তামিম ইকবাল : সরকার বিসিবির নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করছে।
আসিফ মাহমুদ : সরকার রুটিন কাজ করছে, রুটিন কাজকে হস্তক্ষেপ করা বলে না। সরকারের যা এখতিয়ার আছে, তার মধ্যে থেকে সরকার কাজ করছে।
তামিম ইকবাল : তার (আমিনুল ইসলাম বুলবুল) কোনো অধিকারই নেই কাউন্সিলরের নাম বদল করার চিঠি দেওয়ার এবং তাকে সই করার।
আমিনুল ইসলাম বুলবুল : কাউন্সিলরের ফরম তো সভাপতির কাছেই আসে। কাজেই এটা সভাপতির এখতিয়ারের মধ্যেই পড়ে। কেউ কাউন্সিলর হলে তাকে অবশ্যই গঠনতন্ত্রেও শর্ত পূরণ করতে হবে। আমরা গঠনতন্ত্রের মধ্যেই আছি।
বিসিবির সামনের মাসের নির্বাচনকে নিয়ে এমন নরম-গরম বাতচিতে অস্থির এখন দেশের ক্রিকেট। কদিন আগেও এই যারা একে অন্যের সঙ্গে দেখা হলে কুশল বিনিময় করতেন। এখন সেই তারা আড়ালে আবডালে না, একেবারে প্রকাশ্যে এসে একে-অন্যের চামড়া ছিলা সমালোচনা করছেন।
দুপক্ষের লক্ষ্য একটাই-বিসিবির নির্বাচনে জেতা।
বিসিবিতে কাউন্সিলর নিয়ে সমস্যা ও বিতর্কের খেলা শুরু হয়েছে মূলত জেলা ও বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থাগুলোর কাউন্সিলরশিপ নিয়ে। বিসিবির ভোটাভুটিতে যা পরিচিত ক্যাটাগরি-১ হিসেবে। এই ক্যাটাগরিতে বিভিন্ন জেলা ও বিভাগ থেকে কাউন্সিলর হিসেবে যে নামগুলো জমা পড়েছে বিসিবিতে তাদের অনেকেই সংশ্লিষ্ট জেলা এবং বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থার অ্যাডহক কমিটিতে ছিলেন না। কমিটির বাইরে থেকে তাদের নাম কাউন্সিলর হিসেবে পাঠানো হয়েছে বিভিন্নমুখী তৎপরতায়।
সেই তৎপরতা কী? শুনি একটু বিস্তারিত।
জেলার ডিসির কাছে সেই জেলার বা বিভাগের বিশিষ্ট রাজনীতিবিদের ফোন গেল।
হ্যালো, কে ডিসি সাহেব বলছেন? আমাকে চেনেন তো নিশ্চয়ই। বিসিবির নির্বাচনে কাউন্সিলের জন্য আমার একটা চয়েস আছে। আমি নামটা পাঠিয়ে দিচ্ছি। আপনি ওটা চূড়ান্ত করে ঢাকায় পাঠিয়ে দিন। আপনি আমার এই বিষয়টিকে অনুরোধ অথবা নির্দেশ যা ইচ্ছা মানতে পারেন। বিসিবিতে আমাদের নিজের লোক লাগবে, তাই..।
ফোনের এ প্রান্ত থেকে ডিসি সাহেব চেয়ার ছেড়ে প্রায় উঠে দাঁড়িয়ে গেলেন- ‘জি ভাই, জি ভাই, আমার অনুরোধই আমার জন্য নির্দেশনা। আমি অমুক ভাইয়ের নামটা কাউন্সিলর হিসেবে পাঠিয়ে দিচ্ছি। আপনি চিন্তা করবেন না।’
ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর নিজেকে চিন্তামুক্ত রাখতেই সংশ্লিষ্ট ডিসি এমন জি হুজুর, জি হুজুর হয়ে গেলেন! জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের (এনএসসি) বিবেচনায় এসব ডিসি হলেন পাজি ডিসি (এ সংক্রান্ত একটি টেলিফোন রেকর্ড রয়েছে আমার দেশ-এর কাছে)। কয়েকটি জেলা ও বিভাগের ডিসিদের স্বাক্ষরে জমা হওয়া এমন কিছু কাউন্সিলের মনোনয়ন নিয়ে ঘোর আপত্তি এনএসসি এবং বিসিবির। তাদের দাবি এটি গঠনতন্ত্রের বিরোধী। অ্যাডহক কমিটির বাইরে থেকে নিজের ইচ্ছে বা পছন্দ মাফিক ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির জন্য এমনভাবে কাউন্সিলর মনোনয়নের কোনো সুযোগ নেই। তাই সেই কাউন্সিলরদের বদল করে অ্যাডহক কমিটির মধ্য থেকেই কাউন্সিলরের নাম পাঠানোর জন্য নির্দেশনামূলক চিঠি দিয়েছে বিসিবি। যাতে সই আছে বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুলের।
