হোম > ধর্ম ও ইসলাম

নাজাতের জন্য অল্প আমলই যথেষ্ট

মাওলানা সেলিম হোসাইন আজাদী

চারদিকে আজ বেশির ঘনঘটা। সবাই বেশি চায়। কেউ কেউ বেশি বেশি চায়। আরো বেশি চায় এমন মানুষের সংখ্যাও অনেক বেশি। কেউ কম চায় না। বেশি চাওয়ার সমস্যা- ভারসাম্য নষ্ট হয়। সচরাচর কোনো জিনিসের পরিমাণ অল্প হলে তার গুণগত মান সহজেই বজায় রাখা যায়। বেশি হলে ভালো মন্দ মিশে যাওয়ার ভয় থাকে। এ ধারণাটি আমাদের আমলের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। বেশি আমল করলে ভুলের আশঙ্কা বেশি থাকে। যে আশঙ্কা করেছিলেন স্বয়ং নবীজি (সা.)। আমল ইখলাস শূন্য হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা। মারাত্মক বিষয়। এ আশঙ্কা কিন্তু আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। কেননা তারা শয়তানের হামলা সম্পর্কে সচেতন। এ আশাঙ্কা প্রযোজ্য আমাদের ক্ষেত্রে। আমরা শয়তানের হামলা সম্পর্কে খুব কমই জানি। বিশেষ করে নেক সুরতে শয়তানের ধোঁকা সম্পর্কে আমাদের এলেম নেই বললেই চলে। যে কারণে অনেক আমল করার পরও আমাদের নেকের খাতা শূন্য থাকার আশঙ্কা অমূলক নয়। আমরা যারা শয়তানের সূক্ষ্ম ধোঁকা সম্পর্কে সজাগ নই, আমাদের যাদের আমলে রিয়া, শিরক ও বিদআত মিশে যায় আমাদের সম্পর্কেই আল্লাহ বলেছেন, ‘আমি তাদের আমলগুলো সামনে আনব এবং বিক্ষিপ্ত ধূলিকণায় পরিণত করব।’ (সূরা ফোরকান : ২৩)

আয়াতে দুটি শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে, হাবা-আম-মানছুরা। আলী (রা.) বলেন, আরবি ‘হাবা’ বলতে এমন ধূলিকণা বোঝায় যা খালি চোখে দেখা যায় না। ছায়া কিংবা প্রখর রোদেও যা চোখে মালুম হয় না। এসব ধুলিকণা দরজার ফাঁক কিংবা জানালায় লেগে তাকে। যখন রোদের কিরণ দরজা-জানালার ফাঁগ গলে ঘরে প্রবেশ করে তখন অসংখ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ধূলিকণা উড়তে দেখা যায়। কেয়ামতের দিন মুনাফেক-মুশরিক ও কাফেরের আমলনামা আল্লাহ তায়ালা ওই রকম সূক্ষ্ম ধূলিকণায় পরিণত করে দেবেন। ওই ধূলিকণা কেমন হবে পরবর্তীতে শব্দে তার সেফাত বর্ণনা করতে গিয়ে আল্লাহ তায়ালা ‘মানছুরা’ শব্দ ব্যবহার করেছেন। মানছুরা শব্দটি এসেছে ‘আন-নাছরু’ থেকে। অর্থ হয়রান, পেরেশান, বিক্ষিপ্ত, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ইত্যাদি। অর্থাৎ, বাতাসে উড়তে থাকা দিক বিদিক শূন্য ধুলিকণার মত তাদের আমল উড়িয়ে দেওয়া হবে। (তাফসিরে মাজহারি : ৮/৫২১; লোগাতুল কুরআন : ২/১৪১)

কাদের আমল আল্লাহা তায়ালা ধূলিকণার মত উড়িয়ে দেবেনÑ এ নিয়ে মুফাসসিরগণ অনেক আলোচনা করেছেন। হিজরি চতুর্থ শতকের প্রখ্যাত ফকিহ ছিলেন আবু লাইস নসর বিন মুহাম্মদ আস-সমরকন্দী (রহ.)। তার বিখ্যাত কিতাবের নাম তাম্বিহুল গাফেলিন। সেখানে তিনি প্রথম অধ্যায়ে এখলাস প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে আয়াতটি উল্লেখ করে বলেছেন, ‘এলখাসহীন আমলের কোনো মর্যাদা বা প্রতিদান আল্লাহর কাছে নেই। কেয়ামতের দিন আল্লাহর সন্তুষ্টি ছাড়া অন্য যেকোনো উদ্দেশ্যে করা আমল আল্লাহ তায়ালা সামনে নিয়ে আসবেন এবং বিক্ষিপ্ত ধূলিকণার মত উড়িয়ে দেবেন।’

