জামায়াতে ইসলামীর সংরক্ষিত আসনের নারী সংসদ সদস্যদের পোশাক নিয়ে সরকার দলের এমপির আপত্তিকর মন্তব্যে নিয়ে সংসদে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। বক্তব্য শুনেছি, কিন্তু কিন্তু বুঝলামনা তো কারা আপনারা? বিরোধী দলীয় নারী এমপিদের ইঙ্গিত করে সরকার দলের সিনিয়র সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরীর (কুমিল্লা-৬) এমন মন্তব্যে রোববার সংসদ উত্তপ্ত হয়ে উঠে।
বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা দাঁড়িয়ে ওই মন্তব্যের প্রতিবাদ করেন। বিষয়টি নিয়ে কয়েক মিনিটের জন্য সংসদের কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটে। এ সময় ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল ব্যক্তিগত স্বাধীনতা নিয়ে মনিরুল হক চৌধুরীর মন্তব্যটি এক্সপাঞ্জ করলে উত্তেজনা প্রশমিত হয়। পরে অবশ্য বিরোধী দলীয় হুইপ নাহিদ ইসলাম পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে বলেন, সংসদে বিরোধী দলের মহিলা এমপিদের পোশাক নিয়ে যে ধরনের কথা বললেন তা অমার্জনীয় অপরাধ। একজন সংসদ সদস্য হিসেবে এই বক্তব্যে একটি বর্ণবাদী আচরণ।
রোববার সংসদে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থ বছরের সম্পূরর্ক বাজেটের ওপর আলোচনায় অংশ নেন মনিরুল হক চৌধুরী। এ সময় জামায়াতে ইসলামকে চেনা কঠিন এমনটি উল্লেখ করে তিনি তার জেলার এমপি সংসদে বিরোধী দলীয় উপনেতা আবদুল্লাহ মো. তাহেরকে নিয়ে একটি ঘটনা তুলে ধরেন।
মনিরুল হক চৌধুরী বলেন, ২০০১ সালে খন্দকার মোশাররফ হোসেন মন্ত্রী হওয়ার পর সব এমপিদের স্ত্রীসহ দাওয়াত দিয়েছেন। আমি আবার বৌ নিয়ে কোথাও যাই না, কারণ কোন জায়গায় কে কি বলে দেয়, কোন বিপদে পড়ি- জানি না। আমি বৌ নিয়ে যায়নি, কয়েকজন যায়নি কিন্তু তাহের ভাই বৌ নিয়ে গেছেন।
ঢোকার পর দেখি একটা কিছু হাঁটতেছে। আমি বললাম- তাহের ভাই ভাবী কই? উনি বলেন এই যে.. তখন বলি আপনি যে বদলায়ে আনেন নাই এটা কেমনে বুঝবো। এ সময়ে সংসদে হাসির রোল পড়ে যায়।
ওই ঘটনার বর্ণনার পরপরই মনিরুল হক চৌধুরী বর্তমান সংসদে বিরোধী দলীয় নারী এমপিদের নিয়ে কথা বলেন। তিনি বলেন, আমাদের হাউজে বোনেরা এমপি হয়ে এসেছেন। আপনি অভিনন্দন জানিয়েছে, আমিও অভিনন্দন জানাতে চাই, সবাই মেধাবী। দুইজনের বক্তৃতা শুনেছি, আগামীতে কিছু করতে পারবেন। লেখাপড়া জানা। কিন্তু বুঝলামনা তো কারা আপনারা? এ সময় তিনি সরকার ও বিরোধী দলীয় দুই পক্ষের মহিলা এমপিদের হাত দিয়ে ইঙ্গিত করে বলেন, আপনারা এদিকে দেখতে পারেন, আমরা এই দিকে (জামায়াতের মহিলা এমপিদের) দেখলে… কি আছে বুঝবো না, এটা ঠিক না।
