চলে গেল মহিমান্বিত মাস রমজান। এ রমজানের ফরজ বিধান ছিল রোজা রাখা। অনেকের অলসতা কিংবা গাফিলতির কারণে রোজা ছুটে গেছে, কারো বা শরিয়ত-নির্ধারিত ওজরে রোজা রাখা হয়নি। মহান আল্লাহর বড় অনুগ্রহ, তিনি তাদের এমন বিধান দিয়েছেন যার দ্বারা গোনাহের কাফফারা হয় এবং ছুটে যাওয়া বিষয়ের ক্ষতিপূরণ হয়ে যায়। আল্লাহ বলেন, ‘আর যারা কোনো অশ্লীল কাজ করলে অথবা নিজেদের প্রতি জুলুম করলে আল্লাহকে স্মরণ করে, অতঃপর তাদের গোনাহের জন্য ক্ষমা চায়। আর আল্লাহ ছাড়া কে গোনাহ ক্ষমা করবে? আর তারা যা করেছে, জেনেশুনে তা তারা বারবার করে না। এরাই তারা, যাদের প্রতিদান তাদের রবের পক্ষ থেকে মাগফিরাত ও জান্নাতসমূহ যার তলদেশে প্রবাহিত রয়েছে নহরসমূহ। সেখানে তারা স্থায়ী হবে। আর আমলকারীদের প্রতিদান কতই না উত্তম!’ (সুরা আলে ইমরান : ১৩৫-১৩৬)
ইবাদতের ক্ষেত্রে মূল হলো সেটি সময়মতো আদায় করা। তবে শরিয়তসম্মত ওজরে অনেক সময় বিলম্বে তা আদায় করতে হয়। রোজাও এমনই একটি বিষয়। কোনো কারণে তা ছুটে গেলে এর জন্য রয়েছে কাজার বিধান। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘রোজা নির্দিষ্ট কয়েক দিনের জন্য। তবে তোমাদের মধ্যে কেউ যদি অসুস্থ থাকে বা সফরে থাকে, তাহলে সে অন্য সময়ে সেই রোজাগুলো পূরণ করে নেবে।’ (সুরা বাকারা : ১৮৪)
জেনে-বুঝে রমজানের রোজা না রাখা কবিরা গোনাহ। অবশ্য গ্রহণযোগ্য কোনো ওজর, যেমন ৪৮ মাইল দূরে ভ্রমণে গেলে বা সাময়িক অসুস্থতা বোধ করলে রোজা না রাখার অবকাশ আছে। কেউ জেনে-বুঝে রোজা না রাখুক কিংবা কোনো ওজরে রোজা না রাখুক উভয় অবস্থায় কাফফারা আবশ্যক হবে না; বরং যতগুলো রোজা ছুটে গেছে এতগুলো রোজা রাখার দ্বারাই দায়িত্ব আদায় হয়ে যাবে। এ রোজাগুলো ধারাবাহিকভাবে রাখা জরুরি নয়; সময়ে সময়ে রাখলেও চলবে।
তবে রোজা রাখার পর বড় ধরনের কোনো অসুবিধা কিংবা শরিয়ত-নির্ধারিত অনুমতি ব্যতীত রোজা ভেঙে ফেললে কাজা ও কাফফারা উভয়টি আবশ্যক হবে। কাফফারা আদায়ের পদ্ধতি হলো, রমজান ছাড়া লাগাতার পূর্ণ দুই মাস রোজা রাখতে হবে। এক্ষেত্রে চান্দ্র মাসের পহেলা তারিখ থেকে রোজা রাখলে কোনো মাস ৩০ দিনের কম হলেও কাফফারা আদায় হয়ে যাবে। কোনো কারণে ধারাবাহিকতা ছুটে গেলে কাফফারা আদায় হবে না এবং নতুন করে আবার দুই মাস লাগাতার রোজা রাখতে হবে। পেছনের রাখা রোজাগুলো কাফফারা হিসেবে আদায় হবে না। তবে নারীদের ঋতুস্রাবের কারণে ধারাবাহিকতা নষ্ট হলে অসুবিধা নেই। (আল বাহরুর রায়েক : ২/২৭৭)
কারো যদি লাগাতার দুই মাস রোজা না রাখার শক্তি না থাকে, তাহলে ৬০ জন মিসকিনকে দুই বেলা খাওয়াতে হবে, কিংবা তার মূল্য প্রদান করতে হবে। (ফতোয়ায়ে সিরাজিয়া : ৩০)
একাধিক রোজা ভেঙে ফেললে কাফফারা কয়টি? একাধিক রোজা ভেঙে ফেললেও একটি কাফফারা আদায় করাই যথেষ্ট—হোক সেটা একই রমজানের একাধিক রোজা, অথবা হোক সেটা দুই রমজানের একাধিক রোজা। তবে কাফফারার রোজা ছাড়াও কাজা রোজা প্রতিটা আলাদা রাখতে হবে। যেমন কারো দুটি রোজা কাজা হয়েছে, তাহলে তার কাফফারা হলো ৬০টি রোজা এবং কাজা হলো দুটি রোজা। মোট ৬২টি রোজা তাকে রাখতে হবে। (ফতোয়ায়ে দারুল উলুম দেওবন্দ : ৬/৪৫৩-৪৫৫)
