বিবিসির বিশ্লেষণ
গত মাসে নেপালে নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন বালেন্দ্র শাহ। তরুণ আইনপ্রণেতাদের দিয়ে ভরা সংসদসহ নতুন প্রধানমন্ত্রী বলেন্দ্র শাহের যখন অভিষেক সম্পন্ন হচ্ছিল, তখন দূর থেকে তা দেখে বাংলাদেশি রাজনৈতিক কর্মী উমামা ফাতেমার মনে একধরনের হতাশা জন্মায়।
ফাতেমা ছিলেন ২০২৪ সালে বাংলাদেশের জেন-জি আন্দোলনের হাজারো অংশগ্রহণকারীর একজন। নেপালের তরুণদের মতো তারাও রাস্তায় নেমে ব্যাপক বিক্ষোভের মাধ্যমে সরকারের পতন ঘটিয়েছিল।
কিন্তু প্রায় দুই বছর পরেও বাংলাদেশে সেই তরুণ আন্দোলন কোনো অর্থবহ রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ নিতে পারেনি। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত প্রথম নির্বাচনেই দেখা যায়, প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) বিপুল বিজয় অর্জন করেছে। অন্যদিকে ছাত্র আন্দোলন থেকে গড়ে ওঠা ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি) খুবই খারাপ ফল করেছে।
এটি নেপালের পরিস্থিতির সঙ্গে তীব্র বৈপরীত্য তৈরি করে। মাত্র এক মাস পর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে চার বছর বয়সি রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি (আরএসপি) বিপুল ভোটে জয়ী হয়। এই জয়ের ফলে অনেক জেন-জি রাজনীতিবিদ সংসদে প্রবেশ করেন এবং সাবেক র্যাপার বালেন্দ্র শাহ, যিনি আরএসপির সঙ্গে জোট করেছিলেন, দেশের নেতৃত্বে আসেন।
এটি এশিয়ায় একটি বিরল সাফল্যের গল্প, যেখানে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বহু জেন-জি আন্দোলন হলেও খুব কম ক্ষেত্রেই তরুণেরা সরাসরি ক্ষমতায় পৌঁছাতে পেরেছে।
ফাতেমা বলেন, ‘ব্যক্তিগতভাবে আমি খুব হতাশ হয়েছিলাম। নেপালের তরুণেরা যেভাবে নিজেদের সংগঠিত করতে পেরেছে, তা দেখে আমাদের দেশের পরিস্থিতি নিয়ে হতাশ হতে হয়। বাংলাদেশ সেই ধরনের পরিবর্তন আনতে পারেনি।’
নেপালের তরুণ নেতারা তাদের সাফল্যের পেছনে সাধারণ মানুষের সঙ্গে আন্দোলনের সংযোগকে সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে দেখছেন।
আরএসপির প্রার্থী হয়ে নির্বাচিত হওয়া কেপি খানাল বলেন, জেন-জি আন্দোলন ‘দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা ক্ষোভকে সামনে নিয়ে এসেছে।’ একই সঙ্গে তরুণদের আত্মত্যাগ ও কণ্ঠস্বর মানুষের মনে থেকে গেছে।
তিনি আরো বলেন, ‘ধারাবাহিকতা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। আমরা বারবার জবাবদিহি ও ন্যায়বিচারের কথা বলেছি। ধীরে ধীরে এটি শুধু প্রতিক্রিয়া না হয়ে একটি বিশ্বাসযোগ্য আন্দোলনে পরিণত হয়, যেটিকে মানুষ বিশ্বাস করেছে।’
বিশ্লেষকদের মতে, নেপালের বিশেষ রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং কিছু কৌশলগত সিদ্ধান্তও এই সাফল্যে ভূমিকা রেখেছে।
নেপালের নির্বাচনি ব্যবস্থা এমনভাবে গঠিত যে সেখানে জোট সরকার গঠনই বেশি দেখা যায়। বহু বছর ধরে কোনো একক দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। গত ১৭ বছরে ১৪টি সরকার পরিবর্তন হয়েছে, যেখানে কয়েকটি প্রতিষ্ঠিত দল ঘুরেফিরে ক্ষমতায় এসেছে।
এ কারণে জনগণের ক্ষোভ পুরো রাজনৈতিক ব্যবস্থার ওপর গিয়ে পড়ে। ফলে নতুন দল হিসেবে আরএসপি অনেক বেশি আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে।
ওয়েস্টমিনস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক নীতাশা কৌল বলেন, ‘নেপালের ক্ষেত্রে তিনটি প্রধান দলই জনসমর্থন হারিয়েছিল। ফলে এর সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী হয়েছে তরুণদের দল আরএসপি।’
