এশিয়ান গেমসের পদক তালিকায় চীনকে থামানো যেন ক্রমেই অসম্ভব হয়ে উঠছে। আইচি-নাগোয়া আসরের প্রথম সপ্তাহ শেষ হওয়ার আগেই ১০০ সোনার মাইলফলক পেরিয়ে গেছে তারা। ২৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১০৭ স্বর্ণপদক নিয়ে শীর্ষে থাকা চীনের মোট পদকসংখ্যা সবার ধরাছোঁয়ার বাইরেÑ১৭৬টি। দ্বিতীয় স্থানে থাকা জাপানের সোনার সংখ্যা মোটে ৩১। অর্থাৎ, শুধু স্বর্ণপদকের সংখ্যাতেই ব্যবধান ৭০-এর বেশি!
এ ব্যবধান আরেকবার প্রমাণ দিচ্ছে যে, এশিয়ান গেমসে চীন ওয়ান অ্যান্ড অনলি! ভারে বা ধারে তাদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার মতো কেউ নেই!
এশিয়ান গেমসে এই চিত্র অবশ্য নতুন নয়। হাংঝু এশিয়ান গেমসেও ২০১ সোনা নিয়ে সবারে উপরে ছিল চীন। জাপান ৫২ ও দক্ষিণ কোরিয়া ৪২ সোনা নিয়ে যথাক্রমে দ্বিতীয় ও তৃতীয় হয়েছিল। মোট পদকেও চীনের সঙ্গে বাকিদের ব্যবধান ছিল বিশাল; চীনের ৩৮৩ পদকের বিপরীতে জাপানের ১৮৮ এবং দক্ষিণ কোরিয়ার ১৯০।
এবারের আসরেও সেই ধারাবাহিকতা আরো স্পষ্ট। চীন এরই মধ্যে এশিয়ান গেমসে টানা ১২তমবার পদক তালিকার শীর্ষে থাকার পথে এগোচ্ছে। চায়না ডেইলির বিশ্লেষণ অনুযায়ী ১৯৮২ সালের পর থেকে এশিয়ান গেমসে চীন নিয়মিতভাবে শীর্ষে থেকেছে এবং এবার তাদের লক্ষ্য সেই আধিপত্য ধরে রাখার পাশাপাশি আরো বিস্তৃতভাবে খেলায় শক্তি বাড়ানো।
কোথায় চীনের এত দাপট? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে যা মিললÑসেটা ঠিক এমন : চীনের আধিপত্যের সবচেয়ে বড় ভিত্তি তাদের ঐতিহ্যগত শক্তির খেলাগুলো। ডাইভিং, জিমন্যাস্টিকস, ভারোত্তোলন, শুটিং, টেবিল টেনিস ও ব্যাডমিন্টনÑএ ছয় খেলাকে দেশটির ক্রীড়া কর্তৃপক্ষ দীর্ঘদিনের ‘ট্র্যাডিশনাল স্ট্রেংথ’ হিসেবে বিবেচনা করে। এর সঙ্গে অ্যাথলেটিকস, সাঁতার ও জলক্রীড়া রয়েছে ভিত্তিমূলের খেলা হিসেবে।
আইচি-নাগোয়ায় সাঁতারেই এর সবচেয়ে উজ্জ্বল উদাহরণ পাওয়া গেছে। চীনের ১৯ বছর বয়সি ঝাং ঝানশুও একাই সাতটি সোনা জিতেছেন। ২০০, ৪০০, ৮০০ ও ১৫০০ মিটার ফ্রিস্টাইলে ব্যক্তিগত চার সোনার পাশাপাশি তিনটি রিলেতে সোনা পেয়েছেন তিনি। তার সাত সোনার কীর্তি এক আসরে কোনো সাঁতারুর সর্বোচ্চ সাফল্য। চীন সাঁতারে মোট ৪১ ইভেন্টের মধ্যে ৩০টিতেই সোনা জিতেছে, যেখানে দ্বিতীয় জাপানের সোনা মাত্র সাতটি।
চীনের ভবিষ্যৎ শক্তির আরেকটি ছবি দেখা গেছে ১৩ বছর বয়সি ইউ জিদির পারফরম্যান্সে। তিনি তিনটি ব্যক্তিগত সোনা জিতেছেন। এর মধ্যে ২০০ মিটার ব্যক্তিগত মিডলেতে ২:০৬.১০ সময় করে এশিয়ান রেকর্ড গড়েছেন। মাত্র ১৩ বছর বয়সেই বিশ্বমানের পারফরম্যান্স দেখিয়ে তিনি চীনের দীর্ঘমেয়াদি প্রতিভা তৈরির ব্যবস্থার একটি উদাহরণ হয়ে উঠেছেন।
