হোম > ইসলাম ও জীবন

সত্যের মিম্বরে রাজনীতির তকমা

সাইফুল ইসলাম

‘হুজুর, রাজনৈতিক আলোচনা করবেন না’—সমাজের অন্যায়, অবিচার, দুর্নীতি কিংবা মানুষের অধিকার নিয়ে কোনো আলেম কথা বললেই কখনো কখনো এমন কথা শোনা যায়। কিন্তু প্রশ্ন হলো—কোরআন-সুন্নাহর আলোকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সত্য কথা বলাই কি রাজনীতি? ইসলাম শুধু নামাজ, রোজা ও ব্যক্তিগত ইবাদতের শিক্ষা দেয়নি; মানুষের ব্যক্তি ও সামাজিক জীবনকে ন্যায়, আমানতদারি, কল্যাণ ও মানবিকতার ভিত্তিতে গড়ে তোলার নির্দেশও দিয়েছে। মহান আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়বিচার ও সদাচরণের নির্দেশ দেন এবং অশ্লীলতা, অসৎকাজ ও সীমালঙ্ঘন থেকে নিষেধ করেন।’ (সুরা আন-নাহল : ৯০) এই নির্দেশ কি শুধু ব্যক্তিগত জীবনের জন্য, নাকি সমাজ ও রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য?

আল-কোরআন আরো বলে, ‘তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল থাকা উচিত, যারা কল্যাণের দিকে আহ্বান করবে, সৎকাজের নির্দেশ দেবে এবং অসৎকাজ থেকে নিষেধ করবে।’ (সুরা আলে ইমরান : ১০৪) এই দায়িত্বই ‘আমর বিল মারুফ’ ও ‘নাহি আনিল মুনকার’। অর্থাৎ ‘সৎ কাজের আদেশ করো’ আর ‘অসৎ কাজের নিষেধ করো’। তাহলে সমাজে প্রকাশ্য অন্যায় দেখেও একজন মানুষ কি সম্পূর্ণ নীরব থাকবেন? নাকি মানুষকে সত্য ও কল্যাণের পথে আহ্বান করাই হবে তার দায়িত্ব?

মাদক, ঘুস, দুর্নীতি, জুলুম, প্রতারণা, সন্ত্রাস, নৈতিক অবক্ষয় কিংবা মানুষের অধিকার হরণ নিয়ে সতর্ক করা—

এসবকে যদি শুধু ‘রাজনীতি’ বলা হয়, তাহলে ইসলামের সামাজিক নৈতিকতার শিক্ষা বাস্তবায়িত হবে কীভাবে? একজন আলেম যখন এসব অন্যায়ের বিরুদ্ধে কোরআন-সুন্নাহর আলোকে মানুষকে সতর্ক করেন, তখন তার উদ্দেশ্য দলীয় রাজনীতি নয়; বরং সমাজকে অন্যায় থেকে ফিরিয়ে আনা।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ কোনো অন্যায় দেখলে সে যেন হাত দিয়ে তা প্রতিহত করে; তা সম্ভব না হলে মুখ দিয়ে; তাও সম্ভব না হলে অন্তর দিয়ে যেন ঘৃণা করে।’ (সহিহ মুসলিম) তার মানে অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া ঈমানের গুরুত্বপূর্ণ দাবি। তবে এই দায়িত্ব পালনে প্রজ্ঞা, সামর্থ্য, পরিস্থিতি ও শরিয়তের নীতিমালা বিবেচনা করাও জরুরি।

তবে মিম্বরের স্বাধীনতা মানে মিথ্যা, অপবাদ, গুজব, ব্যক্তিগত আক্রমণ কিংবা দলীয় উসকানির স্বাধীনতা নয়। আলেমের বক্তব্য হতে হবে সত্যনিষ্ঠ, শালীন, প্রমাণনির্ভর এবং কোরআন-সুন্নাহসম্মত। কোনো দলকে অন্ধ সমর্থন করা যেমন ইসলামের শিক্ষা নয়, তেমনি কোনো রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে সত্যকে আড়াল করাও ন্যায়বিচারের দাবি হতে পারে না। মহান আল্লাহ বলেন, ‘ন্যায়ের ওপর দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকো এবং আল্লাহর জন্য সাক্ষ্য দাও, যদিও তা তোমাদের নিজেদের, পিতা-মাতা কিংবা আত্মীয়স্বজনের বিরুদ্ধে হয়।’ (সুরা আন-নিসা : ১৩৫) আবার কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ যেন মানুষকে ন্যায়বিচার থেকে বিরত না রাখে—ইসলাম এ নির্দেশও দিয়েছে। (সুরা আল-মায়িদা, আয়াত : ৮)

