হোম > খেলা > ক্রিকেট

কোচ-ক্যাপ্টেন ‘সাইজ’, দলও ‘কাইত’Ñইমরানের ব্যাখ্যা

এম. এম. কায়সার, জাপান থেকে

‘টুর্নামেন্টের আগে হেড কোচ আর ক্যাপ্টেনদের সাইজ করে দিলেন, তাহলে কীভাবে ভালো পারফরম্যান্স আশা করেন?’

নাগোয়ার মাঠে তখন বাংলাদেশের নারী ক্রিকেটারদের মুখে পরাজয়ের হতাশা। কেউ মাথা নিচু করে ড্রেসিংরুমের দিকে ফিরছেন, কেউ ব্যাগ গুছিয়ে নিচ্ছেন। হাতে ধরা স্কোরকার্ডে তখনো ক্ষত ছড়াচ্ছে ৩১ রানের হারে। বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট দলের এশিয়ান গেমস শেষ। পদকের লড়াইও শেষ। এমন একটি হারের পর মিক্সড জোনে দাঁড়িয়ে কোচ সারোয়ার ইমরানের মুখে প্রথমেই এলো ‘বাইরের চাপ’-এর প্রসঙ্গ।

নেতিবাচক খবর, কোচ-অধিনায়ককে নিয়ে আলোচনা, দলের ওপর মানসিক চাপ—সবকিছুকেই ব্যর্থতার সঙ্গে মিলিয়ে দেখালেন তিনি। পাওয়ার প্লেতে মাত্র ২৪ রান হওয়া, বড় শট না আসা, ছক্কা মারতে না পারা—এসবের পাশাপাশি বিভিন্ন মাধ্যমে সমালোচনাকেও দেখালেন দলের পারফরম্যান্সে প্রভাব ফেলার কারণ হিসেবে।

কিন্তু নাগোয়ার খারোগি অ্যাথলেটিক্স পার্কের মাঠ থেকে বেরিয়ে আসার সময় প্রশ্নটা থেকেই গেল—সত্যিই কি বাইরের চাপেই হেরেছে বাংলাদেশ? নাকি মাঠের দীর্ঘদিনের ব্যর্থতার পর এখন চারপাশ থেকে ‘কারণ’ এনে ব্যাখ্যাটা একটু সহজ করে নেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে?

১৪৫ রান তাড়া করতে নেমে বাংলাদেশের শুরুটা টি-টোয়েন্টি ধাঁচের হলো না। পাওয়ার প্লের ছয় ওভারে এসেছে মাত্র ২৪ রান। রান তোলার গতি বাড়েনি পরেও। উইকেট পড়েছে, চাপ বেড়েছে, আর শেষ পর্যন্ত ম্যাচ চলে গেছে পাকিস্তানের হাতে। ৩১ রানের হার দিয়ে ‘ব্রোঞ্জ স্বপ্নের’ মৃত্যু!

ইমরানের যুক্তি, ১৪৫ রান তাড়া করতে পাওয়ার প্লেতে ৪০ থেকে ৪৫ রান দরকার ছিল। সেটি হয়নি। অন্য দলগুলো যেখানে সহজে ছক্কা মারছে, বাংলাদেশ সেখানে পারছে না। এই ব্যাটিং দুর্বলতার কারণ হিসেবে তিনি মানসিক চাপের কথাও বলেছেন।

পাওয়ার প্লেতে রান কম হওয়া যে ম্যাচের একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ, সেটি নিয়ে বিতর্ক নেই। বড় শটের ঘাটতিও বাংলাদেশের নারী ক্রিকেটে নতুন কোনো সমস্যা নয়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এর সবটুকুর দায় কি নেতিবাচক খবরের?