শুটিংয়েও চীনের শক্তি স্পষ্ট। পুরুষদের ১০ মিটার এয়ার রাইফেলে অলিম্পিক চ্যাম্পিয়ন শেং লিহাও ২৫৪.২ পয়েন্ট নিয়ে সোনা জিতেছেন এবং গেমস রেকর্ড গড়েছেন। তার পেছনে একই ইভেন্টে ভারতীয় দুই শুটার রুপা ও ব্রোঞ্জ পেয়েছেন। টেবিল টেনিসে চীন এবার একটি বড় ধাক্কা খেলেও সামগ্রিক চিত্র বদলায়নি। পুরুষ দলগত ইভেন্টে ১৯৯০ সালের পর প্রথমবার সোনা হারিয়েছে তারা, জাপানের কাছে ৩-২ ব্যবধানে হেরে। কিন্তু নারীদের দলগত ইভেন্টে আবারও সোনা জিতে টানা ষষ্ঠবারের মতো চ্যাম্পিয়ন হয়েছে চীন।
তারকা নয়, বিশাল গভীরতাই চীনের ক্রীড়াক্ষেত্রের সবচেয়ে বড় শক্তি। তাদের সাফল্য কেবল কয়েকজন বিশ্বমানের তারকার ওপর নির্ভরশীল নয়। এবার ১,২৭৪ সদস্যের বিশাল প্রতিনিধিদলে ৮১৫ অ্যাথলেট অংশ নিচ্ছেন ৩৮টি খেলায়। তাদের ৫৪৮ জন প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ প্রথমবারের মতো এশিয়ান গেমসে অংশ নিচ্ছেন। অর্থাৎ, বর্তমান সাফল্যের পাশাপাশি পরবর্তী প্রজন্মও প্রস্তুত হচ্ছে।
চীনের ক্রীড়া পরিকল্পনাতেও এই ধারাবাহিকতার ছাপ রয়েছে। দেশটির ‘৬৩৩’ কৌশলে ছয়টি ঐতিহ্যগত শক্তির খেলা, তিনটি ভিত্তিমূলের খেলা এবং ফুটবল-বাস্কেটবল-ভলিবলের মতো তিনটি বড় দলীয় খেলাকে আলাদা গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। লক্ষ্য শুধু পদক জেতা নয়, সামগ্রিকভাবে একটি ক্রীড়া শক্তিধর দেশ হয়ে ওঠা, সত্যিকার অর্থেই স্পোর্টিং নেশন হয়ে ওঠা।
এ কারণেই চীনের সঙ্গে অন্য দেশগুলোর ব্যবধান শুধু পদকসংখ্যার নয়; প্রতিযোগিতার গভীরতারও। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ভারত, ইরান কিংবা উজবেকিস্তান নির্দিষ্ট কিছু খেলায় শক্তিশালী। কিন্তু চীন একইসঙ্গে সাঁতার, শুটিং, ডাইভিং, জিমন্যাস্টিকস, ভারোত্তোলন, টেবিল টেনিস ও ব্যাডমিন্টনের মতো বহু পদকসমৃদ্ধ খেলায় একসঙ্গে শীর্ষ পর্যায়ের অ্যাথলেট তৈরি করতে পারে।
তাই আইচি-নাগোয়ায় এখন প্রশ্নটা আর ‘চীন শীর্ষে থাকবে কি না’Ñএমন নয়। বরং প্রশ্ন, শেষ পর্যন্ত চীনের সোনার সংখ্যা কত হয় এবং দ্বিতীয় স্থানের দলটি কতটা কাছাকাছি যেতে পারে। জাপানের ঘরের মাঠের আসরেও চীনের মুঠোয় ১০০-এর বেশি স্বর্ণপদকÑএ পরিসংখ্যান, এ সমীকরণই যে তাদের আধিপত্যের সবচেয়ে পরিষ্কার ছবি।
কী বুঝলেন? যথারীতি চীন আরেকবার এশিয়ান গেমসের চ্যাম্পিয়ন!