এশিয়ান গেমসে মঙ্গলবারের সকালটা শুরু হয়েছিল বাংলাদেশের জন্য একরাশ হতাশা নিয়ে। নারী ক্রিকেট দল পাকিস্তানের কাছে হেরে ব্রোঞ্জের স্বপ্ন হারাল। দুপুরে স্বাগতিক জাপানের কাছে পুরুষ কাবাডি দলের পরাজয় প্রায় নিভিয়ে দিল পদকের আরেকটি সম্ভাবনা। একের পর এক ইভেন্ট থেকে যখন ব্যর্থতার খবর আসছিল, আইচি-নাগোয়ায় তখন বাংলাদেশের পদক-খরা যেন আরো দীর্ঘ হওয়ারই আভাস দিচ্ছিল। কিন্তু সন্ধ্যা নামতেই বদলে গেল ছবিটা। এমন এক ইভেন্ট থেকে এলো পদকের খবর, যেটিকে গেমস শুরুর আগে সম্ভাব্য পদক তালিকাতেই খুব একটা রাখা হয়নি। খেলাটা ‘উশু’।
আরো বিস্ময়ের ব্যাপার, একটি ম্যাচও না খেলেই সেমিফাইনালে উঠে পদক নিশ্চিত করেছেন বাংলাদেশের জিন্নাত আক্তার!
Ñকীভাবে?
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় আইচি প্রিফেকচারাল মার্শাল আর্টস হলে বাংলাদেশের জন্য এই অপ্রত্যাশিত সুখবরটি নিশ্চিত হওয়ার পর উশু ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক দিলদার হোসেন দিলুর মুখে আর উচ্ছ্বাস চেপে রাখার চেষ্টা ছিল না। বললেন, ‘হ্যাঁ, আমরা পদক জিতেছি। যে কোনো একটি পদক তো পাবই।’
দিলুর কথার মধ্যেই তখন স্বস্তি। দিনের ব্যর্থতার চাপ পেরিয়ে বাংলাদেশ শিবিরে যেন একটু অন্যরকম আনন্দ। কারণ, এশিয়ান গেমসের এবারের আসরে কাবাডি, ক্রিকেট, শুটিং কিংবা আর্চারি থেকে পদকের প্রত্যাশা নিয়ে বাংলাদেশ এসেছিল। উশুকে নিয়ে এমন আলোচনা ছিল না। অথচ সেই উশুই সবার আগে বাংলাদেশকে পদক অর্জনের সম্মান এনে দেওয়ার ব্যবস্থা করে ফেলল।
৫২ কেজি ওজন শ্রেণির ফাইট ডিসিপ্লিনে জিন্নাত আক্তারের এই পদক নিশ্চিত হওয়ার গল্পটাও কম নাটকীয় নয়। প্রথম রাউন্ডেই লটারির ভাগ্যে ‘বাই’ পেয়েছিলেন বাংলাদেশি উশুকা। ফলে সরাসরি উঠে যান কোয়ার্টার ফাইনালে। সেখানেও তাকে কোনো লড়াই করতে হলো না।
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় কোয়ার্টার ফাইনালের জন্য জিন্নাত যখন আইচি প্রিফেকচারাল মার্শাল আর্টস হলে প্রস্তুত, তখন প্রতিপক্ষ ইন্দোনেশিয়ার থিসারা দিয়া ফ্লোরেন্টিনার নাম ঘোষণার কথা। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে লড়াই আর হলো না। ওজন মাপার পরীক্ষায় নির্ধারিত সীমার চেয়ে বেশি ওজন পাওয়া যায় ইন্দোনেশিয়ান প্রতিযোগীর। নিয়ম অনুযায়ী তাকে ডিসকোয়ালিফাই করে জিন্নাতকে বিজয়ী ঘোষণা করে জুরি বোর্ড।
ব্যস, ম্যাচ না খেলেই জিন্নাত উঠে গেলেন সেমিফাইনালে। আর সেমিফাইনালে ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই নিশ্চিত হয়ে গেল অন্তত ব্রোঞ্জ পদক। অর্থাৎ, এখন আর পদকহীন হয়ে ফেরার কোনো সুযোগ নেই বাংলাদেশের এই উশুকার।
Ñউশুতে কেন এমন ব্যতিক্রমী পদ্ধতি?
