উইম্বলডন ২০২৫
বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীনতম টেনিস টুর্নামেন্ট উইম্বলডন। প্রায় দেড় শতাব্দী ধরে চলছে টেনিসের এই বিখ্যাত আসরটি। ১৮৭৭ সালে লন্ডনের উইম্বলডনে অল ইংল্যান্ড লনটেনিস ও ক্রোকেট ক্লাবে প্রথমবারের মতো আয়োজিত হয় ঘাসের কোর্টের মহারণ। দুই সপ্তাহব্যাপী চলা সেই আসর ১৪৮ বছর পেরিয়েও ধরে রেখেছে নিজের ঐতিহ্য। সময়ের ক্রমে ছড়িয়ে গেছে বিশ্বজুড়ে। ইংল্যান্ডের রাজপরিবারের মতোই টেনিসের রাজকীয় আসর হিসেবে কুড়িয়ে নিয়েছে খ্যাতি। আজ অল ইংল্যান্ড ক্লাবে পর্দা উঠতে যাচ্ছে এই আসরের ১৩৮তম সংস্করণের।
বছরে টেনিসের চারটি মেজর টুর্নামেন্ট হয়ে থাকে। অস্ট্রেলিয়ান ওপেন দিয়ে শুরু; এরপর ফ্রেঞ্চ ওপেন শেষেই উইম্বলডনের আমেজ। বছরের শেষ টুর্নামেন্ট ইউএস ওপেন। এই চার আসরের মধ্যে উইম্বলডনই ব্যতিক্রম, যেখানে ঘাসের কোর্টে খেলা হয়। বাকি তিনটির দুটো খেলা হয় হার্ড কোর্টে, ফ্রেঞ্চ ওপেন ক্লে বা মাটির কোর্টে।
উইম্বলডনের ইতিহাসে জড়িয়ে আছে অল ইংল্যান্ড ক্রোকেট ক্লাবের নাম। ১৮৬৯ সালে অল ইংল্যান্ড ক্রোকেট ক্লাবের যাত্রা শুরু হয়। সে সময় সেখানের ইনডোরে ‘রিয়েল টেনিস’ খেলা হতো। সময়ের ক্রমে রিয়েল টেনিসের জনপ্রিয়তা ছড়িয়ে পড়লে নব্বইয়ের দশকে অল ইংল্যান্ড ক্লাব কর্তৃপক্ষ দর্শকদের জন্য টেনিস কোর্টে খেলাটি উপভোগের ব্যবস্থা নেয়। সেখান থেকেই ১৮৭৭ সালের ১৪ এপ্রিল অল ইংল্যান্ড ক্রোকেট ক্লাব নামের সঙ্গে লনটেনিস জুড়ে দিয়ে ‘অল ইংল্যান্ড ক্রোকেট অ্যান্ড লনটেনিস ক্লাব’ নামকরণ করা হয়।
উইম্বলডনের প্রথম আসরে কেবল ছেলেদের এককে খেলা অনুষ্ঠিত হয়। ১৮৭৭ সালের সেই আসরে মেয়েদের খেলার অনুমতি ছিল না। উইম্বলডনে নারীরা প্রথমবারের মতো খেলার সুযোগ পায় ১৮৮৪ সালে। ১৯৬৭ সালে এ আসরটি রঙিন পর্দায় সরাসরি সম্প্রচারিত হয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করে। প্রথম আসরে ২২ পুরুষ প্রতিযোগীর লড়াইয়ে ২০০ দর্শকের সামনে ফাইনালে স্পেনসার উইলিয়াম গোর ৪৮ মিনিটের লড়াইয়ে ৬-১, ৬-২, ৬-৪ ব্যবধানে হারান উইলিয়াম মার্শালকে।
উইম্বলডনে শুরুর দিকে পুরুষ এককে শিরোপাজয়ীকে শুধু ট্রফি দিয়ে পুরস্কৃত করা হতো। যেখানে রুপার প্রলেপের ওপর লেখা থাকত-‘দ্য অল ইংল্যান্ড লনটেনিস ক্লাব সিঙ্গেল হ্যান্ডেড চ্যাম্পিয়ন অব দ্য ওয়ার্ল্ড’। মেয়েদের এককে ১৮৮৬ সালে প্রথম শিরোপা ট্রফি দেওয়া শুরু হয়। রুপার প্রলেপখচিত সেই শিরোপার নাম ছিল ‘রোজওয়াটার ডিশ’। ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত উইম্বলডনে কোনো প্রাইজমানির প্রচলন ছিল না। সে বছরই আর্থিক পুরস্কার দেওয়া শুরু হয় এবং ২০০৭ সালে পুরুষ ও নারীদের ক্ষেত্রে সেটা সমতায় আনা হয়।