এই ঘটনাকে তামিম ইকবাল বলছেন সরকারি হস্তক্ষেপ। আর ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদের দাবি এটা সরকারের রুটিন কাজ। রুটিন কাজকে যদি আপনি বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করেন তাহলে সেটা আরো বাজে নজির। এটা তো তাহলে ফেয়ার নয়। আসিফ জানান, ‘বিসিবিতে আগের বছরগুলোতে আসলে কোনো নির্বাচনই হতো না। নামকাওয়াস্তে দেখানোর জন্য নির্বাচন হতো। জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি বিসিবির কাউন্সিলর হয়ে আসত। এমনকি জেলা আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির জ্যেষ্ঠ নেতা তিনি বিসিবির নির্বাচনে কাউন্সিলর হয়ে আসতেন। অথচ বিসিবির গঠনতন্ত্রে লেখা আছে যে, জেলা ও বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থা থেকে ক্রিকেট সংগঠক অথবা ক্রিকেটারকে অগ্রাধিকার দিয়ে কাউন্সিলর হিসেবে মনোনয়ন দেওয়া উচিত। এটা পরিষ্কার যিনি কাউন্সিলর হবেন তাকে জেলা ক্রীড়া সংস্থার সদস্য হতে হবে। সেই গঠনতন্ত্র এখন যদি কেউ না মানে তাহলে তো আমাদের সেটা ঠিক করতে হবে। আগে এমন সব ঘটনায় কেউ চ্যালেঞ্জ করত না। কারণ, দ্বিতীয় কোনো প্রার্থীই তো সেখানে থাকত না। পুরোনো সেই বন্দোবস্ত এবারও করার একটা অপচেষ্টা হয়েছে। অনেক জায়গায় ডিসিদের রাজনৈতিক দলের নেতারা কল (ফোন) দিয়েছেন। এটাকে আমি বলব অবৈধ হস্তক্ষেপ। আমার মতে এটাই খেলাধুলায় রাজনীতিকরণ। তারা ডিসিকে ফোন দিয়ে বলেছেন, জেলা বিএনপির নেতার নাম কাউন্সিলর হিসেবে পাঠাও। ডিসিরাও একটু বিব্রত হচ্ছেন। স্বাভাবিকভাবে তারাও রাজনৈতিক চাপ অনুভব করছেন। তারা আমাকে বলেছেন, স্যার, আমরাও চাপে আছি। কিন্তু আমরা তো গঠনতন্ত্রের বাইরে থেকে কারো নাম পাঠাতে পারি না। কিছু জায়গায় নিয়মের ব্যত্যয় ঘটেছিল তারা সেটা ঠিক করে আবার কাউন্সিলরদের নাম পাঠিয়েছেন।’
বিসিবির নির্বাচনে এখন স্পষ্ট দুটো পক্ষ। আমিনুল ইসলাম বুলবুল বনাম তামিম ইকবাল। দুদিন আগে তামিম ইকবাল সংবাদ সম্মেলন করে অভিযোগ আনলেন সরকার এই নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করছে। সরকার তথা ক্রীড়া উপদেষ্টা বা আসিফ মাহমুদ। অথচ এই আসিফ মাহমুদ এবং তামিম ইকবালের মধ্যে একসময় ভালো ‘বন্ধুত্ব’ ছিল। আসিফ মাহমুদ বিসিবি বা মাঠ পরিদর্শনে এলে তামিম তার সঙ্গী হতেন। পাশে থাকতেন। এখন সময়ের ফেরে আসিফ মাহমুদের ঘোর সমালোচক তামিম ইকবাল! ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদও টিভি সাক্ষাৎকারে বলছেন, ‘তামিম ভাইয়ের পক্ষ হয়ে মানুষজন ক্লাবের কাউন্সিলরশিপ দখল করার জন্য লোকজনকে অপহরণ করছে। তামিম ভাইয়ের পক্ষে বুলবুল ভাইয়ে ফোন দিয়ে বলা হলো আপনি নির্বাচন থেকে সরে যান। আপনাকে বিসিবির সিও বানিয়ে দেব। এগুলোতে এক অর্থে সন্ত্রাসী কার্যক্রম এবং এগুলো করা হচ্ছে তামিম ইকবালের মতো একজন ক্রিকেটারকে সামনে রেখে। তাকে ব্যানার সাজিয়ে। অথচ আপনারা সবাই জানেন যে ব্যক্তিগতভাবে আমি নিজেও তামিম ভাইয়ের ফ্যান।’
ক্রিকেট ম্যাচের পরিস্থিতির মতো তাহলে সম্পর্কও বদলায়। বিসিবির নির্বাচন দুরের কাউকে কাছে আনে, আবার কাছের কাউকে দূরে ঠেলে দেয়!