এসময় ডেপুটি স্পিকার বলেন, মাননীয় সংসদ সদস্য ব্যক্তিগত স্বাধীনতা নিয়ে কথা বলা উচিত না।
এদিকে একই সময়ে মহিলা সংসদ সদস্যসহ বিরোধী দলের সকল সংসদ সদস্যরা দাঁড়িয়ে হইচই করতে থাকেন। ডেপুটি স্পিকার বিরোধী দলীয় এমপিদের বার বার বসার অনুরোধ করলেও তারা হইচই অব্যাহত রাখেন।
তখন মনিরুল হক চৌধুরী বলেন, প্রতিবাদ করার কিছু নেই। আমি কাউকে কিছু বলিনি। অতীতের একটি ঘটনার গল্প বলেছি। কিন্তু বিরোধী দল এতে তারপরও আপত্তি জানাতে থাকেন। সকলে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করেন। এসময় বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম মাসুদ উচ্চস্বরে কিছু বলতে গেলে, তাকেসহ বিরোধী দলীয় সদস্যদের ডেপুটি স্পিকার বসার অনুরোধ করেন।
মনিরুল হক চৌধুরী বলেন, আমি কাউকে ছোট করিনি। যদি ছোট হয়ে থাকেন তাহলে ক্ষমা চাইছি। আমি কাউকে ছোট মিন করিনি। এটা ঠিক নয়। ডেপুটি স্পিকার বিরোধী দলীয় এমপিদের বসার অনুরোধ করেন। তিনি বলেন, সবাইকে দেওয়া যাবে না, সবাই বসেন। পরে বিরোধী দলীয় এমপিরা বসে পড়েন।
পরে ডেপুটি স্পিকার মনিরুল হক চৌধুরীকে উদ্দেশ্যে করে বলেন, আপনি ব্যক্তিগত স্বাধীনতা নিয়ে যে বক্তব্য দিয়েছেন, এই অংশটুকু এক্সপাঞ্জ করা হল। তখন বিরোধী দলীয় এমপিরা হাত তালি দিয়ে সমর্থন জানান। একই সঙ্গে ডেপুটি স্পিকারকে উদ্দেশ্য করে ধন্যবাদ জানান মনিরুল হক চৌধুরী।
পরে ডেপুটি স্পিকার এ বিষয়ে একটি রুলিং দেন। তিনি বলেন, সংসদ সদস্যরা একটু শুনুন দয়া করে। আপনারা-আমরা সকলেই জাতীয় সংসদের নির্বাচিত সদস্য। আমরা আমাদের শালীনতা, সম্মান-মর্যাদা না রাখি, জাতির কাছে-যারা আমাদের ভোট দিয়ে সংসদে পাঠিয়েছেন, তাদের কাছে লজ্জিত হব। এই মহান সংসদ গণতান্ত্রিক কার্যক্রম পরিচালনার চারণক্ষেত্র, ব্যক্তিগত স্বাধীনতা নিয়ে কেউ কোন কথা ভবিষ্যতে বলবেন না। পরে মনিরুল হককে তার বক্তব্য শেষ করার অনুরোধ করেন ডেপুটি স্পিকার।
মনিরুল হক চৌধুরী বলেন, এ পরিস্থিতি আমি প্রত্যাশা করি নাই। যদি আমার কোন বক্তব্য আকার-ইঙ্গিতে কারও লেগে থাকে তাহলে অবশ্যই এক্সপাঞ্জ করার অনুরোধ করব। আমার মনেহয় ওনারা ভুল বুঝেছেন। এটা বোঝার শক্তি সবার থাকে না। এসময় মনিরুল হক চৌধুরীর জন্য নির্ধারিত সময় শেষ হলে তাকে চারমিনিট সময় বাড়িয়ে দেন ডেপুটি স্পিকার।
এসময় সরকারি দলের অনেক সদস্য হাত তুলে কথা বলতে চাইলে ডেপুটি স্পিকার বলেন, আমি রুলিং দিয়েছি।
পরে মনিরুল হক চৌধুরী বলেন, ৫ আগস্টের পরে বর্তমান সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে সম্পর্ক কি কারণে নষ্ট হলো তা নিয়ে গবেষণা করা হোক। কি কারণে বিএনপির প্রতিপক্ষ হল?
