‘অটো পাস’ শব্দটা নিশ্চয়ই শুনেছেন আপনি। কোনো পরীক্ষা না দিয়েই পরের ধাপে উত্তীর্ণ। করোনাকালে বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষায় এই সিস্টেমের প্রয়োগ চলে। কিন্তু যখন করোনা ছিল না, তারও অনেক আগে থেকে বাংলাদেশের ক্রিকেটে এই ‘অটো পাস’ সিস্টেমের প্রচলন ছিল। আর সেই ধান্ধাবাজির সিস্টেম চালু করেছিলেন বিসিবির সাবেক সভাপতি নাজমুল হাসান পাপনের সভাসদের সবচেয়ে প্রভাবশালী পরিচালক ডা. ইসমাইল হায়দার মল্লিক।
ঘটনার বিস্তারিত বিবরণে যাই।
তৃতীয় বিভাগ বাছাইয়ে চ্যাম্পিয়ন ও রানার্সআপ। এই দুটো ক্লাব পরের মৌসুমে তৃতীয় বিভাগে উঠবে। নিয়ম সেটাই। কিন্তু সেই নিয়মকে কেবল ‘নিজের নিয়ম’ করতেই বিসিবির পলাতক পরিচালক মল্লিক কুটিল এক ষড়যন্ত্রে নামলেন। এমন ব্যবস্থা করলেন যাতে তৃতীয় বিভাগের বাছাইয়ে কেবল দুটো দলই অংশ নিতে পারে! আর এই ধান্ধাবাজিতে সঙ্গী হিসেবে রাখলেন ক্রিকেট কমিটি অব ঢাকা মেট্রোপলিস বা সিসিডিএমের তৎকালীন চেয়ারম্যান গাজী গোলাম মোর্তজাকে। সাবেক পরিচালক গোলাম মোর্তজা সিসিডিএমের দায়িত্ব নেওয়ার আগে তৃতীয় বিভাগের বাছাই ক্রিকেটে প্রতি আসরে উৎসবের মেজাজ থাকত। অংশ নিত শতাধিক ক্লাব। কিন্তু এই নিয়ম তারা বদলে দিলেন ২০১৪-১৫ ক্রিকেট মৌসুম থেকে। সম্পূরক তথ্য হলো, সে সময় বিসিবির সভাপতি ছিলেন নাজমুল হাসান পাপন। সে সময়কাল থেকে তৃতীয় বিভাগ বাছাই ক্রিকেট স্রেফ নামসর্বস্ব আসরে পরিণত হলো। প্রতি মৌসুমে নিজেদের পছন্দের দুই ক্লাবকে তৃতীয় বিভাগে উত্তীর্ণ করতেই তারা কুটিল এক চক্রজাল তৈরি করেন। এমন কিছু ব্যবস্থা নেন, যাতে সেই বাছাই পর্বে মাত্র দুটি দল ছাড়া আর কেউ অংশ নিতে আগ্রহই না দেখায়! তৃতীয় বিভাগের বাছাই সেই ক্রিকেট লিগকে তারা ‘কৃত্রিম বাছাই লিগে’ পরিণত করতে অদ্ভুত কিছু শর্ত জুড়ে দেন। সেই লিগের এন্ট্রি ফি হঠাৎ করেই পাঁচ লাখ টাকা করে দেওয়া হলো, যা ছিল আগে মাত্র ৭৫ হাজার টাকা। জটিলতা বাড়াতে সিসিডিএম জানিয়ে দিল, এন্ট্রির পাঁচ লাখের সঙ্গে ক্লাবের গঠনতন্ত্র ও পূর্ণাঙ্গ কমিটি জমা দিতে হবে। কোনো ক্লাব তাদের প্যাডে অস্থায়ী ঠিকানা ব্যবহার করতে পারবে না। অবাক করার বিষয় হলো, ২০১৪-১৫ থেকে ২০২৩-২৪ সময়কালে তৃতীয় বিভাগের ‘কৃত্রিম বাছাই লিগে’ যে কয়েকটি ক্লাব অংশ নিয়েছিল, তাদের সেই আবেদনপত্র বিসিবির ফাইল ক্যাবিনেট থেকে বের করে এখন পরীক্ষা করার পর প্রমাণ মিলেছে যে, সেই শর্তকে ক্লাবগুলো তখনই বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়েছিল। কম্পিউটার প্রিন্টে প্যাড বানিয়ে অপূর্ণাঙ্গ কমিটি জমা দেওয়া ছাড়া আর অন্য কোনো শর্ত পূরণ করতে পারেনি ওই মেয়াদকালে অংশ নেওয়া ১১টি ক্লাব। ব্যতিক্রম ছিল কেবল শান্তিনগর। তারা ক্লাবের গঠনতন্ত্র দিতে পেরেছিল। ২০১৫-১৬ মৌসুমে তৃতীয় বিভাগ বাছাইয়ে অটো পাস পাওয়া শান্তিনগর ক্লাব সর্বশেষ ক্রিকেট মৌসুমে রেলিগেটেড হয়ে গেছে।