ইংল্যান্ডের ঘাসের কোর্টের ওই আসরে ছিল ড্রেস কোড। যার প্রচলন শুরু হয় ৯০ দশকে। শুরুর দিকে পুরুষদের জন্য সাদা ফুলহাতা শার্টের সঙ্গে ছিল সাদা ট্রাউজার। তবে ঝামেলা বাধিয়ে দেন সে সময়ের তারকা আন্দ্রে আগাসি। জমকালো পোশাক পরতে না পারায় ১৯৮৮ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত উইম্বলডনে খেলতে অস্বীকৃতি জানান তিনি। তাতেও অবশ্য ছাড় দেয়নি কর্তৃপক্ষ। এমনকি সর্বকালের সেরা পুরুষ টেনিস খেলোয়াড় রজার ফেদেরারকেও ২০১৩ সালে কমলা রঙের সোলযুক্ত সাদা জুতা পরার জন্য তিরস্কার করা হয়। মূলত ইংল্যান্ডের রাজপরিবারের ঐতিহ্য এবং গরমে আবহাওয়ার সঙ্গে মানানসই বলে সাদা রঙ বেছে নেওয়া হয়েছে। নারী-পুরুষ উভয়কেই সম্পূর্ণ সাদা শার্ট, প্যান্ট, স্কার্ট, শর্টস, টুপি, ব্যান্ড, মোজা ইত্যাদি পরে খেলতে হয়।
উইম্বলডনে টেনিস অনুষ্ঠিত হয় ঐতিহ্যবাহী নিয়মে। খেলোয়াড়দের সাধারণত র্যাংকিং ও যোগ্যতা অনুযায়ী নির্বাচন করা হয়। তবে কিছু খেলোয়াড়কে ওয়াইল্ড কার্ডের মাধ্যমেও খেলার সুযোগ দেওয়া হয়। বছরের তৃতীয় এই গ্র্যান্ড স্ল্যামে সাধারণত পুরুষদের ক্ষেত্রে ৫ সেট আর নারীদের ক্ষেত্রে ৩ সেটের খেলা হয়ে থাকে। একজন খেলোয়াড়কে একটি সেট জিততে হলে তাকে কমপক্ষে দুই গেমে এগিয়ে থাকতে হয় এবং ছয়টি গেমে জিতে জয় নিশ্চিত করতে হয়। যদি সেটটি ৬-৬ গেমে সমতায় পৌঁছায়, তবে সেটা টাইব্রেকারে গড়ায়। টাইব্রেকারে কোনো খেলোয়াড় দুই পয়েন্ট এগিয়ে থেকে সাত পয়েন্ট অর্জন করতে পারলেই সেটটি জিতে নেয়।
বছরের চারটি গ্র্যান্ড স্ল্যামের মধ্যে উইম্বলডন ব্যতিক্রম। সেটা ইতিহাস-ঐতিহ্য থেকে শুরু করে মাঠের খেলার দিক দিয়েও। এ আসরে টেনিস বলের ক্যারিশমা দেখতে কোর্টে হাজির হন অসংখ্য তারকা-মহাতারকা। এ তালিকায় ক্রিকেটার, ফুটবলার থেকে শুরু করে বিশ্বক্রীড়াঙ্গনের বিভিন্ন তারকা রয়েছেন। ইংল্যান্ডের এই ঐতিহ্যবাহী কোর্টে রয়েল বক্সে আমন্ত্রিত অতিথিরাও ঐতিহ্য ধারণ করে মিশে যান শুভ্রতার পরশে। যে শুভ্রতায় বছর ঘুরে আবারও জেগে ওঠার অপেক্ষায় অল ইংল্যান্ড লনটেনিস ও ক্রোকেট ক্লাব।