ইসলামী ব্যাংক নিয়ে বহুবিধ ষড়যন্ত্র চলছে বলে অভিযোগ করেছেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। একইসঙ্গে গভর্নরের অযোগ্যতা ও সরকারের অযাচিত হস্তক্ষেপে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের কার্যক্রম মুখ থুবড়ে পড়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
দেশের ব্যাংকিং সেক্টরের চলমান বিশৃঙ্খলা নিয়ে শনিবার গণমাধ্যমে পাঠানো বিবৃতিতে তিনি এ মন্তব্য করেন।
বিবৃতিতে গোলাম পরওয়ার বলেন, দেশের অর্থনীতির অন্যতম মূল চালিকা শক্তি হলো ব্যাংকিং সেক্টর। অর্থনীতির অগ্রগতির জন্য সুষ্ঠু ব্যাংক ব্যবস্থার গুরুত্ব অপরিসীম। কিন্তু ফ্যাসিস্ট আমলে লুটপাট হয়ে যাওয়া ব্যাংক-ব্যবস্থা পুনর্গঠনের দিকে নজর না দিয়ে সরকার তার নিজস্ব এজেন্ডা বাস্তবায়নে তৎপর রয়েছে। বর্তমানে দেশের অধিকাংশ ব্যাংক কঠিন সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে কয়েকটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক রেজুলেশন আইনের আওতায় সমন্বিত করেও গ্রাহকদের টাকা ফেরত দিতে পারছে না। অনেক ব্যাংক ডিভিডেন্ড দিতে ব্যর্থ হচ্ছে এবং চরম তারল্য সংকটে ভুগছে। তাছাড়া ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণ দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর মহাদুর্যোগ সৃষ্টি করছে।
তিনি আরো বলেন, ইসলামী ধারার ৫টি ব্যাংকের সমন্বয়ে গঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের যে কার্যক্রম শুরু হয়েছিল, গভর্নরের অযোগ্যতা ও সরকারের অযাচিত হস্তক্ষেপে তাও মুখ থুবড়ে পড়েছে। আমানতকারীরা সর্বস্ব হারিয়ে হাহাকার করছেন। সরকার এসব সংকট নিরসন না করে কয়েকটি ব্যাংকে নিজস্ব লোকদের বসিয়ে আর্থিক শৃঙ্খলা বিনষ্ট করছে এবং গ্রাহকদের মধ্যে অবিশ্বাস ও অস্থিরতা সৃষ্টি করে আর্থিক খাতকে আরও সংকটাপন্ন করে তুলছে, যা কোনো দায়িত্বশীল সরকারের কাজ হতে পারে না।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, আমরা অত্যন্ত উদ্বেগের সাথে লক্ষ্য করছি, দেশের রেমিট্যান্স আহরণে, আমদানি-রপ্তানিতে ও শিল্প-বাণিজ্যে শীর্ষস্থানীয় ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি নিয়েও চলছে বহুবিধ ষড়যন্ত্র। বৈধ এমডিকে জোরপূর্বক পদচ্যুত করতে বাধ্য করা হচ্ছে। আমি একটি প্রাইভেট ব্যাংকের এমডি অপসারণে সরকারি হস্তক্ষেপের নিন্দা জানাচ্ছি।
তিনি বলেন, অযোগ্যদের পর্ষদে বসিয়ে সফল ব্যাংকটিকে স্থবির করার চেষ্টা চলছে। ইতোমধ্যে বিনিয়োগে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে, গ্রাহকদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হচ্ছে। এসবের মাধ্যমে ৩ কোটি আমানতকারী এবং ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বড় মিলিয়ে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ৮০ লক্ষ উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীকে চরম হুমকির মধ্যে নিক্ষেপ করা হয়েছে, যা দেশের কর্মসংস্থানে মারাত্মক সংকট তৈরি করবে।
তিনি বলেন, দেশের প্রায় ৩০ শতাংশ রেমিট্যান্স আহরণ থেকে শুরু করে বৈদেশিক বাণিজ্যের একটি বড় অংশের নিয়ন্ত্রণকারী এই ব্যাংক ঝুঁকিতে পড়লে আন্তর্জাতিকভাবেও দেশের মর্যাদা মারাত্মকভাবে সংকটে নিপতিত হবে। আমরা মনে করি, ইসলামী ব্যাংকিং খাত ধ্বংস হলে পুরো ব্যাংকিং খাত ধ্বংস হবে।
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, সরকার ক্ষমতাগ্রহণের পরপরই একরকম মব তৈরি করে দলের অনুগত এবং অনুকম্পা নিয়ে ঋণ পুনঃতফসীলকারী একজন মধ্যমসারীর ব্যবসায়ীকে গভর্নর নিযুক্ত করেছে। দলীয় আনুগত্য ছাড়া যার বিশেষ কোনো যোগ্যতা নেই।
তিনি বলেন, অবিলম্বে দলীয় গভর্নরকে অপসারণ করে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য একজন পেশাদার ও আর্থিকখাতে দক্ষ কোনো ব্যক্তিকে গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দিতে হবে। ইসলামী ব্যাংকের এমডিকে স্বপদে ফিরিয়ে এনে পেশাদারিত্বের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। ইসলামী ব্যাংকের বর্তমান বোর্ড ভেঙে দিয়ে যোগ্য, দক্ষ এবং ইসলামী ব্যাংকিং সম্পর্কে অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের সমন্বয়ে নতুন বোর্ড গঠন করতে হবে। একইসঙ্গে আর্থিক খাত ও ব্যাংকসমূহে সরকারি হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে হবে।
বিবৃতিতে তিনি আরো বলেন, ব্যাংক লুটেরাদের আইনের আওতায় এনে পাচারকৃত সম্পদ দেশে ফিরিয়ে আনতে হবে। ইসলামী ধারার ৫টি ব্যাংকের সমন্বয়ে গঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে সুশাসন নিশ্চিত করে আমানতকারীদের আমানত ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, অর্থনীতি ও ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত না হলে দেশের আর্থিক খাতে যে অভিঘাত আসবে তা সামাল দেওয়া সরকারের পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব হবে না। সরকারকে এ ধরনের বিতর্কিত কর্মকাণ্ড থেকে ফিরে আসার আহ্বান জানাচ্ছি। অন্যথায় ইসলামী ব্যাংক ধ্বংস হলে এবং আর্থিক খাতে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি হলে তার দায় সরকারকেই বহন করতে হবে, যা কারও কাম্য নয়।