যেখানে ক্লাবগুলো সামান্য গঠনতন্ত্র বা পূর্ণাঙ্গ কমিটিই দিতে পারে না, সেখানে পরবর্তীতে এই লিগে অংশগ্রহণের পথ আরো কঠিন করার ব্যবস্থা নেয় বিসিবি। ২০২১-২২ ও পরের মৌসুমে এই লিগে অংশগ্রহণকারীদের জন্য আরেকটি জটিল শর্ত জুড়ে দেওয়া হলো। জানিয়ে দেওয়া হলো, এন্ট্রি ফি’র সঙ্গে ক্লাবের নামে সমাজসেবা অধিদপ্তরের নিবন্ধন অথবা নিবন্ধন আবেদনের দলিল, ক্লাবের নিজস্ব কার্যালয়, গঠনতন্ত্র এবং ক্লাবের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকসহ পূর্ণাঙ্গ কমিটি জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক। তবে বিসিবির ক্ষমতাবান পরিচালকদের সঙ্গে দহরম-মহরম থাকা ক্লাব সংগঠকদের ক্ষেত্রে এ নিয়মটাও শিথিল করা হয়। প্রতি মৌসুমে মাত্র দুটি ক্লাবের অংশগ্রহণের বিষয়টি যখন হাস্যকর ও স্থুল প্রমাণিত হয়, তখন নতুন আরেকটি নাটক মঞ্চস্থ করতে সিসিডিএম ২০২২-২৩ থেকে ২০২৩-২৪ মৌসুম পর্যন্ত এই লিগে অংশগ্রহণকারী দলের সংখ্যা চারে উন্নীত করে!
আরো অবাক করা তথ্য হলো, এই কৃত্রিম লিগের এক মৌসুমে চ্যাম্পিয়ন এবং রার্নাস আপ নির্ধারিত হয় টসের মাধ্যমে! লোক দেখানো কায়দায় মাত্র দুটি ক্লাব নিয়ে বাছাই লিগ করে বিসিবি ১০ বছরে ক্রিকেট এবং ক্রিকেটারদের কি ভয়াবহ ক্ষতি করেছে তা বোঝার জন্য নিচের নিচের অংকে একটু চোখ বুলিয়ে নিন।
আগে এই লিগে অংশ নিতো ৬০টি ক্লাব। প্রতি ক্লাবে ন্যূনতম ১৫ জন খেলোয়াড় সংখ্যা ধরলে প্রতি মৌসুমে ৯০০ জন ক্রিকেটার খেলার সুযোগ পেত। কিন্তু মাত্র দুটো ক্লাবের মধ্যে এই লিগকে আটকে রাখায় প্রায় ৯০০*১০= ৯০০০ হাজার কিশোর ক্রিকেটারদের প্রতিযোগিতামুলক ক্রিকেটে বঞ্চিত করা হলো। এই ১০ বছরে পুরো একটা প্রজন্মকেই ক্রিকেটে গড়ে উঠতে দেওয়া হলো না। এই ধংসের দায়ে তো বিসিবির ধান্দাবাজ, কুচক্রী পরিচালকদের এখন জেলে থাকার কথা! অথচ সেই তারাই এখন আরেকবার বিসিবির গদিতে বসার জন্য নির্বাচনের ছক কষছেন।
এবার আসুন জেনে নিই ২০১৪-১৫ থেকে ২০২৩-২৪ এই ৯ মৌসুমের মধ্যে প্রথম যে সাত আসরে এই ‘কৃত্রিম বাছাই লিগে’ যে দুটি করে দল অংশ নিয়ে অটো পাসের সিল গায়ে লাগিয়ে ছক সাজিয়ে কাউন্সিলরশিপ বাগিয়েছিল, সেই ক্লাবের মালিক ছিলেন কারা?