বালেন্দ্র শাহ ও আরএসপির মধ্যে জোট এবং অনেক তরুণ আন্দোলনকারীর এই দলে যোগ দেওয়াও তাদের সাফল্য বাড়িয়েছে। আরএসপি তাদের সংগঠন, অর্থ ও নেটওয়ার্ক দিয়ে নির্বাচনি লড়াইয়ে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পেরেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করেন, দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে শক্তিশালী দলীয় কাঠামো ছাড়া কোনো নতুন দল প্রথমবারেই বড় সাফল্য পায় না।
নেপালের তরুণ কর্মী পুরুষোত্তম সুপ্রভাত যাদব বলেন, ‘নির্বাচনে জয়লাভ করা সহজ নয়। একটি আন্দোলন গড়ে তোলা আর নির্বাচনে জেতা সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়।’
তিনি নতুন দল গঠনের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে আরএসপিতে যোগ দেন এবং শেষ পর্যন্ত সংসদ সদস্য হন।
নীতাশা কৌল বলেন, শুধু আবেগ, ক্ষোভ বা আদর্শ দিয়ে আন্দোলন গড়ে তোলা সম্ভব হলেও তা দিয়ে নির্বাচন জেতা সব সময় সম্ভব হয় না। নির্বাচনে জিততে হলে দীর্ঘমেয়াদি সংগঠন ও প্রস্তুতি দরকার।
তিনি আরো বলেন, দক্ষিণ এশিয়ায় সামাজিক কাঠামো, বয়সভিত্তিক শ্রদ্ধাবোধ এবং লিঙ্গবৈষম্যও তরুণদের রাজনৈতিক সাফল্যের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তবে নেপাল এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম।
বাংলাদেশে এই গুরুত্বপূর্ণ উপাদানগুলোর অভাব ছিল বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বিরোধী দলগুলো নিজেদের ‘ভুক্তভোগী’ হিসেবে তুলে ধরে জনসমর্থন আদায় করতে সক্ষম হয়।
নীতাশা কৌল বলেন, এর ফলে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল এবং জামায়াতে ইসলামীর মতো দলগুলোই আন্দোলনের ফল ভোগ করে।
গবেষক ইমরান আহমেদ বলেন, এই দলগুলো নিজেদের সংস্কারপন্থি হিসেবে তুলে ধরে এবং আন্দোলনের শক্তিকে নিজেদের দিকে টানতে সক্ষম হয়, যা নতুন তরুণ দলগুলোর পক্ষে সম্ভব হয়নি।
এনসিপির একটি বড় ভুল ছিল জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট করা। এতে তাদের তরুণ সমর্থকদের একটি বড় অংশ, বিশেষ করে নারী ভোটাররা, দূরে সরে যায়।
দিল্লিতে এশিয়া সোসাইটি পলিসি ইনস্টিটিউটের সহকারী পরিচালক ঋষি গুপ্ত বলেন, বাংলাদেশের একটি পশ্চাৎপদ শক্তির সঙ্গে জোট বেঁধে এনসিপি জেন -জি প্রজন্মের স্বার্থের চেয়ে রাজনৈতিক ক্ষমতার বিষয়ে বেশি মনোযোগী হয়ে ওঠে এবং আরও বেশি ভোটারের কাছে আবেদন জানানোর সুবর্ণ সুযোগ নষ্ট করে।
বিশ্লেষকদের মতে, সময়ও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল। বাংলাদেশে আন্দোলন ও নির্বাচনের মধ্যে প্রায় দেড় বছরের ব্যবধান ছিল, ফলে আন্দোলনের গতি কমে যায়। অন্যদিকে নেপালে মাত্র ছয় মাসের মধ্যে নির্বাচন হওয়ায় সেই গতি বজায় থাকে।
তবে বাংলাদেশের তরুণদের আন্দোলন কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে পেরেছে। এটি জাতীয় রাজনীতিতে সংস্কারের আলোচনাকে সামনে এনেছে এবং একটি গণভোটের মাধ্যমে সংবিধান ও রাষ্ট্রীয় কাঠামো পরিবর্তনের পক্ষে জনমত তৈরি হয়েছে।
নতুন সরকার ৩১ দফা সংস্কার পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে, তবে অনেকে মনে করছেন, এটি আগের মতোই প্রচলিত ধারার পুনরাবৃত্তি হতে পারে।
বর্তমানে অনেক তরুণ রাজনীতি নিয়ে হতাশ এবং বিদেশে কাজের সুযোগ খুঁজছেন।
উমামা ফাতেমা বলেন, ‘তরুণদের বিদেশে যাওয়ার প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। যারা আগে দেশে থাকতে চাইত, তারাও এখন আর সেই চিন্তা করছে না।’
তবে কিছু মানুষ এখনো আশা দেখছেন। তারা মনে করেন, ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি যদি নিজেদের সংগঠন শক্তিশালী করতে পারে এবং জনগণের পাশে থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে তারা ভালো করতে পারবে।
নেপাল ও বাংলাদেশের তরুণদের লক্ষ্য একই—পরিবর্তন আনা। নেপালের তরুণেরা এখন সংসদে থেকেও সেই লক্ষ্য ধরে রাখতে চায় আর বাংলাদেশের তরুণেরা প্রয়োজনে আবারও রাস্তায় নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
ভাষান্তর: সোহানুর রহমান