ইসলামের মূল লক্ষ্য শান্তি, ন্যায়বিচার ও মানবকল্যাণ প্রতিষ্ঠা করা। তবে শান্তি ও ন্যায়বিচার রক্ষার জন্য কখনো কখনো শক্তি ও প্রতিরোধক্ষমতার প্রয়োজন হয়। তাই অনেক সময় দুর্বলতা ও অসহায়ত্ব পরিহার করে আত্মরক্ষা, জাতীয় নিরাপত্তা এবং নির্যাতিত মানুষের সুরক্ষার জন্য যথাসাধ্য শক্তি অর্জনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। এই শক্তি শুধু অস্ত্রশস্ত্র বা সামরিক বাহিনীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং জ্ঞান, প্রযুক্তি, অর্থনীতি, কৌশলগত দক্ষতা ও নৈতিক নেতৃত্বও এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ইসলামের আলোকে মুসলিম উম্মাহর সামরিক শক্তি অর্জনের প্রয়োজনীয়তা আলোচনা করা হলো।
আত্মরক্ষা ও শত্রুর আগ্রাসন প্রতিরোধ
ইসলাম মুসলমানদের আত্মরক্ষা ও শত্রুর আগ্রাসন প্রতিহত করার জন্য যথাসাধ্য শক্তি অর্জন এবং প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দিয়েছে। এর মধ্যে যুদ্ধোপকরণ সংগ্রহ, অস্ত্রশস্ত্র ও যানবাহনের ব্যবস্থা, শরীরচর্চা এবং সামরিক প্রশিক্ষণ অন্তর্ভুক্ত। কোরআনে নির্দিষ্ট কোনো অস্ত্রের নাম উল্লেখ না করে শক্তি অর্জনের কথা বলা হয়েছে, যা যুগ ও সময়ভেদে পরিবর্তিত সামরিক সক্ষমতার প্রতি ইঙ্গিত করে। অতীতে তীর-তলোয়ার ও বর্শা ছিল যুদ্ধের প্রধান অস্ত্র; পরে বন্দুক ও কামানের যুগ এসেছে আর বর্তমান যুগে রকেট, ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর যুদ্ধব্যবস্থা প্রচলিত।
সুতরাং সময়ের প্রয়োজন অনুযায়ী সামরিক জ্ঞান, প্রযুক্তি ও কৌশল আয়ত্ত করা ইসলামি নির্দেশনার অন্তর্ভুক্ত। আধুনিক বিশ্বে সামরিক শক্তি শুধু অস্ত্রভান্ডারের ওপর নির্ভরশীল নয়; বরং প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, অর্থনৈতিক সক্ষমতা, বৈজ্ঞানিক গবেষণা, শিক্ষা, গোয়েন্দা দক্ষতা এবং জাতীয় নিরাপত্তাব্যবস্থাও এর অপরিহার্য অংশ। এ কারণেই মুসলিম উম্মাহর মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সামগ্রিক শক্তি অর্জন অপরিহার্য। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর তোমরা তাদের মোকাবিলার জন্য যথাসাধ্য প্রস্তুত রাখ শক্তি ও অশ্ববাহিনী, তা দিয়ে তোমরা ভীত-সন্ত্রস্ত করবে আল্লাহর শক্রকে, তোমাদের শক্রকে এবং এরা ছাড়া অন্যদের যাদের তোমরা জানো না, আল্লাহ তাদের জানেন। আর আল্লাহর পথে তোমরা যা কিছু ব্যয় করবে, তার পূর্ণ প্রতিদান তোমাদের দেওয়া হবে এবং তোমাদের প্রতি জুলুম করা হবে না।’ (সুরা আল-আনফাল : ৬০)
নিপীড়িত মানুষের সুরক্ষা
ইসলামে সামরিক শক্তি অর্জনের অন্যতম উদ্দেশ্য হলোÑ অত্যাচারিত ও নিপীড়িত মানুষের সাহায্যে এগিয়ে আসা। যদি দুর্বলদের রক্ষা করা না হয়, তাহলে পৃথিবীতে শক্তিশালীরা দুর্বলদের ওপর অত্যাচার করবে এবং সমাজে অরাজকতা ও বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়বে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘যুদ্ধের অনুমতি দেওয়া হলো তাদের যারা আক্রান্ত হয়েছে; কারণ তারা অত্যাচারিত। আর নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সাহায্য করতে সম্যক সক্ষম। তাদের তাদের ঘরবাড়ি থেকে অন্যায়ভাবে বহিষ্কৃত করা হয়েছে শুধু এ কারণে যে, তারা বলে, ‘আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ।’ আল্লাহ যদি মানবজাতির এক দলকে অন্য দল দ্বারা প্রতিহত না করতেন, তাহলে বিধ্বস্ত হয়ে যেত খ্রিষ্টান সংসার-বিরাগীদের উপাসনা স্থান, গির্জা, ইহুদিদের উপাসনালয় এবং মসজিদগুলো; যাতে অধিক স্মরণ করা হয় আল্লাহর নাম। আর আল্লাহ নিশ্চয়ই তাকে সাহায্য করেন যে তাঁকে (তাঁর ধর্মকে) সাহায্য করে। আল্লাহ নিশ্চয়ই মহাশক্তিমান, চরম পরাক্রমশালী।’ (সুরা আল-হজ : ৩৯-৪০)
