২০২৬ সালের ৭ থেকে ১৫ জুন যুক্তরাজ্যের কান্ট্রি পলিসি অ্যান্ড ইনফরমেশন টিমের (সিপিআইটি) তিনজন কর্মকর্তা বাংলাদেশে একটি তথ্য অনুসন্ধান মিশন পরিচালনা করেন। ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থান এবং একই বছরের আগস্টের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগের পর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে বিভিন্ন সূত্র থেকে তথ্য সংগ্রহ করাই ছিল এই মিশনের উদ্দেশ্য।
যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় (ইউকে হোম অফিস) কর্তৃক ১৪ অক্টোবর প্রকাশিত ‘রিপোর্ট অব আ ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং মিশন বাংলাদেশ: পলিটিক্যাল সিচুয়েশন, অক্টোবর ২০২৬’ শীর্ষক প্রতিবেদনে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) এর সাংগঠনিক সম্পাদক নাভিদ নওরোজ শাহের সঙ্গে সাক্ষাৎকার উল্লেখ করা হয়েছে। সিপিআইটির তিনজন কর্মকর্তা এবং যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র, কমনওয়েলথ ও উন্নয়ন দপ্তরের একজন কর্মকর্তার উপস্থিতিতে যেটি ঢাকাস্থ ব্রিটিশ হাইকমিশনে ৭ জুন নেয়া হয়েছিল। প্রকাশিত সাক্ষাৎকারটি অনুবাদ করে পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো-
২০২৪ সালের পর রাজনৈতিক পরিবেশে কী পরিবর্তন এসেছে?
মূলত আমরা সবাই জানি, আওয়ামী লীগ এবং অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে শাসনব্যবস্থা কিছুটা সমস্যার মুখে পড়েছিল, বিশেষ করে পুলিশ বাহিনী। আগের সরকারের নিয়োগ দেওয়া অনেক ব্যক্তি পুলিশে রয়ে গিয়েছিলেন। এতে অনেক মানুষ পুলিশের ওপর আস্থা ও বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেন। পুলিশও তাদের নিয়মিত দায়িত্ব পালন করতে হিমশিম খাচ্ছিল। মানুষের আস্থা নষ্ট হয়ে যাওয়ায় জরুরি কোনো পরিস্থিতি তৈরি হলেও অনেকে পুলিশের কাছে যেতে দ্বিধা করতেন।
আমরা তখন ভেবেছিলাম, নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নিলে পরিস্থিতির পরিবর্তন হবে এবং উন্নতি ঘটবে। কিছুটা উন্নতি হয়েছে ঠিকই, কিন্তু বর্তমানে আওয়ামী লীগ আবারও শক্তিশালী হয়ে উঠছে, যা একটি সমস্যা।
ক্ষমতাসীন বিএনপি আওয়ামী লীগের ‘গুণ্ডাদের’ পক্ষ নিচ্ছে। তারা বিচারিক প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধে বিচার চলছে; তারপরও বিএনপি তাদের সুবিধা দিচ্ছে। আওয়ামী লীগের সদস্যরা কারাগার থেকে বেরিয়ে আসছেন এবং তাদের কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন পদ পাচ্ছেন। মুক্তি পাওয়ার পর তাদের কেউ কেউ ভাঙচুরেও জড়াচ্ছেন। জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সার্বিক চিত্র এটাই।
মানুষের ক্ষমতার প্রসঙ্গে বলতে চাই, জনগণ বুঝতে পেরেছে যে তাদেরও ক্ষমতা আছে। সরকার, পুলিশ ও অন্যান্য বাহিনী আগের তুলনায় ভালো আচরণ করছে। ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে এবং তারা জনগণকে সম্মান করছে। পরিস্থিতি আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে ভালো, তবে রাজনৈতিক দল, সাধারণ নাগরিক ও জাতি হিসেবে আমাদের এখনও অনেক কাজ করতে হবে।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ের তুলনায় এখন আপনার দলের কার্যক্রম পরিচালনার স্বাধীনতা কি বেড়েছে?
