ভারতে বিশ্বকাপ না খেলার সিদ্ধান্ত
মোস্তাফিজ ইস্যুতে ভারতের বিরুদ্ধে পাল্টা পদক্ষেপ নিয়েছে বাংলাদেশ। সংখ্যালঘু কার্ড ব্যবহার করে মোস্তাফিজুর রহমানকে ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ (আইপিএল) থেকে বহিষ্কারে দিল্লির চরম সাম্প্রদায়িক পদক্ষেপের পর ভারতজুড়ে যখন উগ্রবাদী হিন্দুদের রীতিমতো উল্লাস চলছিল ঠিক সে মুহূর্তে ঢাকার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে কড়া প্রতিক্রিয়া। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের নির্দেশে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) সাফ জানিয়ে দিয়েছেÑবিশ্বকাপ খেলতে ভারত যাবে না বাংলাদেশ। বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের নিরাপত্তা নিয়ে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন সরকার। ভারত সরকার যেখানে একজন মোস্তাফিজের নিরাপত্তা দিতে অপারগ, সেখানে পুরো বাংলাদেশ টিমের নিরাপত্তা দেবে কীভাবেÑএ প্রশ্ন জোরালোভাবে তুলে ধরা হয়েছে সরকারের পক্ষে থেকে। বাংলাদেশ সরকারের এ সিদ্ধান্তের কথা ইতোমধ্যেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলকে (আইসিসি) জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। বিবেচনা করা হচ্ছেÑআইপিএলের সম্প্রচার বন্ধের বিষয়টিও।
ক্রীড়া উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল সরকারের পক্ষ থেকে কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, গোলামির দিন শেষ হয়েছে। তথ্য উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান তার প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, চুপ থাকার সময় নেই। দিল্লির পদক্ষেপে আমাদের প্রতিক্রিয়া দেখাতেই হচ্ছে।
এদিকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেছেন, মোস্তাফিজ ইস্যুতে যে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে তা কূটনৈতিক পদক্ষেপেরই অংশ। এ পদক্ষেপ নেওয়া ছাড়া এই মুহূর্তে বাংলাদেশের সামনে আর কোনো বিকল্প নেই।
ঢাকা-দিল্লির সম্পর্কের বিষয়টির দেখভাল করেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এমন একজন সিনিয়র কূটনীতিক সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে আমার দেশকে বলেন, ভারত সরকার আসলে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ককে কোথায় নিয়ে যেতে চায়Ñতা বোধগম্য নয়। তারা তাদের রাজনৈতিক স্বার্থে সংখ্যালঘু ইস্যুটিকে বারবার অপব্যবহারের মাধ্যমে দুদেশের বিদ্যমান সম্পর্ককে চরম খারাপ পর্যায়ে নিয়ে গেছে। ভারত সরকার মুখে বারবার সম্পর্ক উন্নয়নের পাশাপাশি দুদেশের জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর কথা বললেও তারা এমন সব পদক্ষেপ নিচ্ছে, যা দুদেশের জনগণের মধ্যে বৈরিতাকেই বাড়িয়ে তুলছে।
মোস্তাফিজ ইস্যুতে ওই সিনিয়র কূটনীতিক আরো বলেন, এ বিষয়ে দিল্লির নীতিনির্ধারকরা তাদের জনগণের মধ্যে বাংলাদেশবিরোধী বিষ ঢেলে দিয়েছে। ছড়িয়ে দিয়েছে সাম্প্রদায়িক ঘৃণা। শশী থারুরের মতো কিছু ব্যক্তি ভারত সরকারের এ সিদ্ধান্তের সমালোচনা করলেও তাতে আসলে কোনো কাজ হয়নি। উগ্রবাদী হিন্দু জঙ্গিদের মনোবাসনাই পূরণ করেছে দিল্লির নীতিনির্ধারকরা।
