হোম > ইসলাম ও জীবন

আবেগের পরিণতি অশুভ না হোক

আনিকা বিনতে আজিজ

একটি ছেলে ও একটি মেয়ের পরিচয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। প্রথমে বন্ধুত্ব, তারপর নিয়মিত কথোপকথন। একসময় দুজনের মনে হলো, তারা একে অন্যকে ছাড়া থাকতে পারবে না। ছবি, বার্তা আর রাতজাগা আলাপে তৈরি হলো একান্ত এক জগৎ। কিন্তু সম্পর্কটি যখন বাস্তবতার মুখোমুখি হলো, তখন দেখা গেল—দুজনের মূল্যবোধ, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও দায়িত্ববোধে রয়েছে বিস্তর পার্থক্য। একসময় সম্পর্ক ভেঙে গেল। থেকে গেল অভিমান, অনুতাপ আর মানসিক অস্থিরতা।

এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সম্পর্ক তৈরিকে যেমন সহজ করেছে, তেমনি আবেগের তাড়নায় দ্রুত সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ার সুযোগও বাড়িয়েছে। অনেক সময় মানুষ অন্যকে গভীরভাবে জানার আগেই বাহ্যিক আকর্ষণকে ভালোবাসা মনে করে। প্রত্যাশা বাড়ে, অধিকারবোধ তৈরি হয়, সন্দেহ ও মান-অভিমান সম্পর্ককে ভারী করে তোলে। কখনো তা শেষ হয় প্রতারণা বা বিচ্ছেদে। তবে এর অর্থ এই নয় যে ভালোবাসাই সমস্যার মূল। বরং প্রশ্ন হলো—ভালোবাসা আমরা কীভাবে বুঝছি এবং কোন পথে পরিচালিত করছি?

ইসলাম মানুষের স্বাভাবিক অনুভূতিকে অস্বীকার করে না। বরং তাকে দিয়েছে মর্যাদা, সংযম ও দায়িত্বের কাঠামো। পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা দাম্পত্য সম্পর্কের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলেন, ‘তিনি তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন।’ (সুরা আর-রুম : ২১) এখানে ভালোবাসার সঙ্গে প্রশান্তি, মমতা ও দয়ার সম্পর্ক দেখানো হয়েছে। অর্থাৎ ইসলামের কাছে ভালোবাসা নিছক আবেগ নয়; এর সঙ্গে দায়িত্বও জড়িত।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘দুজন ভালোবাসার মানুষের জন্য নিকাহর মতো উত্তম কিছু নেই।’ (ইবনে মাজাহ : ১৮৪৭) এই হাদিস ভালোবাসাকে একটি বৈধ ও দায়িত্বশীল পরিণতির দিকে নিয়ে যাওয়ার দিকনির্দেশনা দেয়। নিকাহ তাই শুধু সামাজিক আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি ভালোবাসাকে অঙ্গীকার, দায়িত্ব ও পারস্পরিক অধিকারের বন্ধনে আবদ্ধ করার একটি পবিত্র ব্যবস্থা।

অন্যদিকে ইসলাম সীমালঙ্ঘনের পথ থেকেও সতর্ক করেছে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তোমরা ব্যভিচারের কাছেও যেয়ো না। নিশ্চয়ই এটি অশ্লীল এবং নিকৃষ্ট পথ।’ (সুরা আল-ইসরা : ৩২) শুধু চূড়ান্ত অপরাধ নয়, তার দিকে নিয়ে যেতে পারে এমন পথ থেকেও দূরে থাকার শিক্ষা এখানে রয়েছে।

এই আত্মসংযমের শুরু দৃষ্টি থেকে। আল্লাহ মুমিন পুরুষ ও নারীদের দৃষ্টি সংযত রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। (সুরা আন-নূর : ৩০-৩১) ডিজিটাল যুগে এই নির্দেশনার তাৎপর্য আরো গভীর। কারণ আজ সম্পর্কের শুরু হতে পারে একটি ছবি, মন্তব্য, ব্যক্তিগত বার্তা কিংবা নিয়মিত ভার্চুয়াল যোগাযোগ থেকে। তাই পবিত্রতা শুধু আচরণে নয়; দৃষ্টি, চিন্তা ও যোগাযোগেও প্রয়োজন।

কারো প্রতি আকর্ষণ তৈরি হওয়া মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি। তাই অনুভূতিকে অপরাধ না বানিয়ে তাকে সঠিক পথে পরিচালনা করাই ইসলামের শিক্ষা। বিয়ের সামর্থ্য থাকলে গোপন সম্পর্কের পরিবর্তে পরিবারকে সম্পৃক্ত করে নিকাহর উদ্যোগ নেওয়া উচিত। আর সামর্থ্য না থাকলে আত্মসংযম, ইবাদত ও চরিত্র রক্ষায় মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন। রাসুলুল্লাহ (সা.) যুবকদের উদ্দেশে বলেছেন, তাদের মধ্যে যারা বিয়ের সামর্থ্য রাখে, তারা যেন বিয়ে করে; আর যারা সামর্থ্য রাখে না, তারা যেন রোজা রাখে। (বুখারি : ৫০৬৬)

ভালোবাসা তাই নিষিদ্ধ নয়; নিষিদ্ধ হলো ভালোবাসার নামে সীমালঙ্ঘন। আধুনিক জীবনে সম্পর্কের স্বাধীনতা যত বাড়ছে, ততই প্রয়োজন আত্মসংযম ও দায়িত্ববোধের। কারণ কাউকে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষাই ভালোবাসার শেষ কথা নয়; তাকে সম্মানের সঙ্গে পাওয়ার চেষ্টা, তার অধিকার রক্ষা এবং সম্পর্ককে পবিত্র রাখা—ভালোবাসার প্রকৃত সৌন্দর্য সেখানেই।

মোহ মানুষকে কাছে টানে, কিন্তু প্রকৃত ভালোবাসা মানুষকে দায়িত্বশীল করে। তাই ক্ষণস্থায়ী আবেগের পেছনে না ছুটে ভালোবাসাকে যদি পবিত্রতা, অঙ্গীকার ও আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে পরিচালিত করা যায়, তবেই তা জীবনে প্রশান্তির কারণ হতে পারে। ভালোবাসার সবচেয়ে সুন্দর ঠিকানা তখন শুধু হৃদয় নয়—একটি পবিত্র বন্ধন, একটি দায়িত্বশীল পরিবার এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির পথ।

লেখক: ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ মুমিনের পরিচয়

একনজরে ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা উমর (রা.)

সুরা কাহফ: ঢাল ও আলোকবর্তিকা

বিশ্ব ইজতেমার প্রাথমিক তারিখ ঘোষণা

১১০ প্রতিযোগীকে পেছনে ফেলে ইউরোপে তৃতীয় বাংলাদেশি হাফেজ সাদ

জ্যোতির্বিজ্ঞান শাস্ত্রে মুসলিম মনীষীদের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ

একনজরে ইসলামের তৃতীয় খলিফা উসমান (রা.)

ইসলামে কথার সংযম

অসুস্থতাও আল্লাহর নেয়ামত

প্রযুক্তির যুগে ইসলাম প্রচারে সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