বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) আগামীতে সরকার গঠন করলে বরিশাল-ভোলা সেতু করা হবে বলে আশ্বাস দিয়েছে দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সেই সঙ্গে বরিশালের শেরে বাংলা মেডিকেল কলেজের উন্নয়ন ও ভোলাতে মেডিকেল কলেজের কাজে হাত দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি। বরিশাল নগরীর বেলস পার্ক ময়দানে অনুষ্ঠিত নির্বাচনি সমাবেশে তারেক রহমান এসব প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন।
সমাবেশে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেন, ১৯৯৩ সালে বিএনপি তথা দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার সরকার এই বরিশালকে বিভাগ হিসাবে ঘোষণা করেছে। তারপরে নদীর পানি অনেকদূর গড়িয়ে গিয়েছে আমরা এলাকার উন্নয়নে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন কাজ করেছি কিন্তু আরো বহু কাজ করা বাকি যেমন বরিশাল ভোলা ব্রিজ এই কাজটি আমাদেরকে করতে হবে। এখানকার শেরে বাংলা মেডিকেল কলেজ সেটিকে এলাকার মানুষের চিকিৎসার জন্য উন্নত করতে হবে। ভোলাতে মেডিকেল কলেজ সেটির কাজে আমাদেরকে হাত দিতে হবে।
বরিশাল বিভাগ ও ভোলাসহ দক্ষিণাঞ্চলের উন্নয়ন, নদীভাঙন রোধ, কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তা নিয়ে দলের পরিকল্পনা তুলে ধরেছেন তারেক রহমান। বক্তব্যে তিনি বিএনপির অতীত ভূমিকার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, এই অঞ্চলের বহু উন্নয়নকাজ বিএনপির হাত ধরেই শুরু হয়েছিল, তবে দীর্ঘ স্বৈরাচারী শাসনামলে অনেক কাজ জমে আছে, যা সম্পন্ন করতে হলে জনগণকে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
নদীভাঙনকে বরিশাল বিভাগের সবচেয়ে বড় সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করে বিএনপির চেয়ারম্যান বলেন, এই অঞ্চলে নদীভাঙনের কারণে মানুষের জীবনে ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে এসেছে। অনেক এলাকায় মুরুব্বিদের কবর ভেঙে যাচ্ছে, মসজিদ ভেঙে যাচ্ছে, বাপ-দাদার ভিটে-মাটি নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে।
তিনি বলেন, এই বিশাল এলাকাকে বাঁচাতে হলে বেড়িবাঁধ নির্মাণ করে যেকোনো মূল্যে নদীভাঙন ঠেকাতে হবে। এই কাজগুলো এখনো বাকি রয়েছে এবং সেগুলো বাস্তবায়নের জন্য জনগণের সমর্থন প্রয়োজন।
তারেক রহমান বলেন, বিএনপি সবসময় জনগণের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছে। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, ১৯৭৮ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বরিশাল অঞ্চলে পল্লী বিদ্যুতের লাইন চালু করেছিলেন। বিদ্যুৎ, বরিশাল বিভাগ ঘোষণাসহ আরও অনেক উন্নয়নকাজ বিএনপির সময়ে হয়েছিল। তবে কিছু কাজ শেষ করা সম্ভব হয়নি। বিগত ১৬ বছর ধরে স্বৈরাচারী শাসনের কারণে সেই অসম্পন্ন কাজগুলো আরও জমে গেছে। এ সময় রাস্তাঘাট ভেঙে ধ্বংস হয়েছে, স্কুল-কলেজের অবস্থা নাজুক হয়েছে, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে ডাক্তারের অভাব দেখা দিয়েছে এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকের সংকট তৈরি হয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
বিএনপির চেয়ারম্যান বলেন, এসব সমস্যার সমাধান বিএনপিই করতে পারবে, তবে তার জন্য জনগণকে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তিনি বলেন, ধানের শীষে ভোট দিয়ে বিএনপিকে নির্বাচিত করলে দল সরকার গঠন করতে পারবে এবং তখনই এসব কাজ বাস্তবায়ন সম্ভব হবে।
বক্তব্যে বরিশাল বিভাগের কৃষি ও মৎস্য সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরেন বিএনপির চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, বৃহত্তর বরিশাল বিভাগে প্রচুর কৃষিপণ্য উৎপাদিত হয় এবং বিপুলসংখ্যক মানুষ মাছ ও মৎস্য চাষের সঙ্গে যুক্ত। কৃষক ও মৎস্যচাষীদের সহযোগিতার জন্য বিএনপি পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।
তিনি জানান, ফসল ও মাছ সংরক্ষণের জন্য এই এলাকায় প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন স্থানে হিমাগার নির্মাণ করা হবে। এসব হিমাগারে পণ্য সংরক্ষণের মাধ্যমে কৃষক ও মৎস্যচাষীরা ন্যায্যমূল্যে তাদের উৎপাদিত পণ্যের দাম পেতে পারবেন।
তারেক রহমান বলেন, বিএনপি যেমন মায়েদের হাতে ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছে দিতে চায়, তেমনি কৃষক ভাইদের জন্য কৃষি কার্ডও চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে। এই কৃষি কার্ডের মাধ্যমে প্রতি মৌসুমে কৃষকদের জমির পরিমাণ ও ফসলের ধরন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় বীজ, সার ও কীটনাশক সরাসরি কৃষকের হাতে পৌঁছে দেওয়া হবে।
কৃষিঋণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিএনপি সিদ্ধান্ত নিয়েছে—যেসব কৃষকের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ রয়েছে, নির্বাচনের পর সরকার গঠন করলে সেই ঋণ মওকুফ করা হবে। তিনি জানান, সমগ্র বাংলাদেশজুড়ে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হবে।
তরুণ ও যুব সমাজের কর্মসংস্থানের বিষয়েও বক্তব্য দেন বিএনপির চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, বরিশাল ও ভোলাসহ দক্ষিণাঞ্চলে তরুণদের একটি বড় সমস্যা হলো কর্মসংস্থানের অভাব। ভোলায় পাওয়া গ্যাসকে কাজে লাগিয়ে সেখানে উপযোগী শিল্প গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এর মাধ্যমে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। একইভাবে বরিশাল বিভাগের অন্যান্য জেলাতেও তরুণ ও যুবকদের জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তোলা হবে।
তারেক রহমান বলেন, এসব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে তরুণরা কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারবে, ছোট ব্যবসা-বাণিজ্য শুরু করতে পারবে এবং প্রয়োজনে বিদেশেও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে পারবে।
স্বাস্থ্যসেবার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ভোলা ও বরিশালের প্রত্যন্ত অঞ্চলে এখনও অনেক মানুষ সঠিক চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত। বিশেষ করে মা ও শিশুদের জন্য গ্রাম পর্যায়ে চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দিতে বিএনপি পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।
তিনি জানান, গ্রামে গ্রামে গিয়ে ঘরে বসে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার জন্য প্রশিক্ষিত হেলথকেয়ার কর্মী নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হবে। এসব কর্মী মা, বোন ও শিশুদের ছোটখাটো অসুখের চিকিৎসা দেবেন, যাতে তাদের কষ্ট করে হাসপাতালে যেতে না হয়।
নারীর ক্ষমতায়ন ও বেকার সমস্যা প্রসঙ্গে বক্তব্যের শেষাংশে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেন, দেশের নারী সমাজকে স্বাবলম্বী করার জন্য বিএনপির সুস্পষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে যুবকদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এবং অঞ্চলভিত্তিক উপযোগী কলকারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা করে বেকারদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হবে।