শবেমেরাজ
ইসলামের ইতিহাসে শবেমেরাজ অনুপম, অতুলনীয় ও বিস্ময়কর একটি ঘটনা। এটি নবুয়তের সত্যতা, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মর্যাদা প্রকাশ এবং মানবজাতির জন্য আল্লাহর চূড়ান্ত দিকনির্দেশনার অধ্যায়।
মেরাজের অর্থ
মেরাজ শব্দের আভিধানিক অর্থ ঊর্ধ্বগমন। ইসলামি পরিভাষায় মেরাজ হলো মহানবী (সা.)-এর সশরীরে, পূর্ণ জাগ্রত ও সচেতন অবস্থায়, ফেরেশতা জিবরাইল (আ.) ও মিকাইল (আ.)-এর সঙ্গ নিয়ে বিশেষ বাহন বোরাকে আরোহণ করে মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আকসা পর্যন্ত গমন; এরপর প্রথম আসমান থেকে পর্যায়ক্রমে সপ্তম আসমান অতিক্রম করে সিদরাতুল মুনতাহা পর্যন্ত পৌঁছানো এবং সেখান থেকে রফরফ নামক বাহনে একাকী আরশে আজিমে উপনীত হওয়ার নাম। মেরাজে রাসুলুল্লাহ (সা.) রাব্বুল আলামিনের সান্নিধ্য লাভ করেন, জান্নাত ও জাহান্নাম প্রত্যক্ষ করেন এবং অতঃপর পৃথিবীতে প্রত্যাবর্তন করেন।
ইসরা ও মেরাজ
মেরাজের প্রথম অংশকে বলা হয় ‘ইসরা’। ইসরা অর্থ রাত্রিকালীন সফর। যেহেতু এই ঐতিহাসিক ভ্রমণ রাতের বেলায় সংঘটিত হয়েছিল, তাই একে ইসরা বলা হয়। বিশেষভাবে মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আকসা পর্যন্ত অংশটিই ইসরা নামে পরিচিত। পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা এই সফরের কথা ঘোষণা করে বলেন, ‘তিনি পবিত্র সত্তা, যিনি তাঁর বান্দাকে রাত্রিতে ভ্রমণ করিয়েছেন মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আকসা পর্যন্ত—যার আশপাশ আমি বরকতময় করেছি—যাতে আমি তাকে আমার নিদর্শনাবলি দেখাতে পারি। নিশ্চয়ই তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।’ (সুরা বনি ইসরাইল : ১)
মেরাজ আত্মিক নাকি শারীরিক
প্রসিদ্ধ মত অনুযায়ী, মেরাজ সংঘটিত হয় নবুয়তের একাদশ বছরের রজব মাসে। তখন নবীজি (সা.)-এর বয়স ছিল ৫১ বছর। এই সফর কোনো স্বপ্ন বা আত্মিক দর্শন ছিল না, এটি ছিল সশরীরে সংঘটিত বাস্তব ঘটনা। এর অন্যতম প্রমাণ কাফের, মুশরিক ও মুনাফিকদের তীব্র অস্বীকৃতি ও বিদ্রুপ। যদি এটি শুধু স্বপ্ন বা রুহানি যাত্রা ও অভিজ্ঞতা হতো, তবে তাদের অবিশ্বাস করার কোনো যুক্তিসংগত কারণ থাকত না।
কোরআন ও হাদিসে মেরাজের প্রমাণ
মেরাজের ঘটনাবলি পবিত্র কোরআনের সুরা নাজম ও সুরা বনি ইসরাইলে সুস্পষ্টভাবে বিবৃত হয়েছে। বিশেষ করে সুরা নাজমের প্রথম ১৮টি আয়াতে নবীজি (সা.)-এর আসমানি দর্শন, জিবরাইল (আ.)-এর সাক্ষাৎ, সিদরাতুল মুনতাহা ও আল্লাহর নিদর্শনাবলি প্রত্যক্ষ করার কথা তুলে ধরা হয়েছে।
সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিমসহ সিহাহ সিত্তার বহু নির্ভরযোগ্য হাদিসে ইসরা ও মেরাজের বিস্তারিত বিবরণ সংরক্ষিত আছে, যা আকিদা ও ইতিহাস উভয় দিকেরই অকাট্য প্রমাণ।
মেরাজের সংক্ষিপ্ত ঘটনা
এক রাতে রাসুলুল্লাহ (সা.) এমন এক অবস্থায় ছিলেন, যা ঘুম ও জাগরণের মধ্যবর্তী। ঠিক সেই সময় আল্লাহর পাঠানো ফেরেশতা জিবরাইল (আ.) তাঁর কাছে উপস্থিত হন। আল্লাহর হিকমতে নবীজির বুক বিদীর্ণ করা হয়, জমজমের পবিত্র পানি দিয়ে তা ধৌত করা হয় এবং ঈমান ও প্রজ্ঞায় তা পরিপূর্ণ করে আবার যথাস্থানে স্থাপন করা হয়। এ ঘটনাটি ছিল নবীজির অন্তরকে আসমানি দর্শনের জন্য প্রস্তুত করার এক বিশেষ ব্যবস্থা।
