হোম > ইসলাম ও জীবন

বন্ধ হোক ধর্মের নামে অধর্ম

হাফেজ মুফতি রাশেদুর রহমান

এই বদ্বীপকে বলা হয় ‘বারো আউলিয়ার দেশ’। হজরত শাহজালাল, শাহ পরান, খান জাহান আলীসহ অসংখ্য মহান বুজুর্গ শত শত বছর আগে দূর দেশ থেকে পথ পেরিয়ে এই মাটিতে এসেছিলেন। কেন এসেছিলেন? তাওহিদের আলো ছড়িয়ে দিতে। শিরক আর কুসংস্কারের অন্ধকার দূর করতে। মানুষকে এক আল্লাহর পথে আনতে। অথচ সেই বুজুর্গদের কবরকে কেন্দ্র করে যা চলছে, তা দেখলে মনে হয়—কবরে শুয়ে থাকা সেই মহামানবরাই আজ সবচেয়ে বড় অসহায়ত্বের শিকার। তারা সারাজীবন যেসবের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন, তাদের সমাধিস্থলকে ঘিরে আজ সেসবেরই জয়জয়কার।

ধর্মের নামে অধর্ম

মাজারে কত কী হয়, তা কে না জানেন। কবরের পাশে হুক্কার ধোঁয়া, গাঁজার আড্ডা, জটাধারী ভণ্ড ফকিরের ভিড়, নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা, অবৈধ যৌনাচার—এসব দৃশ্য দেশের বহু মাজারে পরিচিত। অথচ ইসলামে প্রতিটি নেশাদ্রব্য হারাম। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘প্রতিটি মাদকদ্রব্যই হারাম।’ (মুসলিম: ২০০৩)

কবরে সিজদা দেওয়া, কবরের গ্রিল ধরে ফরিয়াদ করা, কবরে মানত করা, কবরের চাদরে কপাল স্পর্শ করা, চুম্বন করা, তাজিম-সম্মানার্থে মাথা ঝোঁকানো—এসবই সম্পূর্ণ হারাম এবং এগুলোর কোনো কোনোটি শিরক। রাসুল (সা.) স্পষ্ট বলেছেন, ‘আল্লাহ তায়ালা ইহুদি-নাসারাকে ধ্বংস করুন! তারা তাদের নবীদের কবরকে সিজদার স্থান বানিয়েছে।’ (মুসলিম : ৫৩০)

মৃত মানুষের কাছে সাহায্য চাওয়া শিরক। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘মসজিদগুলো আল্লাহরই জন্য, সুতরাং আল্লাহর সঙ্গে অন্য কাউকে ডেকো না।’ (সুরা জিন: ১৮)। মানতের নামে সাধারণ মানুষের পকেট থেকে টাকা হাতানো, তথাকথিত ‘প্রেম’ ও ‘ভক্তি’র আড়ালে শিরকি আচার-অনুষ্ঠানকে বৈধতা দেওয়া—এসবই কোরআন-সুন্নাহর মানদণ্ডে হারাম। বরং একজন মুমিনের ঈমানের মূল ভিত্তি তাওহিদকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। মাজারে আর কী কী হয়, এর বিস্তারিত লেখাটাও অরুচিকর ও লজ্জার। আল্লাহ রক্ষা করুন।

আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতি

মাজারে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা জমা পড়ে দানবাক্সে। এই অর্থের কোনো স্বচ্ছ হিসাব নেই। মাজারের খাদেম, তথাকথিত পির বা গদিনশিন ও প্রভাবশালী মহলের যোগসাজশে গড়ে উঠেছে দুর্নীতির এক শক্তিশালী সিন্ডিকেট। সাধারণ মানুষ ভাবেন, মাজারে দেওয়া অর্থ গরিবের কাজে লাগবে। কিন্তু সেই অর্থ চলে যাচ্ছে সিন্ডিকেটের পকেটে। এটি শুধু অর্থের অপব্যবহার নয়, বিশ্বাসেরও অপব্যবহার। বছরের পর বছর ধরে চলা এসব দুর্নীতিকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। এগুলো সুপরিকল্পিত ব্যবস্থা, যার মূল ভিত্তি সাধারণ মানুষের আবেগ পুঁজি করা।

সাহসী একটি পদক্ষেপ

এই দীর্ঘ অন্ধকারে একটি আলোর রেখা সম্প্রতি দেখা গেছে। সিলেটের সদ্য সাবেক ডিসি সারোয়ার আলম প্রায় ৭০০ বছরের পুরোনো একটি অস্বচ্ছ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন। প্রথমবারের মতো মাজারের দানবাক্সের অর্থের সুষ্ঠু হিসাব-নিকাশ এবং স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে তার মাধ্যমে। মাজারকেন্দ্রিক অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে সাংগঠনিক পদক্ষেপও শুরু হয়েছে। এই উদ্যোগ ছোট মনে হলেও এর তাৎপর্য অনেক বড়। কারণ এতদিন যে ব্যবস্থায় কেউ হাত দেওয়ার সাহস পাননি, সেখানে প্রথমবার জবাবদিহিতার দাবি উঠেছে। এটি মাজার-সংস্কারের পথে একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ।