অবশ্যই। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিরোধী দলগুলো কার্যত কোনো কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারত না। এখন পরিস্থিতি মোটামুটি স্বাভাবিক। সরকার তার কাজ করছে। তারা কিছু ভুলও করছে, তবে বিরোধী দল হিসেবে আমরা সরকারের সমালোচনা করে নিজেদের দায়িত্ব পালন করছি। কিছু ‘সংশোধনমূলক রাজনীতি’ হচ্ছে, যদিও সরকারের পক্ষ থেকে কিছুটা অন্যায্য চাপও রয়েছে।
গত ১০০ দিনে কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে। সরকারের সমালোচনা করার কারণে ছয়-সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যা নেতিবাচক। তারপরও আগের চেয়ে পরিস্থিতি ভালো। সরকার এখনও স্বৈরাচারী হয়ে ওঠেনি; আমরা এখনও আমাদের অসন্তোষ প্রকাশ করতে পারছি।
২০২৬ সালের ঈদের আগে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের ঝিনাইদহ জেলায় একটি ঘটনা ঘটে। বিএনপির লোকজন এনসিপির তিনজনকে আক্রমণ করেন, কিন্তু পুলিশ এনসিপির সদস্যদেরই গ্রেপ্তার করে ঈদের সময় কারাগারে আটকে রাখে। সবাই জানে, এটি ছিল মিথ্যা মামলা এবং সরকারের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত গ্রেপ্তার। সামগ্রিকভাবে পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে, তবে গণ-অভ্যুত্থানের পর আমরা যে মানের পরিবর্তন আশা করেছিলাম, তা হয়নি। আমরা বেআইনি গ্রেপ্তার প্রত্যাশা করিনি।
গণ-অভ্যুত্থানে বহু মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। বাক্স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক স্বাধীনতার জন্য তারা আত্মত্যাগ করেছিলেন।
সংস্কার ও জুলাই সনদের সুপারিশ বাস্তবায়নে নতুন সরকারের অঙ্গীকার কী?
এটি বড় ধরনের হতাশার বিষয়। সরকার সংস্কার বাস্তবায়নে আগ্রহী নয়। পুরো সংস্কারপ্রক্রিয়ায় অন্তর্বর্তী সরকার এক বছরেরও বেশি সময় ধরে নাগরিক সমাজ ও রাজনীতিবিদদের মতামত সংগ্রহ করে। পরে তারা জুলাই সনদের প্রস্তাব দেয়। বিএনপির আপত্তি থাকা সত্ত্বেও সনদটি গণভোটে যায় এবং ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়ী হয়। জনগণ এর পক্ষে ভোট দিয়েছিল, কিন্তু সরকার সেই সিদ্ধান্ত পুরোপুরি উপেক্ষা করেছে। গত ১০০ দিনে সংস্কারের পক্ষে কোনো পদক্ষেপ বা অগ্রগতির লক্ষণ দেখা যায়নি।
বিএনপিকে ভোট দেওয়া এবং জুলাই সনদের পক্ষে ভোট দেওয়া মানুষেরা এতে ভীষণ হতাশ হয়েছেন। নির্বাচনী অঙ্গীকারে যে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, তাদের কাছে মনে হচ্ছে, সরকার তা থেকে সরে গিয়ে তাদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে।
এর একটি উদাহরণ হলো বিচার বিভাগের জন্য স্বাধীন সচিবালয় প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি থেকে সরকারের সরে আসা। বিএনপির নির্বাচনী অঙ্গীকারে স্বাধীন বিচার বিভাগীয় সচিবালয় প্রতিষ্ঠার কথা ছিল, কিন্তু সরকার গঠনের পর তারা তা করেনি।
এটি পুরো জাতির জন্য বড় হতাশার বিষয়। তারপরও আমরা সংস্কারের পক্ষে আছি। তবে এখনও রাস্তায় নামিনি বা প্রতিবাদ শুরু করিনি, কারণ প্রায় দেড় দশক পর নির্বাচিত সংসদ কার্যকর হয়েছে। আমাদের ছয়জন সংসদ সদস্য রয়েছেন, পাশাপাশি আরও দুজন নারী সংসদ সদস্য সংসদে সংস্কারের পক্ষে কথা বলছেন। কিন্তু এ পরিস্থিতি চলতে থাকলে রাস্তায় নামা ছাড়া আর কোনো পথ থাকবে না। কারণ গণ-অভ্যুত্থানের মূল উদ্দেশ্যই ছিল পরিবর্তন—মানুষ পরিবর্তন চায়।
আপনাদের দলের প্রধান লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য কী?
