৬ জুন, ২০১৫। বার্লিনের অলিম্পিক স্টেডিয়ামে জুভেন্টাসকে ৩-১ গোলে হারিয়ে চ্যাম্পিয়নস লিগের শিরোপা জিতে বার্সেলোনা। সেই ম্যাচে উদযাপনের মধ্যমণি কোচ এনরিকের পাঁচ বছর বয়সি মেয়ে শানা। এনরিকে কোমরে হাত দিয়ে মাঠে দাঁড়িয়ে মিটিমিটি হাসছেন। একটু দূরেই শানার হাতে বার্সেলোনার লাল-নীল-হলুদ পতাকা। বাবাকে সাক্ষী রেখে জার্মানির মাটিতে বার্সেলোনার পতাকা পুঁতেছিল শানা। মেয়ের কাণ্ড দেখে বাবা যেন খুশিতে আটখানা!
৩১ মে, ২০২৫। মিউনিখের আলিয়াঞ্জ অ্যারেনায় তখনো আলোর ঝরনাধারা। শিরোপা নিয়ে উল্লাসে মেতে উঠছেন আশরাফ হাকিমি-মারকিনিওসরা। ক্যামেরার লেন্স ঘুরে গেল গ্যালারির দিকে। বিশালাকার জায়গাজুড়ে দোল খাচ্ছে নয়নাভিরাম দৃশ্যের তিফো; শানার পরনে পিএসজির ৮ নম্বর জার্সি, দলের পতাকা পুঁতছেন স্নেহ-বিগলিত বাবা। একটু পরই ভেসে উঠল এনরিকের অবয়ব। ছলছলে চোখ, হাসিমাখা মুখ আর ভেতরে মর্মস্পর্শী এক গল্প। যে গল্প কন্যাকে ছুঁতে না পেরে আনন্দাশ্রুতে ভেসে যাওয়া এক বাবার।
লুইস এনরিকের বেদনার গল্পটা এক যুগের। যার সূচনা হয়েছিল ২০১৯ সালে। হাড়ের ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করে না ফেরার দেশে চলে যান শানা। মাত্র ৯ বছর বয়সি মেয়ের এই মৃত্যু এনরিকের জীবনে ঝড় বইয়ে দেয়। থামিয়ে দেয় তার ঊর্ধ্বমুখী কোচিং ক্যারিয়ার। এই ধাক্কা পুরোপুরিভাবে বদলে দেয় তার জীবনদর্শন। সেটা এমনই যে, মেয়েকে হারাতে কেমন লাগে, সেই ব্যথা কাউকে বুঝতে দেবেন না বলে হোয়াটসঅ্যাপেও ছিলেন না। এনরিকের জীবনের প্রতিটি উৎসবের আমেজেও হাজির থাকেন শানা। আনন্দের মুহূর্তগুলো এলেই মেয়েকে স্মরণ করেন শোকার্ত বাবা।
স্মরণ করলেন পিএসজির ইতিহাস গড়ার রাতেও। ইন্টার মিলানকে ৫-০ গোলে উড়িয়ে প্রথমবারের মতো ইউরোপ সেরার মুকুট জিতল পিএসজি। প্যারিসের রাজাদের ৫৪ বছরের আক্ষেপ ঘোচানোর মঞ্চে আরেকবার ফিরে এলেন শানা। ম্যাচের পর চোখ ভেজা গলায় এনরিকে বলেন, ‘আমি খুবই আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছি। সমর্থকরা আমার পরিবারের কথা ভাবে, এটা অসাধারণ। শুধু ম্যাচ কিংবা শিরোপা নয়, আমি আমার ছোট্ট সোনামণিকে প্রতিদিনই মনে করি। আমাদের কাটানো মুহূর্তগুলো আজীবন বয়ে বেড়াব।’
ফাইনালের আগে এনরিকে বলছিলেন, ‘২০১৫ সালের বার্লিনে শানার একটা অসাধারণ ছবি আছে, যেখানে সে বার্সেলোনার পতাকা গেঁথে দিচ্ছে। আমি চাই, এবার পিএসজির হয়েও সেই মুহূর্তটা ফিরিয়ে আনতে। শারীরিকভাবে ও নেই, কিন্তু আত্মায় সে আমার সঙ্গেই থাকবে।’ কথা রাখলেন তিনি। ফাইনাল জয়ের পর নিজের পরনের টি-শার্টে বুকজুড়ে আগলে রেখেছিলেন শানাকে। পিএসজির দর্শকরাও অ্যালিয়াঞ্জ অ্যারেনার একটি দেয়ালজুড়ে গেঁথে রাখেন চিরচেনা ছবির পোস্টার, এ যেন শানার জন্য নীরবে বেদনার্ত শ্রদ্ধাঞ্জলি।
সন্তান বাবাদের কাছে ভালোবাসার সবচেয়ে বড় নাম। অনুপ্রেরণার সবচেয়ে বড় ভান্ডার। পৃথিবীর বুকে সেই অনুপ্রেরণা হারিয়ে বেদনাবিধুর ধূপ জ্বালিয়ে স্পেন থেকে বার্লিন হয়ে মিউনিখেও বিচরণ করছেন এনরিকে। বিউগলের সুর সঙ্গী করে জয় করছেন একের পর এক শিরোপা। চূড়ান্ত রূপটা দেখালেন চ্যাম্পিয়নস লিগ ট্রফিতে। দিনশেষে, বেদনার্ত হৃদয় নিয়ে কন্যার স্মৃতির সোনালি আলোয় ‘আনন্দাশ্রু’তে ভাসলেন একজন বাবা।