ওয়াক্‌ফ সম্পদ ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব

মাজারের দানবাক্সের অর্থ, মাজারের জমি—সবই ওয়াক্‌ফ সম্পদের অন্তর্ভুক্ত। এটি কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ব্যক্তিগত সম্পত্তি হতে পারে না। এই সম্পদ যথাযথ কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হওয়া, জাতীয় কোষাগারে জমা হওয়া এবং জনকল্যাণে ব্যয় হওয়া এখন সময়ের দাবি। দানবাক্স খোলা থেকে শুরু করে অর্থ গণনা পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে ডিজিটাল রেকর্ড, সিসিটিভি ক্যামেরা এবং নিয়মিত অডিটের ব্যবস্থা করা জরুরি। মাজারকেন্দ্রিক অবৈধ সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়া সরকারের দায়িত্ব। সাধারণ মানুষের ধর্মীয় অনুভূতির সুযোগ নিয়ে কেউ যাতে অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়তে না পারে, সেজন্য কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।

দান হোক কেবল আল্লাহর উদ্দেশে

দাতাদেরও দায়িত্ব আছে। তাদের বুঝতে হবে মাজারে দান করার কোনো নির্দেশনা ইসলামে নেই। বরং মাজারে দেওয়া প্রতিটি টাকা ওই দুর্নীতির সিন্ডিকেটকে আরো শক্তিশালী করে। দান হতে হবে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘বলুন, আমার সালাত, আমার কোরবানি, আমার জীবন ও মরণ জগৎসমূহের প্রতিপালক আল্লাহরই জন্য।’ (সুরা আনআম : ১৬২)

বুজুর্গদের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধার নিদর্শন হিসেবে আল্লাহকে খুশি করার নিয়তে এতিমখানায়, মাদরাসায়, হাসপাতালে ও গরিবকে সাদাকা করা যেতে পারে। দেশে হাজারো পরিবার আছে, যারা কয়টি টাকার জন্য দুবেলা পেট পুরে খেতে পারে না, মাথা গোঁজার ঠাঁই তৈরি করতে পারে না, কিংবা মায়ের বা সন্তানের চিকিৎসা করতে পারে না। এমনকি আপনার নিকটাত্মীয়দের অনেকেই আছেন গ্রামে, যারা নিত্যদিন অর্থকষ্টে কাটাচ্ছেন। আপনি এসব জরুরি খাতে ব্যয় না করে পাগলা মসজিদ বা অমুক-তমুকের দরবারে হুমড়ি খেয়ে দান করার কোনো মানে হয় না।

শেষকথা

যারা মাজারে শুয়ে আছেন, তারা এসেছিলেন আল্লাহর পথে মানুষকে ডাকতে—কবরের সামনে সিজদা নিতে নয়। তাদের নাম ভাঙিয়ে যেসব অপকর্ম চলছে, তাতে তাদের আত্মা কষ্ট পায় বৈকি। ডিসি সারোয়ার আলমের মতো যারা এই অন্ধকারে আলো জ্বালানোর সাহস দেখাচ্ছেন, তাদের সমর্থন করা নাগরিক ও সরকারের দায়িত্ব। মাজারকেন্দ্রিক শিরক ও দুর্নীতির বেড়াজাল ব্যক্তিগতভাবে, সামাজিকভাবে এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে ছিন্ন করতে হবে। অলি-আউলিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা থাকুক মনে; কিন্তু সেই শ্রদ্ধা যেন কোনো শিরকি আচারে পরিণত না হয়। সত্য ও ন্যায়ের পথে ফিরে আসার এখনই সময়।

লেখক : সিনিয়র পেশ ইমাম, বুয়েট সেন্ট্রাল মসজিদ, ঢাকা

ইসলামের ন্যায়ভিত্তিক বাজেটনীতি

শরিয়ার দৃষ্টিতে বৈধ-অবৈধ খেলাধুলা

হজের ফিরতি ফ্লাইট শেষ হচ্ছে বুধবার

যে অভ্যাসগুলো প্রকৃত জ্ঞানী মানুষে পরিণত করে

ভূমিকম্প ও অপমৃত্যু থেকে বাঁচার দোয়া

আশুরার তাৎপর্য ও ইবাদত

আশুরায় বর্জনীয় বিষয়

হোসেনি দালান থেকে তাজিয়া মিছিল শুরু

যা ঘটেছিল কারবালায়

কারবালার শোকাবহ পবিত্র আশুরা আজ