দৈনন্দিন জীবনে চলতে গেলে বিভিন্ন প্রয়োজনে মানুষের সঙ্গে আমাদের কথা বলতে হয়। সামাজিক জীব হওয়ার দরুন আমরা নির্বাক হয়ে থাকতে পারি না। নিজেদের প্রয়োজনে আমরা একে-অপরের কাছে কথা ব্যক্ত করি। সমাজ ব্যতীত মানুষ একা কখনোই তার জীবন পরিচালনার সক্ষমতা রাখে না। এক্ষেত্রে কথা বলার মাধ্যমে যে বোঝাপড়া তৈরি হয়, তার বিকল্প নেই। মহান আল্লাহ তায়ালাই আমাদের স্বচ্ছন্দে কথা বলতে শিখিয়েছেন। এমনকি তিনি কথা বলার জন্য বিভিন্ন মানদণ্ড নির্ধারণ করে দিয়েছেন। কথা বলার ক্ষেত্রে উত্তম কথা বলতে হবে, নতুবা চুপ থাকতে হবে। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করিম (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ইমান রাখে, সে যেন উত্তম কথা বলে অথবা চুপ থাকে।’ (বুখারি : ৬০৩১)।
কথা মহান রবের দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ একটি নেয়ামত হওয়ায় কথা বলার ক্ষেত্রেও মুমিন তথা বিশ্বাসীদের কিছু নৈতিকতা বা শিষ্টাচার মেনে চলতে হয়। আর আমাদের সবার কর্তব্য এই নেয়ামতের সঠিক ব্যবহার করা। অহেতুক কথা বলার কারণে আমাদের যে সময়টুকু ব্যয় হচ্ছে, এই সময় সম্পর্কে কেয়ামতের দিন আল্লাহর কাছে জিজ্ঞাসিত হতে হবে। আর আল্লাহ তায়ালা তো বলেই দিয়েছেন বান্দা দুনিয়াতে যা করবে তার পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসেব আমি নেব। এ ছাড়া হাদিসে নববিতে এসেছে—‘আল্লাহর জিকির (স্মরণ) ছাড়া তোমরা অধিক কথা বলো না; কারণ আল্লাহর জিকির ছাড়া অধিক কথা বললে অন্তর কঠিন হয়ে যায়। আর কঠিন অন্তরের মানুষ আল্লাহ থেকে সবচেয়ে দূরে থাকে।’ (তিরমিজি : ২৪১১)।
আমাদের বলা প্রতিটি শব্দের জবাবদিহিতা আল্লাহর কাছে করতে হবে। এজন্য কথা বলার ক্ষেত্রে সচেতন হওয়া আবশ্যক। কথার মাধ্যমেই কোথাও শান্তি, আবার কোথাও ঝগড়া-বিবাদ সৃষ্টি হয়। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘মানুষ যে কথাই উচ্চারণ করে, তার জন্য একজন প্রহরী (নথিভুক্ত করার জন্য ফেরেশতা) নিযুক্ত আছে, যে সদা প্রস্তুত।’ (সুরা ক্বাফ : ১৮)।
প্রয়োজনের বেশি কথা বললে ভুল হওয়ার আশঙ্কা বেশি থাকে। আর এ ভুলের পরিণতি মন্দও হতে পারে। তাই যেকোনো কথা বলার আগে ভেবে বলা উচিত। ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) এ বিষয়ে সতর্ক করে বলেন, ‘যার কথা বৃদ্ধি পায়, তার ভুলত্রুটিও বৃদ্ধি পায়।’ (ইবনে হিব্বান)
অনর্থক কথা কিংবা কাজ থেকে বিরত থাকা মুমিনের অন্যতম একটি বৈশিষ্ট্য। তাই মুমিন বান্দার গুণাবলি বর্ণনা করতে গিয়ে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয়ই মুমিনরা সফলকাম হয়েছে, যারা নিজেদের সালাতে বিনয়-নম্রতা অবলম্বন করে এবং যারা অনর্থক কথাবার্তা থেকে বিরত থাকে।’ (সুরা মুমিনুন : ১-৩)
অহেতুক অথবা নিষ্প্রয়োজনীয় কথা বলা মুমিন বান্দার গুণ হতে পারে না। আর অহেতুক কথা বলার কারণে মিথ্যা, গোঁজামিল আর অপতথ্যের আশ্রয় নিতে হয়। ফলে অনেকটা অবচেতন মনেই মিথ্যাবাদী হিসেবে নিজের অবস্থান তৈরি হয়। অহেতুক কথা বলার কারণে গিবত, অপবাদ, চোগলখোরি ও পরনিন্দা চলে আসে। আর গিবত ও পরনিন্দা নিয়ে আল্লাহ তায়ালা কঠিন সতর্কবার্তা দিয়েছেন। গিবত সম্পর্কিত সচেতন হতে ইরশাদ হচ্ছে, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা অনেক ধারণা থেকে বেঁচে থাক। নিশ্চয় কতক ধারণা গোনাহ এবং গোপনীয় বিষয় সন্ধান কোরো না। তোমাদের কেউ যেন কারো পশ্চাতে নিন্দা না করে। তোমাদের কেউ কি তার মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে পছন্দ করবে? বস্তুত তোমরা তো এটা ঘৃণা করে থাক।’ (সুরা আল-হুজুরাত : ১২)
গিবতের পরিণতিও বেশ ভয়াবহ। গিবতকে শুধু ‘মুখের একটি গুনাহ’ মনে করা ঠিক নয়—এটি বান্দার হকের সঙ্গেও সম্পৃক্ত। গিবত করে থাকলে নির্দিষ্ট কোনো একটি আমলই কেটে নেওয়া হবে—এমনটা নয়; বরং যার গিবত করা হয়েছে, তার হক আদায়ের জন্য গিবতকারীর নেক আমল থেকে তাকে দেওয়া হতে পারে। নেক আমল শেষ হয়ে গেলে মজলুম ব্যক্তির গুনাহ তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হতে পারে। কিয়ামতের দিন তার জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
কথায় শুধু ভাব প্রকাশ হয় তেমনটা নয়, এটি মর্যাদা বৃদ্ধি কিংবা অপমানের কারণও বটে। মহানবী (সা.) বলেন, ‘নিশ্চয় বান্দা কখনো আল্লাহর সন্তুষ্টির কোনো কথা বলে, অথচ সে কথা সম্পর্কে তার চেতনা নেই। কিন্তু এ কথার দ্বারা আল্লাহ তার মর্যাদা বৃদ্ধি করে দেন। আবার বান্দা কখনো আল্লাহর অসন্তুষ্টির কথা বলে ফেলে, যার পরিণতি সম্পর্কে তার ধারণা নেই, অথচ সে কথার কারণে সে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে।’ (বুখারি : ৬৪৭৮)
আসুন আমরা অপ্রয়োজনীয় ও অনর্থক কথা পরিহার করি। যতটুকু আমাদের প্রয়োজন, যতটুকু উপকারী, ঠিক ততটুকু কথা যেন আমরা বলতে পারি। মহান আল্লাহ কথা বলার ক্ষেত্রে আমাদের সংযমী হওয়ার তৌফিক দান করুন, আমিন।
লেখক: শিক্ষার্থী, ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়