অপ্রাপ্তবয়স্ক বাচ্চার রোজা ভেঙে ফেলা
অপ্রাপ্তবয়স্ক বাচ্চার ওপর রোজা ফরজ নয়। এজন্য রোজা রেখে ভেঙে ফেললেও তার ওপর কাজা ও কাফফারা কোনোটি আবশ্যক নয়। (ফতোয়ায়ে শামি : ২/৪০৯)
তবে প্রাপ্তবয়স্ক কেউ রোজার নিয়তই না করে থাকলে তওবা-ইস্তেগফার করবে এবং সেজন্য একটি রোজার বদলে একটি রোজা কাজা করলেই হবে। কাফফারা তার ওপর আবশ্যক হবে না। (ফতোয়ায়ে শামি : ৩/৪২৯)
কাজা রোজার আগে শাওয়ালের ছয় রোজা
ফরজ রোজা কাজা থাকাবস্থায় নফল রোজা রাখা জায়েজ। অতএব, কাজা রোজা থাকার পরও শাওয়ালের রোজা রাখা যাবে। তবে জীবন-মৃত্যুর বিষয়টি যেহেতু কারো জানা নেই, সেজন্য ফরজ রোজাগুলো আগে কাজা করে নেওয়া উত্তম। এতে দ্রুত ফরজ রোজার দায়িত্ব থেকে মুক্তি মিলবে। তারপর যত ইচ্ছা নফল রোজা রাখা যাবে। (বাদায়েউস সানায়ে : ২/১০৪)
শাওয়ালের ছয় রোজার সঙ্গে কাজা রোজার নিয়ত
নফল ও কাজা রোজার বিধান সম্পূর্ণ ভিন্ন। উভয় রোজার নিয়ত একসঙ্গে করার অবকাশ নেই। না জেনে শাওয়ালের নফল রোজার সঙ্গে কাজা রোজার নিয়ত করে ফেললে কাজা রোজা আদায় হবে—শাওয়ালের রোজা আদায় হবে না এবং তার সওয়ারও হবে না। (ফতোয়ায়ে আলমগিরি : ১/১৯৭)
কাজা রোজার নিয়ত কখন করতে হবে?
কাজা রোজার নিয়ত সুবহে সাদেকের আগে করে নেওয়া জরুরি; রাতে করে নিলেও হয়। তবে সুবহে সাদেকের পরে নিয়ত করলে তা ধর্তব্য হবে না, তখন রোজাটি নফল হিসেবে গণ্য হবে। (ফতোয়ায়ে শামি : ২/৩৮০)
কাজা রোজা আদায় করার সময়
কাজা রোজা বছরের পাঁচ দিন ব্যতীত যেকোনো দিন আদায় করা যায়। বছরে পাঁচ দিন রোজা রাখা নিষেধ। পাঁচ দিনের মধ্যে ঈদুল ফিতরের দিন (পহেলা শাওয়াল) হলো এক দিন আর অবশিষ্ট চার দিন হলো, জিলহজ মাসের ধারাবাহিক ১০, ১১, ১২ ও ১৩ তারিখ। এ পাঁচ দিন ব্যতীত বছরে যেকোনো দিন রোজা রাখা যাবে। (বাদায়েউস সানায়ে : ২/৭৮)
কাজা রোজা বাকি থাকাবস্থায় আরেক রমজান এসে গেলে
কাজা রোজা যথাসম্ভব দ্রুত আদায় করে ফেলতে হয়। কোনো কারণে বিলম্ব করতে করতে আরেক রমজান এসে গেলে বিদ্যমান রমজানের রোজা আগে রাখতে হবে। তারপর রমজান শেষে বিগত রমজানের কাজা রোজাগুলো রাখতে হবে। (তাবয়িনুল হাকায়েক : ২/২০৩)
কাজা রোজা রেখে ভেঙে ফেললে
কাজা রোজা রেখে ভেঙে ফেললে অতিরিক্ত কোনো রোজা আবশ্যক হয় না। রোজার কাজা করতে হয় একমাত্র ফরজ রোজা ভেঙে ফেলে নফল কিংবা অন্য কোনো রোজা ভেঙে ফেলার কারণে কোনো রোজা আবশ্যক হয় না। (আল বাহরুর রায়েক : ৩/১৭)
দাওয়াতের কারণে কাজা রোজা ভাঙা যাবে?
দাওয়াতের কারণে শুধু নফল রোজা ভাঙার অবকাশ আছে। ফরজ ও ওয়াজিব রোজা ভাঙার অবকাশ নেই। তাই রমজানের কাজা হিসেবে রাখা রোজা দাওয়াতের কারণে ভাঙা জায়েজ হবে না। তারপরও রোজাটি ভেঙে ফেললে এর কারণে অতিরিক্ত কোনো রোজা আবশ্যক হবে না। (ফতোয়ায়ে শামি : ২/৪২৮)
লেখক : শিক্ষাসচিব ও সিনিয়র মুহাদ্দিস, জামিয়া আরাবিয়া দারুল উলুম বাগে জান্নাত, চাষাঢ়া, নারায়ণগঞ্জ