এ প্রসঙ্গে তিনি একাটি হাদিস উল্লেখ করেছেন। হাদিসটি বর্ণিত হয়েছে মাহমুদ বিন লবিদ (রা) থেকে, তিনি বলেন, একদিন নবিজি (সা.) বলেছেন, ‘হে আমার প্রিয় সাহাবিরা! তোমাদের ব্যাপারে আমার সবচেয়ে বেশি ভয় হয় ছোট শিরক নিয়ে।’ সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! ছোট শিরক আবার কী?’ নবিজি (সা.) বললেন, ‘রিয়া বা মানুষকে দেখানোর জন্য যে আমল করা হয় সেটাই ছোট শিরক। কেয়ামতের দিন আল্লাহ তায়ালা ওইসব বান্দাকে ডাকবেন যাদের জীবন লৌকিকতায় পূর্ণ ছিল। তারপর বলবেন, তোমরা যেসব মানুষকে দেখানোর জন্য আমল করেছ, তাদের কাছে যাও। আজকের এই কঠিন দিনে তারা তোমারে কোনো উপকার করতে পারে কি না দেখো।’ (মুসনাদে আহমাদ : ২৩৬৩০; ইবনে খোজাইমা : ৯৩৭)

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত অন্য হাদিসে নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘শিরক প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, তোমরা আমার সঙ্গে যা কিছু শরিক করো আমি ওইসব থেকে অমুখাপেক্ষি। জেনে রাখো! যে আমলে শিরক থাকে ওই আমলের সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই।’ (মুসলিম : ২৯৮৫)

এ দুটো হাদিস উল্লেখ করে ফকিহ আবু লাইস বলেন, ‘হে দুনিয়ার মানুষ শোনো! আল্লাহর কাছে আমল কবুল হওয়ার জন্য প্রথম শর্ত হল এখলাস। এখলাস ছাড়া কোনো আমল আল্লাহ কবুল করবেন না। আখেরাতে ওই আমলের কোনো প্রতিদানও পাওয়া যাবে না। বরং কেউ যদি লোক দেখানোর জন্য নামাজ-রোজা-দান-সদকা করে বিনিময়ে সওয়াবের বদলে তার জন্য জাহান্নারে ওয়াদা করেছেন আল্লাহ তায়ালা। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন, ‘যারা পার্থিব সুখসম্ভোগ কামনা করে, আমি ইচ্ছামতো তাদেরকে পৃথিবীতেই তা দেই। তারপর পরকালের জন্যে জাহান্নাম বরাদ্দ করি। সেখানে তারা লাঞ্ছিত ও পরিত্যক্ত অবস্থায় পুড়তে থাকবে। আর যারা পরকালীন কল্যাণ কামনা করে এবং সে উদ্দেশ্যে সর্বাত্মক প্রয়াস চালায়, তারাই সত্যিকার বিশ্বাসী। তাদের প্রয়াস অবশ্যই যথাযথ পুরস্কারযোগ্য।’ (সূরা বনি ইসরাইল : ১৮-১৯)

বলছিলাম, সবাই বেশি চায়। বেশি বেশি চাওয়ার এই দুনিয়ায় কমেও সন্তোষ্ট হন একমাত্র আল্লাহ তায়ালা। আল্লাহ জানেন তার বান্দা কত কমজোরি। তাই অযথা বেশি ভার দিতে চান না। কঠিন করতে চান না। চান সহজ করতে। তাই আল্লাহর নবি উম্মতকে একটি সহজ কৌশল শিখিয়ে দিয়েছেন। হাদিসটি ইবনে আবিদ দুনিয়া কিতাবুল এখলাসে উল্লেখ করেছেন। জাবের (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, তোমার ধর্ম খাঁটি করো, নাজাতের জন্য অল্প আমলই যথেষ্ট।’ (মুস্তাদরাক : ৭৯১৪; শুআবুল ইমান : ৬৮৫৯)

আল্লাহ আমাদের শিরক, বেদাত ও নেফাকমুক্ত খাঁটি আমল করার তাওফিক দিন। আমিন।

জিকিরে সজীব রোজাদার

সপ্তম তারাবি: হিজরত, নুসরত ও জিহাদ

ষষ্ঠ তারাবি: শয়তান উলঙ্গপনা ও বেহায়াপনার পথ দেখায়

তারাবিতে কোরআন তিলাওয়াত রবের সঙ্গে একান্ত আলাপন

পঞ্চম তারাবি: জীবন মরণ সবই আল্লাহর জন্য

মাহে রমজানে নবজীবনে আহ্বান

চতুর্থ তারাবি: আল্লাহর অবাধ্যতা আজাব ও অভিশাপ ডেকে আনে

রোজার গুরুত্বপূর্ণ আমল সাহরি ও ইফতার

মাদক নির্মূল করতে পারলে প্রশাসনকে পুরস্কৃত করা হবে: ধর্মমন্ত্রী

তারাবির নামাজ নিয়ে আজহারীর বিশেষ বার্তা