আমার দেশ-এর কাছে এ-সংক্রান্ত যে তথ্যপ্রমাণ রয়েছে, তাতে দেখা যাচ্ছে এভাবে অটো পাস নিয়ে তৃতীয় বিভাগ বাছাই লিগ থেকে উঠে আসা তিনটি ক্লাবের মালিকানা ছিল বেক্সিমকোর পরিচালক শায়ান এফ রহমানের নামে। তার বাবার নাম সালমান এফ রহমান, যিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা এবং বেক্সিমকোর ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন। জুলাই আন্দোলন হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার দায়ে বর্তমানে তিনি কারাগারে। ২০১৬-১৭ মৌসুমে তৃতীয় বিভাগ বাছাই লিগে নবাবগঞ্জ ক্রিকেট কোচিং ক্লাব দিয়ে শায়ানের এই মালিকানার শুরু। এরপর ২০১৭-১৮ মৌসুমে গুলশান ক্রিকেট ক্লাব এবং ২০১৯-২০ মৌসুমে বনানী ক্রিকেট ক্লাবÑ এ দুটো ক্লাবের মালিকানাও তার। এই তিন ক্লাবের সভাপতি হিসেবে তার নাম এবং সাধারণ সম্পাদক হিসেবে রয়েছে খালেদ মাহমুদ সুজনের নাম। যিনি আবার এই পুরোটা সময়জুড়ে বিসিবির পরিচালক ছিলেন।
এমনভাবে তৃতীয় বিভাগের ‘কৃত্রিম লিগে’ অংশ নেওয়া সব ক্লাবের মালিক ছিলেন এমন ব্যক্তি, যারা এই লিগকে কিনেছেন। আবার যখন প্রয়োজন হয়েছে বিক্রি করে দিয়েছেন। আর এই পুরো প্রক্রিয়ায় ধান্ধাবাজিতে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন বিসিবির প্রভাবশালী পরিচালক ডা. ইসমাইল হায়দার মল্লিক। যাকে বিসিবিতে পাপনের পর দ্বিতীয় ক্ষমতাধর পরিচালক হিসেবে পুরো বিসিবি হাতজোড় করে চলত।
পেছনের ৯ মৌসুমে তৃতীয় বিভাগ বাছাইয়ের এই ‘কৃত্রিম লিগে’ অটো পাস নিয়ে উঠে আসা ১৮ ক্লাবের মধ্যে এখনো ১৫টি ক্লাব টিকে আছে ঢাকার ক্রিকেটের তৃতীয়, দ্বিতীয়, প্রথম বিভাগ; এমনকি প্রিমিয়ার লিগেও! এ সময়ে রেলিগেটেড হয়ে গেছে তিনটি ক্লাব। ধান্ধাবাজি প্রক্রিয়ায় কাউন্সিলরশিপ বাগিয়ে নেওয়া এই ১৫ ক্লাব বিসিবির নির্বাচনে ডা. মল্লিকের ভোট ব্যাংক। জুলাই আন্দোলনে ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর সাবেক বিসিবি সভাপতির সঙ্গে পরিচালক মল্লিকও পলাতক। দুজনের নামেই দুদক অর্থ পাচারসহ দুর্নীতির মামলাও করেছে। মল্লিক পালিয়ে আছেন। তবে তার রেখে যাওয়া ভোট ব্যাংক হিসেবে পরিচিত এই ক্লাবগুলোতে নিয়ন্ত্রণ ঠিক রাখার উপায় তিনি সেট করে দিয়েছেন। অবাক করার বিষয় হলো, অটো পাস নিয়ে ক্রিকেট লিগে আসা এই ক্লাবগুলোর অভিভাবক-কর্তা সাজছেন এখন বিসিবির বর্তমান তিন পরিচালক! নাম প্রকাশে অনিচ্ছ্বক এক ক্রিকেট কর্তা এ প্রসঙ্গে হাসতে হাসতে বলেন, ‘বিদেশে বসেও মল্লিক দেশে পাহারাদার নিয়োগ দিয়েছেন।’
এখনো তাহলে তিনিই ক্ষমতাধর!