্যান।
বৈঠক সূত্রে জানা যায়, আওয়ামী লীগের সাম্প্রতিক তৎপরতা, বিরোধী দলের লং মার্চ এবং আগামী ডিসেম্বরের রাজনৈতিক কর্মসূচি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা যাতে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটাতে না পারে, সে বিষয়ে বিএনপির নেতাকর্মীদের মাঠে সক্রিয় থাকার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বৈঠকে আওয়ামী লীগের ডিসেম্বরের দেশে ফেরার ঘোষণার সঙ্গে বিরোধী দলের একই সময়ে এক দফার কর্মসূচি ঘোষণার কোনো যোগসূত্র আছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখার বিষয়ে আলোচনা হয়। পাশাপাশি জামায়াতে ইসলামী ও আওয়ামী লীগের ডিসেম্বরের কর্মসূচির মধ্যে কোনো সমন্বয় বা রাজনৈতিক যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা নিয়েও দলের কয়েকজন নেতা প্রশ্ন তোলেন।
বৈঠকে উপস্থিত একাধিক নেতা বলেন, অতীতেও আওয়ামী লীগ ও জামায়াতের মধ্যে রাজনৈতিক সমঝোতার নজির রয়েছে। অতীতের মতো বর্তমান সময়েও এ ধরনের কোনো রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি হচ্ছে কি না, তা পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে বলে নেতারা মনে করেন।
কারণ হিসেবে তারা মনে করেনÑফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনা ডিসেম্বরে দেশে আসার ঘোষণা দিয়েছেন। একই সময়ে আবার বিরোধী দল থেকে বলা হয়েছে তারা ডিসেম্বরে এক দফার ঘোষণা দেবে।
এদিকে পুলিশের ভূমিকা নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। দলের কয়েকজন নেতা অভিযোগ করেন, প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে এখনো আওয়ামী লীগপন্থি কর্মকর্তারা সক্রিয় রয়েছেন। সম্প্রতি ক্যান্টনমেন্ট থানার ওসির একটি কথোপকথনের অডিও প্রকাশের ঘটনাকে এর উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন তারা। ওই অডিও ছড়িয়ে পড়ার পর ক্যান্টনমেন্ট থানার ওসি রাকিবুল হাসানকে প্রত্যাহার করা। বৈঠকে এ ধরনের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া এবং প্রশাসনকে আরো গতিশীল করার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে বলে দলীয় সূত্র জানায়।
বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স আমার দেশকে বলেন, সম্প্রতি আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড নিয়ে বিএনপির ১০ বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক, সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক এবং ঢাকা মহানগরের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসী তৎপরতা আর বাড়তে দেওয়া যাবে না—এ বিষয়ে নেতাকর্মীদের সতর্ক অবস্থানে থাকার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সদস্য সচিব তানভীর আহমেদ রবিন আমার দেশকে বলেন, আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদে বিএনপির নেতাকর্মীদের রাজপথে সতর্ক অবস্থানে থাকার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় আজ নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হবে। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী।
দলীয় সূত্রে আরো জানা গেছে, শুধু বিএনপির মূল সংগঠন নয়, সারা দেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের সতর্ক অবস্থানে থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় পর্যায়েও আওয়ামী লীগের নিষিদ্ধ কর্মকাণ্ডের ওপর নজর রাখার পাশাপাশি কোনো ধরনের উসকানি বা নাশকতার ঘটনা ঘটলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অবহিত করার বিষয়ে নেতাকর্মীদের সতর্ক করা হয়েছে।
এর আগে গত শনিবার বিএনপির নীতিনির্ধারণী ফোরামের বৈঠকেও দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি, বিরোধী দলের লং মার্চ এবং আগামী ডিসেম্বরের সম্ভাব্য কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা হয়। দলীয় নেতারা মনে করছেন, সামনে রাজনৈতিক কর্মসূচি আরো বাড়তে পারে। সে কারণে সাংগঠনিকভাবে নেতাকর্মীদের প্রস্তুত রাখা এবং রাজপথে সক্রিয়তা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপি।