শুক্রবার ছুটির দিন সাধারণত হাট-বাজারে ভিড় বেশি হয়। কেনাবেচাও চলে বেশ। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) নির্বাচনের দিন যত কাছে আসছে ততই কেনাবেচার ভিড় বাড়ছে।
ক্লাবগুলো বিক্রি করছে কাউন্সিলরশিপ। আর বিসিবির নির্বাচনে ভোটের বাজারে জিততে দেদারসে এই কাউন্সিলরশিপ কিনছেন পরিচালক পদের ভোটে অংশ নিতে যাওয়া সম্ভাব্য প্রার্থীরা।
এই ভোট কেনাবেচার বাজারে ক্লাবের সঙ্গে চেনা নেই জানা নেই, এমনকি ক্লাবের সভাপতি আগে কখনো যার নামও শুনেননি এমন লোকের কাছে কাউন্সিলরশিপ ‘বিক্রি’ করে দিচ্ছে অনেক ক্লাব। বিনিময় মূল্য ২০ থেকে ৪০ লাখ। কোথাও আবার কোটি ছাড়িয়ে। আর অর্থের বিনিময়ে এই কাউন্সিলরশিপ বিক্রিবাট্টার টাকা জমা পড়ছে ক্লাবের এক বা দুজন শীর্ষ কর্তার অ্যাকাউন্টে। প্রকারান্তরে এমনভাবে ক্লাবের কাউন্সিলরশিপ বিক্রির এসব ঘটনাকে সংশ্লিষ্ট ক্লাব কর্তারা ডোনেশন বলে চালিয়ে দিতে চাইছেন। তবে অবাক করার বিষয় হলো ‘বিক্রি’ হওয়া এসব ক্লাবের দুঃসময়ে যারা এতদিন পাশে ছিলেন তাদের এখন কাউন্সিলরশিপের গনায়ও আনা হচ্ছে না।
কারণ, এখন কাউন্সিলরশিপ যে ব্যাপক মূল্যে বিক্রি করা যাচ্ছে। একটা ক্লাবের কাউন্সিলরশিপ এভাবে নির্বাচনের বাজারে বিক্রি করে কোটি টাকা কামানো যাচ্ছে- এমন লাভজনক ‘ব্যবসা’ আর কী হতে পারে!
আর নিশ্চিত জানুন, যিনি এই টাকায় কাউন্সিলরশিপ কিনছেন তিনি সেই ‘বিনিয়োগ’ বিসিবিতে নির্বাচিত হয়ে কয়েকগুণ বেশি কামিয়ে নেবেন। বিসিবির পরিচালক পদ এমনই মধুর চাক যে চারপাশে এখন ঝাঁকে ঝাঁকে মৌমাছি ভনভন করছে!
১৩০০ কোটি টাকা যে বিসিবির রাজকোষে!
আর এই খাজাঞ্চিখানায় ভাগ বসাতে ক্রিকেটের সঙ্গে যার কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই, ক্রিকেট উচ্চারণ করতে গিয়ে যিনি বলেন কিরকেট- এমন ‘স্যার’ও এখন বিসিবির পরিচালক হওয়ার সুখস্বপ্ন দেখে গড়গড়ায় ধোঁয়া ছাড়ছেন!
দেখে মনে হচ্ছে বিসিবির পরিচালক পদ এখন জাতীয় সংসদের এমপি পদের চেয়ে কোনো অংশ কম নয়! খেলা এবং রাজনীতি প্রসঙ্গ উঠলেই প্রায় সবাই গলা ফাটিয়ে বলেন, খেলার সঙ্গে রাজনীতিকে জড়িয়ে ফেলা উচিত নয়। কিন্তু সেই চেনাজানা রাজনীতিবিদরাই যাদের আবার একমাত্র পরিচয় হলো রাজনীতি করা, সেই তারাই প্রায় দলবেঁধে এবার বিসিবির নির্বাচনে পরিচালকের গদিতে বসার জন্য আকুল!
নির্বাচিত হওয়ার পর এই রাজনীতিবিদ কাম ‘কিরকেট পরিচালকরা’ বাংলাদেশের ক্রিকেটের উন্নয়নে কী ভূমিকা রাখবেন, সেটা জানার জন্য আপনার বেশি কষ্ট করার প্রয়োজন নেই। বিসিবির পেছনের ২৫ বছরের খাতা উল্টে দেখুন। আপনি উত্তর পেয়ে যাবেন।
একটা ছোট্ট সূত্র ধরিয়ে দিচ্ছি। টেস্ট খেলছে বাংলাদেশ প্রায় ২৫ বছর ধরে। এখনো এই ফরম্যাটে আমাদের পরিসংখ্যান এবং সার্বিক পারফরম্যান্স জানাচ্ছে আমরা প্রাথমিকের স্তরে রয়েছি!
বিসিবির নির্বাচনকে ঘিরে ক্লাবের কাউন্সিলরশিপ কেনাবেচা চলছে প্রায় প্রকাশ্যেই। এখানে রয়েছে টাকার খেলা। আর জেলা এবং বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থা থেকে কাউন্সিলরশিপ মনোনয়নে চলছে পলিটিক্যাল পাওয়ারের খেলা!
বিসিবির নির্বাচনে জেলা এবং বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থাগুলো বা ক্যাটাগরি-১ থেকে পরিচালক নির্বাচিত হবেন ১০ জন। এই ক্যাটাগরিতে বিভিন্ন জেলা ও বিভাগ থেকে কাউন্সিলর মনোনয়নে (যারা ভোট দেবেন এবং নির্বাচনে অংশ নেবেন) যাদের নাম জমা পড়ছে তাদের মধ্যে বেশির ভাগেরই মুখ্য পরিচয় রাজনীতিবিদ!
একটু চোখ বুলাই কয়েকটি নামে। নড়াইল : মনিরুল ইসলাম, নড়াইল জেলা সাধারণ সম্পাদক। বাগেরহাট : এমএ সালাম, বাগেরহাট বিএনপির সভাপতি। কিশোরগঞ্জ : মো. শরিফুল আলম, সাংগঠনিক সম্পাদক, কেন্দ্রীয় কমিটি ও সভাপতি কিশোরগঞ্জ জেলা বিএনপি। সিলেট জেলা : আব্দুল কাউয়ুম চৌধুরী, সিলেট জেলা বিএনপি সভাপতি (ইনি অবশ্য বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালীন বিসিবির পরিচালক ছিলেন একবার)। মৌলভীবাজার : মনোয়ার আহমেদ, মৌলভীবাজার জেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক। রাঙামাটি : মো. মামুনুর রশীদ, জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক। লক্ষ্মীপুর : মঈন উদ্দিন চৌধুরী, লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি। কুমিল্লা : ইউসুফ মোল্লা টিপু, কুমিল্লা মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব।
তালিকায় থাকা এই রাজনীতিবিদরা দলবেঁধে ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচনে অংশ নিলে হাততালির সঙ্গে তোমার ভাই আমার ভাই, স্লোগানও শুনতেন। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে বিসিবির নির্বাচনে তাদের সংশ্লিষ্টতা কেন এবং কী কারণে?
আপনি হিসাব মিলিয়ে নিন।