ক্রিকেট মাঠে নেমে ব্যাট চালাতে হয়। বল দেখতে হয়। রান নিতে হয়। চাপের মুহূর্তে সিদ্ধান্তও নিতে হয়। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এই চাপটাই তো খেলার অংশ। সমালোচনা, প্রত্যাশা, অধিনায়কত্ব নিয়ে প্রশ্ন, কোচের ভবিষ্যৎ—এসবের মধ্যেও পারফর্ম করতে হয়।

আর বাংলাদেশের নারী দল তো এক ম্যাচ ধরে খারাপ খেলছে না। এই নাজুক পারফরম্যান্স অনেক লম্বা সময় ধরে চলে আসছে। এ দলটি কখনো কখনো কালেভদ্রে ভালো খেলে। আর নিয়মিতই বাজে খেলে। দলের ব্যাটিং দেখে মনে হয় কাঠে নয়, এই দল ব্যাট করছে বোধ করি লোহার ব্যাটে! ব্যাট তুলতেই যেন দম বেরিয়ে যাচ্ছে। শট খেলবে কীভাবে? বাউন্ডারি লাইন ক্লিয়ারই করতে পারে না কেউ। সবাই সীমানার কাছাকাছি ক্যাচ দিয়ে মাথা নিচু করে ফিরছে।

এশিয়া কাপের সেমিফাইনালে ভারতের কাছে ৪০ রানে হার। এরপর এশিয়ান গেমসে ভারতের কাছে বড় পরাজয়। শেষ সুযোগ ছিল পাকিস্তানের বিপক্ষে ব্রোঞ্জের ম্যাচ। সেখানেও ৩১ রানের হার। পরপর গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে ব্যাটিং ব্যর্থতা, চাপের সময় জুটি না হওয়া এবং ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে না পারা—সব মিলিয়ে প্রশ্নটা তাই শুধু বাইরের চাপের নয়।

প্রশ্নটা মাঠেরও। পারফরম্যান্সেরও। এ দলটি টি- টোয়েন্টি ধাঁচের সঙ্গেই যেন পরিচিত নয়!

এশিয়ান গেমসে মাঠে নামার আগেই বিসিবিকে ইমেইল করে টি-টোয়েন্টি অধিনায়কত্ব ছাড়ার ইচ্ছার কথা জানান জ্যোতি। অর্থাৎ, টুর্নামেন্ট শুরুর আগেই দলের নেতৃত্ব নিয়ে একটা অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল। গেমসে নামার আগে বিসিবি তার কাছ থেকে এমন চিঠি পেয়ে গোস্বা হয়েছে।

কোচ সারোয়ার ইমরানের চুক্তি শেষ হচ্ছে আগামী মাসেই। বিসিবি তাকে আর রাখবে না—এমন সিদ্ধান্তের কথাই ক্রিকেট অঙ্গনে রয়েছে। নতুন কোচও প্রায় চূড়ান্ত করে ফেলেছে বোর্ড। ফলে দলের ভেতরে কোচ-অধিনায়কের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা থাকবেÑসেটাই স্বাভাবিক।

কিন্তু এখানেই তো আসল পরীক্ষা।

একজন কোচকে শুধু শান্ত পরিবেশে দল পরিচালনা করতে হয় না। একজন অধিনায়ককেও শুধু জয়ের দিনে নেতৃত্ব দিতে হয় না। প্রতিকূলতা সামলানো, সমালোচনা গ্রহণ করা, খেলোয়াড়দের মানসিকভাবে প্রস্তুত রাখা—এসবও পেশাদার ক্রিকেটের অংশ।

তাহলে সমালোচনা এলেই সেটাকে ‘সাইজ করে দেওয়া’ বলতে হবে কেন?