একজন মায়ের মাদকাসক্ত সন্তানের জন্য কান্না কি রাজনৈতিক? দুর্নীতির কারণে সর্বস্ব হারানো বাবার দীর্ঘশ্বাস

কি রাজনৈতিক? জুলুমের শিকার মানুষের আর্তনাদ কি রাজনৈতিক? যদি তাদের কষ্ট দলীয় রাজনীতি না হয়, তাহলে সেই কষ্টের কথা মিম্বরে উচ্চারিত হলেই কেন তাতে রাজনৈতিক তকমা লাগবে?

যদি কোনো আলেম কোরআন ও সুন্নাহর সুস্পষ্ট নির্দেশের ভিত্তিতে সত্য কথা বলেন, তাহলে শুধু ‘রাজনীতি’ তকমা দিয়ে সেই বক্তব্য থামিয়ে দেওয়া কি যথার্থ? কোনো ব্যক্তির বিরোধিতা আর আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সা.)-এর সুস্পষ্ট বিরোধিতা এক নয়। তাই কোরআন-সুন্নাহর প্রমাণিত নির্দেশকে জেনেবুঝে প্রত্যাখ্যান করা, তার বিরোধিতা করা কিংবা মানুষকে তা থেকে দূরে রাখা অত্যন্ত ভয়ংকর বিষয়। মহান আল্লাহ বলেন, ‘যারা তাঁর (রাসুল সা.) আদেশের বিরোধিতা করে, তারা সতর্ক হোক যে, বিপর্যয় তাদের ওপর আপতিত হবে অথবা আপতিত হবে তাদের ওপর যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।’ (সুরা আন-নুর : ৬৩)

মিম্বর কোনো দলের প্রচারণার মঞ্চ নয়; একইভাবে সমাজের অন্যায় থেকে মিম্বরকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করাও ইসলামের শিক্ষা নয়। মিম্বর হলো সত্য, ন্যায়, তাকওয়া ও কল্যাণের আহ্বানের স্থান। সেখানে ক্ষমতাবান ও সাধারণ উভয়ের জন্য একই ন্যায়ের বার্তা উচ্চারিত হওয়া উচিত।

মনে রাখতে হবে, মিম্বরের কণ্ঠ থামানো সহজ; কিন্তু সত্যের কণ্ঠ থামানো অসম্ভব। সত্যের মিম্বরে কোনো দলের পতাকা থাকে না; সেখানে থাকে আল্লাহর ভয়, রাসুল (সা.)-এর শিক্ষা ও মানুষের কল্যাণের বার্তা।

তাই কোরআন-সুন্নাহর সত্য কথা বলা একজন বক্তাকে থামানো শুধু একটি কণ্ঠকে স্তব্ধ করা নয়; বরং তা আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সা.)-এর নির্দেশিত সত্যের সরাসরি বিরোধিতার শামিল। যার পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ।

লেখক : শিক্ষক, যশোর ইংলিশ স্কুল অ্যান্ড কলেজ, যশোর সেনানিবাস

ইসলামের চোখে নারীর ড্রাইভিং

যৌন উন্মাদ সমাজ : দায় ও সমাধান

নারীর উচ্চশিক্ষা ও চাকরির বিষয়ে ইসলাম কী বলে, জানালেন মাওলানা শিব্বীর আহমদ

সন্তান লালন-পালনে সীমারেখার গুরুত্ব নিয়ে বিতর্ক, পাল্টে যাচ্ছে প্যারেন্টিংয়ের ধারণা

স্বামীকে অহেতুক সন্দেহ করার ক্ষতির বিষয়ে যা জানালেন মাওলানা আবুল বাশার

বগুড়ার বড় মসজিদ

রিজিক নিয়ে দুশ্চিন্তার অবকাশ নেই

ইসলামি বিধানে মব জাস্টিস

হেবা আইন সংশোধন ২০২৬: শরিয়া কী বলে?

জাকির নায়েকের সঙ্গে সাক্ষাৎ, নিজের লেখা বই উপহার দিলেন শায়খ আহমাদুল্লাহ