গত শনিবার বাংলাদেশে হিন্দু নির্যাতনের ভুয়া ও বানোয়াট অভিযোগ আমলে নিয়ে এবারের আইপিএলে অন্তর্ভুক্ত বাংলাদেশের একমাত্র ক্রিকেটার মোস্তাফিজুর রহমানকে বহিষ্কার করে ভারতের ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই)। এ ঘটনা জানান দিয়েছে, ঢাকার ব্যাপারে তাদের মনোভাবের কোনো বদল হয়নি। ভারত সরকারের এ সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের প্রতি ভারতের শত্রুভাবাপন্ন নীতির বহিঃপ্রকাশ। মোস্তাফিজের বহিষ্কারের দাবিতে উগ্রবাদী সংগঠনগুলোর সঙ্গে কংগ্রেসের নেতারাও যোগ দেন। এমনকি উগ্রবাদী হিন্দুদের চাপের মুখে কোনো কোনো মুসলিম সংগঠনও বাংলাদেশে হিন্দু নির্যাতনের মিথ্যা অভিযোগ তুলে মোস্তাফিজকে বহিষ্কারের দাবি জানায়। হুমকি দেওয়া হয় মোস্তাফিজকে দলে নেওয়া কলকাতা নাইট রাইডার্সের (কেকেআর) মালিক অভিনেতা শাহরুখ খানকে।
মোস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়ায় তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল। নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুকে পেজে আসিফ নজরুল লিখেনÑ‘উগ্র সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর কাছে নতি স্বীকার করে বাংলাদেশের ক্রিকেটার মোস্তাফিজুর রহমানকে দল থেকে বাদ দেওয়ার জন্য কলকাতা নাইট রাইডার্সকে নির্দেশ দিয়েছে ভারতের ক্রিকেট বোর্ড। আমি এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি।’
বাংলাদেশে আইপিএল সম্প্রচার বন্ধের উদ্যোগ নিতেও অনুরোধ জানান আসিফ নজরুল। তিনি বলেন, ‘আমি তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টাকে অনুরোধ করেছি, বাংলাদেশে আইপিএল খেলার সম্প্রচারও যেন বন্ধ করে দেওয়া হয়। আমরা কোনো অবস্থাতেই বাংলাদেশের ক্রিকেট, ক্রিকেটার ও বাংলাদেশকে অবমাননা মেনে নেব না। গোলামির দিন শেষ।’
ফেসবুকে আসিফ নজরুল আরো বলেন, ‘ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী হিসেবে আমি ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ডকে বলেছি, তারা যেন আইসিসির কাছে পুরো বিষয়টি ব্যাখ্যা করে লিখে। বোর্ড যেন জানিয়ে দেয় যে যেখানে বাংলাদেশের একজন ক্রিকেটার চুক্তিবদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও ভারতে খেলতে পারেন না, সেখানে বাংলাদেশের গোটা ক্রিকেট টিম বিশ্বকাপ খেলতে যাওয়া নিরাপদ মনে করতে পারে না। বোর্ড থেকে বাংলাদেশের বিশ্বকাপ খেলাগুলো শ্রীলঙ্কায় করার অনুরোধ জানানোর নির্দেশনাও আমি দিয়েছি।’
তথ্য উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেছেন, ‘চুপ করে বসে থাকার উপায় নেই। আমাদের একটা প্রতিক্রিয়া দেখাতেই হচ্ছে।’ আইপিএল এ বছর বাংলাদেশে দেখানো হবে কি নাÑএমন প্রশ্নের জবাবে রিজওয়ানা হাসান জানান, ‘আইনি ভিত্তিগুলো পর্যালোচনা করা হচ্ছে। তারপর এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেওয়া হবে। ভারত সরকারকে কঠোর বার্তা দিয়ে তিনি বলেন, খেলার মধ্যে রাজনীতি নিয়ে আসা তারা মেনে নেবেন না। দুর্ভাগ্যজনকভাবে খেলার মধ্যে রাজনীতি নিয়ে আসা হয়েছে। খেলা খেলার জায়গায় রাখা হয়নি। অন্য সময়ে দেখি, দুটি দেশের মধ্যে রাজনৈতিক টেনশন থাকলেও খেলাধুলার মাধ্যমে তা কমিয়ে আনা যায়। এখানে দেখা গেল, সম্পূর্ণ উল্টো কাজটি করা হয়েছে।’