তিনি বলেন, তারেক রহমান নীলকণ্ঠ বিষ খেয়ে বিষ হজম করেন। এসময় বিরোধী দলীয় সদস্যদের আসনে প্রধানমন্ত্রীর বরাদ্দ দেওয়ার কথাটি উল্লেখ করেন। এসময় বিরোধী দলের সদস্যরা বলেন, এখনো হয়নি। তখন মনিরুল হক চৌধুরী বলেন, হয় নাই, হবে। যার হয় নাই, তার কোনদিনই হয় না।
সংসদে বিরোধী দলীয় নেতার বক্তব্যের কথা উল্লেখ করে মনিরুল হক চৌধুরী বলেন, তিনি এত সুশৃঙ্খল কথা বলেন, যা অতীতে কখনো শুনি নাই। কিন্তু এখান থেকে যাওয়ার পরে.. (জামায়াতের লিফলেট দেখিয়ে) মসজিদে মসজিদে এগুলো বন্টন করে বিএনপিকে হেও বনানো, তারেক রহমানকে হেও করা। আপনাদের কথার মাধ্যমে কি ভাষা প্রয়োগ করেন। এসময় সংসদে আবারও উত্তেজনা তৈরি হয়। এরপর আসরের নামাজের জন্য ৩০ মিনিটের বিরতি ঘোষণা করেন ডেপুটি স্পিকার।
পরে আসরের নামাজের বিরতির পর পয়েন্ট অব অর্ডারে ফ্লোর নেন বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, অনাকাঙ্ক্ষিত পরিবেশ এবং বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি এখানে তৈরি হলো যদিও আপনি তার বক্তব্যের সে অংশকে এক্সপন্স করেছেন এজন্য আপনাকে ধন্যবাদ জানাই কিন্তু উনি উনার বক্তব্যে যা বলেছেন তা আসলে সংসদীয় রীতিনীতি এবং আমাদের সাংবিধানিক অধিকার সকল কিছু সীমাকে অতিক্রম করে গিয়েছে। উনি সংসদের বিরোধী দলীয় উপনেতার স্ত্রীকে নিয়ে উনি কটাক্ষ করেছেন। উনার সাথে ব্যক্তিগত সম্পর্ক থাকতে পারে কিন্তু সেটাকে সংসদে এনে যেভাবে কটাক্ষ করা হলো এটা অমার্জনীয় অপরাধ। দ্বিতীয়ত উনি বিরোধী দলের মহিলা এমপিদের পোশাক নিয়ে যে ধরনের কথা বললেন, তাদের ধর্মীয় স্বাধীনতাকে হরণ সম্পর্কিত যে ধরনের বক্তব্য দিলেন এটাও একটি অমার্জনীয় অপরাধ। প্রত্যেকটা ব্যক্তির গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে তার ধর্মীয় স্বাধীনতা রয়েছে। পোশাকের স্বাধীনতা রয়েছে। উনি একজন সংসদ সদস্য হিসেবে সেই স্বাধীনতাকে লঙ্ঘন করে এই ধরনের হীন বক্তব্য দিয়েছেন। উনার হীন ও মানসিকতার পরিচয় পেয়েছে। এবং আমরা মনে করি উনি উনার বক্তব্যে একটি বর্ণবাদী আচরণ বহিঃপ্রকাশ পেয়েছে। ফলে আমরা আশা করব ভবিষ্যতে কোন সংসদ সদস্যের কাছ থেকে যাতে এই ধরনের বক্তব্য মহান এই জাতীয় সংসদে আর উচ্চারিত না হয়।
পরে ডেপুটি স্পিকার তার আগের রুলিংয়ের কথা পুনব্যক্ত করেন। বলেন, উনার ওই অংশটুকু সংসদীয় রীতিনীতির বাইরে যে কথাবার্তা হয়েছে ইতিমধ্যে সেগুলো এক্সপান্স করার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। আমি একটা রুলিংও দিয়েছি টুয়ার্ডস অল দা রাইটস অনারেবল মেম্বারস সংসদে বসে আমরা কারো ব্যক্তিগত স্বাধীনতা নিয়ে কথা বলবো না আমাদের ডিগটি আমরা রাখবো। পরে অবশ্য পানিসম্পদ মন্ত্রী শহিদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে চাইলে স্পিকার তাকে সুযোগ দেননি।
এমই