দল ভালো খেললে প্রশংসা পাবে। খারাপ খেললে প্রশ্নের মুখোমুখি হবেÑএটা কোনো ব্যক্তিগত আক্রমণ নয়। এটা জবাবদিহির স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। বিশেষ করে যখন একটি দল দীর্ঘ সময় ধরে প্রত্যাশিত পারফরম্যান্স দিতে পারছে না। বাংলাদেশ নারী ক্রিকেটের ইতিহাসও সে প্রশ্নকে আরো জোরালো করে।

একসময় এই এশিয়ান গেমস থেকেই স্বর্ণ জিতেছিল বাংলাদেশের নারী ক্রিকেট দল। সেই বাংলাদেশ এখন ব্রোঞ্জের ম্যাচেও হেরে পদকহীন হয়ে দেশে ফিরছে। সোনার মঞ্চ থেকে পদকের বাইরে চলে যাওয়ার এই যাত্রার হিসাব তো চাইতেই হবে।

অবশ্যই সব দায় কোচের নয়। নারী ক্রিকেটের ঘরোয়া কাঠামো, স্কুল ক্রিকেটের সীমাবদ্ধতা, প্রতিভা তৈরির ঘাটতি—ইমরান যে সমস্যাগুলোর কথা বলেছেন, সেগুলো বাস্তব ও দীর্ঘমেয়াদি। শ্রীলঙ্কার সঙ্গে বাংলাদেশের কাঠামোগত পার্থক্যের কথাও তিনি বলেছেন। এসব নিয়ে বোর্ডকে ভাবতে হবে।

কিন্তু কাঠামোগত দুর্বলতা আর একটি নির্দিষ্ট ম্যাচের ব্যর্থতা এক জিনিস নয়।

১৪৫ রান তাড়া করতে নেমে কেন পাওয়ার প্লেতে ২৪ রান হলো, কেন মাঝের ওভারে ম্যাচের গতি বদলানো গেল না, কেন বড় শট এলো না—এসবের উত্তর ক্রিকেটের ভেতরেই খুঁজতে হবে। মানসিক চাপ থাকলে সেই চাপ সামলানোর প্রস্তুতিও দলেরই অংশ। আর সেই প্রস্তুতির দায় কোচিং স্টাফ ও নেতৃত্বের ওপরও থাকে।

নাগোয়ার এই ক্রিকেট মাঠে তখন পাকিস্তানের খেলোয়াড়দের উচ্ছ্বাস। অন্য পাশে বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা নিঃশব্দে ড্রেসিংরুমে ফিরছেন। কয়েক ঘণ্টা আগেও যাদের চোখে ছিল পদকের স্বপ্ন, তাদের হাতে এখন শুধু কাঁধে ক্রিকেট ব্যাগ। বাড়ি ফেরার তাড়া।

এ দলকে নতুন করে শুরু করতে হবে। নতুন অধিনায়ক আসবে। নতুন কোচ আসবে। হয়তো নতুন পরিকল্পনাও হবে। কিন্তু পুরোনো প্রশ্নগুলো সঙ্গে নিয়েই শুরু করতে হবে সেই নতুন যাত্রা।

কারণ, সমালোচনা বন্ধ করে ক্রিকেটে জেতা যায় না।

সমালোচনার জবাব দিতে হয় ব্যাটে, চাপের জবাব দিতে হয় পারফরম্যান্সে। ক্যাপ্টেন জ্যোতি ও কোচ সারোয়ার ইমরানের দল সেখানে জিরো, বিগ জিরো!

এশিয়ান গেমসে সাইফউদ্দিনের বদলি আলিস

প্রথমবার বিদেশি লিগে ডাক পেলেন রুবেল, খেলবেন সাকিবের দলে

সরোয়ারকে শোকজ নোটিশ দেয়ার সিদ্ধান্ত বিসিবির

'কিছুদিন ধরেই ভালো খেলছি না', ব্রোঞ্জ হারিয়ে শারমিনের আক্ষেপ

এশিয়ান গেমসে পদকহীন বাংলাদেশ, রুমানার কণ্ঠে আক্ষেপ

মাঠের বাইরের ঘটনাকে দায় দিচ্ছেন কোচ ইমরান

পাকিস্তানের কাছে হেরে শূন্য হাতে বিদায় বাংলাদেশের

কাবাডি ও ক্রিকেটে পদক জয়ের দিন আজ

ব্রোঞ্জের লড়াইয়ে প্রতিপক্ষ পাকিস্তান

প্রস্তুতি ম্যাচে লিটনদের হারাল সোহানরা