এরপর রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জন্য হাজির করা হয় বুরাক নামের এক অনন্য বাহন। এর গতি ছিল অবিশ্বাস্য। একেকটি কদম পড়ছিল চোখ যত দূর দেখতে পায় তারও শেষ প্রান্তে। এই বাহনে আরোহণ করে নবীজি (সা.) মুহূর্তের মধ্যেই মক্কা থেকে বাইতুল মুকাদ্দাসে পৌঁছে যান। সেখানে তিনি দুই রাকাত নামাজ আদায় করেন এবং পূর্ববর্তী সব নবীর ইমামতি করেন।
এরপর শুরু হয় ঊর্ধ্বাকাশের দিকে আরোহণ। সহিহ বুখারির বর্ণনায় এসেছে, প্রতিটি আসমানে প্রবেশের আগে জিবরাইল (আ.) সংশ্লিষ্ট আসমানের প্রহরী ফেরেশতাদের কাছে অনুমতি প্রার্থনা করেন। এই অনুমতির ধারা আসমানি শৃঙ্খলা, নিয়ম ও আল্লাহর দরবারের অসীম মর্যাদার সুস্পষ্ট প্রমাণ।
প্রতিটি আসমানে রাসুলুল্লাহ (সা.) এক বা একাধিক নবীর সাক্ষাৎ লাভ করেন। প্রথম আসমানে তিনি মানবজাতির আদি পিতা আদম (আ.)-এর সাক্ষাৎ পান। দ্বিতীয় আসমানে ছিলেন ইসা (আ.) ও ইয়াহইয়া (আ.)। তৃতীয় আসমানে সৌন্দর্য ও চরিত্রের অনন্য দৃষ্টান্ত ইউসুফ (আ.)। চতুর্থ আসমানে ইদরিস (আ.), পঞ্চম আসমানে হারুন (আ.), ষষ্ঠ আসমানে মুসা (আ.) এবং সপ্তম আসমানে মুসলিম মিল্লাতের পিতা ইবরাহিম (আ.)-এর সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়।
ইবরাহিম (আ.)-কে নবীজি (সা.) দেখতে পান বাইতুল মামুরের সঙ্গে হেলান দিয়ে বসে থাকতে। এটি আসমানের কাবা, যেখানে প্রতিদিন সত্তর হাজার ফেরেশতা ইবাদতে প্রবেশ করেন এবং এখানে যারা একবার ইবাদত করেন, তারা আর কখনো সেখানে ফিরে আসার সুযোগ পান না।
এরপর রাসুলুল্লাহ (সা.) পৌঁছান সিদরাতুল মুনতাহায়, এটি সৃষ্টিজগতের চূড়ান্ত সীমা। এখানেই এসে জিবরাইল (আ.) থেমে যান এবং বলেন, ‘আমি যদি এখান থেকে সামান্যও অগ্রসর হই, তবে আমি জ্বলে-পুড়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাব।’
এই সীমা অতিক্রম করে একমাত্র রাসুলুল্লাহ (সা.) অগ্রসর হন। অতঃপর আল্লাহতায়ালা তাঁকে বিশেষ নৈকট্য দান করেন। এই মহিমান্বিত অবস্থায় প্রথমে উম্মতের ওপর দৈনিক পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করা হয়। ফেরার পথে হজরত মুসা (আ.)-এর পরামর্শে নবীজি বারবার আল্লাহর দরবারে ফিরে যান। প্রতিবারই নামাজের সংখ্যা কমতে থাকে। অবশেষে তা পাঁচ ওয়াক্তে নির্ধারিত হয়, তবে আল্লাহতায়ালা দয়া করে এর সওয়াব পঞ্চাশ ওয়াক্তের সমানই রেখে দেন। (বুখারি : ৩২০৭)
শবেমেরাজে ঘোষিত সিদ্ধান্ত
এই মহিমান্বিত রজনিতে আল্লাহতায়ালা মানবজাতির জন্য ১৪ দফার এক মৌলিক নীতিমালা ঘোষণা করেন। এতে তাওহিদ, পরিবার, সমাজ, অর্থনীতি, নৈতিকতা ও ব্যক্তিচরিত্রÑসবকিছুর দিকনির্দেশনা রয়েছে। এগুলো হলো—আল্লাহ ছাড়া কারো ইবাদত না করা, পিতা-মাতার সঙ্গে সদাচরণ, আত্মীয়স্বজনের অধিকার আদায়, মিসকিন ও পথচারীর হক প্রদান, অপচয় পরিহার, কৃপণতা বর্জন, সন্তান হত্যা নিষিদ্ধকরণ, ব্যভিচারের ধারে-কাছেও না যাওয়া, অন্যায়ভাবে মানুষ হত্যা না করা, এতিমের সম্পদ সংরক্ষণ, প্রতিশ্রুতি রক্ষা, মাপে ও ওজনে পূর্ণতা, অজ্ঞতার অনুসরণ বর্জন এবং অহংকার পরিহার। আল্লাহতায়ালা বলেন, এসব কাজই মন্দ এবং তিনি (আল্লাহতায়ালা) এগুলো অপছন্দ করেন। (সুরা বনি ইসরাইল : ২২-৪৪)
লেখক : মুহাদ্দিস, জামিয়া আরাবিয়া দারুস সুন্নাহ রাজাবাড়ী, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ, ঢাকা