বান্দার হক
মহান আল্লাহ অসীম দয়াময়, পরম করুণাময় ও ক্ষমার আধার। বান্দা যদি নিজের অজান্তে বা শয়তানের প্ররোচনায় কোনো পাপ করে ফেলে এবং পরে আল্লাহর দরবারে খাঁটি মনে চোখের জল ফেলে ক্ষমা চায়, তবে আল্লাহতায়ালা তার পাহাড় সমান গুনাহও মাফ করে দিতে পারেন। কিন্তু ইসলামের একটি অমোঘ ও অলঙ্ঘনীয় বিধান হলো, আল্লাহতায়ালা মানুষের সব পাপ ক্ষমা করলেও একটি বিশেষ শ্রেণির পাপ তিনি নিজে চাইলেও সরাসরি ক্ষমা করবেন না। আর তা হলো ‘হাক্কুল ইবাদ’ বা মানুষের অধিকার ও হক। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ এর গুরুত্ব বোঝাতে গিয়ে ইরশাদ করেছেন— ‘হে মুমিনরা, তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না।’ (সুরা আন-নিসা : ২৯)
আমাদের সমাজ ও প্রাত্যহিক জীবনে ‘বান্দার হক’ বিষয়টি অত্যন্ত ব্যাপক ও সংবেদনশীল। দুঃখজনক হলেও সত্য, আজ আমরা নামাজ, রোজা, হজ ও জাকাতের মতো ইবাদতগুলো নিয়মিত পালন করলেও, অবহেলায় এবং অসচেতনতায় প্রতিনিয়ত অন্যের হক নষ্ট করে চলেছি। অথচ এই একটি মাত্র ভুলের কারণে কিয়ামতের দিন জীবনের সব নেক আমল ধুলায় মিশে যেতে পারে।
নিত্যজীবনে নানা উপায়ে আমরা অন্যের হক বা প্রাপ্য হরণ করছি, যা আমরা অনেক সময় পাপ বলেই গণ্য করি না। ব্যবসা-বাণিজ্যে ওজনে কম দেওয়া, খাদ্যে ভেজাল মেশানো, চড়া সুদে টাকা খাটানো কিংবা পাওনাদারের টাকা সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও সময়মতো পরিশোধ না করে ঘোরানো—বান্দার হক নষ্ট করার সবচেয়ে বড় উদাহরণ। তবে সব থেকে ভয়ংকর দিক হলো উত্তরাধিকারের হক পরিশোধ না করা। বোন, স্ত্রী বা কন্যাদের শরিয়তসম্মত মিরাস বা উত্তরাধিকারের সম্পত্তি থেকে কৌশলে বঞ্চিত করা এক ভয়াবহ ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। কেউ কেউ পরিশোধ করলেও তা ন্যায্যতার ভিত্তিতে যথাযথ থাকে না। আবার কারো পেছনে তার অনুপস্থিতিতে পরনিন্দা (গিবত) করা, মিথ্যা অপবাদ দিয়ে কারো সম্মানহানি করা অথবা কথা ও আচরণের মাধ্যমে কাউকে মানসিকভাবে কষ্ট দেওয়াও ‘হাক্কুল ইবাদে’র অন্তর্ভুক্ত।
আর কিছু বিষয় আছে, যেগুলো নিয়ে আমরা কখনোই ভাবি না; রাস্তায় জ্যাম তৈরি করে সাধারণ মানুষের চলাচলে বিঘ্ন ঘটানো, সরকারি সম্পত্তি বা জনকল্যাণের অর্থ আত্মসাৎ করা, কিংবা কর্মক্ষেত্রে ফাঁকি দিয়ে বেতন নেওয়া—এগুলো সবই কোটি কোটি মানুষের হক নষ্ট করার শামিল। পবিত্র কোরআনে অন্যায়ভাবে অন্যের সম্পদ আত্মসাৎকারীদের তীব্র নিন্দা করে বলা হয়েছে— ‘নিশ্চয়ই যারা এতিমদের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করে, তারা মূলত নিজেদের পেটে আগুনই ভর্তি করছে এবং শিগগিরই তারা প্রজ্বলিত আগুনে প্রবেশ করবে।’ (সুরা আন-নিসা : ১০)