আমরা সক্রিয় ও উদ্যোগী রাজনীতি করতে চাই। আমাদের প্রধান কর্মসূচি সংস্কার; দ্বিতীয় অগ্রাধিকার কর্মসংস্থান। কর্মসংস্থানের প্রয়োজন থেকেই গণ-অভ্যুত্থানের সূচনা হয়েছিল।
সম্প্রতি আমরা সরকারি বাজেট ঘোষণার আগে একটি বিকল্প বাজেট প্রস্তাব করেছি। আমরা ক্ষমতায় থাকলে বাজেট কেমন হওয়া উচিত, সেখানে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া দরকার—তা তুলে ধরেছি। সংস্কার, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ—এই তিনটি বিষয় ছিল আমাদের মূল মনোযোগ। প্রস্তাবগুলো আমরা সরকারের কাছে দিয়েছি। সরকার সেগুলো বিবেচনা করে কি না, তা দেখব। মানুষের চাকরি দরকার। সারা বিশ্বেই মূল্যস্ফীতি চলছে, নানা ধরনের অস্থিরতা রয়েছে। কর্মসংস্থানই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
চাকরি না থাকলে এবং পরিবারকে খাওয়াতে না পারলে অন্য নীতির গুরুত্ব কমে যায়। আমাদের দক্ষ কর্মী প্রয়োজন এবং তরুণদের দক্ষতা বাড়াতে হবে। দেশে বিপুলসংখ্যক তরুণ রয়েছে; তাদের দক্ষ করে তুলতে হবে। অনেক কর্মী দক্ষ নন এবং অন্য দেশের কর্মীদের তুলনায় কম মজুরি পান। দেশের পুরো জনগোষ্ঠীকে দক্ষ করে তোলা দরকার। তাঁরা বিদেশে কাজ করতে গেলেও বেশি দক্ষতা ও বেশি বেতনের কারণে দেশে আরও বেশি অর্থ পাঠাতে পারবেন।
আপনাদের দলের সমর্থক ও সদস্যদের মধ্যে কারা বেশি?
মূলত তরুণেরা। নির্বাচনের সময় বয়স্ক জনগোষ্ঠীকে আমাদের পক্ষে আনা কঠিন ছিল, কারণ আমাদের দলটি খুবই নতুন এবং তরুণদের নেতৃত্বে গঠিত। বয়স্কদের অনেকে তরুণদের সহজে বিশ্বাস করতে চান না; তাদের ধারণা, প্রবীণদের অভিজ্ঞতা বেশি।
পরিবর্তনের ফলে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, প্রবীণ রাজনীতিবিদ এবং জ্যেষ্ঠ রাজনৈতিক কর্মীদের কেউ কেউ আমাদের দলে যোগ দিয়েছেন। তারপরও দলের অধিকাংশই তরুণ। তাদের অনেকেই তখনও ভোটার হননি, যা নির্বাচনের সময় আমাদের জন্য একটি সমস্যা ছিল।
আমি আমার নিজ জেলা কুমিল্লায় গিয়েছিলাম। সেখানে বিভিন্ন উপজেলায় আমাদের রাজনৈতিক কর্মসূচি ছিল। সভা-সমাবেশে স্বেচ্ছায় অংশ নেওয়া মানুষের প্রায় ৭০ শতাংশের বয়স ১৮ বছরের নিচে। তারা আমাদের দল নিয়ে খুব আগ্রহী। তাদের মনে হয়েছে, আমরা যুক্তিসংগত কথা বলছি এবং তাদের যথাযথ প্রতিনিধিত্ব করতে পারব। আমাদের দৃষ্টিতে, আগামী চার-পাঁচ বছর মাঠে কাজ করে যেতে হবে; তারপর দেখা যাবে তারা আমাদের ভোট দেয় কি না।
সারা দেশে আপনাদের উপস্থিতি আছে, নাকি নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় সমর্থন বেশি?
মূলত ঢাকা ও শহরাঞ্চলে আমাদের সমর্থন বেশি। আমাদের আন্দোলনের ভিত্তি বিশ্ববিদ্যালয়, স্কুল ও কলেজ। শহরাঞ্চলে আমাদের সমর্থক বেশি। গ্রামীণ এলাকায় স্থানীয় প্রবীণ ব্যক্তিদের প্রভাব রয়েছে। সেখানে মানুষের আস্থা অর্জন করতে এবং নিজেদের অবস্থান তৈরি করতে আমাদের আরও সময় লাগবে। আমরা সে জন্য কাজ করছি।
জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে আপনাদের জোট কীভাবে কাজ করছে?