বাংলাদেশ উশু অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক দিলদার হোসেন দিলু এর ব্যাখ্যায় জানালেন, গেমসের নিয়ম অনুযায়ী কোনো ওজন শ্রেণিতে আটজনের বেশি প্রতিযোগী থাকলে সেমিফাইনালে ওঠা চার প্রতিযোগীর প্রত্যেকের পদক নিশ্চিত হয়। জিন্নাতের ৫২ কেজি ওজন শ্রেণিতে অংশ নিয়েছেন ১৬ জন। ফলে সেমিফাইনালে ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই বাংলাদেশের পদক নিশ্চিত হয়েছে।
এবার সামনে শুধু পদকের রঙ বদলের লড়াই। আজ বুধবার সেমিফাইনালে জিন্নাতের প্রতিপক্ষ চীনের প্রতিযোগী ডি উ। সে লড়াইয়ে জিততে পারলে ব্রোঞ্জ বদলে যাবে রৌপ্য কিংবা স্বর্ণের স্বপ্নে! আর হারলেও জিন্নাতের গলায় থাকবে ব্রোঞ্জ। বাংলাদেশের জন্য সেটিই হয়ে উঠবে এই এশিয়ান গেমসের প্রথম পদক।
জিন্নাতের কাছে তাই বুধবারের (আজ) লড়াইটা শুধু একটি সেমিফাইনাল নয়, এটি ৪০ বছরের অপেক্ষার পর ব্যক্তিগত ইভেন্টে বাংলাদেশের আরেকটি ইতিহাস লেখার সুযোগ। তিনি বলছিলেন, ‘আমি অনেক খুশি। দেশের জন্য কিছু করতে পেরেছি। সবার দোয়া চাই। বাংলাদেশের উশুকে যেন আরো অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যেতে পারি।’
কথাগুলো বলছিলেন সেনাবাহিনীর উশুকা জিন্নাত আক্তার। চারপাশে তখন বাংলাদেশের পদক নিশ্চিত হওয়ার আনন্দ। অথচ যে মেয়েটিকে কিছুক্ষণ আগেও শুধু পরের ম্যাচের প্রস্তুতি নিতে দেখা যাচ্ছিল, তিনিই হয়ে গেছেন বাংলাদেশের পদকের প্রথম খবরের কেন্দ্রবিন্দু।
এ অর্জনের ঐতিহাসিক গুরুত্ব কিন্তু কম নয়।
১৯৮৬ সালের সিউল এশিয়ান গেমসে বক্সার মোশাররফ হোসেন ব্যক্তিগত ইভেন্টে বাংলাদেশের জন্য ব্রোঞ্জ পদক জিতেছিলেন। এতদিন সেটিই ছিল এশিয়ান গেমসে ব্যক্তিগত ইভেন্টে বাংলাদেশের একমাত্র পদক। এরপর কেটে গেছে চার দশক। ব্যক্তিগত ইভেন্টে আর কোনো পদক আসেনি।
দীর্ঘ ৪০ বছর পর সে অপেক্ষার অবসান ঘটাতে যাচ্ছেন জিন্নাত। তবে আবারও বলিÑগল্পটা এখানেই শেষ নয়। বরং শুরু হতে পারে আরেকটি গল্প। ম্যাচ না খেলেই সেমিফাইনালে ওঠা জিন্নাত এখন এমন এক লড়াইয়ের সামনে দাঁড়িয়ে, যেখানে একটি জয় তাকে ব্রোঞ্জের গণ্ডি পেরিয়ে স্বর্ণ কিংবা রৌপ্যের মঞ্চে নিয়ে যেতে পারে।
ম্যাচ খেলতে হয়নি; কিন্তু ইতিহাসের দরজায় কড়া নেড়েছেন জিন্নাত আক্তার। বুধবার সন্ধ্যায় আইচি প্রিফেকচারাল মার্শাল আর্টস হলে চীনের সঙ্গে লড়াইয়ে ব্রোঞ্জ থাকবে, নাকি রঙ বদলে আরো উজ্জ্বল হবে বাংলাদেশের পদক?
স্বপ্ন দেখছি দুই চোখ মেলে!