রাসুলুল্লাহ (সা.) এক হাদিসে সাহাবিদের জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘তোমরা কি জানো নিঃস্ব বা দেউলিয়া কে?’ সাহাবিরা উত্তর দিলেন, যার ধন-সম্পদ বা টাকাপয়সা নেই। তখন আল্লাহর রাসুল (সা.) উম্মতকে সতর্ক করে বললেন, ‘আমার উম্মতের মধ্যে সেই ব্যক্তিই প্রকৃত দেউলিয়া, যে কিয়ামতের দিন অনেক নামাজ, রোজা, জাকাত নিয়ে হাজির হবে; কিন্তু সে দুনিয়াতে কাউকে গালি দিয়েছিল, কারো প্রতি অপবাদ আরোপ করেছিল, অন্যায়ভাবে কারো সম্পদ গ্রাস করেছিল, কারো রক্তপাত করেছিল এবং কাউকে আঘাত করেছিল। ফলে (বিচারের মাঠে) তার নেক আমলগুলো থেকে একে একে ভুক্তভোগীদের পাওনা চুকানো হবে। একপর্যায়ে যদি তার নেক আমল শেষ হয়ে যায়, তবে পাওনাদারদের পাপগুলো তার ঘাড়ে চাপানো হবে এবং পরিশেষে তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।’ (মুসলিম : ২৫৮১)
এই হাদিসটি প্রমাণ করে, মানুষের হক কতখানি স্পর্শকাতর। আল্লাহর ইবাদতে ঘাটতি থাকলে তিনি চাইলে মাফ করতে পারেন, কিন্তু কোনো মানুষের অধিকার খর্ব করা হলে, যতক্ষণ না সেই মানুষটি মন থেকে ক্ষমা করবেন, ততক্ষণ স্রষ্টা নিজেও সেই পাপ মোচন করবেন না। আজ আমরা অনেকেই বাহ্যিক ইবাদত নিয়ে অহংকার করি, কিন্তু পর্দার আড়ালে কত মানুষের চোখের জল ও দীর্ঘশ্বাসের কারণ হচ্ছি, তার খবর রাখি না। দুনিয়ার আদালতে টাকা বা ক্ষমতার জোরে পার পাওয়া গেলেও, কিয়ামতের সেই মহাবিচারের দিনে কিন্তু রেহাই পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। সেদিন নিজের অতি কষ্টের নেক আমলগুলো অন্যের হাতে তুলে দিতে হবে।
আসুন, আজই আমরা নিজেকে একটু হিসাবের কাঠগড়ায় দাঁড় করাই। সচেতন বা অবচেতন মনে আমরা কি কারো জমি দখল করেছি? কোনো শ্রমিকের ঘাম শুকানোর আগে তার মজুরি আটকে রেখেছি? কোনো ভাই, বোন বা আত্মীয়ের মন ভেঙেছি? দায়িত্ব পালনে মানুষের অধিকার নষ্ট করেছি? যদি এমনটা হয়ে থাকে, তবে অহংকার ও লোকলজ্জা ভুলে আজই তাদের কাছে ছুটে যাই। জীবিত থাকলে তাদের কাছে করজোড়ে ক্ষমা চেয়ে নিই, তাদের পাওনা বুঝিয়ে দিই। আর যদি তারা দুনিয়া ছেড়ে চলে গিয়ে থাকেন, তবে তাদের পক্ষ থেকে দান-সদকাহ করি এবং আল্লাহর কাছে তাদের জন্য দোয়া করি। খাঁটি মুসলমান হতে হলে শুধু আল্লাহর হক নয়, মানুষের হকের প্রতিও সর্বোচ্চ যত্নশীল হই।