বিরোধী দলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের মতবিনিময় করেছেন তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) নেতারা। এ সময় দেশের অর্থনীতিকে একসঙ্গে এগিয়ে নিতে সরকারের পাশাপাশি বিরোধীদলের সহযোগিতা কামনা করেন তারা।
বুধবার সন্ধ্যায় রাজধানীর মিন্টো রোডের বিরোধীদলীয় নেতার সরকারি বাসভবনে এ মতবিনিময় হয়। সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা থেকে রাত পৌনে ৯টা পর্যন্ত সভা চলে।
সভায় তৈরি পোশাকশিল্পের উৎপাদন ও রপ্তানি, গ্যাস-বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট, ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদহার, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিস্থিতি, এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনজনিত চ্যালেঞ্জ এবং এ খাতের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাসহ বিভিন্ন বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
বিজিএমইএর নেতারা জানান, দেশের প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী সরাসরি তৈরি পোশাকশিল্পের সঙ্গে যুক্ত এবং প্রায় ৩ হাজার উদ্যোক্তা এ শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে সম্পৃক্ত। দেশের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও রপ্তানি আয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা এ শিল্প বর্তমানে বিভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি।
বিজিএমইএর পক্ষ থেকে তৈরি পোশাক রপ্তানি বর্তমান পর্যায় থেকে ভবিষ্যতে ১০০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার সম্ভাবনার কথা তুলে ধরা হয়। তবে একই সঙ্গে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটসহ বিভিন্ন কারণে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়।
বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য (এমপি) মিয়া গোলাম পরওয়ার এবং বিজিএমইএর সভাপতি জনাব মাহমুদ হাসান খান।
ব্রিফিংয়ে বিজিএমইএ সভাপতি বলেন, বিরোধীদলীয় নেতার সঙ্গে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের বিভিন্ন সমস্যা বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। তিনি আন্তরিকতার সঙ্গে আমাদের বিদ্যমান সমস্যার বিষয়ে শুনেছেন এবং আমাদের পরামর্শ দিয়েছেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে শিল্পের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে সরকারের সহযোগিতা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বিরোধী দলের কাছ থেকেও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা ও দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রত্যাশা করেন তিনি।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের দায়িত্ব পালনের প্রয়োজনীয়তার অংশ হিসেবে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ তৈরি পোশাকশিল্পের উৎপাদন ও রপ্তানির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মালিকদের প্রতিনিধিত্বকারী গুরুত্বপূর্ণ সংগঠন বিজিএমইএর নেতাদের আমরা আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম।
পোশাকশিল্পে বর্তমানে সমস্যাগুলো কী, সম্ভাবনাগুলো কোথায় এবং এসব সমস্যা সমাধানে কী ধরনের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন- এসব বিষয়ে তাদের কাছ থেকে ধারণা নেওয়াই ছিল আজকের মতবিনিময় সভার মূল উদ্দেশ্য। তিনি বলেন, দেশের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের জন্য তৈরি পোশাকশিল্প অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই এ খাতের সমস্যা সমাধানে সরকার ও বিরোধী দলসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। আমিরে জামায়াত আরও বলেছেন, সংসদের ভেতরে ও বাইরে দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে জামায়াতে ইসলামী দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করবে। সরকারের কোনো ভালো উদ্যোগ জনস্বার্থে হলে বিরোধী দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামী তাতে সহযোগিতা করবে। একই সঙ্গে জনস্বার্থবিরোধী কোনো সিদ্ধান্ত বা উদ্যোগ গ্রহণ করা হলে তার প্রতিবাদও করা হবে।
মতবিনিময়কালে বিরোধী দলীয় নেতা বলেছেন, দেশের স্বার্থে ট্রেজারি বেঞ্চ ও বিরোধী দলের মধ্যে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা থাকা উচিত। জ্বালানি সংকটসহ জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের সম্পৃক্ত করে কার্যকর সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। প্রয়োজনে জামায়াতে ইসলামী বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে সরকারকে আরও সহযোগিতা করতে প্রস্তুত।
গোলাম পরওয়ার আরও বলেন, সভায় গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট বিশেষ গুরুত্ব পায়। বিজিএমইএর নেতারা জানান, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে আগামী দিনগুলোতে শিল্পের উৎপাদন আরও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। মতবিনিময় সভায় বিজিএমইএর নেতারা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন। তারা বলেন, শিল্প ও অর্থনীতির স্বার্থে একটি স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এ সময় জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে বলা হয়, জনগণের ভোটে নির্বাচিত বিরোধী দল হিসেবে সংসদে জনগণের স্বার্থ তুলে ধরা এবং সরকারের ইতিবাচক উদ্যোগে সহযোগিতা করা তাদের দায়িত্ব। একই সঙ্গে প্রয়োজন হলে সংসদ ও রাজপথে জনগণের ন্যায্য দাবির পক্ষে কথা বলার কথাও উল্লেখ করা হয়।
অত্যন্ত আন্তরিক ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে বিজিএমইএর নেতারা দীর্ঘদিন পর বিরোধীদলীয় নেতার আমন্ত্রণে একসঙ্গে বসতে পেরে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন এবং তাদের শিল্পের বিভিন্ন সমস্যা, সম্ভাবনা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার বিষয়গুলো তুলে ধরেছেন।
মিয়া গোলাম পরওয়ার ছাড়াও বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও এমপি মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান ও ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ (সাবেক এমপি) ও এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও এমপি সাইফুল আলম খান মিলন, মোবারক হোসাইন, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণ জামায়াতের আমির নূরুল ইসলাম বুলবুল ও সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী উত্তরের সেক্রেটারি ড. মো. রেজাউল করিম এবং কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি আতিকুর রহমান, জামায়াতের শিল্প ও বাণিজ্য বিভাগীয় কমিটির সভাপতি শহিদুল ইসলাম ও সেক্রেটারি ডা. আনোয়ারুল আজিম প্রমুখ।
বিজিএমইএ নেতাদের মাহমুদ হাসান খানসহ উপস্থিত ছিলেন- প্রথম সহসভাপতি সেলিম রহমান, সহসভাপতি মো. রেজওয়ান সেলিম, মিজানুর রহমান, বিদিয়া অমৃত খান, মো. শিহাব উদ্দোজা চৌধুরী, মোহাম্মদ রফিক চৌধুরী, পরিচালক ফাহিমা আখতার, মজুমদার আরিফুর রহমান, আনোয়ার হোসেন চৌধুরী, কাজী মিজানুর রহমান, জোয়ার্দার এম. হোসনে কামার আলম, এ বি এম শামসুদ্দিন, ডা. রাশিদ আহমেদ হোসাইনি, রুমানা রাশিদ, মোহাম্মদ সোহেল, সামিহা আজিম, সাকিফ আহমেদ সালাম, মো. শাইফ উল্লাহ, এনামুল আজিজ চৌধুরী প্রমুখ।