এই আয়াত প্রমাণ করে, সামরিক শক্তি শুধু মুসলমানদের স্বার্থ রক্ষার জন্য নয়; বরং মানবসমাজে ধর্মীয় স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার ও নিরাপত্তা বজায় রাখার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
মুসলিম জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা রক্ষা
রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনায় ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর জাতীয় নিরাপত্তা ও পারস্পরিক সহাবস্থান নিশ্চিত করতে মুসলিম এবং অমুসলিমদের মধ্যে ঐতিহাসিক ‘মদিনা সনদ’ প্রণয়ন করেন। এতে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, নাগরিকদের অধিকার এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়। ইসলাম শান্তিপ্রিয় অমুসলিমদের সঙ্গে সদাচরণ ও ন্যায়বিচারের নির্দেশ দেয়। তবে যখন কোনো শক্তি ইসলাম, মুসলমান বা রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়, তখন সেই হুমকি মোকাবিলায় প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে তোলা অপরিহার্য হয়ে ওঠে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘দ্বীনের ব্যাপারে যারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেনি এবং তোমাদের স্বদেশ থেকে বহিষ্কার করেনি, তাদের সঙ্গে মহানুভবতা প্রদর্শন ও ন্যায়বিচার করতে আল্লাহ তোমাদের নিষেধ করেন না। আল্লাহ ন্যায়পরায়ণদের ভালোবাসেন।’ (সুরা আল-মুমতাহিনা : ৮)
সামরিক শক্তি অর্জনে নবীজির অনুপ্রেরণা
নবী (সা.) মুসলমানদের যুদ্ধোপকরণ প্রস্তুত করা, তীরন্দাজি শেখা, ঘোড়সওয়ারি অনুশীলন করা এবং সামরিক দক্ষতা অর্জনে উৎসাহিত করেছেন। তিনি এসব কাজকে শুধু সামরিক প্রস্তুতি নয়, বরং ইবাদত ও সওয়াবের কাজ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। আবদুল্লাহ ইবনু আবদুর রহমান ইবনু আবু হোসাইন (রহ.) থেকে বর্ণিত আছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আল্লাহতায়ালা একটি তিরের উসিলায় তিনজন লোককে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। তীর নির্মাতা যে নির্মাণকালে কল্যাণের আশা করেছে, (জিহাদে) এই তীর নিক্ষেপকারী এবং তা নিক্ষেপে সাহায্যকারী।’ তিনি আরো বলেন, ‘তোমরা তীরন্দাজি করো ও ঘোড়দৌড় শিক্ষা করো। তবে তোমাদের ঘোড়দৌড় শেখার তুলনায় তীরন্দাজি শিক্ষা করা আমার কাছে বেশি পছন্দনীয়। মুসলিম ব্যক্তির সব ক্রীড়া-কৌতুকই বৃথা। তবে তীর নিক্ষেপ, ঘোড়ার প্রশিক্ষণ এবং নিজ স্ত্রীর সঙ্গে ক্রীড়া-কৌতুক বৃথা নয়। (কারণ) এগুলো হলো উপকারী ও বিধিসম্মত। (তিরমিজি : ১৬৩৭)
বোঝা যায়, মুসলিম সমাজকে সর্বদা দক্ষ, সক্ষম ও প্রস্তুত থাকার শিক্ষা দেওয়া হয়েছে।
পরিশেষে বলা যায়, ইসলামের দৃষ্টিতে সামরিক শক্তি অর্জন কোনো আগ্রাসী মনোভাবের প্রতীক নয়; বরং আত্মরক্ষা, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং নিপীড়িত মানুষের সুরক্ষার একটি অপরিহার্য উপায়। মুসলিম উম্মাহর জন্য সামরিক শক্তি অর্জনের পাশাপাশি জ্ঞান, প্রযুক্তি, অর্থনীতি, চরিত্রগঠন ও নৈতিক নেতৃত্বে সমৃদ্ধ হওয়াও সমানভাবে জরুরি। তখনই একটি শক্তিশালী, ন্যায়ভিত্তিক ও শান্তিপূর্ণ সমাজ প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে।
লেখক: অধ্যাপক, আরবি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়