আদর্শগতভাবে আমরা সম্পূর্ণ ভিন্ন। শুরু থেকেই আমাদের রাজনীতির ভিত্তি মধ্যপন্থা। দলের অনেকেই প্রগতিশীল; আমি নিজেও মধ্যপন্থী উদারপন্থি। তবে সংস্কার কর্মসূচির কারণে আমাদের এই জোটে থাকতে হচ্ছে।
আমরা অন্যান্য দলের সঙ্গেও আলোচনা করেছি। আমাদের মনে হয়েছে, বিএনপি সংস্কারবিরোধী এবং আগের কাঠামো ব্যবহার করেই দেশ পরিচালনা করতে চায়। আওয়ামী লীগের তুলনায় বিএনপি অবশ্যই ভালো এবং জনগণের জন্য তাদের সদিচ্ছা রয়েছে। কিন্তু শুধু সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করা যায় না; সরকার পরিচালনার কাঠামোতে পরিবর্তন প্রয়োজন। আমাদের জোটের ভিত্তি আদর্শগত মিল নয়, বরং সংস্কারের প্রয়োজন।
আমরা আলাদা রাজনৈতিক দল হিসেবে কাজ করছি, কারণ সারা দেশে নিজেদের সংগঠন বিস্তৃত করতে হবে। জামায়াত আগে থেকেই প্রতিষ্ঠিত। আমাদের অভিন্ন স্বার্থ শুধু সংস্কার। টেলিভিশনের আলোচনা অনুষ্ঠান ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমরা জামায়াতের সমালোচনাও করি—বিশেষ করে ক্ষমতায় নারীর অংশগ্রহণ এবং ধর্মের মতো বিষয় নিয়ে।
সংস্কারের ক্ষেত্রে এখনও উন্নতি দেখতে পাইনি বলে আমরা জোটে রয়েছি। আগামী কয়েক বছরে পরিস্থিতি কীভাবে এগোয়, তা দেখব।
আগামী বছর স্থানীয় সরকার নির্বাচন হবে। আমরা নিজেদের মতো করে প্রস্তুতি নিচ্ছি এবং চাই আমাদের দল জিতুক। বিএনপিকে হারাতে জোট করা প্রয়োজন হলে করতে পারি, আবার নাও করতে পারি।
নির্বাচনের সময় দলগুলোর মধ্যে ও একই দলের ভেতরে সহিংসতার খবর পাওয়া গিয়েছিল। আপনারা কি এমন ঘটনা দেখেছেন বা জানতেন?
অনেক ঘটনা ঘটেছে, তবে বাংলাদেশের ইতিহাসে এটি অন্যতম সুষ্ঠু নির্বাচন ছিল। কিছু নির্দিষ্ট আসনে ঘটনা ঘটেছিল। নির্বাচন পুরোপুরি অবাধ ও সুষ্ঠু হলে বিএনপি হয়তো ২০০টির বেশি আসন পেত না, তবে সরকার গঠন করত—হয়তো ২০ বা ৩০টি আসন নিয়ে। বিএনপি হয়তো কিছু নির্বাচনী কৌশল প্রয়োগ করেছে, তারপরও নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু ছিল। ঘটনা ঘটেছে, তবে সংখ্যা ছিল খুবই কম।
আমরা চাই কোনো সহিংসতার ঘটনাই না ঘটুক। কিন্তু আগের নির্বাচনগুলোর সঙ্গে তুলনা করলে এবার ঘটনা অনেক কম ছিল।
নির্বাচনের পর সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে কি?
হ্যাঁ, রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। তবে পরিস্থিতি শান্ত হয়েছে এবং এখনও তা আরও খারাপের দিকে যায়নি। অধিকাংশ ঘটনা একই দলের ভেতরের বিরোধ নিয়ে। বিএনপি বড় দল; আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে স্থানীয় ক্ষমতা ও প্রভাব নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তাদের নিজেদের মধ্যে সংঘাত হচ্ছে।
দলগুলোর মধ্যে সহিংসতার ঘটনা তুলনামূলকভাবে কম। ঝিনাইদহে এনসিপির তিন সদস্যকে গ্রেপ্তারের ঘটনাটি আগেই বলেছি। বিএনপির সঙ্গে আরো কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে।
একটি ঘটনায় বিএনপি আমাদের সমাবেশের স্থান ভাঙচুর করে। আমাদের দলের শীর্ষ নেতাদের লক্ষ্য করে হামলা চালানো হচ্ছে, যাতে আমরা ওই অঞ্চলে দলকে বিস্তৃত করতে না পারি। বিষয়টি উদ্বেগজনক। বিএনপির মধ্যে স্বৈরাচারী আচরণের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। আশা করি, তারা দ্রুত এ প্রবণতা থেকে সরে আসবে।
এসব ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা কেমন?
দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, পুলিশ বরাবরের মতো ক্ষমতাসীন দলের পক্ষ নিচ্ছে। আওয়ামী লীগের আমলেও আমরা প্রতিবাদ করেছি, তখন পুলিশ আওয়ামী লীগের পক্ষ নিত। সরকারের বিরুদ্ধে কিছু বলতে গেলেই পুলিশের আচরণে উন্নতি দেখা যায় না।
তবে বিএনপি সরকারের অধীনে পরিস্থিতি আগের মতো নয়। বিএনপি কিছুটা সম্ভাবনা দেখাচ্ছে। তাই আমরা আশা নিয়ে অপেক্ষা করছি। সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর মাত্র ১০০ দিন হয়েছে। আমরা সরকারকে সময় দিতে প্রস্তুত, তবে বিরোধী দল হিসেবে নিজেদের দায়িত্বও পালন করছি।
প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার বাস্তবায়নের জন্য এখনও যথেষ্ট সময় পায়নি সরকার। আমরা সে জন্য তাদের সময় দিতে রাজি।
২০২৪ সালের জুলাইয়ের বিক্ষোভে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের মামলা বা আটক থাকার বিষয়ে কিছু জানেন?
অধিকাংশ মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছে এবং কেউ আটক নেই। কিছু মামলা এখনও বিচারাধীন, তবে শিগগিরই সেগুলো প্রত্যাহার করা হবে বলে আশা করছি।
এখন কি মানুষ যেকোনো বিষয়ে প্রতিবাদ বা সমাবেশ করতে পারে?
হ্যাঁ, এখন মানুষ প্রতিবাদ করতে পারে। পরিস্থিতি মোটামুটি ঠিক আছে, যদিও আগেই বলেছি, কিছু ঘটনা ঘটেছে। সাধারণ মানুষ প্রতিবাদ করতে পারছে এবং বিএনপি পুলিশকে চাপ দিচ্ছে না। কিন্তু আমরা দল হিসেবে প্রতিবাদ বা সমাবেশের আয়োজন করলে বিএনপির লোকজনের হামলার শিকার হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। পরিস্থিতি খুব খারাপ নয়; দেখা যাক সামনে কী হয়।
প্রতিবাদের বিষয়বস্তুর ওপর কি পুলিশের আচরণ নির্ভর করে—যেমন ভূমির অধিকার বা রাজনৈতিক দাবি?
আমার তা মনে হয় না। আপাতত প্রতিবাদ করার স্বাধীনতা আছে এবং পরিস্থিতি ঠিক আছে। তবে প্রধানমন্ত্রীকে সরাসরি সমালোচনা করলে পরিস্থিতি খারাপ হয়। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ও এমন ছিল। আওয়ামী লীগের সমালোচনা করা যেত, কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সমালোচনা করা যেত না; তাকে প্রায় দেবতার মতো করে উপস্থাপন করা হয়েছিল।
তারেক রহমানের সমালোচনা করে কয়েকজন কথা বলেছিলেন, তাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে এটি সাধারণ চিত্র নয়।
আমরা আশা করি, বর্তমান সরকার বাক্স্বাধীনতা বজায় রাখবে। কারণ বাক্স্বাধীনতার ওপর আঘাত এলে কী হতে পারে, সরকার তা জানে।
এখন স্বাধীনভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারছেন কি?
আমার মনে হয়, পরিস্থিতি ঠিক আছে। কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটছে, তবে আগের মতো নয়।
বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে আর কিছু বলার আছে?
একটি কথা বলতে চাই—অন্তর্বর্তী সরকার ও আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ের তুলনায় এখন সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি ভালো। তবে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পর আমরা এমন পরিস্থিতি আশা করিনি। নতুন দেশ গড়ার জন্য ওই মাসে লাখ লাখ মানুষ রাস্তায় নেমেছিলেন এবং বহু মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন। এখনও পরিস্থিতি তেমন আশাব্যঞ্জক নয়। সরকার সত্যিই ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে চায় কি না, তা নিয়েও আমরা নিশ্চিত নই।
আওয়ামী লীগের সময়ের তুলনায় পরিস্থিতি ভালো এবং বিএনপি একটি ভালো দল। কিন্তু জনগণ যে সংস্কার চেয়েছিল, তা কীভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে—সে বিষয়ে বিএনপি এখনও নিশ্চিত নয়। তারপরও পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে বলে আমরা আশা ধরে রাখতে পারি। বিরোধী দল হয়েও আমাদের আশা রয়েছে।
উল্লেখ্য, যুক্তরাজ্যের কান্ট্রি পলিসি অ্যান্ড ইনফরমেশন টিম (Country Policy and Information Team - CPIT) হলো ইউকে হোম অফিসের (Home Office)-এর অধীনে থাকা একটি বিশেষ বিভাগ। এই টিম বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক, আইনগত এবং মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে তথ্য নথি তৈরি করে, যেগুলোকে কান্ট্রি পলিসি অ্যান্ড ইনফরমেশন নোটস (Country Policy and Information Notes - CPIN) বলা হয়।