রিজওয়ানা হাসান ভারতীয় সিদ্ধান্তে সৃষ্ট প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে বলেন, ‘বাংলাদেশের একজন খেলোয়াড়কে নিশ্চিত করার পর বলা হচ্ছে, রাজনৈতিক যুক্তিতে তাকে নেওয়া হবে না। এতে বাংলাদেশের জনগণের মনে প্রচণ্ড আঘাত লাগে; প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। সে রকম জায়গায় আমাদেরও একটা অবস্থান নিতে হবে। সেই অবস্থানের আইনি ভিত্তি ও প্রক্রিয়া আমরা যাচাই-বাছাই করছি। তারপর পদক্ষেপ নেব।’
তিনি ভারতের কাছে প্রশ্ন করেনÑকোন যুক্তিতে মোস্তাফিজকে বাদ দেওয়া হলো? খেলোয়াড়ি কোনো যুক্তিতে হলে তো কোনো ব্যাপার ছিল না। এ যুক্তি আমরা কোনোভাবেই গ্রহণ করতে পারছি না। ফলে আমাদের পদক্ষেপ নিতেই হচ্ছে। চুপ করে থাকার উপায় নেই।
সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের সিদ্ধান্তকে ‘ন্যক্কারজনক’ বলে অভিহিত করেন। ফারুকী এক ফেসবুক পোস্টে লিখেছেনÑ‘আইপিএলে মোস্তাফিজকে নিয়ে যা হয়েছে, সেটা ন্যক্কারজনক। এর মধ্যে বাংলাদেশের নাগরিকরা ঘৃণার রাজনীতি দেখতে পেয়েছেন এবং ব্যথিত হয়েছেন। ভারতে সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতনের যেসব অভিযোগ আছে, বাংলাদেশি খেলোয়াড়-বিরোধিতাও একই সূত্রে গাঁথা থাকতে পারে বলে সন্দেহ তার।
এদিকে বাংলাদেশের মোস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড বিসিসিআইকে ধন্যবাদ জানিয়েছে ভারতের সরকারি দল বিজেপিসহ উগ্রবাদী হিন্দু নেতা ও গুরুরা। বিজেপি নেতা সংগীত সোম মোস্তাফিজকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, এটি পুরো ভারতের হিন্দুদের জয়। তিনি বলেন, ‘১০০ কোটি সনাতনী ভারতীয়দের প্রতি লক্ষ রেখে বিসিসিআইয়ের এ সিদ্ধান্তের জন্য ধন্যবাদ। আমরা বলেছিলাম, এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া হবে। কারণ ১০০ কোটি মানুষের আবেগ-অনুভূতিকে হেলাফেলা করা যায় না।’
মোস্তাফিজকে নিলাম থেকে কেনায় কলকাতার মালিক শাহরুখ খানকে ‘দেশদ্রোহী’ আখ্যা দেওয়া এ বিজেপি নেতা বলেন, ‘শাহরুখ খান বুঝেছেন যে ভারতে থেকে সনাতনীদের বিরুদ্ধে যাওয়া উচিত নয়। তিনি এটিও বুঝেছেন হাজারো সনাতনীর কারণেই তিনি শাহরুখ খান হয়েছেন।’
উত্তর প্রদেশের মন্ত্রী ও বিজেপি নেতা নরেন্দ্র কাশ্যপও বিসিসিআইয়ের সিদ্ধান্তের প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, ‘আমরা বিসিসিআইয়ের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাই। কারণ তারা দেশের আবেগ-অনুভূতি বুঝে বাংলাদেশি খেলোয়াড়কে সরিয়ে দিয়েছেন, যেহেতু বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর অত্যাচার চলছে—এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী মোদি এবং সরকার প্রতিবাদ জানাচ্ছেন।’
মোস্তাফিজকে বাদ দেওয়ার দাবিতে সরব ছিলেন আধ্যাত্মিক গুরু দেবকীনন্দন ঠাকুরও। তিনি বিসিসিআইয়ের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানালেও বলিউড তারকা শাহরুখ খানের নীরবতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলেন, ‘এ সিদ্ধান্তের জন্য বিসিসিআইয়ের প্রতি কৃতজ্ঞ।’
এর আগে আইপিএলের আট আসরে পাঁচটি ভিন্ন দলের হয়ে খেলেছেন মোস্তাফিজ। ২০২৬ সালের আসরের নিলামে তাকে ৯ কোটি ২০ লাখ রুপিতে কিনেছিল কেকেআর।